বিন্দু ও বিসর্গ: খাজুরাহো-র অতীন্দ্রিয় সভা

0
1297

খাজুরাহোয় পৌঁছনোর আগে আমি জানতাম, এই শহরকে মানুষ সাধারণত দু’ভাবে চেনে। এক, মধ্যপ্রদেশের প্রাচীন চন্দেল রাজাদের নির্মিত মন্দিরগুলির জন্য; দুই, মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সেই সব নারী-পুরুষের শরীরের জন্য, যাদের দেখে আজও আমাদের সমাজের বহু মানুষের চোখে একই সঙ্গে বিস্ময়, লজ্জা, কৌতূহল এবং এক ধরনের গোপন হাসি এসে যায়। কিন্তু খাজুরাহোয় পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতিটি আমাকে আচ্ছন্ন করল, তা এর কোনওটিই নয়। বরং মনে হল, এত শতাব্দী ধরে পাথরের ভিতরে যে মানুষগুলি বাস করে আছে, তাদের শরীরের উষ্ণতা এখনও এই শুকনো মাটির বাতাসে মিশে আছে। চারদিকে মধ্য ভারতের রোদ, দূরে গাছের রেখা, আকাশের নিচে উঠে দাঁড়ানো শিখরগুলি—আর তাদের গায়ে অসংখ্য মানুষ। দেবতা, দেবী, যোদ্ধা, সঙ্গীতশিল্পী, নর্তকী, পশু, পাখি, রাজসভা, গৃহস্থের জীবন, যুদ্ধ, অলঙ্কার, প্রসাধন, প্রেম, আলিঙ্গন এবং যৌনতার নানা দৃশ্য। মনে হয়, পাথর এখানে কেবল পাথর নয়, সময়ের জমাট শরীর। আর সেই শরীরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হল, খাজুরাহো আসলে যৌনতার ইতিহাস নয়; খাজুরাহো হল মানুষের শরীরকে ভারতীয় সভ্যতা কীভাবে দেখেছিল তার এক অসাধারণ দলিল।

খাজুরাহোর বর্তমান মন্দিরসমষ্টি মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর অঞ্চলে। দশম ও একাদশ শতকে চন্দেল রাজবংশের শক্তির উত্থানের সঙ্গে এই মন্দিরগুলির নির্মাণ জড়িয়ে। চন্দেলদের রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষকাল মোটামুটি ৯৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এক সময় এই অঞ্চলে প্রায় ৮৫টি মন্দির ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়; আজ টিকে আছে প্রায় কুড়ি-বাইশটি, পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ—এই তিনটি গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে। হিন্দু ও জৈন—দুই ধর্মীয় পরম্পরার মন্দিরই এই সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত। উত্তর ভারতের নাগর শৈলীর মন্দির-স্থাপত্য এখানে এমন এক পূর্ণতা পেয়েছে, যেখানে স্থাপত্য আর ভাস্কর্যকে আলাদা করে দেখা প্রায় অসম্ভব। UNESCO-ও খাজুরাহোর বিশেষত্ব হিসেবে এই স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অভূতপূর্ব সমন্বয়ের কথাই বলেছে।

কিন্তু ইতিহাস জানার পরও যখন প্রথম মন্দিরটির সামনে দাঁড়াই, ইতিহাস যেন পিছনে সরে যায়। সামনে তখন শুধু পাথর। আর সেই পাথরের গায়ে একটি নারী। তার শরীর যেন কোনও নির্দিষ্ট বয়সে থেমে নেই। কোমর সামান্য বেঁকে আছে, একটি হাত শরীরের রেখাকে অনুসরণ করছে, মুখে এমন একটি অভিব্যক্তি যা একই সঙ্গে আত্মসচেতন এবং অন্যমনস্ক। তার গলায় হার, কানে দুল, কোমরে অলঙ্কার। আমি তাকে দেবী বলব, না মানুষ বলব, না সৌন্দর্যের কোনও আদর্শ রূপ বলব—ঠিক বুঝতে পারি না। ভারতীয় মন্দিরের ভাস্কর্যে এই ধরনের নারীকে প্রায়ই সুরসুন্দরী বা দেবাঙ্গনা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নাম দিয়ে কি তাকে সম্পূর্ণ বোঝা যায়? সে কি কেবল দেবতার মন্দিরের অলঙ্কার? নাকি সে সেই নারীশরীর, যার উপস্থিতি ছাড়া ভারতীয় মন্দিরের কল্পনাই অসম্পূর্ণ? খাজুরাহোর গায়ে যে বিপুল সংখ্যক নারী-মূর্তি ছড়িয়ে আছে, তাদের কেউ আয়না দেখছে, কেউ চুল বাঁধছে, কেউ পায়ের কাঁটা তুলছে, কেউ অলঙ্কার পরছে, কেউ পাখির সঙ্গে খেলছে, কেউ সঙ্গীতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, কেউ প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে। শরীর এখানে নিষ্ক্রিয় নয়। শরীর কাজ করছে, অনুভব করছে, অপেক্ষা করছে, কামনা করছে। এই শরীরের মধ্যেই শিল্পী প্রাণের গতি ধরেছেন।

আমি যখন লক্ষ্মণ মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাই, তখন মনে হয়, মন্দিরের গায়ে খোদাই করা মানুষগুলি যেন আমাকে দেখে ফেলেছে। তাদের চোখ পাথরের, অথচ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। লক্ষ্মণ মন্দির খাজুরাহোর প্রাচীনতম ও গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলির একটি; এর নির্মাণ দশম শতকের মাঝামাঝি চন্দেল রাজা যশোবর্মনের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। মন্দিরের বহির্ভাগে দেবদেবী, মিথুন, সুরসুন্দরী, প্রাণী, দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য—সব মিলিয়ে যেন একটি সম্পূর্ণ জগৎ। মন্দিরের গায়ে জীবনের এত বহুমাত্রিক উপস্থিতি দেখে মনে হয়, এখানে ধর্ম কোনও বিচ্ছিন্ন অঞ্চল নয়, জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যে টেনে নেওয়া একটি মহাবৃত্ত। খাজুরাহোর মন্দিরের দেওয়াল তাই ধর্মীয় ছবি দিয়ে শুধু পূর্ণ হয়নি; মানুষও সেখানে পূর্ণমাত্রায় উপস্থিত। প্রেমিক-প্রেমিকা আছে, সঙ্গীত আছে, নৃত্য আছে, যুদ্ধ আছে, প্রসাধন আছে, হাসি আছে, শরীর আছে। অর্থাৎ দেবতার কাছে পৌঁছনোর পথটি মানুষের জীবনকে বাদ দিয়ে তৈরি হয়নি।

এরপর আমি যখন কান্দারিয়া মহাদেব মন্দিরের সামনে দাঁড়াই, তখন খাজুরাহোর প্রকৃত বিস্ময়টি যেন হঠাৎ আমার সামনে খুলে যায়। প্রায় চল্লিশ মিটার উচ্চতায় উঠে যাওয়া শিখরটি দূর থেকে মনে হয় যেন পাথরের পাহাড়। ভারতীয় মন্দির-স্থাপত্যে শিখর কেবল একটি স্থাপত্যরীতি নয়; তা এক ধরনের ঊর্ধ্বগমন। মাটির পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে ওঠা। তাই কান্দারিয়া মহাদেবের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতা—তার কাম, ভয়, আনন্দ, দুঃখ, সৌন্দর্য—সবকিছু অতিক্রম করে কোনও এক কেন্দ্রের দিকে এই উত্থান। আর সেই উত্থানের পথের গায়ে খোদাই করা মানুষের শরীর। এ এক গভীর বৈপরীত্য, আবার হয়তো বৈপরীত্যও নয়। UNESCO-র বর্ণনায় কান্দারিয়া মহাদেবের ভাস্কর্যসম্ভারকে ভারতীয় শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলির মধ্যে গণ্য করা হয়েছে।

কান্দারিয়ার দেওয়ালে প্রথম যে মিথুন-মূর্তিটির সামনে দাঁড়ালাম, তাকে দেখে আমার মনে হল, আমরা আজকের চোখ দিয়ে এই শরীরকে দেখছি, কিন্তু শিল্পী নিশ্চয়ই এই শরীরকে আমাদের মতো করে দেখেননি। তাঁর কাছে নগ্নতা কি লজ্জার? সম্ভবত সবসময় নয়। যৌনতা কি পাপ? ভারতীয় দর্শনের বহু ধারায় তা এত সরলভাবে বলা যায় না। কাম ভারতীয় পুরুষার্থচতুষ্টয়ের একটি—ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। অর্থাৎ মানুষের জীবনের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, রতি, সৌন্দর্য, ইন্দ্রিয়সুখ—এগুলি মানবজীবনের স্বীকৃত ক্ষেত্র। কামকে স্বীকার করা আর কামকে জীবনের একমাত্র সত্য বলে মানা এক জিনিস নয়। ভারতীয় চিন্তার বিশেষত্ব এখানেই—একটি প্রবৃত্তিকে অস্বীকার না করেও তাকে জীবনের বৃহত্তর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোর ভিতরে রাখা যায়। খাজুরাহোর পাথর যেন সেই জটিলতারই দৃশ্যমান রূপ।

কিন্তু এখানেই একটি ভুল ধারণা থেকে সাবধান হওয়া দরকার। খাজুরাহোর মন্দিরের সমস্ত ভাস্কর্য যৌন নয়, এমনকি যৌন দৃশ্যগুলিও মোট ভাস্কর্যের ক্ষুদ্র অংশ। মন্দিরের বৃহত্তর ভাস্কর্যভুবনে দেবদেবী, সুরসুন্দরী, সঙ্গীতজ্ঞ, যোদ্ধা, প্রাণী, গৃহস্থ জীবন, অলঙ্করণ এবং নানা সামাজিক দৃশ্য রয়েছে। ফলে খাজুরাহোকে শুধু ‘সেক্স মন্দির’ হিসেবে দেখা তার শিল্প ও ইতিহাসকে ভয়াবহ ভাবে সংকুচিত করা। গবেষণাতেও এই সরলীকরণের বিরুদ্ধে সতর্কতা রয়েছে। সাম্প্রতিক এক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা যেমন মনে করিয়ে দিয়েছে, খাজুরাহোর যৌনভাস্কর্যকে শুধু ধর্মীয় প্রতীক বা শুধু যৌনতার ছবি—কোনও একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না; নন্দনতত্ত্ব, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং যৌনতার পারস্পরিক সম্পর্ক একসঙ্গে দেখতে হয়।

আমি আবার সেই মূর্তিটির কাছে ফিরে যাই। এবার আর তার যৌনতা আমার চোখে প্রথম হয়ে ওঠে না। বরং শরীরের নির্মাণ দেখি। পাথরের মধ্যে এমন নরমতা কীভাবে এল? স্তনের বক্রতা, কোমরের সূক্ষ্ম ভাঁজ, উরুর টান, গলার রেখা—কঠিন পাথর যেন মানুষের চামড়ার স্মৃতি ধরে রেখেছে। শিল্পী শরীরকে শুধু অনুকরণ করেননি; শরীরের ভিতরে যে গতি, তাকে ধরেছেন। খাজুরাহোর নারীরা তাই দাঁড়িয়ে থেকেও স্থির নয়। তারা যেন একটু পরেই নড়বে। কেউ চুল সরাবে, কেউ চোখ তুলবে, কেউ প্রেমিকের দিকে এগিয়ে যাবে। এই চলমানতা ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্যতম রহস্য। পাথরকে জীবন্ত করার জন্য এখানে পেশির বাস্তব অনুকরণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শরীরের ভিতরের ছন্দ। সেই ছন্দই তাদের শরীরকে রসের শরীর করে তোলে।

ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে ‘শৃঙ্গার’ কেবল যৌনতার সমার্থক নয়। প্রেম, আকর্ষণ, বিরহ, মিলন, সৌন্দর্য, দেহের সাজ, চোখের ভাষা—সব মিলিয়ে শৃঙ্গার রসের বিস্তৃত ক্ষেত্র। খাজুরাহোর ভাস্কর্যগুলিকে সেই নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বাইরে রেখে শুধু পাশ্চাত্য অর্থে ‘erotic sculpture’ বললে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অদৃশ্য হয়ে যায়। এখানে দেহ কামনার বিষয়, কিন্তু একই সঙ্গে সৌন্দর্যেরও বিষয়। আর সৌন্দর্য ভারতীয় ভাবনায় অনেক সময় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে কোনও বৃহত্তর সত্যের দরজা খুলে দেয়। শরীরকে অস্বীকার না করে শরীরের মধ্য দিয়েই অশরীরের দিকে যাওয়া—ভারতীয় সাধনা ও শিল্পের বহু ধারায় এই আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়।

খাজুরাহোর মিথুনমূর্তিগুলির সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়—মন্দিরের গায়ে যৌনতার ছবি কেন? এর কোনও একক উত্তর নেই। কেউ এর সঙ্গে তান্ত্রিক সাধনার সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, এগুলি শুভ, উর্বরতা ও জীবনের শক্তির প্রতীক। কেউ বলেছেন, মন্দিরের বহির্ভাগে জাগতিক জীবনের ছবি আর ভিতরের গর্ভগৃহে দেবতার উপস্থিতি একটি প্রতীকী যাত্রা নির্মাণ করে। আবার কেউ এর ব্যাখ্যায় মধ্যযুগীয় সমাজের বহুমাত্রিক জীবন ও কামসংস্কৃতির প্রতিফলন দেখেছেন। ভারত সরকারের অধীন শিক্ষামূলক একটি গবেষণাধর্মী মডিউলেও খাজুরাহোর erotic imagery নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যার কথা বলা হয়েছে এবং তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা আলোচিত হয়েছে। কিন্তু কোনও একটি তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

তন্ত্রের প্রসঙ্গ এলে খাজুরাহোর শরীরগুলি যেন আরও অন্যরকম হয়ে ওঠে। ভারতীয় তন্ত্র শরীরকে কেবল পরিত্যাজ্য বস্তু হিসেবে দেখে না। শরীর, শক্তি, ইন্দ্রিয়, কামনা—সবকিছুকেই সাধনার পরিসরে নিয়ে আসার বিভিন্ন তান্ত্রিক পথ ছিল। লক্ষ্মণ মন্দির নিয়ে শিল্প-ইতিহাসের আলোচনায় খাজুরাহোর যৌনচিত্রের সঙ্গে কপালিক ও তান্ত্রিক প্রথার সম্ভাব্য সম্পর্কও আলোচিত হয়েছে, যদিও এই ব্যাখ্যা সর্বসম্মত নয়। এখানে একটি গভীর ভারতীয় দার্শনিক প্রশ্ন এসে পড়ে—যাকে জয় করতে চাই, তাকে কি প্রথমে অস্বীকার করব, না তার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করব? কামকে দমন করা এক পথ; কামকে বুঝে তাকে অতিক্রম করা আর এক পথ। তন্ত্রের বহু ব্যাখ্যায় দ্বিতীয় পথটির গুরুত্ব আছে। খাজুরাহোর পাথর সেই দর্শনের সরাসরি পাঠ্যপুস্তক কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে; কিন্তু এই ভাস্কর্যগুলি অন্তত এমন একটি সভ্যতার স্মৃতি বহন করে যেখানে শরীর ও আত্মাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়নি।

আমি মন্দিরের প্রদক্ষিণপথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখতে পাই, একটি পুরুষ ও একটি নারী একে অপরের দিকে ঝুঁকে আছে। তাদের চারপাশে যেন আরেক পৃথিবী। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবি, এই দুই শরীর কি শুধু দুই শরীর? ভারতীয় দর্শনে শিব ও শক্তির সম্পর্কের কথা মনে পড়ে। শিব চেতনা, শক্তি ক্রিয়া; শিব স্থির, শক্তি গতিশীল—এই প্রতীকী ভাষা পরবর্তী শৈব-শাক্ত তন্ত্রে বহুভাবে বিকশিত হয়েছে। অবশ্য খাজুরাহোর প্রতিটি মিথুনমূর্তিকে শিব-শক্তির প্রতীক বলে দেওয়া ইতিহাসের পক্ষে অতিরঞ্জিত হবে। কিন্তু ভারতীয় শিল্পে নারী-পুরুষের মিলন যে কেবল ব্যক্তিগত যৌনতার দৃশ্য নয়, সৃষ্টির আদিম শক্তিরও একটি রূপ হতে পারে—এই ধারণা অস্বাভাবিক নয়। সৃষ্টি নিজেই তো এক মিলন। জীবন এক দেহ থেকে আর এক দেহে প্রবাহিত হয়। প্রজনন, আনন্দ, আকাঙ্ক্ষা—সবই জীবনশক্তির প্রকাশ। এই জায়গাতেই ‘কাম’ আর ‘সৃষ্টি’ পরস্পরের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়।

তারপর আমার চোখে পড়ে অন্য এক দৃশ্য—একজন নারী আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। আমি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকি। যৌনতার কোনও প্রত্যক্ষ দৃশ্য নেই এখানে। অথচ এই মূর্তির মধ্যে যে আত্মসচেতনতা, তা হয়তো আগের দৃশ্যগুলির থেকেও বেশি ইন্দ্রিয়ময়। আয়নায় নিজেকে দেখা মানে নিজেকে অন্যের চোখে দেখার প্রস্তুতি। নিজের শরীরকে নিজের কাছে আবিষ্কার করা। ভারতীয় শিল্পে নারীদেহ তাই কেবল পুরুষের দৃষ্টির বস্তু নয়; সে নিজেও নিজের শরীরের অধিকারী, নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে সচেতন। খাজুরাহোর সুরসুন্দরীদের মধ্যে এই আত্মসচেতনতা বারবার ফিরে আসে। তাদের শরীর যেন দর্শকের জন্য যেমন, নিজের জন্যও তেমন।

খাজুরাহোতে নারীকে দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে ভারতীয় দর্শনের ‘প্রকৃতি’ ধারণার কথাও ভাবায়। সাংখ্যে পুরুষ ও প্রকৃতি—দুই মৌল নীতির সম্পর্ক। পুরুষ চৈতন্য, প্রকৃতি সমস্ত পরিবর্তনশীল জগতের উৎস। যদিও সাংখ্য দর্শনকে সরাসরি খাজুরাহোর প্রতিটি ভাস্কর্যের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না, তবু ভারতীয় চিন্তায় নারী ও সৃষ্টিশক্তির সম্পর্ক যে কত গভীর, তা বুঝতে এই দার্শনিক-ঐতিহ্য সাহায্য করে। পরবর্তী শাক্ত দর্শনে দেবীই শক্তি, দেবীই সৃষ্টির গতিশীলতা। তখন নারীশরীর কেবল আকর্ষণের বস্তু নয়, মহাশক্তির দৃশ্যমান রূপ। খাজুরাহোর পাথরে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য নারীকে তাই কেবল ‘সেক্সি ফিগার’ বলে দেখলে তাদের শিল্প-দার্শনিক গভীরতার প্রতি অন্যায় করা হয়।

মন্দিরের আরও কাছে যাই। ভাস্কর্যের পাশে ভাস্কর্য। কখনও একা নারী, কখনও জোড়া, কখনও একাধিক চরিত্র। কোনও কোনও দৃশ্য এত স্পষ্ট যে আধুনিক চোখ তাকে সঙ্গে সঙ্গে যৌন দৃশ্য বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই দৃশ্যগুলির পাশে আবার সঙ্গীতজ্ঞ, নর্তক, দেবতা, পশু, রাজপুরুষ। অর্থাৎ কাম এখানে একটি বিচ্ছিন্ন ঘর নয়। জীবনের একই দেওয়ালে প্রেমের পাশে যুদ্ধ, প্রসাধনের পাশে পূজা, শরীরের পাশে দেবতা। এই বিন্যাসই হয়তো খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় দার্শনিক শিক্ষা—মানুষের জীবনকে টুকরো করে দেখা যায় না। আমরা একই সঙ্গে শরীরী, সামাজিক, নৈতিক, রাজনৈতিক, নান্দনিক এবং আধ্যাত্মিক।

‘কামসূত্র’-এর কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। বাত্স্যায়নের কামসূত্র ভারতীয় কামশাস্ত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ, এবং খাজুরাহোর ভাস্কর্য দেখলেই আধুনিক দর্শক তার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজতে চান। কিন্তু খাজুরাহোর ভাস্কর্যকে সরাসরি কামসূত্রের চিত্ররূপ বলা ঠিক নয়। কামশাস্ত্র একটি বিস্তৃত জ্ঞানপরম্পরা; তার মধ্যে যৌন আচরণ ছাড়াও প্রেম, সামাজিক সম্পর্ক, সৌন্দর্য, অলঙ্কার, নাগরিক জীবন, দাম্পত্য এবং রতিক্রিয়ার নানা প্রসঙ্গ আছে। অন্যদিকে খাজুরাহোর ভাস্কর্য একটি মন্দির-স্থাপত্যের সামগ্রিক কর্মসূচির অংশ। গবেষণাতেও কামসূত্র এবং খাজুরাহোকে পাশাপাশি রেখে আলোচনা করা হলেও তাদের সরাসরি একে অপরের illustrated version হিসেবে দেখার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আমি এবার মন্দিরের ভাস্কর্য থেকে চোখ সরিয়ে ভিতরের দিকে তাকাই। বাইরে এত দেহ, ভিতরে গর্ভগৃহ। বাইরে আলো, মানুষের চলাচল, অসংখ্য আকৃতি; ভিতরে অন্ধকার, স্থিরতা, দেবতার উপস্থিতি। এই স্থাপত্যিক যাত্রার মধ্যে কি কোনও দর্শন লুকিয়ে আছে? আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে প্রতিটি যৌনমূর্তি এই নির্দিষ্ট দর্শনের জন্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতাটি নিজেই একটি অর্থ তৈরি করে। বাইরে থেকে ভিতরে যেতে যেতে মানুষের দেহ, কামনা, সৌন্দর্য, সমাজ, পৃথিবী—সব পেরিয়ে এক অন্ধকার কেন্দ্রে পৌঁছনো। সেই কেন্দ্র যেন ইন্দ্রিয়ের বাইরে। মন্দিরের বহিরঙ্গ তাই জগতের বহুত্ব, আর গর্ভগৃহ তার কেন্দ্রীভূত একত্ব। ভারতীয় মন্দির-ভাবনার সঙ্গে এই প্রতীকী পাঠের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আমার মনে হয়, খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় ভুল পাঠ হল—এখানে যৌনতা আছে, তাই খাজুরাহো ‘যৌনতার মন্দির’। যেন কয়েকটি স্পষ্ট মূর্তিই সমগ্র স্থাপত্যকে সংজ্ঞায়িত করে। অথচ এই মন্দিরগুলির গায়ে যে বিপুল সংখ্যক ভাস্কর্য, তার অধিকাংশই যৌন দৃশ্য নয়। UNESCO-র বিবরণেও ধর্মীয় আচার, দেবদেবী, দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষক-শিষ্য, নর্তক-বাদক, প্রেমিক-প্রেমিকা—সবকিছুকে একই ভাস্কর্যজগতের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে খাজুরাহোকে বুঝতে হলে আমাদের চোখকে প্রথমে যৌনতার উত্তেজনা থেকে সরিয়ে জীবনের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তখনই দেখা যায়, যৌনতা এখানে জীবনের একটি মাত্র ভাষা, সমগ্র ভাষা নয়।

এমন সময় একটি জৈন মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালে অভিজ্ঞতাটি আরও বিস্ময়কর হয়। খাজুরাহোর পূর্ব গোষ্ঠীতে জৈন মন্দিরগুলিও এই সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের অংশ। হিন্দু ও জৈন ধর্মীয় স্থাপত্য পাশাপাশি টিকে আছে। এ থেকেই বোঝা যায়, খাজুরাহো কোনও একক ধর্মীয় মতের সরল প্রকাশ নয়; এটি ছিল মধ্যযুগীয় এক বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর। UNESCO-র নথিতেও খাজুরাহোর মন্দিরসমূহকে হিন্দু ও জৈন—দুই ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। আর তখন মনে হয়, ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসকে যদি শুধু একটিমাত্র ধর্মীয় সূত্রে পড়তে যাই, তা হলে খাজুরাহোর মতো জায়গা আমাদের বারবার থামিয়ে দেবে।

খাজুরাহোর ইতিহাসের আর একটি দিক আমাকে ভাবায়—তার হারিয়ে যাওয়া। যে নগরীতে একসময় এতগুলি মন্দির ছিল, আজ সেখানে মাত্র কয়েক ডজনের স্মৃতি। ইতিহাসের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল, অবক্ষয়, আক্রমণ, সময় এবং প্রকৃতি—সব মিলিয়ে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক জগত ক্রমে ক্ষয়ে গেছে। যে মানুষগুলি এই মূর্তি গড়েছিল, তারা জানত না তাদের নাম ইতিহাসে থাকবে না। কোনও শিল্পীর স্বাক্ষর নেই। কিন্তু তার হাতের রেখা আছে। সে হয়তো কোনও একদিন পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে নারীর কোমরের বাঁক কেটেছিল, কিংবা একটি পুরুষের কাঁধে পেশির টান তুলেছিল। সে জানত না হাজার বছর পরে একজন পথিক এসে তার হাতের কাজ দেখে নিজের সভ্যতাকে নতুন করে প্রশ্ন করবে।

এই প্রশ্নটিই খাজুরাহো আমাকে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে—আমরা দেহকে কী ভাবে দেখি? আজকের সমাজে শরীরকে আমরা একই সঙ্গে বাজারের পণ্য, নৈতিকতার বিষয়, আকাঙ্ক্ষার বিষয় এবং গোপনতার বিষয় করে ফেলেছি। নগ্নতা মানেই যৌনতা, যৌনতা মানেই লজ্জা—এই সরল সমীকরণ আমাদের চোখকে অনেক কিছু দেখতে দেয় না। খাজুরাহোর শিল্পী যেন সেই চোখের সামনে এক বিশাল পাথরের আয়না ধরে বলেন, শরীরকে আগে দেখো। শরীরকে ভয় পেয়ো না। তার সৌন্দর্যকে দেখো, তার কামনাকে দেখো, তার ভঙ্গুরতাকে দেখো, তার সৃষ্টিশক্তিকে দেখো। তারপর প্রশ্ন করো—শরীরের ওপারে কী আছে?

ভারতীয় দর্শনে এই ‘ওপারে’ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। উপনিষদে শরীর চূড়ান্ত আত্মপরিচয় নয়; যোগে শরীর সাধনার ক্ষেত্র; তন্ত্রে শরীর শক্তির আধার; ভক্তিতে শরীর প্রেমের বাহন; কামশাস্ত্রে শরীর আনন্দ ও সামাজিক জীবনের অংশ; নন্দনতত্ত্বে শরীর রসের প্রকাশ। অর্থাৎ ভারতীয় চিন্তার বিভিন্ন ধারায় শরীরকে একটিমাত্র অর্থে বন্দি করা হয়নি। কোথাও শরীরকে অতিক্রম করতে বলা হয়েছে, কোথাও শরীরকে শুদ্ধ করতে, কোথাও শরীরের মধ্যেই শক্তিকে আবিষ্কার করতে, কোথাও শরীরের আনন্দকে স্বীকার করতে। খাজুরাহোর ভাস্কর্য এই বহুস্বরের একটি দৃশ্যমান, পাথুরে প্রতিধ্বনি।

সন্ধের আলো তখন মন্দিরের গায়ে এসে পড়েছে। সূর্যের তাপ একটু নরম হয়েছে। শিখরের গায়ে ছায়া নেমেছে। কিছু মূর্তি আলোয়, কিছু অন্ধকারে। হঠাৎ মনে হল, এই আলো-অন্ধকারই যেন খাজুরাহোর আসল ভাষা। দেহ আছে, কিন্তু দেহের ভিতর অদৃশ্য কিছু আছে। কাম আছে, কিন্তু কামই শেষ কথা নয়। নগ্নতা আছে, কিন্তু তা লজ্জার ভাষায় কথা বলে না। দেবতা আছে, কিন্তু দেবতার দিকে যাওয়ার পথে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং মানুষ তার সমস্ত দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, শরীর এবং ইন্দ্রিয় নিয়ে সেই পথে হাঁটছে।

আমি শেষবার কান্দারিয়া মহাদেবের দিকে তাকাই। পাথরের পাহাড়টি তখন আকাশের দিকে উঠছে। তার নিচে অসংখ্য মানুষ—কেউ আলিঙ্গনে, কেউ নৃত্যে, কেউ প্রার্থনায়, কেউ নিজের শরীর নিয়ে ব্যস্ত, কেউ প্রেমে। মনে হয়, এই মন্দিরের প্রকৃত রহস্য কোনও একটি যৌনমূর্তিতে নেই। রহস্যটি আছে সম্পূর্ণ সমগ্রতায়। মানুষ এখানে দেবতার বিপরীত নয়; মানুষ দেবতার দিকে যাত্রারই একটি অংশ। ইন্দ্রিয় এখানে শত্রু নয়; ইন্দ্রিয় হল অভিজ্ঞতার দরজা। কাম এখানে পাপ নয়; কিন্তু কামই মুক্তি—এ কথাও বলা হয়নি। শরীরকে অস্বীকার না করেই শরীরের সীমা অনুভব করা, আনন্দকে স্বীকার করেও আনন্দের অতীতকে ভাবা—সম্ভবত সেই দ্বন্দ্বের মধ্যেই খাজুরাহোর শিল্পের গভীরতা।

তখন মনে হয়, খাজুরাহোর ভাস্কর্য আসলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা তাদের দেখছি না, তারাও আমাদের দেখছে। এক হাজার বছর আগে যে শিল্পী পাথরে মানুষের দেহের উষ্ণতা রেখে গিয়েছিলেন, তিনি যেন আজকের মানুষকে জিজ্ঞেস করছেন—তোমার শরীরের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী? তুমি কি তাকে লুকিয়ে রাখবে, নাকি বুঝবে? তুমি কি কামনাকে ভয় করবে, নাকি তার প্রকৃতি চিনবে? তুমি কি দেহেই থেমে যাবে, নাকি দেহের ভিতর দিয়ে অন্য কোনও সত্যের দিকে যাবে?

খাজুরাহো থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাই আমার মনে হল, আমি কোনও ‘কামমন্দির’ দেখে ফিরছি না। আমি মানুষের মন্দির দেখে ফিরছি। সেই মানুষ যে একই সঙ্গে কামুক এবং সংযমী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং মুক্তির সন্ধানী, মর্ত্যের এবং দেবতার দিকে মুখ করা। ভারতীয় দর্শনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই স্বীকারোক্তিতে—মানুষকে তার অসম্পূর্ণতা সহকারেই গ্রহণ করা। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ—চারটি পুরুষার্থকে পাশাপাশি রেখে জীবনকে দেখা সেই বহুমাত্রিকতারই একটি প্রাচীন বোধ। খাজুরাহোর পাথর সেই বোধকে কোনও শাস্ত্রের পাতায় নয়, মানুষের শরীরে লিখে রেখেছে।

আর সেই জন্যই খাজুরাহোতে দাঁড়িয়ে কোনও একটি মূর্তির দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা মানে শুধু একটি মূর্তি দেখা নয়। তার কোমরের বাঁক থেকে ইতিহাসে যাওয়া যায়, তার নগ্নতা থেকে নন্দনতত্ত্বে, তার আলিঙ্গন থেকে তন্ত্রে, তার মুখের হাসি থেকে শৃঙ্গার রসে, তার শরীর থেকে পুরুষার্থের ধারণায়, তার পাথর থেকে সময়ের মধ্যে। আর শেষ পর্যন্ত হয়তো দেবত্বের কাছেও। কারণ দেবত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে তাকে কেবল আকাশে খুঁজলে চলবে না—মানুষের শরীরেও তার একটি স্মৃতি থাকে। খাজুরাহো সেই স্মৃতিরই পাথরের মহাগ্রন্থ। এখানে দেহ কোনও নিষিদ্ধ অন্ধকার নয়; দেহই আলোয় আসা মানুষের প্রথম ভাষা। ইন্দ্রিয় কোনও শত্রু নয়; ইন্দ্রিয়ই জগতকে জানার প্রথম দরজা। কাম কোনও একমাত্র সত্য নয়; কিন্তু তাকে অস্বীকার করেও সত্যের কাছে পৌঁছনো যায় না। আর দেবত্ব? হয়তো দেবত্ব সেই মুহূর্তেই জন্ম নেয়, যখন মানুষ নিজের শরীর, নিজের আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের সীমাকে অতিক্রম করার প্রশ্নটি করতে শেখে। খাজুরাহোর মন্দিরের গায়ে তাই শুধু পাথর খোদাই করা নেই—খোদাই করা আছে মানুষের সেই অনন্ত প্রশ্ন: আমি কে, আমার দেহ কী, আমার কামনা কোথা থেকে আসে, এবং এই সমস্ত দৃশ্যমান জীবনের ভিতর দিয়ে আমি কোন অদৃশ্যের দিকে এগিয়ে চলেছি?  খাজুরাহোর ভাস্কর্যগুলিকে দূর থেকে একসঙ্গে দেখলে তারা যেন একটি বিপুল পাথুরে জনসমুদ্র। কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি মুখ আলাদা, প্রত্যেকটি শরীরের নিজস্ব ভাষা আছে, প্রত্যেকটি ভঙ্গির মধ্যে কোনও না কোনও গল্প থেমে আছে। তাই খাজুরাহোকে বোঝার একমাত্র উপায় হয়তো তার দেওয়াল ধরে ধীরে ধীরে হাঁটা। কোনও মূর্তির সামনে পাঁচ মিনিট, কোনওটির সামনে দশ মিনিট, কখনও আরও বেশি। যে মূর্তিটিকে দূর থেকে শুধু এক সুন্দরী নারী বলে মনে হয়েছিল, কাছে গিয়ে দেখা গেল তার পায়ের কাছে একটি কাঁটা। নারীটি শরীরটিকে এমনভাবে বাঁকিয়েছে যে মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত দেহরেখা বদলে গেছে। আমি লক্ষ্মণ মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম দিকের সেই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়াই। মনে হয়, সে যেন এইমাত্র হাঁটতে হাঁটতে কাঁটায় পা দিয়েছে। এক পা সামান্য তুলে নিয়েছে, শরীর পিছনে বেঁকেছে, মুখ ঘুরেছে, একটি হাত দিয়ে নিজের পায়ের দিকে ইঙ্গিত করছে, অন্য হাতের ভঙ্গিতে যেন সঙ্গীকে বলছে—এসো, কাঁটাটি বার করে দাও। মূর্তিটির আশ্চর্য হল, এখানে কোনও দেবত্ব নেই, কোনও পৌরাণিক নাটক নেই, কোনও মহাকাব্যের যুদ্ধ নেই। আছে একটি অতি সাধারণ মানবিক মুহূর্ত—পায়ে কাঁটা ফুটেছে, আর একজন মানুষ আর একজন মানুষের সাহায্য চাইছে। অথচ সেই সাধারণ মুহূর্তকেই শিল্পী এমন এক সৌন্দর্যে উন্নীত করেছেন যে তা আর সাধারণ থাকে না।

এই নারীটির দিকে তাকিয়ে আমার প্রথমে শরীরের কথাই মনে হয়। তার শরীরের ভাঁজগুলি যেন স্থির নয়, চলমান। একটি পা মাটিতে, অন্যটি প্রায় শরীর থেকে আলাদা হয়ে উঠে এসেছে; কোমর বাঁকতে গিয়ে ধড়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করেছে। ভারতীয় ভাস্কর্যের এই ত্রিভঙ্গ ভঙ্গি—মাথা, ধড় ও কোমরের তিনটি বিপরীত বাঁক—শরীরকে যেন একটি সরল জ্যামিতি থেকে মুক্ত করে। সে আর সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিমা নয়, সে হয়ে ওঠে গতি। শিল্পী যেন পাথরের ভিতর থেকে হাঁটার শব্দ শুনেছেন। লক্ষ্মণ মন্দিরের এই বিখ্যাত ‘thorn-puller’ বা কাঁটা তুলতে থাকা নারীর ভাস্কর্যকে শিল্প-ইতিহাসের আলোচনাতেও আদর্শ নারীসৌন্দর্য ও মন্দির-অলঙ্করণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। এমন নারীমূর্তিকে মন্দির-স্থাপত্যে শুভ, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

কিন্তু আমি তাকে কোনও প্রতীকের মধ্যে আটকে রাখতে পারি না। আমার চোখে সে প্রথমে একজন নারী। তার পায়ে কাঁটা ফুটেছে। এই ক্ষুদ্র যন্ত্রণাটুকুই তাকে আমার কাছে এত মানবিক করে তোলে। দেবীর শরীরে ব্যথা কল্পনা করা যায়, কিন্তু মন্দিরের দেওয়ালে একজন সাধারণ নারীর পায়ে কাঁটা ফুটেছে—এই দৃশ্য আমাকে মধ্যযুগীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাছে নিয়ে যায়। খাজুরাহোর শিল্পীরা যে শুধু দেবতা বানাননি, মানুষও বানিয়েছেন, এই একটি মূর্তিই তার প্রমাণ। মন্দিরের গায়ে যে জীবন খোদিত হয়েছিল, তা ছিল পূজা ও পুরাণের পাশাপাশি মানুষের শরীরেরও জীবন।

আর তখনই আমার মনে হয়, ভারতীয় শিল্পে সৌন্দর্য কখনও কেবল মুখের সৌন্দর্য নয়। সৌন্দর্য হল ভঙ্গির সৌন্দর্য, চলনের সৌন্দর্য, অপেক্ষার সৌন্দর্য, এমনকি ব্যথারও সৌন্দর্য। কাঁটা ফুটেছে বলে নারীটির শরীরের যে অপ্রস্তুত বাঁক তৈরি হয়েছে, সেটিই তার সৌন্দর্যের কেন্দ্র। শিল্পী যদি তাকে কেবল সোজা করে দাঁড় করাতেন, হয়তো সে সুন্দরীই হত; কিন্তু এই আকস্মিক বিপর্যয় তাকে জীবন্ত করেছে। সৌন্দর্য এখানে স্থিরতা নয়, পরিবর্তন। শরীর নিজের ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার নিজেই ভারসাম্য খুঁজে নিচ্ছে। এই সামান্য দৃশ্যের ভিতরেই যেন ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের একটি গভীর সত্য—রস কখনও নিখুঁত স্থিরতার মধ্যে জন্মায় না, জন্মায় অনুভূতির আন্দোলনে।

লক্ষ্মণ মন্দিরের দেওয়াল ধরে আরও এগোতেই দেখি আর-এক নারী। হাতে আয়না। মুখটি আয়নার দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে। সে যেন নিজের মুখ দেখছে, অথচ আমার মনে হয়, সে নিজের মুখ নয়, নিজের অস্তিত্ব দেখছে। আয়নায় নিজেকে দেখা ভারতীয় ভাস্কর্যে একটি অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য, কিন্তু খাজুরাহোর মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে তার অর্থ অন্যরকম হয়ে যায়। কারণ এখানে চারদিকে অসংখ্য চোখ—দর্শকের চোখ, দেবতার চোখ, অন্য মূর্তির চোখ, ইতিহাসের চোখ। সেই সমস্ত চোখের মাঝখানে একজন নারী নিজের দিকে নিজেই তাকাচ্ছে। যেন বলছে, আমাকে তোমরা দেখার আগে আমি নিজেকে দেখি।

আমি ভাবি, এই আত্মদর্শনের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক কোথায়? নিজের মুখ দেখা কি কেবল প্রসাধন? না কি নিজের শরীরকে নিজের বলে অনুভব করার একটি মুহূর্ত? কামকে আমরা প্রায়ই অন্যের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু কামনার প্রথম ভূগোল তো নিজের শরীরেই তৈরি হয়। নিজের ত্বক, নিজের মুখ, নিজের চুল, নিজের গন্ধ, নিজের স্পর্শ—নিজেকে নিজের কাছে আবিষ্কার করার মধ্যেই তো ইন্দ্রিয়ের প্রথম জাগরণ। খাজুরাহোর আয়না-ধরা নারী সেই কারণে আমার কাছে কেবল সজ্জিত সুন্দরী নয়; সে নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন এক মানুষ।

তারপর হঠাৎ চোখে পড়ে এক নর্তকী। পার্শ্বনাথ মন্দিরের ভাস্কর্যে যে নারী নিজের পায়ে নূপুর বা ঘুঙুর বাঁধছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, এই মূর্তিটি যেন শব্দহীন সঙ্গীত। পাথরে কোনও শব্দ নেই, অথচ পায়ের কাছে বাঁধা ঘুঙুরের শব্দ যেন আমি শুনতে পাই। একটি পা সামান্য উঁচু, শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে, দুই হাত পায়ের দিকে। সে নাচ শুরু করার ঠিক আগের মুহূর্তে। নাচ এখনও হয়নি, কিন্তু তার সমস্ত শরীরের ভিতরে নাচের সম্ভাবনা জমে আছে। শিল্পী এখানে আন্দোলনের আগে আন্দোলনকে ধরেছেন।

এই ভাস্কর্যের কাছে এসে ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির অর্থ আমার কাছে একটু বদলে যায়। ইন্দ্রিয় মানে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা নয়। চোখের দেখা, কানের শোনা, চামড়ার স্পর্শ, শরীরের ভারসাম্য, শব্দের প্রতীক্ষা—সবই ইন্দ্রিয়ের জগৎ। ভারতীয় দর্শনে ইন্দ্রিয়কে কখনও নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে, কখনও ইন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করতে। কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ই তো প্রথম দরজা। আমি চোখ দিয়ে মূর্তিটি দেখি, তারপর তার নাচ কল্পনা করি, তারপর শব্দ শুনতে পাই, যদিও বাস্তবে কোনও শব্দ নেই। পাথর আমার চোখের মাধ্যমে সঙ্গীতে পরিণত হয়। এইখানেই শিল্পের আশ্চর্য ক্ষমতা।

আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি সেই নারীকে, যার শরীরের কাছে একটি বিচ্ছু। প্রথম দর্শনে দৃশ্যটি অদ্ভুত। নারীটির শরীরের পাশে একটি ছোট প্রাণী, যেন তার দিকে উঠে আসছে। সে কি তা টের পেয়েছে? না কি পায়নি? তার মুখে যেন অন্য কোনও চিন্তা। শরীরের সৌন্দর্য, অলঙ্কার, ভঙ্গি—সবকিছুর মধ্যে সেই বিচ্ছুটি হঠাৎ একটি বিপদের চিহ্ন হয়ে ওঠে। কামনা ও বিপদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়।

এই মূর্তিটির সামনে দাঁড়িয়ে আমি অনেকক্ষণ ভাবি—বিচ্ছুটি কি কেবল একটি বিচ্ছু? নাকি এটি শিল্পীর তৈরি একটি রূপক? আমাদের ইন্দ্রিয়সুখের মুহূর্তে বিপদও তো নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। কামনা নিজে বিপদ নয়; কিন্তু কামনার সঙ্গে আত্মবিস্মৃতি জুড়ে গেলে বিপদ তৈরি হয়। আবার এও হতে পারে, এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আমাদের আধুনিক মনের তৈরি। শিল্পী হয়তো কেবল একটি বিচ্ছু এঁকেছেন, নারীর অলঙ্করণের অংশ হিসেবে বা জীবনের কোনও আকস্মিক মুহূর্ত ধরে রাখার জন্য। খাজুরাহোর সামনে দাঁড়িয়ে এই অনিশ্চয়তাটিই আমার ভাল লাগে। প্রতিটি মূর্তির অর্থ একবারে খুলে যায় না।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইতিহাসের সৌন্দর্য। আমরা জানি না শিল্পীর মাথায় ঠিক কী ছিল। কোনও মূর্তির পাশে তার নিজের লেখা ব্যাখ্যা নেই। কোনও আধুনিক শিল্পীর মতো তিনি দর্শককে বলেননি—‘এই কাজটির অর্থ এই’। ফলে আমাদের কাজ হল দেখা, তুলনা করা, ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত জানা এবং তারপর অনুমান করা। খাজুরাহো তাই শুধু ভাস্কর্যের সংগ্রহ নয়, ব্যাখ্যারও এক বিশাল ক্ষেত্র।

এরপর আমার চোখ গিয়ে থামে দুই শরীরের মিলনের দিকে। মিথুনমূর্তি। এই শব্দটির মধ্যেই যেন ভারতীয় শিল্পের এক দীর্ঘ ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে। মিথুন—পুরুষ ও নারীর যুগল। প্রথমে তা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল হতে পারে। কখনও আলিঙ্গন, কখনও চুম্বন, কখনও আরও স্পষ্ট যৌন মিলন। কিন্তু খাজুরাহোর শিল্পে মিথুনের তাৎপর্য কেবল শরীরের মিলনে শেষ হয় না। লক্ষ্মণ মন্দিরের ক্ষেত্রে শিল্প-ইতিহাসের ব্যাখ্যায় এই যুগলমূর্তিকে মন্দিরের স্থাপত্যিক সংযোগস্থলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে—যেখানে মণ্ডপ ও গর্ভগৃহের স্থাপত্যিক অংশ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেখানে ‘joined’ বা মিলিত দেহ যেন স্থাপত্যের মিলনেরও এক দৃশ্যমান প্রতিধ্বনি।

আমি সেই যুগলের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি—দুটি মানুষ যখন আলিঙ্গন করে, তখন আসলে কতগুলি সীমা ভেঙে যায়। দুটি শরীরের সীমা, দুটি নিঃশ্বাসের সীমা, দুটি দৃষ্টির সীমা। ভারতীয় দর্শনে ‘অদ্বৈত’ শব্দটির যে গভীরতা, তা সরাসরি এই মূর্তির ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু দেহের মিলনের দৃশ্য আমাকে সেই দার্শনিক প্রশ্নের কথা মনে করায়—দুই কি কখনও এক হতে পারে? প্রেমিক-প্রেমিকার শরীর আলাদা, অথচ আলিঙ্গনের মুহূর্তে তারা নিজেদের আলাদা থাকার কথা ভুলতে চায়। যৌনতার ভিতর এই এক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হয়তো মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন আকাঙ্ক্ষা।

এখানেই ‘মিথুন’ শব্দটি আমার কাছে নতুন অর্থ পায়। এটি শুধু পুরুষ ও নারীর ছবি নয়; এটি সম্পর্কের ছবি। একা মানুষ নিজের শরীর নিয়ে যতই সম্পূর্ণ হোক, সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করলেই তার শরীরের অর্থ বদলে যায়। স্পর্শ তখন ভাষা হয়ে ওঠে। চোখ ভাষা হয়ে ওঠে। নিঃশ্বাস ভাষা হয়ে ওঠে। খাজুরাহোর ভাস্কর্য সেই নীরব ভাষাকে পাথরে অনুবাদ করেছে। কিন্তু এর পরেই দেওয়ালের আর-এক জায়গায় পৌঁছে সেই নীরবতা ভেঙে যায়। এখানে যৌনতার দৃশ্য অনেক বেশি স্পষ্ট। শরীরগুলি জটিল ভঙ্গিতে যুক্ত। একজন পুরুষ, একজন নারী, তাদের পাশে সহায়ক চরিত্র। কোথাও শরীরের ভারসাম্য এমন যে মনে হয়, শিল্পী মানবদেহের সীমা পরীক্ষা করছেন। খাজুরাহোর কয়েকটি ভাস্কর্যে এমন acrobatic sexual posture সত্যিই দেখা যায়; কান্দারিয়া মহাদেব ও বিশ্বনাথ মন্দিরের নির্দিষ্ট ভাস্কর্যগুলির বর্ণনা সরকারি শিল্প-নথিতেও পাওয়া যায়। এই মূর্তিগুলির সামনে এসে আমার চোখ প্রথমে থমকে যায়। তারপর লজ্জা আসে না, বরং বিস্ময় আসে। কীভাবে একটি সভ্যতা মানুষের যৌন শরীরকে এমন প্রকাশ্যে পাথরে রেখে যেতে পারে? প্রশ্নটি আসলে ‘তারা এত খোলামেলা কেন ছিল’—এমন নয়। প্রশ্নটি হওয়া উচিত, তারা শরীর সম্পর্কে কী ভাবত? আমাদের বর্তমান নৈতিকতা, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক যুগের তৈরি যৌন-লজ্জার অনেক ধারণা দিয়ে মধ্যযুগীয় ভারতকে বিচার করলে হয়তো আমরা এই মূর্তিগুলির ভাষা বুঝব না।

তবু খাজুরাহোকে কোনও রোম্যান্টিক ‘অতি-উদার ভারত’-এর প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করতে চাই না। কারণ ইতিহাস কখনও এত সরল নয়। একটি মন্দিরে যৌন ভাস্কর্য থাকা মানেই সেই সমাজের প্রত্যেক মানুষ যৌনতার ক্ষেত্রে একই রকম স্বাধীন ছিল—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাস সমর্থন করে না। শিল্প কোনও সমাজের পূর্ণ সামাজিক আইনপুস্তক নয়। বরং শিল্প আমাদের সামনে সেই সমাজের কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় প্রতীক, নন্দনবোধ এবং ক্ষমতার ভাষার কিছু অংশ খুলে দেয়। খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় সততা সম্ভবত এই যে সে আমাদের উত্তর দেয় না; প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। আমি এবার কান্দারিয়া মহাদেবের দিকে হাঁটি। দূর থেকেই তার শিখর দেখা যায়। যত কাছে যাই, তত মনে হয়, পাথরের শরীরটি অসংখ্য ছোট ছোট শরীর দিয়ে তৈরি। দেবতা, দেবী, নারী, পুরুষ, নর্তকী, যোদ্ধা, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রেমিক, প্রেমিকা—সবাই যেন এক বিশাল জীবন্ত শরীরের কোষ। সরকারি ভারতীয় শিল্প-নথিতে কান্দারিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ ফ্যাসাদের ভাস্কর্যসমূহের মধ্যে দেবদেবী, প্রসাধনরত নারী এবং erotic scene-এর উল্লেখ রয়েছে। কান্দারিয়ার গায়ে প্রথম যে সুরসুন্দরীটির সামনে আমি দাঁড়াই, তার শরীরের বাঁক যেন মন্দিরের নিজস্ব স্থাপত্যের বাঁকের সঙ্গে মিশে গেছে। শিখর উপরে উঠেছে, তার নিচে নারীর কোমর বেঁকেছে; স্থাপত্যে যে ঊর্ধ্বমুখিতা, শরীরে তার বিপরীতমুখী একটি তরঙ্গ। মনে হয়, মন্দিরের পাথর নিজেই যেন নারী হয়ে উঠেছে। ভারতীয় মন্দির-স্থাপত্যে নারী-মূর্তি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার উত্তর শুধু সৌন্দর্যে নেই। মন্দিরের সঙ্গে উর্বরতা, সমৃদ্ধি, শুভতা ও জীবনের ধারাবাহিকতার ধারণাও যুক্ত ছিল। ফলে নারীশরীর এখানে একদিকে কামনার, অন্যদিকে সৃষ্টিরও চিহ্ন। কিন্তু আমি যখন তার মুখের দিকে তাকাই, তখন আবার সমস্ত প্রতীক ভুলে যাই। মুখে এমন এক শান্তি, যেন সে জানে না যে এক হাজার বছর পরে মানুষ তার শরীর নিয়ে গবেষণা করবে। সে জানে না তার কোমরের বাঁক কোনও একদিন ‘erotic sculpture’ নামে জাদুঘরের আলোচনায় আসবে। সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে। তার অলঙ্কার পাথরের, তার চুল পাথরের, তার ঠোঁট পাথরের—তবু তার মধ্যে এমন এক প্রাণ আছে যে মনে হয়, এইমাত্র সে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে। এই ‘জীবন্ত’ হয়ে ওঠার ক্ষমতাই খাজুরাহোর ভাস্কর্যের আসল শক্তি। পাথরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শিল্পী পাথরকে নরম করেননি; বরং পাথরের কঠোরতাকেই ব্যবহার করেছেন। শরীরের ত্বক তিনি পাথরে নকল করেননি, শরীরের ছন্দকে পাথরে ধরেছেন। তাই মূর্তিগুলি বাস্তব মানুষের মতো নয়, বরং বাস্তব মানুষের চেয়েও বেশি জীবন্ত। তারা প্রকৃতির অনুকরণ নয়; প্রকৃতির একটি নন্দনতাত্ত্বিক পুনর্নির্মাণ।

আর তখন মনে পড়ে, ভারতীয় শিল্পে ‘রূপ’ কখনও কেবল বাহ্যিক আকৃতি নয়। রূপের সঙ্গে ‘রস’-এর সম্পর্ক। একটি মুখ কেন সুন্দর? শুধু চোখ, নাক, ঠোঁটের অনুপাতের জন্য নয়। তার মধ্যে কোনও অনুভূতি জাগে বলে। খাজুরাহোর নারী-মূর্তিগুলির সৌন্দর্য তাই শরীরের মাপে শেষ হয় না; তারা দর্শকের মধ্যে যে অনুভূতি জাগায়, সেই অনুভূতিই তাদের শিল্পমূল্য তৈরি করে। কান্দারিয়ার দেওয়ালে আর-একটি মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, একজন নারী নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। কোথাও সে প্রসাধন করছে, কোথাও অলঙ্কার পরছে, কোথাও চুল ঠিক করছে। এই নারীরা যেন দেবালয়ের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নারীজীবন তৈরি করে। প্রেমের আগে প্রস্তুতি আছে, কামনার আগে প্রসাধন আছে, মিলনের আগে দেহসচেতনতা আছে। কাম কখনও আকস্মিক নয়; তার একটি নন্দনশাস্ত্র আছে। শরীরকে সাজানো, শরীরকে সুগন্ধিত করা, শরীরকে অন্যের কাছে উপস্থিত করার এই প্রক্রিয়াটিও কামসংস্কৃতির অংশ।

এখানে কামসূত্রের প্রসঙ্গ আবার ফিরে আসে। বাত্স্যায়নের গ্রন্থকে শুধু যৌন কৌশলের বই হিসেবে পড়া যেমন ভুল, খাজুরাহোর ভাস্কর্যকে কামসূত্রের ছবি ভাবাও তেমনই ভুল। কামশাস্ত্রের বৃহত্তর জগতে প্রেম, আকর্ষণ, নাগরিক জীবন, প্রসাধন, সামাজিক আচরণ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক—অনেক কিছু রয়েছে। খাজুরাহোর ভাস্কর্যও তার দেওয়ালে একটি বহুমাত্রিক জীবনচিত্র তৈরি করেছে। ফলে দুইয়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা নিয়ে ভাবা যায়, কিন্তু সরাসরি ‘এই মূর্তি এই শ্লোকের ছবি’ বলা ইতিহাসের পক্ষে বিপজ্জনক সরলীকরণ। আমি আবার একটি মিথুনমূর্তির সামনে দাঁড়াই। এবার তাদের শরীরের চেয়ে মুখ দেখি। আশ্চর্য, শরীর যতই স্পষ্ট হোক, মুখে তেমন কোনও উত্তেজনা নেই। যেন শিল্পী যৌনতার মুহূর্তকে কোনও ব্যক্তিগত কাহিনি হিসেবে নয়, একটি বৃহত্তর জীবনশক্তির প্রকাশ হিসেবে ধরেছেন। এই জায়গাতেই খাজুরাহো আধুনিক erotic art থেকে আলাদা হয়ে যায়। আধুনিক শিল্পে যৌনতা ব্যক্তিগত, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, প্রতিবাদী বা voyeuristic হতে পারে। খাজুরাহোর মন্দিরে যৌনতার দৃশ্য একটি বৃহত্তর ধর্মীয়-স্থাপত্যিক জগতের অংশ। তার পাশে দেবতা, তার পাশে নৃত্য, তার পাশে সঙ্গীত, তার পাশে প্রসাধন, তার পাশে যুদ্ধ। এই সহাবস্থানটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতীয় পুরুষার্থের ধারণায় কামকে ধর্ম ও অর্থের পাশাপাশি রাখা হয়েছিল, এবং মোক্ষ ছিল সেই জীবনের আর-এক সম্ভাব্য লক্ষ্য। এই চারটি শব্দকে কোনও সরল ‘ধাপে ধাপে’ ওঠার সিঁড়ি ভাবা উচিত নয়; বরং মানবজীবনের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষার একটি দার্শনিক বিন্যাস হিসেবে দেখা যায়। মানুষ ধর্ম পালন করবে, অর্থ উপার্জন করবে, কামনা করবে, এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তির প্রশ্ন তুলবে। খাজুরাহোর দেওয়ালে যেন সেই মানুষটিরই ছবি—যে একই সঙ্গে কামুক এবং আধ্যাত্মিক।

আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, সম্ভবত এই কারণেই খাজুরাহোর মন্দিরের গায়ে যৌনতার ছবি দেখে এত বিতর্ক। কারণ আমরা ধর্মকে প্রায়ই শরীরের বিপরীতে দাঁড় করাতে অভ্যস্ত। পবিত্র মানেই শরীরের ঊর্ধ্বে, যৌন মানেই অপবিত্র—এই দ্বৈততা ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের সব ধারার ক্ষেত্রে সত্য নয়। শৈব, শাক্ত, তান্ত্রিক, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ—বিভিন্ন ভারতীয় পরম্পরায় শরীর, প্রেম, শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক নানাভাবে ভাবা হয়েছে। খাজুরাহো সেই বহুমাত্রিকতার একটি শিল্পরূপ, যদিও প্রতিটি ভাস্কর্যের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক অর্থ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না।

আর তখন আমার সামনে আবার সেই শরীরগুলি ফিরে আসে। একটি পুরুষ শরীরের ওপর নারী শরীর। কোথাও একাধিক দেহ। কোথাও সহায়ক নারী-পুরুষ। কোথাও এমন ভঙ্গি যা আজকের চোখে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। আমি এবার আর শুধু যৌনতার দিকে তাকাই না। দেখি ভারসাম্য। দেখি শরীরের গণিত। দেখি শিল্পীর কল্পনা। দেখি কীভাবে এক দেহের ওজন অন্য দেহ বহন করছে। দেখি হাতের অবস্থান, হাঁটুর বাঁক, পায়ের চাপ, ঘাড়ের ঘূর্ণন। মনে হয়, কামনার দৃশ্যের আড়ালে একজন ভাস্কর মানবদেহের সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা করছেন।

এখানেই খাজুরাহোর ভাস্কর্যকে ‘কামশাস্ত্র’ বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই ‘শুধু ধর্মীয় প্রতীক’ বলাও অসম্পূর্ণ। এটি একই সঙ্গে শরীরের নন্দনতত্ত্ব, স্থাপত্যের সংগীত, ধর্মীয় কল্পনা, সামাজিক জীবন এবং মানবিক আকাঙ্ক্ষার দৃশ্যপট। মন্দিরের গায়ে যে নারী নিজের পায়ের কাঁটা তুলছে, সেই নারী এবং যে নারী প্রেমিকের সঙ্গে মিলনে যুক্ত—তারা আসলে একই বৃহত্তর জগতের মানুষ। একজনের পায়ে ব্যথা, অন্যজনের শরীরে আনন্দ। একজন একা, অন্যজন যুগলে। একজন দৈনন্দিন, অন্যজন কামুক। কিন্তু দুজনের শরীরই একই শিল্পীর হাতে পাথর হয়ে উঠেছে।

খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—মানুষের শরীরকে একটি মাত্র শব্দে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। দেহ কখনও কাম, কখনও যন্ত্রণা, কখনও নৃত্য, কখনও প্রসাধন, কখনও মাতৃত্ব, কখনও যুদ্ধ, কখনও প্রেম, কখনও সাধনা। শরীরের এই বহুরূপতাই ভারতীয় শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর খাজুরাহো সেই বহুরূপতাকে এক বিশাল পাথরের ভাষায় ধরে রেখেছে। মন্দিরের ছায়া তখন দীর্ঘ হচ্ছে। আমি শেষবার পিছনে তাকাই। দেওয়ালের সেই নারী এখনও দাঁড়িয়ে। তার পায়ে কাঁটা, তার হাতে আয়না, কোথাও নূপুর, কোথাও বিচ্ছু, কোথাও প্রেমিকের বাহু, কোথাও দেবতার মুখ। হাজার বছর ধরে তারা একই জায়গায়। শুধু দর্শক বদলেছে। রাজা নেই, সেই শিল্পী নেই, সেই পুরোহিত নেই, সেই প্রেমিক-প্রেমিকা নেই। আছে পাথর। আর পাথর তার নীরবতায় মানুষের সমস্ত শরীরের ইতিহাস বহন করছে।

আমি বুঝতে পারি, খাজুরাহোকে দেখার জন্য শুধু চোখ যথেষ্ট নয়। ইতিহাসের চোখ দরকার, শরীরের চোখ দরকার, শিল্পের চোখ দরকার, দর্শনের চোখ দরকার। আর সবশেষে দরকার নিজের চোখ—যে চোখ কোনও মূর্তিকে দেখে লজ্জা পাবে না, আবার উত্তেজনার সহজ ফাঁদেও আটকে থাকবে না। যে চোখ একটি নারীর কোমরের বাঁক দেখবে, কিন্তু তার সঙ্গে তার একাকিত্বও দেখবে; একটি মিলনদৃশ্য দেখবে, কিন্তু তার মধ্যে মানুষের এক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও দেখবে; একটি দেবমূর্তি দেখবে, কিন্তু দেবতার পাশে মানুষের শরীরকেও দেখতে ভুলবে না। খাজুরাহোর প্রতিটি ভাস্কর্য তাই আমার কাছে একটি করে দরজা। একটি দরজা খুললে ইতিহাসে যাই, অন্যটি খুললে কামে, অন্যটি নন্দনতত্ত্বে, অন্যটি তন্ত্রে, অন্যটি মানুষের শরীরের কাছে। আর সব দরজা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যে জায়গাটিতে পৌঁছনো যায়, তার নাম হয়তো দেবত্ব নয়—নিজেকে নতুন করে দেখা। কারণ নিজের শরীরকে যে সভ্যতা এত গভীরভাবে দেখেছিল, সে সভ্যতা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দেখেছিল। আর মানুষকে সম্পূর্ণ দেখতে গেলে তার দেবতা যেমন দরকার, তেমনই তার কামনাও দরকার। খাজুরাহোর দেওয়াল ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় আমার মনে হল, আমি আর কোনও মন্দির দেখছি না। আমি যেন মানুষের শরীরের ভিতর দিয়ে হাঁটছি। পাথরের শরীর, তার মধ্যে মানুষের শরীর, সেই শরীরের মধ্যে আবার আর-এক শরীরের আকাঙ্ক্ষা। মন্দিরের দেওয়ালে যত এগোই, ততই মনে হয়, শিল্পী কোনও এক জায়গায় থামতে চাননি। তিনি দেবতাকে যেমন খোদাই করেছেন, তেমনই খোদাই করেছেন এক নারীর চুল বাঁধার মুহূর্ত; যেমন খোদাই করেছেন যুদ্ধ, তেমনই প্রেমিকের হাত; যেমন খোদাই করেছেন সঙ্গীত, তেমনই যৌনতার এমন দৃশ্য যা আজকের চোখেও চমকে দেয়। খাজুরাহোর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার এই যে এখানে কোনও কিছুই একা নেই। কাম একা নেই, ধর্ম একা নেই, শরীর একা নেই, দেবতাও একা নন। প্রত্যেকটি অন্যটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

লক্ষ্মণ মন্দিরের সেই কাঁটা-তোলা নারীটির কাছে আবার ফিরে আসি। প্রথম দেখায় যে মূর্তিটি আমাকে বিস্মিত করেছিল, দ্বিতীয়বার তার সামনে দাঁড়ালে তার শরীরের চেয়ে তার ভঙ্গিটি বেশি চোখে পড়ে। সে যেন শরীরের ভার হারিয়ে ফেলেছে। ডান হাত নিচের দিকে, পায়ের কাঁটার দিকে ইঙ্গিত করছে; অন্য হাতটি উপরে, যেন নিজের শরীরকে সামলে রাখছে। মুখে যন্ত্রণার কোনও অতিনাটকীয় চিহ্ন নেই। সে চিৎকার করছে না। তার ব্যথা ব্যক্তিগত, প্রায় গোপন। পায়ে একটি কাঁটা ফুটেছে—এই সামান্য ঘটনাকে শিল্পী এমন করে তুলেছেন যে নারীটির সমস্ত শরীর একটি মুহূর্তের মধ্যে বাঁক নিয়ে ফেলেছে। তার কোমর, উরু, পায়ের পাতা, ঘাড়—সব যেন এক অদৃশ্য রেখায় যুক্ত। এই মূর্তিটির সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, ভারতীয় ভাস্কর্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই—সে ঘটনাকে নয়, ঘটনার ভিতরে শরীরের প্রতিক্রিয়াকে ধরে। কাঁটা ফুটলে আমরা কী করি? শরীর সরে যায়। ভারসাম্য বদলায়। মুখের রেখা বদলায়। চোখের দৃষ্টি নিচে নামে। লক্ষ্মণ মন্দিরের শিল্পী সেই পরিবর্তনটুকু ধরেছেন। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই নারীটি সুন্দর হয়ে উঠেছে। সৌন্দর্য এখানে স্থির নয়, গতিশীল। সুন্দর শরীর মানেই নিখুঁত অনুপাত নয়; সুন্দর শরীর মানে অনুভূতিশীল শরীর। আমরা আজকের সময়ে শরীরকে প্রায়ই আলাদা আলাদা ঘরে রাখি। সৌন্দর্যের শরীর, যৌনতার শরীর, রোগের শরীর, ধর্মের শরীর, শ্রমের শরীর। খাজুরাহোর শিল্পী সেই ঘরগুলির দরজা ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁর নারী একসঙ্গে সুন্দরী, কামনাময়ী, দৈনন্দিন জীবনের মানুষ এবং মন্দিরের অলঙ্করণ। তার পায়ে কাঁটা ফুটতে পারে। সে আয়নায় মুখ দেখতে পারে। সে চুল আঁচড়াতে পারে। সে প্রেমিকের সঙ্গে আলিঙ্গনে যেতে পারে। সে নাচতে পারে। সে দেবতার পাশে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ শরীরকে একটিমাত্র পরিচয়ে আটকে রাখা হয়নি।

লক্ষ্মণ মন্দিরের মিথুনমূর্তিগুলির দিকে তাকালে এই ধারণাটি আরও স্পষ্ট হয়। পুরুষ ও নারী পাশাপাশি। কখনও আলিঙ্গন, কখনও চুম্বন, কখনও আরও অন্তরঙ্গতা। কিন্তু তাদের চারপাশে মন্দিরের অন্যান্য ভাস্কর্যও রয়েছে। ফলে যৌনতা এখানে আলাদা কোনও গোপন কক্ষ নয়। তা জীবনের বৃহৎ দৃশ্যপটের একটি অংশ। লক্ষ্মণ মন্দিরের এই যুগলমূর্তিগুলিকে নিয়ে শিল্প-ইতিহাসে divine union এবং moksha-র সঙ্গে সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে; যদিও প্রতিটি মূর্তিকে একটিমাত্র প্রতীকে আবদ্ধ করা যায় না।

আমি একটি যুগলের মুখের দিকে তাকাই। শরীর কাছাকাছি, কিন্তু মুখে যেন অদ্ভুত শান্তি। মনে হয়, কামনার মুহূর্তেও মানুষ নিজেকে হারায় না; বরং নিজেকে অন্যের মধ্যে খুঁজে পেতে চায়। যৌনতা কেবল শরীরের সংঘর্ষ নয়, এক ধরনের অদ্বৈত আকাঙ্ক্ষাও। ‘আমি’ এবং ‘তুমি’—এই দুটি পৃথক অস্তিত্ব মুহূর্তের জন্য এক হতে চায়। উপনিষদের অদ্বৈত দর্শনকে সরাসরি এই মূর্তির ব্যাখ্যা বলা যাবে না, কিন্তু ভারতীয় চিন্তার দীর্ঘ ইতিহাসে এক থেকে দুই এবং দুই থেকে এক হওয়ার যে প্রতীকী যাত্রা, মিথুনমূর্তি তাকে মনে করিয়ে দেয়।

এরপর আমার চোখ যায় এক সুরসুন্দরীর দিকে। তার হাতে যেন একটি বাদ্যযন্ত্র। শরীর সামান্য বেঁকে আছে। সে সঙ্গীত বাজাচ্ছে কি না, বোঝা যায় না; কিন্তু তার শরীরের ভঙ্গি থেকেই শব্দের সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাথরে কোনও সুর নেই, অথচ আমি যেন শুনতে পাচ্ছি। এই যে না-থাকা শব্দকে চোখের মাধ্যমে অনুভব করা—এটাই তো শিল্পের জাদু। ইন্দ্রিয় একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। চোখ দিয়ে দেখা মূর্তি কানে শব্দ তৈরি করে। পাথরের কঠোরতা স্পর্শের অনুভূতি তৈরি করে। একটি ভঙ্গি নৃত্যের স্মৃতি জাগায়. খাজুরাহোর ভাস্কর্য তাই মূলত ইন্দ্রিয়ের শিল্প। আমরা তাকে কেবল চোখ দিয়ে দেখি, কিন্তু সে আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তোলে। এ কারণেই ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটি খাজুরাহোকে বোঝার ক্ষেত্রে আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় দর্শনে ইন্দ্রিয়কে কখনও নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে, কখনও ইন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করতে। কিন্তু শিল্পে ইন্দ্রিয়ই প্রথম শিক্ষক। চোখ না দেখলে রূপ নেই, কান না শুনলে সঙ্গীত নেই, স্পর্শ না থাকলে শরীরের ধারণা নেই, গন্ধ না থাকলে ফুলের অর্থ নেই। খাজুরাহোর শিল্পী ইন্দ্রিয়কে অস্বীকার করেননি; বরং ইন্দ্রিয়ের পূর্ণতাকে পাথরে স্থাপন করেছেন।

বিশ্বনাথ মন্দিরের দিকে এগোতে গিয়ে আবার নারীদের ভিড়। এক নারী কপালে সিঁদুর দিচ্ছে, অন্যজন চোখে কাজল টানছে, কেউ স্নানের পর চুল নিংড়োচ্ছে, কেউ নাচছে, কেউ আয়নায় নিজেকে দেখছে, কেউ পায়ের কাঁটা তুলছে। মন্দিরের বহির্ভাগের তিনটি ভাস্কর্য-ব্যান্ডে দেবদেবী, সুরসুন্দরী, পৌরাণিক প্রাণী—সব মিলিয়ে এক বহুরৈখিক জগৎ তৈরি হয়েছে। বিশ্বনাথ মন্দিরের পরিক্রমাপথে নারীদের দৈনন্দিন ও অলঙ্কারিক ভঙ্গির যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা খাজুরাহোর নারী-দেহকে বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নারী আয়নায় তাকিয়ে আছে। আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আয়নাটি আসলে পাথর, তবু শিল্পী এমনভাবে হাতের ভঙ্গি তৈরি করেছেন যে মনে হয়, আয়নায় তার মুখ দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্য আমাকে থামিয়ে দেয়। কারণ এখানে কামনা অন্যের চোখে নয়, নিজের চোখে শুরু হচ্ছে। সে নিজেকে দেখছে। নিজের সৌন্দর্যকে যাচাই করছে। শরীরকে সাজিয়ে তোলার আগে নিজের শরীরের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করছে।

এখানে ‘নারীকে পুরুষের চোখে দেখা’—এই আধুনিক শিল্পতাত্ত্বিক প্রশ্নটিও এসে পড়ে। খাজুরাহোর বহু নারী-মূর্তি নিঃসন্দেহে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তৈরি। তাদের কোমর, স্তন, নিতম্ব, চুল, অলঙ্কার—সবকিছুই নন্দনতাত্ত্বিকভাবে উচ্চারিত। কিন্তু তারা কেবল দর্শকের সামনে নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। কেউ নিজের শরীরের দিকে তাকাচ্ছে, কেউ নিজের চুল ঠিক করছে, কেউ প্রসাধন করছে, কেউ নাচছে। অর্থাৎ তাদের নিজস্ব ক্রিয়াশীলতা আছে। এই ছোট্ট পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী নিজের পায়ের গোড়ালিতে অলঙ্কার পরছে। তার শরীর এতখানি বাঁকানো যে তার কোমরের রেখাটি প্রায় একটি অর্ধচন্দ্রের মতো। পায়ের আঙুলগুলি সামান্য কুঁচকে আছে। মনে হয়, সে অলঙ্কার পরার কাজে এতটাই মনোযোগী যে পৃথিবীতে আর কিছু নেই। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, এই মুহূর্তটি তার নিজের। দর্শক তার শরীর দেখছে, কিন্তু নারীটি দর্শককে দেখছে না। এই একতরফা দৃষ্টির মধ্যে একটি অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে। তারপর দেখি এক নারী নিজের চুল নিংড়োচ্ছে। স্নান শেষ হয়েছে। ভেজা চুল থেকে জল পড়ছে—পাথরে অবশ্য জল নেই, কিন্তু শিল্পীর ভঙ্গি আমাদের জল কল্পনা করতে বাধ্য করে। তার দুই হাত মাথার ওপরে। শরীর পিছনে সামান্য বেঁকে। এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, কামনা অনেক সময় নগ্নতার চেয়েও বেশি তৈরি হয় দৈনন্দিনতার ভিতর দিয়ে। স্নানের পর ভেজা চুল, শরীরের ওপর জল, নিজের শরীরের সঙ্গে একান্ত সময়—এসবের মধ্যে যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, তা কোনও সরাসরি যৌন দৃশ্যের চেয়ে কম নয়। এইখানে খাজুরাহোর শিল্পীকে আমি আরও বেশি আধুনিক মনে করি। তিনি জানেন, কামনা শুধু যৌনমিলনের দৃশ্যে থাকে না। কামনা থাকে অপেক্ষায়, প্রসাধনে, দৃষ্টিতে, চুলে, অলঙ্কারে, হাঁটার ভঙ্গিতে, শরীরের বাঁকে। কামনা হল এক ধরনের উপস্থিতি। শরীর যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তখনই ইন্দ্রিয়ের জগৎ তৈরি হয়। পার্শ্বনাথ মন্দিরের দিকে গেলে এই নারীমূর্তিগুলি আরও এক অন্য আবহ তৈরি করে। এটি খাজুরাহোর বৃহত্তম জৈন মন্দির। বাইরের দেওয়ালে সুরসুন্দরী, উড়ন্ত যুগল, নর্তক, বাদ্যযন্ত্রী এবং celestial figures-এর বিপুল সমাবেশ। মন্দিরটি জৈন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, অথচ তার বহির্ভাগের শিল্পভাষা খাজুরাহোর সামগ্রিক সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত। এখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, ধর্মীয় পরিচয় আর শিল্পের ভাষা সবসময় একই জিনিস নয়। একটি জৈন মন্দিরের দেওয়ালে এমন নারী কেন? প্রশ্নটি আমাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। কিন্তু হয়তো এই অস্বস্তিই প্রয়োজন। আমরা ধরে নিই, জৈন ধর্ম মানেই কঠোর সংযম, আর খাজুরাহো মানেই কাম। কিন্তু একই স্থাপত্য-ভূদৃশ্যে এই দুইয়ের সহাবস্থান আমাদের সেই সরল সমীকরণ ভাঙতে বাধ্য করে। মন্দিরের অন্তর্গত ধর্মীয় আদর্শ এক জিনিস, আর বহির্ভাগের শিল্পকর্মের সাংস্কৃতিক ভাষা আর এক জিনিস। খাজুরাহোর জগৎ আমাদের বলে, ভারতীয় মধ্যযুগকে আধুনিক ‘religion versus sexuality’ দ্বন্দ্ব দিয়ে পড়লে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যাবে। পার্শ্বনাথ মন্দিরের সেই নারীটির দিকে তাকাই, যে চোখে কাজল দিচ্ছে। হাতে ছোট্ট পাত্র, অন্য হাতে কাজল তোলার ভঙ্গি। তার মুখ সামান্য উঁচু। এই মূর্তিতে কোনও নগ্নতা নেই, তবু ইন্দ্রিয়ের উপস্থিতি প্রবল। কারণ চোখ নিজেই কামনার একটি অঙ্গ। চোখ সাজানো মানে দৃষ্টিকে সাজানো। আর দৃষ্টি ভারতীয় প্রেমের ভাষায় কত গুরুত্বপূর্ণ, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। প্রেমিকের চোখ, প্রেয়সীর চোখ, লজ্জার চোখ, অপেক্ষার চোখ—শৃঙ্গার রসের অর্ধেকই যেন চোখের ভিতর বাস করে।

আমি ভাবি, ‘শৃঙ্গার’ শব্দটি আমরা কত সহজে ‘যৌনতা’ বলে অনুবাদ করি। অথচ শৃঙ্গার তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। শরীরের সাজ, প্রেম, আকর্ষণ, মিলন, বিরহ, অপেক্ষা—সবই তার মধ্যে। খাজুরাহোর নারীদের অলঙ্কার, চুল, প্রসাধন, দৃষ্টি, শরীরের ভঙ্গি—সব মিলিয়ে যে নন্দনজগৎ তৈরি হয়, তা শৃঙ্গারেরই এক বিশাল দৃশ্যভাষা।

তারপর আসে বিচ্ছুটির মূর্তি। নারীর শরীরের কাছে একটি বিচ্ছু। এই ছোট্ট প্রাণীটি যেন সমগ্র দৃশ্যের অর্থ বদলে দেয়। সৌন্দর্যের পাশে বিপদ। শরীরের পাশে বিষ। কামনার পাশে সম্ভাব্য আঘাত। নারীটি যেন নিজের শরীর নিয়ে ব্যস্ত, আর নিচে এক বিষাক্ত প্রাণী এগিয়ে আসছে। আমি জানি না শিল্পী কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। এই অনিশ্চয়তাকে আমি ইচ্ছা করেই রেখে দিই। কারণ কোনও প্রতীক দেখলেই তার একটি ‘অর্থ’ ঘোষণা করে দেওয়া শিল্পের প্রতি সুবিচার নয়। বিচ্ছু হয়তো বিপদের চিহ্ন, হয়তো আকস্মিকতার, হয়তো কোনও পৌরাণিক অর্থের অংশ, হয়তো নিছক অলঙ্করণ। কিন্তু দর্শক হিসেবে আমার কাছে সে কামনা ও বিপদের মধ্যবর্তী একটি ছোট্ট কালো রেখা হয়ে ওঠে। আমাদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই কি কোনও না কোনও বিচ্ছু লুকিয়ে থাকে? প্রেমে যেমন আনন্দ, তেমন ভয়। শরীরে যেমন স্পর্শ, তেমন আঘাতের সম্ভাবনা। কামনায় যেমন উন্মুক্ততা, তেমন আত্মসমর্পণের আশঙ্কা। মানুষ যখন নিজের শরীর অন্যের কাছে খুলে দেয়, তখন সে নিজের দুর্বলতাও খুলে দেয়। এই দার্শনিক পাঠটি হয়তো মূর্তিটির উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু শিল্পের সৌন্দর্যই এই যে, তা শিল্পীর সময়ের বাইরে গিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে। এরপর বিশ্বনাথ মন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে এসে দাঁড়াই। এখানে যৌন দৃশ্য আর একটু স্পষ্ট। একটি যুগল। শরীরের রেখা পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে। তাদের পাশে সহায়ক চরিত্র। যেন কোনও ব্যক্তিগত মুহূর্ত হঠাৎ মন্দিরের দেওয়ালে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কিন্তু আশ্চর্য, দৃশ্যটি কখনও অশ্লীল বলে মনে হয় না। কারণ পাথরের ভাষায় কামনা কোনও গোপন চাহিদা নয়; এটি জীবনের দৃশ্যমান শক্তি।

বিশ্বনাথ মন্দিরে erotic relief-এর উপস্থিতির সঙ্গে আরও একটি বিশেষ ভাস্কর্য যুক্ত—মন্দিরের vestibule ও sanctum-এর সংযোগস্থলে এমন একটি জটিল যৌনভঙ্গি, যা পরবর্তী কান্দারিয়া মহাদেবের বিখ্যাত acrobatic sexual sculpture-এর এক ধরনের পূর্বসূরি বা variation হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, শরীরেরও স্থাপত্য আছে। দুই দেহ কীভাবে একে অপরকে ধরে, কোথায় ভার যায়, কোথায় হাতের চাপ, কোথায় পায়ের অবস্থান—সবই এক ধরনের স্থাপত্য। এখানে কামশাস্ত্রের প্রসঙ্গ অনিবার্য ভাবে আসে। ভারতীয় কামশাস্ত্র শরীরের আনন্দকে একটি জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু খাজুরাহোর মূর্তিগুলিকে কামসূত্রের সরাসরি illustration বলা যাবে না। এই পার্থক্যটি খুব জরুরি। কামশাস্ত্র একটি গ্রন্থপরম্পরা; খাজুরাহো একটি মন্দির-ভাস্কর্য-পরম্পরা। দুইয়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য থাকতে পারে, কিন্তু একটিকে অন্যটির ছবি বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সহজ করে দেওয়া। আমি বরং ‘কাম’ শব্দটির দিকে ফিরে যাই। ‘কাম’ মানে শুধু যৌনতা নয়; আকাঙ্ক্ষা। ইচ্ছা। যা চাই। যা আমাকে টানে। যা আমার মধ্যে অভাব তৈরি করে এবং সেই অভাব পূরণের দিকে ঠেলে দেয়। এই অর্থে কাম মানবজীবনের মৌলিক শক্তি। খাবারের ইচ্ছা, সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা, প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, শরীরের আকাঙ্ক্ষা—সবই কামনার বিস্তৃত ভূগোলে পড়ে। পুরুষার্থের ধারণায় কামকে তাই জীবনের একটি বৈধ ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু খাজুরাহো একই সঙ্গে আমাদের বলে, কামই শেষ নয়। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে কাম, ভিতরে গর্ভগৃহে দেবতা। এই স্থাপত্যিক বিন্যাসকে একমাত্র নির্দিষ্ট তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না, কিন্তু দর্শকের অভিজ্ঞতায় এর একটি প্রতীকী অর্থ তৈরি হয়। বাইরে বহুত্ব, ভিতরে একত্ব। বাইরে শরীর, ভিতরে অন্ধকার। বাইরে অসংখ্য রূপ, ভিতরে এক দেবমূর্তি।

আমি যখন গর্ভগৃহের অন্ধকারের দিকে তাকাই, তখন বাইরে দেখা নারী-পুরুষের শরীরগুলি হঠাৎ অন্য আলোয় ফিরে আসে। তারা যেন নিষিদ্ধ কিছু নয়। তারা ছিল যাত্রার অংশ। মানুষ পৃথিবীতে জন্মায়, শরীর পায়, ইন্দ্রিয় পায়, আকাঙ্ক্ষা পায়, প্রেমে পড়ে, সংসার করে, আনন্দ পায়, দুঃখ পায়—তারপর একদিন প্রশ্ন করে, এর বাইরে কি কিছু আছে? ভারতীয় দর্শনের মোক্ষ-চিন্তা সেই প্রশ্নের একটি উত্তর খুঁজেছে। খাজুরাহো সেই উত্তরটি দেয় না; কিন্তু প্রশ্নটি সামনে এনে দেয়। কান্দারিয়া মহাদেবের দিকে এগোতেই স্থাপত্য আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। শিখর যেন আকাশের দিকে ছুটে গেছে। অসংখ্য ক্ষুদ্র শিখর তার চারপাশে উঠে এসেছে। দূর থেকে মনে হয়, যেন একটি পর্বত। আর সেই পর্বতের গায়ে অসংখ্য মানবদেহ। দেবতা ও মানুষ, নারী ও পুরুষ, প্রাণী ও পৌরাণিক জীব—সবাই যেন এক মহাজাগতিক শরীরের অংশ। কান্দারিয়ার এক নারী-মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, সে যেন নিজের শরীরের সঙ্গে কথা বলছে। তার মাথা সামান্য কাত, কোমর একদিকে, একটি পা অন্যটির তুলনায় সামান্য এগিয়ে। অলঙ্কারগুলি শরীরের রেখাকে আরও স্পষ্ট করেছে। শিল্পী জানেন, অলঙ্কার শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, শরীরের গতিও প্রকাশ করে। কোমরের মেখলা যখন শরীরের সঙ্গে বাঁক নেয়, তখন পাথরের রেখা আরও স্পষ্ট হয়। গলার হার বুকে নেমে আসে, বাহুবন্ধ বাহুর পেশিকে আলাদা করে, নূপুর পায়ের গতিকে চিহ্নিত করে।

এই অলঙ্কারগুলির মধ্যেও ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমরা বুঝতে পারি, মধ্যযুগীয় সমাজে নারী-সৌন্দর্যের কল্পনা কেমন ছিল, পোশাকের ধরন কী, অলঙ্কারের নকশা কেমন, চুল কীভাবে বাঁধা হত। ভাস্কর্য তাই কেবল নন্দনতত্ত্বের দলিল নয়; সামাজিক ইতিহাসেরও দলিল। যে মন্দিরকে আমরা আজ erotic sculpture-এর জন্য চিনি, তার দেওয়ালেই আসলে মধ্যযুগীয় জীবনের এক বিপুল archive সংরক্ষিত। আর একটি মূর্তিতে দেখি নারী তার পোশাক সামলাচ্ছে। আরেকটিতে সে নিজের চুল ঠিক করছে। কোথাও তার শরীরের সামান্য অংশ উন্মুক্ত, কোথাও কাপড় শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। পাথরে কাপড়ের ভাঁজ এত সূক্ষ্ম যে মনে হয়, শিল্পী কাপড়ের ওজন জানতেন। শরীর ও পোশাকের সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নগ্নতা ও আবরণ—দুইয়ের মাঝখানে যে উত্তেজনা, ভারতীয় শৃঙ্গার নন্দনতত্ত্বে তার বিশেষ গুরুত্ব আছে। সম্পূর্ণ নগ্নতা অনেক সময় যতটা প্রকাশ করে, সামান্য আবরণ ততটাই কল্পনার জায়গা তৈরি করে।

কান্দারিয়ার erotic panels-এর সামনে দাঁড়িয়ে সেই কল্পনার জায়গাটি অবশ্য অনেক সময় সংকুচিত হয়ে যায়। এখানে যৌন মিলনের দৃশ্য সরাসরি। কিন্তু আশ্চর্য, শিল্পী মুখকে অশ্লীল করেননি। শরীর স্পষ্ট, কিন্তু মুখে কোনও চিৎকার নেই। যেন এই দৃশ্যও জীবনের এক স্বাভাবিক ক্রিয়া। এক হাজার বছর আগে পাথরে খোদাই করা এই স্বাভাবিকতা আজকের দর্শককে বরং অস্বস্তিতে ফেলে।

এই অস্বস্তি কোথা থেকে আসে? হয়তো আমাদের দৃষ্টির ইতিহাস থেকে। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সঙ্গে শরীর সম্পর্কে বহু নতুন নৈতিক ধারণা তৈরি হয়েছিল। নগ্নতা, যৌনতা, প্রকাশ্য শরীর—এসবকে নির্দিষ্ট নৈতিক শ্রেণিতে ফেলা শুরু হয়। ফলে খাজুরাহো যখন উনিশ শতকের ইউরোপীয় চোখে পুনরাবিষ্কৃত হয়, তার ভাস্কর্য নিয়ে বিস্ময় ও নৈতিক বিচার—দুই-ই তৈরি হয়। কিন্তু মন্দিরগুলি সেই আধুনিক নৈতিকতার বহু শতাব্দী আগে তৈরি। ফলে তাদের অর্থ বুঝতে গেলে আমাদের সেই মধ্যযুগীয় সাংস্কৃতিক পরিসরের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। আমি আবার একটি মিথুনের মুখ দেখি। নারীটির মুখে যেন হাসি। পুরুষটির চোখ তার দিকে। তাদের শরীরের মিলনের চেয়ে চোখের মিলন আমাকে বেশি টানে। কারণ শরীর মিলতে পারে, কিন্তু চোখের মিলন ছাড়া প্রেম অসম্পূর্ণ। শৃঙ্গার রসের মধ্যে তাই দৃষ্টি এত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দেখা, চোরাচোখে দেখা, অপেক্ষা করা, লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেওয়া—এসবের মধ্যেই প্রেমের নাটক তৈরি হয়। খাজুরাহোর নারী-মূর্তিগুলির অনেকের মুখে যে সামান্য হাসি, তা আমাকে বারবার থামায়। এই হাসি কি কামনার? নাকি আত্মসচেতনতার? নাকি কেবল সৌন্দর্যের convention? আমরা জানি না। কিন্তু মুখের এই সামান্য বাঁক তাদের শরীরকে মন দেয়। তারা আর শুধু anatomical figure নয়। তারা অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠে।

চিত্রগুপ্ত মন্দিরে গিয়ে এই বহুমাত্রিকতা আরও স্পষ্ট হয়। মন্দিরটি সূর্যদেবের উদ্দেশে নিবেদিত; গর্ভগৃহে সূর্যের মূর্তি, রথ ও সাত ঘোড়ার চিত্রকল্প তার কেন্দ্র। বাইরের দেওয়ালে দেবদেবী, সুরসুন্দরী, যুদ্ধ, হাতির মিছিল, নৃত্য এবং erotic couples—সবই আছে। সূর্যের মন্দিরের গায়ে কামদৃশ্য—এই সহাবস্থান আমাকে আবার মনে করায়, ভারতীয় ধর্মীয় শিল্পে জীবনকে খণ্ডিত করে দেখা হয়নি। সূর্য মানে আলো। আর সেই আলোর মন্দিরের গায়ে মানুষের শরীর। শরীরের কামনা, শরীরের নাচ, শরীরের যুদ্ধ, শরীরের শ্রম—সবই সূর্যের আলোর নিচে। যেন বলা হচ্ছে, জীবনকে পবিত্র ও অপবিত্রের আলাদা বাক্সে রাখা যায় না। যা আছে, তা-ই জগতের অংশ।

চিত্রগুপ্ত মন্দিরের এক সুরসুন্দরীর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, সে যেন নিজের পোশাক সামান্য তুলে পায়ের দিকে তাকিয়েছে। অন্য কোথাও নারী তার শরীরের একটি অংশ দর্শকের দিকে উন্মুক্ত করছে। এই ধরনের ভঙ্গি আজকের চোখে অত্যন্ত erotic। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলি শরীরের সচেতনতা এবং শিল্পীর শরীর-পর্যবেক্ষণের নিদর্শন। শিল্পী মানুষের শরীরকে কেবল ধর্মীয় icon-এর কঠোর নিয়মে বাঁধেননি; তিনি শরীরকে স্বাধীন গতির মধ্যে রেখেছেন। এরপর আবার মিথুন। এবার দুই শরীরের সঙ্গে আরও কয়েকটি শরীর। এই জটিল composition-এর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, কাম কখনও একান্ত ব্যক্তিগতও নয়; তা সামাজিকও। মানুষের যৌনতা সবসময় পরিবার, বিবাহ, সমাজ, ক্ষমতা, প্রজনন, উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় বিধির সঙ্গে জড়িত। ফলে মন্দিরের গায়ে যৌনতার ছবি মানে শুধু দুই মানুষের ব্যক্তিগত আনন্দ নয়; এর পিছনে একটি বৃহত্তর সামাজিক বিশ্ব আছে। তবু খাজুরাহোর ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে কোনও ‘নৈতিক শিক্ষা’ খুঁজে পেতে আমার ইচ্ছে করে না। শিল্পকে নীতিকথায় নামিয়ে আনা তার সৌন্দর্য নষ্ট করে। বরং আমি দেখতে চাই, কীভাবে শিল্পী দেহকে দেখেছেন। কীভাবে একটি পাথরের ব্লক থেকে উরু বেরিয়ে এসেছে। কীভাবে কোমরের বাঁক স্থাপত্যের projection-এর সঙ্গে মিশেছে। কীভাবে একটি মুখ সামান্য পিছনে ঘুরে গেছে। কীভাবে একটি হাত অন্য শরীরকে স্পর্শ করছে। কীভাবে একটি পায়ের আঙুল মাটিতে চাপ তৈরি করেছে। শরীরের এই ব্যাকরণই খাজুরাহোর আসল ভাষা। আমি যখন আবার কান্দারিয়ার সেই জটিল যৌনদৃশ্যের কাছে যাই, তখন আর প্রথম দিনের মতো তাকাই না। প্রথম দিন আমি দৃশ্যটি দেখেছিলাম; এখন দেখি তার নির্মাণ। কে কাকে ধরে আছে, কোথায় ভারসাম্য, কোন হাত কোথায়, কোন শরীর সামনে, কোনটি পিছনে। শিল্পী যেন মানুষের শরীর দিয়ে একটি জটিল জ্যামিতি তৈরি করেছেন। যৌনতার উত্তেজনা সেখানে আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে কারিগরি দক্ষতার বিস্ময়। এমনকি কিছু দৃশ্যে যে অতিরঞ্জিত বা acrobatic ভঙ্গি দেখা যায়, তা হয়তো বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। শিল্পী শরীরের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছেন। বাস্তব শরীর যেখানে থেমে যায়, শিল্পের শরীর সেখানে আরও দূরে যায়। এই অতিরঞ্জনই তাকে প্রতীকী করে। মানুষ যতটা পারে, শিল্পী তার চেয়ে বেশি করতে দেন মানুষকে। কারণ শিল্প বাস্তবতার অনুবাদ নয়; বাস্তবতার পুনর্নির্মাণ।

এখানে তন্ত্রের কথাও ফিরে আসে। তন্ত্রের বহু ধারায় শরীরকে মুক্তির পথে ব্যবহার করার ধারণা রয়েছে। কাম, শক্তি, পুরুষ ও প্রকৃতি, শিব ও শক্তি—এসব ধারণা ভারতীয় তান্ত্রিক ঐতিহ্যে নানা ভাবে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু খাজুরাহোর প্রতিটি যৌনমূর্তিকে তান্ত্রিক সাধনার সরাসরি চিত্র বলা উচিত নয়। ঐতিহাসিক প্রমাণ এত সরল নয়। বরং বলা যায়, খাজুরাহোর শিল্প এমন এক মধ্যযুগীয় ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিবেশে জন্মেছিল যেখানে শরীর, শক্তি, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের ভাবনা সক্রিয় ছিল। এই ‘নানা ধরনের’ কথাটিই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কখনও একটি মাত্র দর্শনের দেশ ছিল না। একই সময়ে একদিকে উপনিষদীয় আত্মা, অন্যদিকে বৌদ্ধ শূন্যতা, অন্যদিকে জৈন তপস্যা, অন্যদিকে শৈব তন্ত্র, শাক্ত শক্তিতত্ত্ব, বৈষ্ণব ভক্তি—বহু স্রোত পাশাপাশি চলেছে। খাজুরাহো সেই বহুস্রোতের শিল্পসম্ভার। তাই একটি মূর্তির একমাত্র অর্থ ঘোষণা করা মানে খাজুরাহোর বহুত্বকে হত্যা করা।

মন্দিরের গায়ে একদিকে জৈন তীর্থঙ্কর, অন্যদিকে সুরসুন্দরী; একদিকে শিব, অন্যদিকে মিথুন; একদিকে সূর্য, অন্যদিকে নৃত্যরত নারী। এই সহাবস্থান কোনও দুর্বলতা নয়; এটাই তার শক্তি। ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসের ভিতর যে বহু কণ্ঠের সংলাপ ছিল, খাজুরাহো তার পাথরের দলিল। শেষ বিকেলের দিকে আলো বদলাতে শুরু করে। মূর্তিগুলির মুখে ছায়া পড়ে। যে শরীর দুপুরে তীব্র আলোয় ছিল, এখন তার অর্ধেক অন্ধকার। হঠাৎ মনে হয়, খাজুরাহোর সমস্ত ভাস্কর্য যেন আলো ও অন্ধকারের মধ্যে তৈরি। শরীর দেখা যায়, কিন্তু শরীরের ভিতরের অনুভূতি দেখা যায় না। সেই অনুভূতিকে আমাদের কল্পনা করতে হয়।

একটি মূর্তি তখন আমার কাছে এসে দাঁড়ায়—এক নারী, তার হাতে আয়না। আমি ভাবি, সে কি সত্যিই নিজের মুখ দেখছে? নাকি হাজার বছর পরের আমাকে? সে জানে না আমি তাকে দেখব। আমি জানি না সে কী ভাবছে। আমাদের মধ্যে শুধু পাথর।  আর একটি নারী—তার পায়ে কাঁটা। সে যেন ব্যথা পেয়েছে। আর একটি—চুল নিংড়োচ্ছে। আর একটি—চোখে কাজল দিচ্ছে। আর একটি—নাচছে। আর একটি—প্রেমিকের দিকে তাকিয়েছে। আর একটি—মিলনের মধ্যে। আর একটি—নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা সবাই মিলে একটি নারীজীবন তৈরি করে। তারপর পুরুষরা আসে। যোদ্ধা, প্রেমিক, সঙ্গীতজ্ঞ, রাজপুরুষ, দেবতা। তাদের শরীরও স্থির নয়। পেশি, ভঙ্গি, অস্ত্র, অলঙ্কার—সব  মিলিয়ে পুরুষদেহেরও নানা রূপ। ফলে খাজুরাহো শুধু নারীশরীরের উৎসব নয়; মানবশরীরের উৎসব। এবং সেই কারণেই আমার কাছে খাজুরাহোর ‘যৌনতা’ শব্দটি ধীরে ধীরে অন্য অর্থ নেয়। যৌনতা মানে শুধু যৌনমিলন নয়। যৌনতা মানে শরীর সম্পর্কে সচেতনতা। নিজের শরীরকে অন্যের শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত করা। আকাঙ্ক্ষা। প্রজনন। আনন্দ। প্রেম। সৌন্দর্য। দৃষ্টি। স্পর্শ। এবং শেষ পর্যন্ত নিজের শরীরের সীমা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। দেবত্বের সঙ্গে এই শরীরের সম্পর্ক কোথায়? সম্ভবত গর্ভগৃহের অন্ধকারে।

বাইরে যখন আমি একের পর এক শরীর দেখছি, তখন আমি বহুত্বের মধ্যে আছি। প্রত্যেক শরীর আলাদা। প্রত্যেক মুখ আলাদা। প্রত্যেক আকাঙ্ক্ষা আলাদা। কিন্তু গর্ভগৃহে গিয়ে আলো কমে আসে। সেখানে একটি মাত্র কেন্দ্র। বহুত্ব থেকে একত্বের দিকে যাত্রা। জীবন থেকে দেবতার দিকে। দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যের দিকে। এই কারণেই খাজুরাহোর মন্দির আমার কাছে শেষ পর্যন্ত কামনার স্মারক নয়। এটি কামনা থেকে দেবত্বের দিকে যাত্রার কোনও সরল মানচিত্রও নয়। বরং এটি মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে রাখার সাহসের স্মারক। শরীরকে বাদ দিয়ে ধর্ম নয়, কামকে বাদ দিয়ে নৈতিকতা নয়, ইন্দ্রিয়কে বাদ দিয়ে সৌন্দর্য নয়। মানুষকে সম্পূর্ণ ভাবে দেখার চেষ্টা। আর সম্পূর্ণ মানুষ মানেই অসম্পূর্ণ মানুষ।

তার কাম আছে, তার ভয় আছে, তার লজ্জা আছে, তার আনন্দ আছে, তার শরীর আছে, তার মৃত্যু আছে। সেই মানুষই দেবতার সামনে দাঁড়ায়। সেই মানুষই মুক্তি চায়। সেই মানুষই প্রেমে পড়ে। সেই মানুষই পাথরে নিজের শরীর খোদাই করে রেখে যায়।

খাজুরাহোর পাথর তাই আমার কাছে এক অদ্ভুত আয়না। আমি যতবার তার দিকে তাকাই, ততবার নিজের সময়কে দেখতে পাই। আজ আমরা শরীর নিয়ে যে সংকোচে বাস করি, তার পাশে এক হাজার বছর আগের এই প্রকাশ্য দেহগুলি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অতীতকে আধুনিকতার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে ‘তখন মানুষ অনেক মুক্ত ছিল’ বললেও ভুল হবে। বরং বলা উচিত, তখন মানুষ শরীরকে অন্য এক সাংস্কৃতিক ভাষায় ভাবত। সেই ভাষা আমাদের ভাষা নয়। আমাদের কাজ সেই ভাষাকে সম্মান দিয়ে পড়া।

খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় রহস্য তাই কোনও নির্দিষ্ট যৌনভঙ্গিতে নেই। রহস্যটি আছে এই প্রশ্নে—কেন একটি মন্দিরের গায়ে মানুষের সমগ্র জীবনকে জায়গা দেওয়া হল? কান্দারিয়া মহাদেবের দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি কোথায় চোখ রাখব। এত শরীর, এত ভঙ্গি, এতগুলি মানবদেহের এমন জটিল বিন্যাস যে একটিকে দেখতে গেলে আর-একটি চোখের কোণে এসে পড়ে। দূর থেকে তারা যেন পাথরের অলঙ্করণ; কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি একটি করে দৃশ্য। কোথাও দুজন মানুষ পরস্পরের দিকে ঝুঁকে আছে, কোথাও আলিঙ্গনে আবদ্ধ, কোথাও একাধিক দেহ এমন এক জটিল বিন্যাসে যুক্ত যে মনে হয় শিল্পী মানবশরীরের সম্ভাবনাকেই পরীক্ষা করছেন। খাজুরাহোর এই ভাস্কর্যগুলির সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিস্ময় প্রথমে যৌনতার জন্য নয়, শিল্পীর কল্পনার জন্য। মানুষ শরীর দিয়ে কতরকম রেখা তৈরি করতে পারে, একটি দেহ অন্য একটি দেহের সঙ্গে যুক্ত হলে কতগুলি নতুন আকৃতি জন্ম নেয়, সেই আবিষ্কার যেন এই পাথরগুলির ভিতরে লুকিয়ে আছে।

দুই শরীর পাশাপাশি দাঁড়ালে একটি সরল রেখা তৈরি হয়; কিন্তু আলিঙ্গনে সেই রেখা বেঁকে যায়। একটি দেহ আর-একটির দিকে ঝুঁকলে ত্রিভঙ্গ তৈরি হয়। দুই শরীরের মধ্যে দূরত্ব কমলে পাথরের ফাঁকও কমে আসে, অথচ সেই ফাঁকের ভিতরেই তৈরি হয় সবচেয়ে গভীর ছন্দ। খাজুরাহোর ভাস্কর্যশিল্পী যেন জানতেন, শরীরকে শুধু সামনের দিক থেকে দেখলে শরীরকে সম্পূর্ণ দেখা যায় না। শরীরের আসল সৌন্দর্য তার ঘূর্ণনে, বাঁকে, ভারসাম্যে। ফলে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনও এখানে একটি sculptural problem—দুটি দেহকে কীভাবে এক পাথরের মধ্যে এমনভাবে বসানো যায় যাতে তারা আলাদা থেকেও এক হয়ে ওঠে। একটি যুগলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, এ যেন শুধু নারী ও পুরুষের মূর্তি নয়, দুটি নদীর মিলন। একজনের শরীর অন্যজনের শরীরকে সম্পূর্ণ করছে। হাতের রেখা গিয়ে মিশেছে কাঁধে, কাঁধ থেকে নেমে এসেছে কোমরে, কোমর থেকে উরুতে, উরু থেকে পায়ের পাতায়। কোনও রেখা থেমে নেই। যেন সমস্ত শরীর একটি চলমান বাক্য। এই কারণেই খাজুরাহোর মিথুনমূর্তিগুলিকে শুধু ‘যৌনমূর্তি’ বললে তাদের শিল্পকে ছোট করা হয়। তারা একই সঙ্গে দেহের কবিতা এবং স্থাপত্যের ছন্দ। আরও কাছে গেলে দেখা যায়, সব যুগল একই রকম নয়। কোথাও নারী ও পুরুষের মধ্যে দূরত্ব আছে—চোখে চোখ, হাতের সামান্য স্পর্শ। কোথাও তারা পরস্পরের খুব কাছে। কোথাও আলিঙ্গন। কোথাও এমন ঘনিষ্ঠতা, যেখানে দুই শরীরের পৃথক সীমারেখাই প্রায় অদৃশ্য। এই পরিবর্তনগুলি যেন প্রেমের বিভিন্ন মুহূর্তের একটি নীরব অভিধান। প্রথম দৃষ্টি, আকর্ষণ, কাছে আসা, স্পর্শ, আলিঙ্গন—তারপর সেই ব্যক্তিগত জগৎ, যেখানে বাইরের পৃথিবী আর থাকে না। এই ধারাবাহিকতা ভারতীয় শৃঙ্গার রসের কথা মনে করিয়ে দেয়। শৃঙ্গার শুধু মিলনের মুহূর্ত নয়; তার আগে আছে অপেক্ষা, লজ্জা, আকর্ষণ, সজ্জা, দৃষ্টি, সংকেত। আবার আছে বিরহও। ফলে খাজুরাহোর নারীমূর্তিগুলির আয়না দেখা, চুল ঠিক করা, অলঙ্কার পরা, নাচা কিংবা প্রেমিকের দিকে তাকানোর দৃশ্যগুলিকে মিথুনমূর্তির থেকে আলাদা করে দেখলে হয়তো একটি বড় ছবি হারিয়ে যায়। তারা সবাই মিলে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার একটি বৃহৎ নাটক তৈরি করে। তারপর এমন কিছু ভাস্কর্যের সামনে এসে দাঁড়াই যেখানে দুজন নয়, একাধিক মানবদেহ একই দৃশ্যের মধ্যে। প্রথম দর্শনে চোখ আটকে যায়। কারণ আধুনিক সমাজের চোখে এমন প্রকাশ্য বহুদেহী যৌন দৃশ্য আজও বিস্ময়কর। কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকালে অন্য কিছু দেখতে পাই। দেখি composition। দেখি, একজনের শরীর কীভাবে আর-একজনের শরীরের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করছে। দেখি, কে দাঁড়িয়ে, কে বসে, কে পিছনে, কে সামনের দিকে। দেখি, শিল্পী কীভাবে কয়েকটি মানবদেহকে একটি জ্যামিতিক নকশায় পরিণত করেছেন। এই জায়গাতেই খাজুরাহো আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে। কারণ শিল্পী যৌনতার মুহূর্তকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগ হিসেবে দেখেননি; তিনি তাকে দৃশ্যমান বিন্যাসে পরিণত করেছেন। তিনটি শরীর পাশাপাশি এলে তিনটি পৃথক ব্যক্তিত্বের বদলে একটি জটিল visual rhythm তৈরি হয়। একটি বাহু অন্য শরীরের রেখা অনুসরণ করে, একটি মুখ অন্যদিকে ঘোরে, একটি পা নীচে এসে composition-কে স্থির করে। মানুষের কামনা এখানে একই সঙ্গে জ্যামিতি।

আমি মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে ভাবি, আমাদের শরীর আসলে কতখানি স্থাপত্য। হাঁটুর ভাঁজ, কোমরের বাঁক, কাঁধের ঢাল, ঘাড়ের ঘূর্ণন—সবকিছুই একটি স্থাপত্যিক ভারসাম্য তৈরি করে। একজন ভাস্কর যখন মানুষের ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য পাথরে ধরেন, তখন তাকে শুধু অনুভূতি নয়, ভারও বুঝতে হয়। পাথরের মধ্যে কোনও শরীর ভেসে থাকতে পারে না। প্রতিটি দেহকে অন্য কোনও দেহ, প্রাচীর কিংবা স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। তাই খাজুরাহোর যৌনভাস্কর্যের ভিতরে একটি অসাধারণ কারিগরি জ্ঞানও কাজ করছে।

কখনও কখনও মনে হয়, এই মূর্তিগুলির মধ্যে শিল্পী যেন মানবদেহের সীমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাস্তব জীবনের একটি মুহূর্তকে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই অসম্ভবতাই তাকে শিল্পে পরিণত করে। বাস্তব মানুষ যেখানে থেমে যায়, পাথরের মানুষ সেখানে আরও একটু বাঁক নেয়, আরও একটু ঘোরে, আরও কয়েকটি শরীরকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে। শিল্প বাস্তবের অনুবাদ নয়—বাস্তবের স্বপ্নও হতে পারে। এখানে ‘কাম’ শব্দটির অর্থও নতুন করে ভাবতে হয়। কাম মানে শুধু শরীরের মিলন নয়। কাম মানে আকাঙ্ক্ষা। আর আকাঙ্ক্ষার স্বভাবই হল, সে নিজের সীমা অতিক্রম করতে চায়। যে-মানুষ একা, সে অন্যের দিকে এগোয়। দুটি মানুষ কাছাকাছি আসে। দুইয়ের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল তা কমে যায়। খাজুরাহোর বহু মিথুনমূর্তিতে এই ‘দূরত্ব কমে যাওয়ার’ দৃশ্যটি এত প্রবল যে যৌনতার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সংযুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

আর এক জায়গায় দেখি, কয়েকটি চরিত্র একটি যুগলকে ঘিরে আছে। কেউ যেন তাকিয়ে, কেউ সহায়কের মতো, কেউ আবার সম্পূর্ণ অন্য একটি ক্রিয়ায় ব্যস্ত। প্রথমে দৃশ্যটি আমাকে চমকে দেয়। তারপর মনে হয়, এখানে শিল্পী শুধু দুই মানুষের ব্যক্তিগত জগৎ দেখাননি; তিনি তার চারপাশের সামাজিক জগতটিকেও রেখেছেন। মানুষের যৌনতা কখনও সম্পূর্ণ সামাজিকতার বাইরে নয়। প্রেম, বিবাহ, পরিবার, প্রজনন, উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গে তার যোগ আছে। ফলে একাধিক মানুষের উপস্থিতি শুধু যৌনতার বহুগুণ বৃদ্ধি নয়; তা একটি সামাজিক দৃশ্যও তৈরি করতে পারে। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজের কথা মনে হয়। রাজসভা ছিল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল, শিল্পী ও কারিগর ছিলেন, ব্যবসায়ী ছিলেন, নর্তকী ছিলেন, সংগীতজ্ঞ ছিলেন, নানা পেশার মানুষ ছিলেন। খাজুরাহোর দেওয়াল সেই সমাজের সম্পূর্ণ ছবি নয়, কিন্তু তার একটি সাংস্কৃতিক কল্পনা অবশ্যই বহন করে। যৌনতা সেখানে জীবনের অন্য ক্রিয়াগুলির মতোই একটি দৃশ্যমান বিষয়। তার পাশে সঙ্গীত, নৃত্য, প্রসাধন, যুদ্ধ, শিকার, ধর্মীয় আচার—সবই রয়েছে। কান্দারিয়ার একটি জটিল মিথুনমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমার মনে হয়, পাথরের মানুষগুলির মধ্যে কোনও লজ্জা নেই। অথচ লজ্জা মানুষের খুব প্রাচীন অনুভূতি। শিল্পী তা জানতেন। তাহলে তিনি লজ্জাহীন শরীর কেন নির্মাণ করলেন? হয়তো কারণ মন্দিরের বহির্ভাগে মানুষের জগৎকে এমন একটি অবস্থায় দেখানো হয়েছিল যেখানে জীবন তার সমস্ত রূপ নিয়ে উপস্থিত। অথবা হয়তো ভাস্কর্যগুলির কিছু অংশ ছিল শুভতা, উর্বরতা ও জীবনীশক্তির সঙ্গে যুক্ত। আবার তান্ত্রিক ব্যাখ্যাও এসেছে। কিন্তু কোনও একটি ব্যাখ্যাই সমস্ত মূর্তিকে ব্যাখ্যা করে না। এই অনির্দিষ্টতাই খাজুরাহোর সৌন্দর্য।

একটি মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমি শিল্পীর মন পড়তে পারি না। শুধু তার হাতের কাজ পড়তে পারি। দেখতে পারি, সে শরীরের কোন অংশে জোর দিয়েছে। দেখতে পারি, কোন রেখাকে দীর্ঘ করেছে, কোনটি সংক্ষিপ্ত। কোথাও নারীদেহের কোমর প্রায় অসম্ভব সরু, কোথাও নিতম্বের বাঁক অতিরঞ্জিত, কোথাও স্তনের গোলাকারতা স্পষ্ট, কোথাও পুরুষদেহের কাঁধ ও বাহু শক্তিশালী। এগুলি বাস্তব মানুষের মাপ নয়; এগুলি আদর্শ শরীরের নির্মাণ। অর্থাৎ খাজুরাহোর শিল্পী মানুষকে যেমন দেখেছেন, তার চেয়েও বেশি—মানুষকে যেমন দেখতে চেয়েছেন, তেমন করে গড়েছেন। এই ‘আদর্শ শরীর’ ধারণাটিও ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত। দেবমূর্তির শরীর কখনও বাস্তব মানুষের শরীরের অনুকরণ নয়। তার নিজস্ব iconographic proportion আছে। কিন্তু খাজুরাহোর সুরসুন্দরীরা দেবী না হয়েও এক ধরনের আদর্শ সৌন্দর্য বহন করে। তাদের শরীর বাস্তবের চেয়ে বেশি সুন্দর, বেশি বাঁকানো, বেশি ছন্দময়। তারা প্রকৃতির অনুকরণ নয়; প্রকৃতির নন্দনতাত্ত্বিক পরিশুদ্ধি।

আর সেই শরীর যখন অন্য একটি শরীরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সৃষ্টি হয় মিথুন। ভারতীয় শিল্পে মিথুনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। মন্দিরের প্রবেশপথ, স্তম্ভ, তোরণ, অলঙ্করণে যুগলমূর্তি শুভতার প্রতীক হিসেবেও দেখা গেছে। খাজুরাহো সেই পুরোনো প্রতীকী পরম্পরাকে এক অসাধারণ শৈল্পিক বিস্তারে নিয়ে গেছে। প্রেমিক-প্রেমিকার দেহ যেন মন্দিরের নিজেরই একটি ভাষা হয়ে উঠেছে। আমি তখন ভাবি, মন্দিরের স্থাপত্য নিজেই তো একটি ‘মিলন’। ভিত্তি ও শিখর, মাটি ও আকাশ, অন্ধকার ও আলো, বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ—সব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। একটি মন্দির দাঁড়িয়ে থাকে সংযোগের উপর। তাহলে তার দেওয়ালে মানবদেহের মিলন কি নিছক কাকতালীয়? আমরা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি না। কিন্তু শিল্পের ভিতরে এই প্রতিধ্বনি অনুভব করা যায়। বিশেষ করে যেখানে যুগলমূর্তি স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে রয়েছে, সেখানে দেহের মিলন ও স্থাপত্যের সংযোগের মধ্যে একটি visual parallel তৈরি হয়। দুটি শরীর যেমন একে অপরকে ধরে, স্থাপত্যের দুটি অংশও তেমন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। পাথর এখানে সম্পর্কের ভাষা হয়ে ওঠে। আর এই সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর দিক হল স্পর্শ। খাজুরাহোর ভাস্কর্যে স্পর্শ বারবার ফিরে আসে। হাত কাঁধে, হাত কোমরে, হাত মুখের কাছে, হাত অলঙ্কারে। স্পর্শের ভাষা। আধুনিক পৃথিবীতে আমরা অনেক সময় যৌনতাকে শুধু দৃশ্যের মধ্যে দেখি—কী দেখা যাচ্ছে। কিন্তু খাজুরাহোর শিল্পী যেন জিজ্ঞেস করেন—কী স্পর্শ করা হচ্ছে? শরীরের সঙ্গে শরীরের দূরত্ব কত? সেই দূরত্বের পরিবর্তন কীভাবে অনুভূতি তৈরি করে?

দৃষ্টি ও স্পর্শ—এই দুইয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা ভারতীয় শৃঙ্গারের কেন্দ্রে। প্রেমিকাকে দেখার আনন্দ যেমন, তাকে স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষাও তেমন। কিন্তু স্পর্শের আগের মুহূর্ত, যখন হাত এখনও পৌঁছয়নি, সেই মুহূর্তও কামনার। খাজুরাহোর অনেক মূর্তিতে এই ‘আগে’ এবং ‘পরে’-র মধ্যবর্তী সময়টি ধরা আছে। কোনও নারী দাঁড়িয়ে আছে, পুরুষ তার দিকে এগিয়ে এসেছে। কোনও যুগলে মুখ কাছাকাছি, কিন্তু শরীরের দূরত্ব এখনও আছে। কোথাও হাত বাড়ানো। কোথাও আলিঙ্গন। যেন মন্দিরের দেওয়াল একটি সম্পূর্ণ প্রেমকাহিনি লিখেছে, কিন্তু কোনও শব্দ ব্যবহার না করে। এবং সেই প্রেমকাহিনির শেষ নেই। একটি মূর্তি থেকে অন্য মূর্তিতে গেলে দৃশ্য বদলায়। কিন্তু অনুভূতির ধারাবাহিকতা থেকে যায়। আকর্ষণ থেকে স্পর্শ, স্পর্শ থেকে মিলন, মিলন থেকে তৃপ্তি—আবার একাকিত্ব, প্রসাধন, অপেক্ষা। জীবন যেমন সরল রেখায় চলে না, খাজুরাহোর কামও তেমন নয়। আমি তখন আবার সেই বহু-দেহের ভাস্কর্যগুলির কাছে ফিরি। তিনটি বা তার বেশি মানবদেহের উপস্থিতি আধুনিক দর্শকের চোখে স্বাভাবিকভাবেই বেশি চমক তৈরি করে। কিন্তু শিল্পীর চোখে হয়তো এই বহুদেহ একটি complex composition। তিনি দেখছেন শরীরের ছন্দ। দর্শকের চোখ যেখানে নৈতিক বা যৌন প্রশ্নে আটকে যায়, শিল্পীর চোখ সেখানে রেখা ও ভারসাম্য খুঁজছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। আমরা যদি শুধু প্রশ্ন করি—‘এখানে কী হচ্ছে?’—তাহলে আমরা অল্পই দেখব।

যদি প্রশ্ন করি—‘এখানে শিল্পী কীভাবে দেহগুলি সাজিয়েছেন?’—তখন একটি নতুন খাজুরাহো খুলে যায়।

একটি শরীরের বাঁক অন্য শরীরের বিপরীত বাঁক। একটি হাতের রেখা আর-একটির কাঁধের রেখাকে অনুসরণ করছে। একটি মুখ composition-এর বাইরে তাকিয়ে আছে, ফলে দর্শকের চোখও সেই দিকে চলে যাচ্ছে। একটি পা নিচের দিকে এসে পুরো দৃশ্যকে স্থির করছে। একটি অলঙ্কার দুই শরীরের মধ্যে রেখার সেতু তৈরি করছে। এ যেন পাথরের choreography। এই choreography-র কথা না বললে খাজুরাহোর erotic sculpture-কে বোঝা যায় না। কারণ নৃত্য ও যৌনতার মধ্যে একটি গভীর নন্দনতাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে—দুটিই শরীরের ছন্দের শিল্প। নর্তকী যখন শরীর বাঁকায়, দর্শক শরীরের সম্ভাবনা দেখে। প্রেমিক-প্রেমিকা যখন পরস্পরের দিকে বাঁকে, তখনও শরীরের ছন্দ তৈরি হয়। খাজুরাহোর ভাস্কর্য এই দুই ছন্দকে কখনও কখনও একেবারে পাশাপাশি রেখেছে। একদিকে নৃত্যরত নারী। অন্যদিকে আলিঙ্গনরত যুগল। মাঝখানে সঙ্গীতজ্ঞ। মন্দিরের গায়ে যেন একটি সম্পূর্ণ performance চলছে। আর তার দর্শক আমরা। হাজার বছর পরে এসে।

সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়। পাথরের শরীরগুলি তখন ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে। কিছু মুখ এখনও আলোয়। একটি নারী-মূর্তির ঠোঁটে আলো পড়ে আছে, তার চোখ ছায়ায়। একটি পুরুষের কাঁধে শেষ সূর্যের রেখা। একটি যুগলের শরীর অর্ধেক আলোয়, অর্ধেক অন্ধকারে। মনে হয়, খাজুরাহোর ভাস্কর্যগুলির আসল সৌন্দর্য হয়তো এই আলো-অন্ধকারেই। কারণ কামও তো সম্পূর্ণ আলোয় থাকে না।

তার কিছু অংশ দৃশ্যমান, কিছু অংশ কল্পনা। শরীর দেখা যায়, অনুভূতি দেখা যায় না। আলিঙ্গন দেখা যায়, তার ভিতরের আবেগ দেখা যায় না। মুখ দেখা যায়, মনের কথা জানা যায় না। পাথর তাই যতটা দেখায়, তার চেয়ে বেশি লুকিয়ে রাখে। এই লুকিয়ে রাখাই শিল্পের সৌন্দর্য।

আমি মন্দিরের দেওয়ালে হাত রাখি না, শুধু কাছ থেকে দেখি। পাথরের উপর এখনও কারিগরের ছেনির ক্ষীণ চিহ্ন কোথাও কোথাও বোঝা যায়। ভাবি, এই শরীরগুলি তৈরি করতে কতদিন লেগেছিল। কতবার পাথর কাটা হয়েছে। কোথায় ভুল হলে পুরো অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারত। শিল্পী জানতেন, তিনি যে শরীরটি তৈরি করছেন তা তাঁর নিজের শরীর নয়, কোনও নির্দিষ্ট মানুষেরও নয়। তিনি তৈরি করছেন ‘মানুষের শরীর’-এর একটি আদর্শ। সেই শরীর একদিকে কামনার, অন্যদিকে দেবত্বেরও সম্ভাব্য বাহন। আর এখানেই খাজুরাহোর সবচেয়ে গভীর রহস্য।

যে শরীরকে আমরা কামনার চোখে দেখি, সেই শরীরই মন্দিরের শরীর। যে দেহকে আমরা ইন্দ্রিয়ের বলে ভাবি, সেই দেহ দিয়েই দেবতার আবাস নির্মিত হয়েছে। যে মিলনকে আমরা ব্যক্তিগত বলে মনে করি, তার ছবি খোদিত হয়েছে পবিত্র স্থাপত্যে। এই দ্বন্দ্ব নয়, বরং সহাবস্থানই খাজুরাহোর দর্শনকে এত জটিল করে।

সম্ভবত তাই খাজুরাহোর সামনে দাঁড়িয়ে ‘অশ্লীল’ বা ‘পবিত্র’—এই দুটি শব্দের কোনওটাই যথেষ্ট নয়। বরং বলতে হয়—এগুলি জীবনের ভাস্কর্য। জীবনের যে অংশ আমরা প্রকাশ্যে বলতে সংকোচ করি, সেই অংশও জীবন। আকাঙ্ক্ষা, শরীর, প্রেম, মিলন—এসবকে বাদ দিয়ে মানুষ সম্পূর্ণ হয় না। আর মানুষকে সম্পূর্ণ দেখার এই সাহসই খাজুরাহোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দুই শরীরের মিলন হোক, তিনটি শরীরের জটিল composition হোক, একা আয়নার সামনে দাঁড়ানো নারী হোক, পায়ের কাঁটা তুলতে থাকা সুন্দরী হোক—প্রত্যেকের মধ্যেই শিল্পী একই কথা লিখে গেছেন: শরীর জীবনের বিরুদ্ধে নয়। শরীর জীবনকে প্রকাশ করে। তারপর সেই শরীরের ভিতর দিয়েই আসে প্রশ্ন—জীবন কি শুধু শরীর? এই প্রশ্নের উত্তর মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে নেই। উত্তর খুঁজতে হলে ভিতরে যেতে হয়। বাইরে তখনও অসংখ্য শরীর। ভিতরে অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে দেবতা।

খাজুরাহোর এই পথটি তাই আমার কাছে কোনও নৈতিক সিঁড়ি নয়—‘কাম থেকে পবিত্রতার দিকে’ এমন সরল পথও নয়। বরং এটি মানুষের অভিজ্ঞতার বিস্তৃত মানচিত্র। যেখানে কাম আছে, কিন্তু কামই শেষ নয়; যেখানে দেহ আছে, কিন্তু দেহই সম্পূর্ণ মানুষ নয়; যেখানে ইন্দ্রিয় আছে, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের বাইরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও আছে।

এই কারণেই বহু শতাব্দী পরেও খাজুরাহোর দুই বা তিনটি দেহের সেই জটিল মিলন আমাকে শুধু চমকে দেয় না। আমাকে ভাবায়। কী আশ্চর্য, মানুষের শরীর এত সুন্দর করে পাথরে লেখা যায়। কী আশ্চর্য, আকাঙ্ক্ষার মতো অদৃশ্য একটি জিনিসকে পাথরের মতো কঠিন পদার্থে ধরে রাখা যায়। কী আশ্চর্য, এক হাজার বছর আগে কোনও অজ্ঞাত শিল্পী মানুষের ঘনিষ্ঠতার একটি মুহূর্তকে এমনভাবে খোদাই করে রেখে গিয়েছিলেন যে আজও তার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজের শরীর, নিজের কামনা, নিজের লজ্জা এবং নিজের দেবত্ব—সবকিছুকে একসঙ্গে ভাবতে বাধ্য হই। খাজুরাহো তখন আর শুধু মন্দির থাকে না। সে হয়ে ওঠে মানুষের শরীরের মহাকাব্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে