প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণদর্শন, মিথ, শব্দ ও মানুষের গল্প

মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণদর্শন, মিথ, শব্দ ও মানুষের গল্প

0
56
আসমা বীথি
বাংলাদেশের সমকালীন চলচ্চিত্রে মেজবাউর রহমান সুমন এমন একজন নির্মাতা, যিনি একইসঙ্গে দর্শকপ্রিয়তা এবং শিল্পভাষা—এই দুই ক্ষেত্রেই একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে লোকজ মিথ, প্রতীক, মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতি ও বাস্তবতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ মিলেমিশে নির্মাণ করে এক স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা প্রায়ই গল্পের সীমা অতিক্রম করে পৌঁছে যায় নির্মাণদর্শন, নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পচিন্তার প্রশ্নে।  
এই দীর্ঘ আলাপটি মূলত তাঁর সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র রইদকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে তাঁর সমগ্র সৃজনপ্রক্রিয়া জুড়ে। গল্প নির্বাচন, চিত্রনাট্য, সংলাপ, অভিনয় পরিচালনা, মিজঁ-সান, ক্যামেরা, শব্দ, সংগীত, লোকঐতিহ্য, বাস্তবতার নির্মাণ, শিল্পীসত্তা, বাজার, দর্শক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের নৈতিকতা—বিভিন্ন প্রসঙ্গে তিনি বিস্তারিতভাবে নিজের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি উঠে এসেছে হাওয়া নির্মাণের অভিজ্ঞতা, টেলিভিশন ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রি-প্রোডাকশন, লোকেশন নির্মাণ, শিল্প নির্দেশনা এবং চলচ্চিত্রের প্রচারণা নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
কথোপকথনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে কিছু সংযোগ-প্রশ্নও ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছে, যাতে আলাপের ধারাবাহিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা অক্ষুণ্ণ থাকে। পাঠের সুবিধার্থে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দুই পর্বে প্রকাশ করা হচ্ছে। আশা করি, এই আলাপ নির্মাতার চলচ্চিত্রগুলো দেখার পাশাপাশি তাঁর নির্মাণপ্রক্রিয়া ও শিল্পভাবনা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্যও সমানভাবে উপভোগ্য হবে।

নির্মাণের ভিত: গল্প, মানুষ ও চলচ্চিত্র ভাষা

( পর্ব ১ )

আসমা বীথি: সফলতাকে কীভাবে উপভোগ করছেন?
মেজবাউর রহমান সুমন: এই সময়ে এটা বলা একটু কঠিন। ‘সফলতা’ শব্দটিকে আসলে  বাণিজ্যিক জায়গা থেকে সবাই বোঝার চেষ্টা করে, আর্টের জায়গা থেকে শব্দটি যায় না। সিনেমার সফলতা হয়ে ওঠে সিনেমার কিউরেটিং-এর মধ্য দিয়ে। আর এখন যে সফলতার কথা হচ্ছে সেগুলো মূলত আলোচনা। আমার কাছে মনে হয়, এই আলোচনা শেষ হওয়ার পর এই ছবির কোনো কিছু যদি থেকে থাকে—গভীরতা বা নীরবতা—সেটা আরও পরে আলোচনা হবে। আর তখনই মনে হয় এই ছবির সফলতা হবে।

আসমা বীথি: তার মানে অনেকখানি নির্মোহ থেকে উপভোগ করতে পারেন…
মেজবাউর রহমান সুমন: এটা আমি কী করে বলব! নিজেকে ব্যাখ্যা করা সবচেয়ে কঠিন। আমার কাছে মনে হয়, আমি যে বিষয়ে ছবি বানিয়েছি, অন্য কোনোকিছু না ভেবেচিন্তেই ছবিটা বানিয়েছি। আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে, সিনেমা বলা ভুল হবে, আর্ট ফর্ম যেভাবে বলা হয়; সেটার সাথে এটাকে কীভাবে বাণিজ্যিকরণ করা হবে, কীভাবে সেল করা হবে, কীভাবে দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে—এটাই মূল চ্যালেঞ্জ। সিনেমাটাকে আপনি কী ফিলোসফি বলছেন, কোনও চ্যালেঞ্জকে ভেঙে দিচ্ছেন; কোন  কথাটা বলা উচিত, কোন নীরবতাকে আমরা হারিয়ে ফেলি— সেগুলো এখনকার আর্টের চ্যালেঞ্জ না। তো যেটা হয়, আমাকে এখন অনেকই অনেক কিছু বলছে, সেটা অবশ্যই আমার জন্য ভালো লাগার। কিন্তু মনে হয়, আরও পরে এ-সিনেমার গভীরতা নিয়ে মানুষ কথা বলবে। আমরা তো আসলে দেখা জিনিসের কাছাকাছি জিনিস নির্মাণ করি, কিংবা করতে চাই। আমি যখন হাওয়া করেছিলাম, সেটা আমার প্রথম ছবি। কিংবা এরও আগে যখন আরো কিছু সামান্য কাজ করেছিলাম টেলিভিশনের জন্য, কখনো মাথায় রেখে কিছু করিনি। মাথায় রেখে বলতে বুঝাচ্ছি যে আর্টও মাথায় রাখিনি, বাণিজ্যও মাথায় রাখিনি। আপনি যদি বলেন, তাহলে কি সবকিছুই আপনি এভাবে করতে পেরেছেন? না, আমি পারিনি। সবসময় এটা বজায় রাখতে পেরেছি এমন নয়। অনেক কাজ আছে আমি নষ্ট করেছি, অনেক কাজ বুঝিনি, অনেক কাজ আছে আমার পরিস্থিতি আমাকে করতে বাধ্য করেছে। পরিস্থিতি বলতে টিকে থাকার যে লড়াই। আমাকে তো টিকে থাকার লড়াইটা করতে হয় এই কাজের ভেতর দিয়ে, কাজটা করেই, তাই না? তবে এটাও ঠিক যে, আমি যখন যে কাজটা করতে চেয়েছি; চেয়েছি সেটা আমার মতো করেই হোক। এখন সেটা কীরকম, আমি জানি না।  

আসমা বীথি: একজন নির্মাতার মাথায় অনেক গল্প ঘোরে। কোন গল্পটি চলচ্চিত্র হয়ে উঠবে, সেক্ষেত্রে কী কী উপাদান সিদ্ধান্ত নিতে প্রেরণা যোগায়? বলা চলে, ঝুঁকি নিতে সাহসী করে?
মেজবাউর রহমান সুমন: না, আমার ক্ষেত্রে অনেকগুলো গল্প কখনোই মাথায় একসাথে কাজ করে না। বরং সবসময় গল্পহীনতা, গল্পশূন্যতার মধ্যে থাকি। চারপাশে অসংখ্য সুন্দর গল্প কখনোই আমাকে টানে না। গল্পের সৌন্দর্য কখনোই মুগ্ধ করেনি, কখনোই না। বরং কোনো গল্পের মায়া আমাকে সে-সিনেমা বানানোর জন্য আগ্রহী করে তুলেছে। ওই সিনেমার কোনো একটা বিষয়বস্তু যখন আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে, কোনো একটা অনুভূতি যখন কথা বলতে চেয়েছে, তখনই করতে চেয়েছি। কখনো কোনো স্টোরি লাইনের কোনো একটা লেয়ার কিংবা এমন কোনো বিষয়; যেটা দর্শক বা আমরা সহজে পড়তে আনন্দ পাই, ওইরকম গল্প টানেনি। তাহলে তো চারপাশে অসংখ্য গল্প কিংবা অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্প, যেসব আমার পড়া, সেগুলো আমি বানাতে পারতাম। হয়তো বানাতে চাইও সামনে। কিন্তু ভাবি, গল্পটা আমার সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে কি না, আমার নিজের ক্ষেত্রেও। আমি কোনো একটা কিছুতে ড্রাইভ দিই। এখনকার অনুভূতি এটা। পাঁচ বছর পরে হয়তো আমার অনুভূতি পাল্টে যাবে। আরেকটা জিনিস আমার বলতে ইচ্ছা করবে। তাৎক্ষণিকভাবে এখন কী বলতে ইচ্ছা করছে সেটাই আমার সিনেমা। আমি মনে করি না, আমি কোনো কিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে বলি। এমন না যে, এটা বলতে চাই বিধায় এটা বানাচ্ছি। তো, আমার মধ্যে গল্পশূন্যতা আছে বরং। আমি মনে করি যে, হাওয়ার আগে আর কোনো গল্প আমার কাছে ছিল না। একমাত্র ঐটাই ছিল, সে-কারণে ওটা বানিয়েছি। রইদ বানানোর সময় এই একটা গল্পই ছিল, ফলে সেটাই বানিয়েছি।

আসমা বীথি: সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে ‘মায়া’ শব্দটি আপনি বেশ জোরের সাথে ব্যবহার করেন। ‘কদর্যতা’-কে কীভাবে দেখেন?
মেজবাউর রহমান সুমন: কদর্যতা তো আছে। আমার ছবিতে খেয়াল করে দেখবেন, বেশ ভয়ঙ্করভাবেই আছে। এমনি এমনি রইদ-এ এমন কিছু চেষ্টা করিনি, চোখে আঙুল দিয়ে কোনো কিছু দর্শককে বুঝিয়ে দিতে। পৃথিবীতে আমরা যে পার্সপেক্টিভে আসি, একটা হচ্ছে প্রশ্ন করি নিজেকে—আমি কোথা থেকে আসলাম। এটা তো পল গগ্যাঁর একটা বিখ্যাত পেইন্টিংয়েও আছে। আমি কোথায় যাব—মানবজাতির জন্ম থেকে এই প্রশ্ন। আমার-আপনার জন্ম থেকে জানার এই কৌতূহল। কিন্তু আমরা দুই জায়গা থেকে এই ব্যাখ্যাটা করি। ওয়েস্টে এক ধরনের ব্যাখ্যা, ইস্টে আরেক ধরনের ব্যাখ্যা। ইস্টে আমরা খোঁজার চেষ্টা করি নিজেকে। ওয়েস্ট হচ্ছে কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। কী, কীভাবে হবে—এটা আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায়। আর আমরা আবিষ্কারের দিকে যাই না। আমরা বলি না ‘কীভাবে’, আমরা বলি ‘কোথা থেকে আসলাম’; ‘আমরা কোথায় যাব’—এই যে আধ্যাত্মিক জায়গায় আমরা পৌঁছাই,  কারণ খুঁজতে গিয়ে কিন্তু বেশিদূর এই মানবজন্মকে নিয়ে আগানো যায় না। নিজেকে খুঁজতে গেলে হয়তো কিছুটা আগাতে পারি, ধরতে পারি নিজেকে। আমার সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্য মূলত এটা।

আসমা বীথি: আত্মকে খোঁজা? অন্বেষণ?
মেজবাউর রহমান সুমন: হ্যাঁ আমি আমাকে প্রশ্ন করি; দর্শককে কি আর প্রশ্ন করব! আপনি হয়তো প্রশ্নগুলো করবেন। এখন মাথায় আসল তাই বলে ফেলি…

আসমা বীথি: নিশ্চয়ই…
মেজবাউর রহমান সুমন: মাতা মেরি যে প্রেগন্যান্ট হয় কিংবা মরিয়ম যে প্রেগন্যান্ট হয়, ওইটা আমার প্রশ্ন। এ-প্রশ্নের কোনো উত্তর দিইনি ছবিতে। কিন্তু পাগলির সাথে সাথে ওই চিন্তাটা দর্শকের মাথায় ঢুকিয়ে দিই। পাগলি বলছে, এটা গড গিফটেড। এটা কীভাবে আসলো? জীবন তো আসলে প্রজননের ভিতর দিয়েই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখে। আর নারী এখানে সমস্ত ক্ষমতার উৎস। এখন লিলিথকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করি, পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণ আছে যেটার পুরুষ সত্তা নাই। বিজ্ঞান এখন এটা বলে দিচ্ছে। মাতৃতান্ত্রিক যে সোসাইটি, ওইটা তো আমরা এই যে কোরআন-বাইবেল দিয়ে একরকম ঠিক করে নিয়েছি যে পুরুষের অধীনস্থ হতে হবে নারীকে। প্রশ্নগুলো আমি ছোট-ছোট করে হয়তো আমার ছবিতে রেখে গেছি। এটা ব্যাখ্যাও দিতে চাইনি। অনেক ক্ষেত্রে নিজেও সেই ব্যাখ্যাগুলো খুঁজছি। আমি জানি যে খুঁজে পাওয়ার কোন শেষ নেই। কিন্তু আমার যে খোঁজটা, এটাই আমার সিনেমা। আই থিংক আমি কোনোকিছু একটা সার্চিং-এর ভিতরে থাকি। সে-কারণে মনে হয়, আপনি যেটা বললেন অনেক গল্পের কথা, আমার কাছে আসলে অনেক গল্প থাকে না। আমি একটা নির্দিষ্ট গল্পের মায়ায় পড়ি। ওই ছবিটা যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ না হয়, অন্য গল্পে ঢুকি না।

আসমা বীথি: তার মানে নিজে যে অনুভূতির ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন না বা যে-চরিত্র আপনাকে আক্রান্ত করছে না, সে গল্পকে নিজের জন্য গ্রহণ করছেন না?
মেজবাউর রহমান সুমন: আমার কাছে মনে হয়, আমার পারফর্মার যখন এক্টিং করে, ও-তো একটা চরিত্রের ভেতরে ঢুকে জীবনযাপন করে। ‘ঢুকে’ শব্দটা ভুল, আমার কাছে মনে হয় জীবনযাপন করতে  হয়। আমাদের এখানে এক্টিং মানে হচ্ছে ডায়লগ, এক্টিং মানে হচ্ছে একশন। আর আমার কাছে এক্টিং মানে লাইফ। ‘আর্টিস্ট কাদামাটি’—পারফর্মাররা খুব সহজে বলেন, কিন্তু আসলে কাদামাটি হয় না কখনো। তাকে ওই পরিস্থিতিতে যেতে হলে, ওই পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে। না হলে কোনো থিউরিটিক্যাল এক্টিং করে ওই পরিস্থিতি বা জায়গায় যাওয়ার পসিবিলিটি নাই। এবং ওই এক্টরের ভূমিকায় আমাকেও থাকতে হয় এজ আ ডিরেক্টর। কিন্তু যখন আমি ব্যাপারটা শ্যুট করছি না—লিখছি—এই আইডিয়াটা আমি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে চাই, তখন আমার মাথায় যদি আরো দুটো গল্প থাকে, তাহলে কি সেটা সম্ভব? একটা গল্পের জার্নির ভেতর থাকতে পারলে আমার খুব আনন্দ হয়। এটা যে খুব পরিকল্পিত, তাও নয়।

আসমা বীথি: একটা গল্পই বা কখন ফিক্সড্ হয়? এ বিষয়ে আমি প্রাক-ধারণা/প্রাক-প্রস্তুতির কথা জানতে চেয়েছিলাম…
মেজবাউর রহমান সুমন: আমার ক্ষেত্রে প্রাক-প্রস্তুতি বলতে ম্যাক্সিমাম যেটা হয়, অপেক্ষা। যেমন গানের সুর করা কিন্তু টেবিলে বসে হয় না। যেহেতু আমি ছোটবেলা থেকে গানের টিউন করতাম, এখনো করি। গানের সুর আমার মাথায় দুইভাবে আসে। একটা হচ্ছে হঠাৎ গানের কথা এবং  সুর—দুটো একসাথে আসে। হয়তো শুয়ে আছি, বিছানায় আছি, গাড়িতে আছি, অথবা রাস্তায় হাঁটছি— যে কোনো পরিস্থিতিতে হঠাৎ আমার মাথায় একটা লাইন আসে। আমি সেটা গুনগুন করতে থাকি। তখন আমার মাথা ছটফট করে। কোথাও একটা ঢুকে যেতে চাই, কারণ আমাকে ওটা লিখতে হবে। তখন দ্রুত বাসায় চলে আসি, বা এমন একটা জায়গায় যেতে চাই যেখান বসে নিজেকে সময় দিতে পারব। তারপর আমি ওখানে গিয়ে বাকিটা শেষ করি। আমার ক্ষেত্রে সিনেমাটাও এভাবেই আসে। স্টোরি-র আগেও আমার যত ন্যারেটিভ আছে, সেগুলো অপেক্ষার ভিতর দিয়ে এসেছে। সারাক্ষণই হয়তো মনে মনে সার্চিং-এর ভিতরে থাকি, কিন্তু আসল গল্প বা চরিত্রের ভিতর দিয়ে যাই না। বরং আমার কোনো একটা সময়ের অপেক্ষা আমাকে একটা আইডিয়া, ন্যারেটিভের ভিতরে নিয়ে যায়। এটাই বারবার ঘটে। এর বাইরে কিছু ভাবি বলে মনে হয় না।

বাস্তবের ভাষা: রূপ, চরিত্র ও অভিনয়

আসমা বীথি: চারুকলায় আপনার শিক্ষা বা এরও আগে কবিতা লেখা আপনার ভিজ্যুয়াল চিন্তাকে কি আগে থেকেই গড়ে দিয়েছিল?
মেজবাউর রহমান সুমন: এটা ব্যাখ্যা করা ডিফিকাল্ট। আমি কোনো কাব্যিকতার জায়গা থেকে সিনেমা দেখার চেষ্টা করিনি। যদি ছবি কাব্যিক হয়ে ওঠে, সেটা মানুষ বলছে। আমি তো বলি না আমি পোয়েটিক মানুষ। যখন টেলিভিশনে কাজ শুরু করি, তখনও বলা হয়েছে। বিজ্ঞাপন করি তখনও বলা হয়েছে। সিনেমা বানাই, তখনও। এটা শুনে আমার আনন্দ লাগে, কিন্তু এটা আমার উদ্দেশ্য না। আমার উদ্দেশ্য বরং ভিন্ন।  উদ্দেশ্য হলো, যে চরিত্র নিয়ে কাজ করি তার গভীরতাকে ধরা, তার ফিলোসফি বলা। আমি কেন বারবার মিথকে সামনে আনছি, মিথ কেন আমার জীবনে এত জরুরি হয়ে পড়ল—এর নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে। গল্প বলার জায়গা থেকেও কারণ আছে। কিন্তু এরকম কোনো উদ্দেশ্যগত জায়গা থেকে করি না যে এটা কাব্যিক হবে। 

আসমা বীথি: শিল্পে কবিতার গ্রাহ্যতাকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকও। তিনি বলেছিলেন, সিনেমা মূলত রূপক বা মেটাফরের খেলা, আর রূপকের জন্মই হয়েছে কবিতা থেকে। এজন্যই প্রভাবের কথা জানতে চাইছিলাম।
মেজবাউর রহমান সুমন: নিশ্চয়ই প্রভাব থাকে। তবে আমি মনে করি প্রত্যেকটা জিনিসই প্রভাব ফেলে। খাবারও প্রভাব ফেলে। সকালে কী খাই, সেটা লাইফে প্রভাব ফেলে। আমার জীবনের সম্পর্ক মা-বোন-বন্ধু-সিনেমা-কবিতা-ছবি আঁকা—সবকিছুই প্রভাব ফেলে। আমি যেগুলো দেখি, পড়ি, সেগুলোই আমাকে প্রভাবিত করে। তাই আমি সেই কাজগুলোই দেখি, যেগুলো আমাকে প্রভাবিত করে।

আসমা বীথি: ‘আমি অরূপার দিকে যাচ্ছি’, ২০০৫-এ আপনার প্রথম টিভি নাটক। হুট করেই নাটক বানানো নাকি প্রস্তুতি ছিল?   
মেজবাউর রহমান সুমন: অরূপা ২০০৬-এ। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন মাথায় আসে যে সিনেমা বানাতে চাই। জার্মান কালচারালে একটা শো দেখি তখন। এর আগে সত্যজিৎ রায়ের ছবি ছোটবেলায় দেখতাম। আমার বড় মামা খুব সত্যজিতের ফ্যান ছিলেন। তিনি দেখতেন, আমাদেরও দেখাতেন। তারপর কলেজে এসে ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিক, মেঘে ঢাকা তারা—এই ছবিগুলো দেখি। বিশেষ করে অযান্ত্রিক দেখার পর একটা অনুভূতি তৈরি হয়। কোন বিষয়টা আমাকে পোক করেছিল জানি না, কিন্তু একটা জায়গা তৈরি হয়েছিল। পরে এটা মাথায় থাকেনি, ভুলে গেছি। চারুকলায় পড়া শুরু করলে আমার বন্ধুত্ব হয় শিবু্‌, শোয়েব, সব্য, উজ্জ্বল আরো অনেকের সাথে। আদিত্যসহ বুয়েটেরও আরো কিছু বন্ধু যারা কবিতা পড়ছে… 

আসমা বীথি: মেঘদলের যাত্রা কি তখন থেকেই?
মেজবাউর রহমান সুমন: মেঘদল তখনই, হ্যাঁ। কোচিং থেকে আমাদের বন্ধুত্ব—শিবু, শোয়েব, উজ্জ্বল—ওদের সাথে সখ্যতার মধ্য দিয়ে। তারপর মেঘদল তৈরি হয়। যারা মেঘদলের গান শোনে তারা বুঝবে, ওই সময়টার একটা প্রভাব ছিল।

আসমা বীথি: সচরাচর একটি স্ক্রিপ্ট তৈরির ক্ষেত্রে কতদিন সময় নেন? আপনার কাজের প্রসেস সম্পর্কে জানতে চাই ।
মেজবাউর রহমান সুমন: দুইটা ছবি করলাম। এর আগে টেলিভিশনে কিছু ফিকশন করেছি। সেগুলোতেও অনেক সময় লেগেছে। আঙ্গুরলতা, পারুলের দিন—এইগুলো প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে ডেভেলপ করেছি। সিনেমায় এসে, হাওয়াশ্যুটিং শেষ হওয়ার পরই, রইদ-এর গল্প মাথায় আসে। আমি স্ক্রিপ্টটা এক ধরনের উপন্যাসের মতো করে লিখে ফেলি। কখনো ডায়লগ লিখতে ইচ্ছা হলে লিখি, না হলে না। প্রথমে খুব স্ট্রাকচার ধরে লিখি না। টানা লিখি। রইদ-এর ক্ষেত্রে প্রথম ড্রাফট করতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগেছিল। হাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু আসল স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট হয় পরে—তিন-চার বছর ধরে। সেখানে আমি একা না, কয়েকজনের সঙ্গে কোলাবরেট করি। শেষে আবার আমি একা বসে ডায়লগগুলো ফাইনাল করি। মাঝখানের সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আসমা বীথি: অনেক কম সময়…
মেজবাউর রহমান সুমন: হাওয়ার ক্ষেত্রেও আমার এরকমই লেগেছিল। এক-দুই সপ্তাহ লেগেছিল এই ড্রাফটটা করতে। কিন্তু আমি যখন স্ক্রিপ্ট করেছি, তখন হাওয়ার স্ক্রিপ্ট করেছি চার বছর ধরে। আর রইদ এর স্ক্রিপ্টও আমরা প্রায় চার-সাড়ে চার বছর ধরে করা। শুরু হয় দু’হাজার বিশ সালে। একুশ থেকে চব্বিশ—এই  সময়টা জুড়ে আমরা কাজ করেছি, চব্বিশ সালে শ্যুট করি। ওই সাড়ে তিন-চার বছর ধরে আমি স্ক্রিপ্টটা ডেভেলপ করি। এটা হয়, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে ফার্স্টে যেটা লিখি, ওইটাই আসলে আমাকে পুরোটা করে দেয়। মানে আইডিয়া থেকে শুরু করে সবটা সেট করে দেয়। স্ক্রিপটিংটা আমি লম্বা টাইমে করি এবং তখন অনেকের সাথে কোলাবরেট করি। প্রথম ধাপে এটা করি না, আবার শেষ ধাপেও করি না। শেষ ধাপে আমি ডায়লগগুলো সেট করি। ফাইনালে ওইগুলো আমি নিজের সাথে বসে করি। আর মাঝখানের যে সময়টা, রইদএর ক্ষেত্রে আমি চারজনের সাথে কোলাবরেট করেছি বিভিন্ন সময়ে। হাওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা তিনজন ছিলাম, যাদের সাথে আমার সারাক্ষণ ওঠাবসা আছে, রাইটিং-এর সাথে যোগাযোগ আছে—এরকম মানুষকেই বেছে নিয়েছিলাম। আপাতত এখন পর্যন্ত এরকম, জানি না সামনে কীভাবে হবে। কিন্তু ওই টাইমটাতে আমার মনে হয় যে তিন-চারজনের সাথে আমার ডিসকাস করতে হয়। আমি তখন নানা পয়েন্টে কথা বলতে থাকি এবং ওদের কাছ থেকে শুনতে থাকি যে, এটার যুক্তিটা কোথায়, ও এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে ইত্যাদি। তখন যে  ইমেজ এবং যে সিচুয়েশনগুলো তৈরি হয়, সেটা আমি ঠিক করে নিই। আবার কোনো জায়গায় দুর্বল লাগলে বুঝতে পারি। তখন ওই জায়গাটা ফিক্স করি। ওই টাইমটা আমার অনেক বেশি লাগে।

আসমা বীথি: সংলাপ কি একাই ঠিক করেন, নাকি ডিসকাশনের ভিতর থেকে উঠে আসে?
মেজবাউর রহমান সুমন: সংলাপ আমি ঠিক করি। মানে ফিলোসফিক্যাল জায়গায় সংলাপ আমি চেঞ্জ করতে দিই না কাউকে। এখন ধরেন, সাদু বলতেছে—‘আগের জামাইয়ের কাছে গেছিলি?’ এটা আমি না বলে দিলে ও কেমনে বলবে? ফিলোসফিক্যাল, তাই না? পারফর্মাররা যখন সংলাপ বলে, সে তার জীবনযাপনের সংলাপ বলতে পারে, ফিলোসফি বলতে পারে না। পাগলির ‘পেটের সন্তান আল্লাহ দিছে’—এটা আমার পারফর্মাররা কোথা থেকে আবিষ্কার করবে? কিংবা ‘বাপের জন্মে এমন পিঠা খাই নাই’—এটা আসলে সিনেমার একটা নির্দিষ্ট ফিলোসফির জায়গা থেকে বলেছি। সাদুর তো বাপ-মা নাই। ও তো একটা বেজন্মা মানুষ। ও বলছে—‘বাপের জন্মেও এমন পিঠা খাই নাই।’ তো আমার একটা উদ্দেশ্য আছে এই ডায়লগটা দেওয়ার। ডায়লগের ব্যাপারে আমি খুবই সচেতন থাকতে চেষ্টা করি।

আসমা বীথি: এখানে সাদুর বউয়ের নামটা উহ্য থাকাও একটা সচেতন বোঝাপড়া মনে হয়…
মেজবাউর রহমান সুমন: হ্যাঁ। আমি স্পেসিফিক লেস ডায়লগে থাকতে চেয়েছি রইদএ। এবং যখন ডায়লগ আসছে তখন হয় এটা জীবনের ডায়লগ, আর না হলে এটা ফিলোসফি। মানে গল্পকে ন্যারেট করার জন্য যতটুকু ডায়লগ দরকার, ওইটুকু ছাড়া আমি ডায়লগ ইউজ করিনি। বাকি যেটুকু, সেটুকু ফিলোসফি। মানে আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে বলছি যে ‘তোর নাম কিরে?’ ‘আমার নাম সাদুর বউ’। কিংবা সাদু যখন তার ওয়াইফকে খুঁজতে যায়, তখন পান্না বলে—‘তোর বউয়ের নাম কী? ভাবির নাম কী?’ তখন ও থতমত খেয়ে যায়। তখন আমি দর্শককে মনে করাতে চাই—নারীর কোনো নাম থাকে না। দর্শকও তখন চুপ হয়ে যায়। পুরো ছবি দেখে আসলে সাদুর বউয়ের নামটা খেয়ালই করা হয়নি দর্শকের —এইটাই আমার উদ্দেশ্য। আমি এটা নির্দিষ্ট করে দিই। পারফর্মারদের ওপর ডায়লগটা ছেড়ে দিই না।

আসমা বীথি: স্ক্রিপ্ট তৈরির ক্ষেত্রে গল্পের কোন অংশটি কঠিন মনে হয়? শুরুটা নাকি শেষটা?
মেজবাউর রহমান সুমন: আমার কাছে মনে হয়, আমি লাকি কারণ আমি সবসময় শেষ অংশ আগে পেয়ে যাই। এটা নিজেরই অবাক লাগে। আমি দেখেছি যে, আমার আশপাশে অনেক ফিল্মমেকার শেষ অংশে গিয়ে জটিলতায় পড়ে। হাওয়ার ক্ষেত্রে আমি শেষ অংশটা আগে পেয়েছিলাম। সিনেমার একেবারে শুরুতেই যখন গল্পটা ভাবি, তখনই জানতাম শেষটা কী। রইদএর শেষটা একেবারেই—আমার আম্মু যখন গল্পটা বলছিল, তার পনেরো মিনিট পর আমি গল্পের শেষটা ঠিক করে ফেলি। আমি জানতাম এটা কোথায় শেষ হবে। তারপর ছবিটা কোথায় নিয়ে যাব, সেটা পরে ঠিক করি। আমার মনে হয় মধ্যমটা নিয়ে আমি ক্রাইসিসে থাকি। গল্পের বক্তব্যটা নিয়ে অনেকবার ড্রাফট করি। কী বলতে চাই, সেটা আগে ঠিক হয়ে যায়। তারপর আমি সেটার মায়ায় পড়ে যাই। এই কারণেই ‘মায়া’ শব্দটা বলি। আমি যখন কী বলতে চাই সেটা পেয়ে যাই, তখনই গল্পের প্রেমে পড়ি। তাই শেষটা আমি সবসময় পেয়ে যাই, কিন্তু মধ্যমটা ঠিক করা লাগে। 

আসমা বীথি: এই মধ্যম অংশটা ঠিক করার সময়টাকে কীভাবে মোকাবেলা করেন? ক্রিয়েটিভ ব্লক যখন তৈরি হয় একেক শিল্পী তো একেক রকম পদ্ধতি বেছে নেয়, আপনারটা কীরকম? 
মেজবাউর রহমান সুমন: আমার ক্ষেত্রে ম্যাক্সিমাম হয়েছে ব্রেক—না লেখা। সেটা ন্যাচারালি ঘটে।  রইদ-এর ক্ষেত্রে খুব ন্যাচারালি হয়েছে। হাওয়া-এর ক্ষেত্রে আমি  অনেক  ক্রাইসিসে পড়েছি। লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে কিছু একটা খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। তখন আমি রেখে দিয়েছি। আর রইদ-এর ক্ষেত্রে আমি বুঝতে পারছিলাম আমি কোথায় যেতে চাই। গল্পে মিথকে কিভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। সাদুর বউয়ের নাম নেই—এই জিনিসটাই আমি নোটিশ করাতে চেয়েছি। এই ছবির একটা জটিলতা আছে, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। কিন্তু সরলভাবে উপস্থাপন না করলে সেটা সমস্যায় পড়বে। তখন সেটা অ্যাবস্ট্রাক্ট হয়ে যাবে। আমার দরকার ছিল একটা সরলতা। যে সরলতার ভিতর দিয়ে দর্শক ছবির ভিতরে ঢুকবে, আত্মাটা খুঁজে পাবে। আমার মনে হয় আমি ওই সরলতার খোঁজেই ছিলাম। সবচেয়ে বড় ক্রাইসিস ছিল আমি কতটুকু বলব, এই মিনিমাল জায়গাটা ঠিক করা। বারবার রি-রাইট করেছি। শ্যুটিংয়ের সময়ও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। স্ক্রিপ্ট আর ফাইনাল ছবির মধ্যে কিছু জায়গায় পার্থক্য আছে।

গল্পের ভাষা:  মিথ, লোককথা ও প্রতীক

আসমা বীথি: এখন একটু বাড়িটার ব্যাপারে জানতে চাইব। রইদএ বাড়ি পোড়ানোর কারণ অনেকখানি উহ্য রেখেছেন। কেন? 
মেজবাউর রহমান সুমন: আপনি দেখবেন, এডাম-ইভ পৃথিবীতে আসার পরে সমস্ত যন্ত্রণা লাইফে শুরু হলো। আর সাদু কিন্তু তার ওয়াইফকে জিজ্ঞেস করে—‘তুই বাড়িটা কেন পোড়াই দিলি?’ মামার বাড়িতে দিয়ে আসার সময় ওয়াইফ সাদুকে বলতেছে—‘তুই আমাকে বিশ্বাস করছিস না? দুইটা লোক আসছিল, তারা পুড়ায় দিছে।’ এই দুইটা লোক কে? কেন বাড়ি পুড়ালো তারা—এটার সহজ ব্যাখ্যা করা যেত, সিচুয়েশন তৈরি করা যেত, কিন্তু আমি সেটা করিনি। গ্রামে এই ধরনের ঘটনা থাকে। দুইটা পক্ষ থাকে। কিন্তু কার ঘর পুড়ে যায়? মনিবের ঘর তো পুড়ে না। পুড়ে সাদু আর পাগলির ঘর। এই যে তাদের নিজস্ব ওয়ার্ল্ডটা ধ্বংস হয়ে যায়, এখানে আমি মনস্তত্ত্বটা বলতে চেয়েছি। এর ভিতর ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও আছে। ইডেন গার্ডেনের গল্পের মতোই। আমি একটা স্বর্গ রচনা করেছি, যেখানে ফরবিডেন ফুড খাওয়ার কারণে তাদের সেই স্বর্গ ভাঙ্গে। এই পৃথিবীতে আমরা অসংখ্য পাপ করে যাচ্ছি—একটা ছোট নিষিদ্ধ ফলের চেয়েও বড় পাপ। বার বছরের শিশুর যৌনাঙ্গ কেটে সেক্সুয়াল ঘটনা ঘটছে। মা মেরে ফেলছে সন্তানকে। সন্তান বাবাকে মারছে। বন্ধু বন্ধুর পেটে ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে। এইটাই পৃথিবী। এই ফিলিংটাই আমার গল্প। এর বাইরে কিছু না। সিনেমায় আমি উত্তর দিই না, কারণ নিজেও সেই উত্তর খুঁজি।

আসমা বীথি: বিশ্ব চলচ্চিত্র আপনার চলচ্চিত্রে কীভাবে প্রভাব রাখে? যেমন রইদ ছবির কোনো কোনো দৃশ্য বা নীরবতার ব্যবহার দেখে আন্দ্রেই তারকোভস্কি, বেলা তার বা কিম কি দুকের একটা পরোক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়…
মেজবাউর রহমান সুমন: আপনি যে নামগুলো বললেন, আমি সেইসাথে আরো কিছু নাম অ্যাড করব। লালন, মহীনের ঘোড়াগুলি, কবীর সুমনকে অ্যাড করব। শুধু ফিল্মমেকারদের নাম উল্লেখ করলে মনে হয় অর্ধেকটা বলা হলো। আসলে আমার জীবনে মিউজিক খুবই ইম্পর্ট্যান্ট, মানে সিনেমার থেকেও। আমি মিউজিক থেকে ইন্সপায়ারড হয়েই কাজ করি। শুধু সাইলেন্সের ভিতরে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখতে পারি না। আমার একটা মিউজিক ট্র্যাক লাগে, যেটা লেখার টেম্পোটাকে ঠিক করে দেয়। কলেজ লাইফে মহীনের ঘোড়াগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুবই ভয়ঙ্করভাবে আমাকে প্রভাবিত করে রেখেছে লালন। আমার মামা লালনসংগীত করতেন, বাড়ির পরিবেশে একটা চর্চা ছিল। তারপর অনেক ধরনের ব্যান্ড তো ছিলই।

আসমা বীথি: জানতে চাইছিলাম বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আপনি সেই প্রভাব থেকে সচেতনভাবে মুক্ত থাকতে চান, নাকি মনে করেন যে প্রভাব থাকতে পারে, সেটা কোনো অসুবিধার ব্যাপার না…
মেজবাউর রহমান সুমন: ও আচ্ছা। না, প্রভাবমুক্ত হওয়ার কোনো চেষ্টা আমি করি না। চেষ্টা করি না মানে, প্রভাবমুক্ত আমি কীভাবে হব? প্রত্যেকটা মানুষই তো প্রভাবিত। লালন সাঁইয়ের প্রভাব এড়াতে পারেননি, সত্যজিৎ রায় এড়াতে পারেননি, আমার আশেপাশে অনেক রাইটার পারেননি। তো প্রভাবের আলাপে আমি আসলে মনে করি, প্রত্যেকটা আর্ট ফর্মে যখন থেকে কাজ শুরু করেছি, তখন আমাকে কেউ না কেউ—সেটা মিউজিকে হোক, সিনেমায় হোক, রাইটিংয়ে হোক—মুগ্ধ করেছে, ভাবাচ্ছে কিংবা ভাবিয়েছে। এরকম অসংখ্য ঘটনা আমাকে প্রভাবিত করেছে। সেই প্রভাবের ভিতর থেকেও নিজের মতো করে কাজ করা—সেটাই তো আমার চেষ্টা। আমি আমার কথাটা বলতে  চাই। কীভাবে আমার গল্পটা বলব, কিংবা কীভাবে আমার ছবিটা আঁকব, কিংবা কীভাবে আমার গানটা গাইব—সেটাই তো আমি চেষ্টা করি। কিন্তু সেখানে কারো শ্যাডো বা ছায়া যদি থেকে থাকে, সেটা আমার কাছে মনে হয় যে আমি আমার মতো করে দেখার চেষ্টা করেছি। সেখানে যদি কোনো কিছু এসে যায়, সেটাকে এড়াতেও চাইনি। ওটা এমন না যে, খুব স্ব-প্রণোদিত হয়ে চেষ্টা করেছি, যে তার মতো করেই আমি ছবিটা বানাতে চাই। জানি না, তবে আমার কাজে এরকম আমি সরাসরি ফিল করিনি।  

আসমা বীথি: রইদ ছবির মূল চরিত্র সাদু (মোস্তফা নূর ইমরান) আর পাগলি (নাজিফা তুষি)-র অভিনয় নিয়ে প্রশংসা হচ্ছে। একজন পরিচালক হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী? তারা কি আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে, নাকি প্রত্যাশার চাইতে বেশি উতরে গেছে?
মেজবাউর রহমান সুমন: কিছু সিন আছে, যেসব জায়গায় আমরা যখন লিখছিলাম কিংবা যখন স্ট্রাকচার ডেভেলপ করছিলাম, কিংবা যখন ওদের সঙ্গে রিহার্সেল করছিলাম, তখন যেভাবে ভেবেছিলাম সেটা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার থেকেও বেশি হয়েছে। তবে হ্যাঁ, কিছু  দৃশ্য আছে যেগুলো আমার মনঃপুত হয়নি। এটা তো হবেই। আমার মনে হয়, ঠিক আছে। খুব বেশি পারফেক্ট হওয়ার দরকার নেই। আমি যেভাবে চাই—যেরকম করে আমার চরিত্রকে দেখতে পেয়েছি, সেটাই একশ ভাগ হতে হবে—এটা হওয়ারও দরকার নেই। কারণ এটা আমার চাওয়া। আমি পারফর্মারদের অনেক স্বাধীনতা দিতে পছন্দ করি, যখন তারা সেটে কাজ করে। আবার কিছু কিছু জায়গায় সেই স্বাধীনতা আটকেও দিই। মানে তাদের ইচ্ছে হলো একটা ডায়লগ দিয়ে দেবে, এমন না। আমি তাদের সবসময় বলি, কোনো একটা সিকোয়েন্স হওয়ার সময়, ‘আচ্ছা, এটা বলতে কি অসুবিধা হচ্ছে?’ মানে এই ডায়লগটা দিতে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য লাগছে কি না, কিংবা ডায়লগটা বলতে গিয়ে কোনো জড়তা তৈরি হচ্ছে কি না। এরকম যদি হয়, সেক্ষেত্রে পারফর্মার যদি বলে যে, ‘হ্যাঁ, এই ডায়লগটা এভাবে দিতে আমার ভালো লাগে’, তখন আমি এটা ভেবে নিই যে, আমি যে ফিলোসফিতে যেতে চাই এবং ওর এই ভাবনাটা যদি সেটাকে ঠিক গাইড করে, তাহলে ইট’স্ ওকে। এক্টিংয়ের জায়গা থেকেও যখন ব্লকিং করি, তখন আমি চাই না যে ওরা কোথায় বসবে, কীভাবে দাঁড়াবে—সবকিছু একেবারে নির্দিষ্ট করে দিতে। কিছু কিছু জায়গায় অবশ্য সিন ব্লকিংয়ের কারণে নির্দিষ্ট হয়ে যেতে হয়। তারপরও আমি শুনতে চেষ্টা করি। সো, ডায়লগের জায়গা থেকে হোক কিংবা এক্টিংয়ের জায়গা থেকে—আমি অনেক বেশি স্বাধীনতা দিতে চাই, যেন তারা সহজেই ওই চরিত্র হয়ে উঠতে পারে। তাকে ফ্রেমের মধ্যে বেঁধে দিতে আমি খুব একটা পছন্দ করি না। কিন্তু যদি বলা হয়, তাদের সমস্ত কাজ বা সব সিনে তাদের এক্টিং নিয়ে আমি সন্তুষ্ট কি না—সেটা না, অবশ্যই না।

আসমা বীথি:  হাওয়ার পুরো গল্পই আবর্তিত হয়েছে মাঝসমুদ্রে একটি ট্রলারের সীমাবদ্ধ স্পেসে। অপরদিকে, রইদ-এর বিশাল ক্যানভাস ও পরিবেশ একেবারে ভিন্ন। জানতে চাই, এই দুটি ভিন্ন স্পেসকে ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজে আলাদা করে নির্মাণের পেছনে কোনো বিশেষ পদ্ধতি, ভাবনা বা দর্শন কাজ করেছে কী না। 
মেজবাউর রহমান সুমন: হাওয়া-তে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল, শুধু ভিজুয়ালের ক্ষেত্রেই না, অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই। শুধুমাত্র লাইটিংয়ের কথাই যদি বলি, রাত হয়ে গেলে নৌকার বাইরে আর কিছু দেখা যেত না, ফুল ডার্ক। আমাদের কাছে এরকম কোনো লাইট ছিল না। উন্নত বিশ্বে যেমন হিলিয়াম লাইট বা আরো অনেক কিছু  ব্যবহার করা যায়, যেটা উপর থেকে অনেক ইন্টারেস্টিংভাবে আলো ফেলতে পারে। কিন্তু হাওয়া-তে আমরা ওই সীমাবদ্ধতার ভিতর দিয়েই শ্যুটিং করেছি। ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজের জায়গা থেকে হাওয়া-তে ড্রোনের ব্যবহার ছিল, বার্ডস আই শট ছিল, উপর থেকে দেখার একটা দৃষ্টিকোণ ছিল। খেয়াল করে দেখবেন, ওগুলো খুব বেশি মুভিং শট ছিল না, বরং ফিক্সড শট ছিল। কারণ সমুদ্র, ওই নৌকা, নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি— এই বিষয়গুলো এস্টাবলিশ করার জন্য আমাদের ওই ধরনের ভাষা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রইদ-এ এসে খেয়াল করবেন, আমরা খুব উঁচু থেকে নেওয়া ড্রোন শট বা ওয়াইড শট প্রায় পুরোপুরি বর্জন করেছি। চাইলে আমরা অনেক বিউটিফুল শট নিতে পারতাম। পুরো এলাকাটার মধ্যে ওই বাড়িটা কেমন, সেটা দেখাতে পারতাম। কিন্তু আমরা ওদিকে যাইনি। কারণ, ছবিটা কীভাবে দেখতে চাই, সেই ল্যাঙ্গুয়েজগত জায়গাটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।  

ছবির বিউটি শুরু হয়—একটা গ্রাম, একটা ঘোড়ার গাড়ি, একটা বউ, তারপর খুব এলিয়েটেড একটা জায়গায় একটা বাড়ি, যার আশপাশে আর কোনো বাড়িঘর নেই। তারপর যখন জার্নিটা শুরু হয়, আপনি দেখবেন ছবিটা আস্তে আস্তে ক্যারেক্টার ড্রিভেন হয়ে যায়। আমরা আরো বেশি চরিত্রের দিকে ফোকাস করতে থাকি। আর গল্পের শেষের দিকে এসে আমাদের আর কিছু মনে থাকে না, এই দুইটা চরিত্র ছাড়া। এবং শেষে এসে প্রায় শুধু সাদুই থেকে যায়। এই ল্যাঙ্গুয়েজটাই আমরা ক্রিয়েট করতে চেয়েছি। যেহেতু আমরা সাদু আর পাগলির একটা স্বর্গ রচনা করতে চেয়েছি, তাই তাদের ওই বুনো পরিবেশ—চারদিকে  বন, গাছপালা, মাঝখানে একটা বাড়ি, পেছনে পাহাড়, পাশে নদী, এপাশে লেক—এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা যখন ট্রিটমেন্ট নোট লিখি, তখনই এই ডিজাইনটা করি—পেছনে পাহাড় থাকবে, মাঝখানে নদী থাকবে, আর পাশে থাকবে সাদুর বাড়ি, যেখানে বুনো গাছপালা থাকবে। আমি স্ক্রিপ্টটা এই লোকেশন দেখে লিখিনি। লেখার প্রায় সাড়ে তিন বছর পরে এই জায়গাটা পেয়েছি। আমাদের একটা ধারণা ছিল, এরকম একটা জায়গা পাব। পরে আমরা নদী পেয়েছি, পাহাড় পেয়েছি, লেকও পেয়েছি। কিন্তু বাড়িটা ছিল না, আর এই বুনো পরিবেশটাও ছিল না। ওখানে ছিল পাহাড়ি লাল মাটি, যেখানে ঘাসও জন্মায় না। এখন সিনেমায় যে পরিবেশটা মানুষ দেখছে, সেটা বিশ্বাসযোগ্য লাগছে। কিন্তু তখন আমাদের টিমের অনেকের কাছেও এটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। যে গ্রামের কাছে এই লোকেশন গ্রামের মানুষ, বাজারের লোকজন, এমনকি জমির মালিকও আমাদের পাগল ভাবতেন। তারা বলতেন, শ্যুটিং তো একদিন-দুদিন হয়, এরা আট-দশ মাস ধরে এখানে কী করছে! প্রথম যখন আমরা গাছ লাগাই, তারা বলল—এখানে গাছ হবে না। তারপর আমরা মাটি ফেললাম, রাস্তা বানালাম। কারণ ওখানে ট্রাকও যেত না। পাহাড় ঘিরে ছোট একটা রাস্তা বানাতে হয়েছে। যখন গাছগুলো বড় হতে শুরু করল, বাড়িটা তৈরি হলো, বুনো পরিবেশ তৈরি হলো, তখনও তারা অবাক। তারা ভাবছিল আমরা একটা গেরস্ত বাড়ি বানাচ্ছি, তাহলে এই জংলি গাছগুলো লাগাচ্ছি কেন! কেন আম, কাঁঠাল বা লিচু লাগাচ্ছি না! তারা নিজেরাই আমাদের কিছু আমগাছ, কিছু সুপারি গাছ এনে দিয়েছে। ওগুলো সিনেমায় আছে। তারা ভাবছিল, আমরা ভুল করছি। আর আমরা ভেবেছি, থাক, কিছু মিক্সডও থাকুক।

তো, এটা একটা পরিকল্পনা ছিল। হাওয়া থেকে রইদ-এ এসে ল্যাঙ্গুয়েজগত জায়গা থেকে একটা ডিফারেন্ট পার্সপেক্টিভ ছিল। রইদ-এর সিনেমাটোগ্রাফি কেমন হবে, কিংবা মিজঁ-সান কীভাবে ব্যবহার করব, সেটা নিয়েও আমরা সচেতন ছিলাম। খেয়াল করলে দেখবেন, রইদ-এ আমরা প্রায় কোনো রিপিট শট ব্যবহার করিনি। একই সংলাপের জন্য একবার আপনার ক্লোজআপ, একবার আমার ক্লোজআপ, আবার আপনার ক্লোজআপ—এভাবে শ্যুট করিনি। রইদ সবসময় চলমান। একটা ধারার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। আমরা প্রত্যেকটা সিনের রস, দর্শন আর উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে শট ডিজাইন  করেছি। কোনো সিনে যদি উদ্দেশ্য সাদু হয়, তাহলে সাদুই প্রোটাগনিস্ট। যদি উদ্দেশ্য সাদুর বউ হয়, তাহলে সে-ই প্রোটাগনিস্ট। কারণ গল্পটাও তো এভাবেই এগোয়। প্রথমে এটা সাদুর গল্প। তারপর পাগলির গল্প হয়ে ওঠে। তারপর সাদু আর পাগলির গল্প। তাদের প্রেম-বিচ্ছেদ-চলে যাওয়া-ফিরে আসা-সংঘাত—সবকিছু মিলেই গল্প এগোয়। আবার শেষে এসে ছবিটা ধীরে ধীরে সাদুর দিকে ফিরে যায়। কিন্তু  শুধুমাত্র সাদুকে দিয়ে শেষ হয় না। আমরা পাগলিরও একটা ইশারা রেখে দিই।

এই ডিজাইনটাই আমাদের ভিজুয়ালি ট্রান্সলেট করতে হয়েছে। কখন সাদুতে থাকব, কখন পাগলিতে, কখন দু’জনকে একসঙ্গে দেখব—এগুলো আমরা শ্যুটিংয়ের সময় ঠিক করিনি। স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের সময়ই ঠিক করেছি। এই যে গ্রাফ—সাদু থেকে পাগলি, পাগলি থেকে সাদু, তারপর দুজনের মিলন ও বিচ্ছেদ—এই গ্রাফটাই আমরা ভিজুয়ালি ডিল করার চেষ্টা করেছি। মিজঁ-সানগুলোও সেইভাবেই তৈরি করা হয়েছে। কতটুকু পেরেছি, সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু আমাদের চেষ্টা ছিল ল্যাঙ্গুয়েজগত জায়গা থেকে এইভাবেই ছবিটাকে নির্মাণ করা।

আসমা বীথি: মূলত চরিত্র এবং যে স্ক্রিপ্টটা আপনি আগে করেছেন, সেটাকে কেন্দ্র করেই আসলে ল্যাঙ্গুয়েজটা তৈরি হয়েছে।
মেজবাউর রহমান সুমন: এক্স্যাক্টলি। এটা দুইজনের একটা জায়গা রচনা করার গল্প। তাই আমরা দুইজনকেই কখন কোন সিনে কীভাবে প্রাধান্য দেব; কখন এটা সাদু, কখন এটা পাগলি, কখন এটা ডিরেক্টরের মন্তব্য হয়ে ওঠে—এই বিষয়গুলো নিয়েই কাজ। এন্ডিংটা আসলে ডিরেক্টরের বক্তব্য। আপনি দেখবেন, ওখানে আর সাদু-পাগলি থাকছে না। ওটার পয়েন্ট অফ ভিউ ডিরেক্টরের। সে আসলে বলে—এটা আমি তোমাদেরকে দেখালাম।

অসংখ্য তাল পড়ে যাওয়ার সেই অবস্থার মধ্যে আর সাদু নাই। সাদু যখন তার ওয়াইফকে পেটের মধ্যে সমাধি করে দেয়—ওই যে সে শেষ পর্যন্ত তার ওয়াইফকে পেটে পুরে ফেলে—আমার কাছে মনে হয়, তখনই তার গল্পটা শেষ হয়ে যায়। আর সাদুর যে সকালবেলার ইলিউশন তৈরি হয়, সেটাও আসলে ডিরেক্টরের পয়েন্ট অফ ভিউ। ওটার পরেই গল্পটা শেষ হয়ে যায়, রাতের বেলাতেই। আমরা কী করি—আমরা যখন কাউকে হজম করতে পারি না, তখন আসলে নিজেরাই নিঃশেষ হয়ে যাই। সে তো তার ওয়াইফের শেষ টুকরো মাংস পর্যন্ত খেয়ে ফেলে—এরপর নিজেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তো ওখানেই ভালোবাসা শেষ, ওখানেই সব শেষ। অনেক আদিম সমাজে এখনো এই ধরনের ক্যানিবালিজমের ধারণা পাওয়া যায়—আপনজনকে খেয়ে ফেলার মতো। এখনো পৃথিবীতে এর রেশ আছে। আমি যখন স্ক্রিপ্ট ডেভেলপ করছিলাম, তখনই মনে হয়েছে গল্পটা ওখানেই শেষ করতে হবে। বাকিটা আমি দেখাতে চেয়েছি ডিরেক্টরের জায়গা থেকে, দর্শককে একটু বেশি অনুভূতির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

আসমা বীথি: আপনার দুটো চলচ্চিত্রেই কস্টিউম, মেকআপ এবং চরিত্রের যে মালিন্য, তা খুবই বাস্তবসন্মত। অথচ আপনি বানাচ্ছেন ফিকশনাল গল্প। ফিকশন চরিত্রগুলোকে এত নিখুঁতভাবে বাস্তবের কাছাকাছি দেখানোর উদ্দেশ্য বা কী দর্শন কাজ করে?
মেজবাউর রহমান সুমন: আমি এভাবে দেখতে পছন্দ করি। গতকাল আমার কাস্টিং ডিরেক্টর সুকন্যা বলছিল, ভাইয়া আমি এতদিন খেয়াল করিনি, বড় পর্দায় দেখলাম সাদু যে মাছ রান্না করে, সেই পাতিলটা পুরো কালো হয়ে গেছে, কিন্তু তার ভেতরে বাংলায় বড় করে ‘চার’ লেখা। ও জিজ্ঞেস করল, এটা কেন? আমি বললাম, আমি তো খেয়ালই করিনি যে ওটা দেখা গেছে! আসলে আমরা যখন মাছের খামার দেখানোর পরিকল্পনা করেছিলাম, তখন সাত-আটটা বড় পাতিল কিনেছিলাম। মাছের পোনা ছাড়া, মাছের খাবার দেওয়া, মাছ ধরা—এমন অনেক দৃশ্য স্ক্রিপ্টে ছিল, পরে ফাইনাল এডিটে বাদ গেছে। মাছের খামারের পাতিলে যেমন নাম্বারিং থাকে, আমরাও এক, দুই, তিন, চার লিখে রেখেছিলাম। আমি আর্ট ডিরেক্টরকে বলেছিলাম, আসল মাছের খামারের পাতিলের ছবি তুলে নিয়ে আসতে। যখন রান্নাঘর তৈরি করেছি, তখনও একই কাজ করেছি। আমি আমার আর্ট ডিরেক্টরদের বলেছি— তোমরা গ্রামের দশটা রান্নাঘরের ছবি তুলে নিয়ে আসো। মানুষ কীভাবে হাঁড়ি রাখে, কাপড় রাখে, খাবার রাখে—এসব আমাকে জানতে হবে। গ্রামে চাষের মই দেয়ালের পাশে রেখে তার ওপর হাঁড়ি-পাতিল রাখা হয়—আমরা সেই জিনিসও ছবিতে রেখেছি।

এই ডিটেলটা আমি প্রত্যেকটা কাজে ধরতে চেষ্টা করি। আঙ্গুরলতা করার সময় প্রায় এক মাস বিভিন্ন পতিতালয়ে গিয়েছি—টাঙ্গাইল, দৌলতদিয়া, আরও অনেক জায়গায়। আমি, আমার প্রোডাকশন ম্যানেজার, দুজন সহকারী—বারবার গেছি। কেন? কারণ আমি জানতে চেয়েছি ওরা কীভাবে থাকে, কীভাবে হাঁটে, দোকানগুলো কেমন, মেয়েরা কীভাবে দাঁড়ায়। হুট করে শ্যুট করলে ওটা শুধু ব্যাকড্রপ হয়ে যায়। আমি সেটা চাই না। আমার কাছে চরিত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার চারপাশের জীবন। সাদু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সাদুর বাড়িটাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ওই বাড়ি না হলে ছবিটাই হতো না। ওই বাড়ি একটা চরিত্রের মতো কাজ করে। যেমন একটা তালগাছও এই গল্পের চরিত্র। এই তালগাছের জন্য  আমরা অনেক কষ্ট করেছি। যে জায়গায় তালগাছের দৃশ্য শ্যুট করেছি, সেটা আগে বেগুন ক্ষেত ছিল। আমরা এক বছর আগে জায়গাটা লিজ নিয়ে বলেছিলাম, এখানে আর বেগুন চাষ হবে না। কারণ আমি একটা নির্দিষ্ট আবহ তৈরি করতে চেয়েছি। আমরা এমন একটা লোকেশন খুঁজছিলাম যেখানে ক্যামেরা থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি ঘুরলেও তালগাছ দেখা যাবে। অনেক জায়গা খুঁজে পরে সেটা পেয়েছি। আবার তালগাছের নিচের বনায়নও আমরা ছয় মাস আগে থেকে তৈরি করেছি। ভুটান গাছ, নেপিয়ার ঘাস লাগিয়ে পুরো জায়গাটা তৈরি করেছি।

আপনি যে ডিটেলের কথা বললেন, সেটা শুধু চরিত্রে না— স্পেসের ক্ষেত্রেও। আমি সবসময় চেষ্টা করি জিনিসটা বাস্তব কি না। অন্ধকারে যদি টর্চ লাগে, তাহলে সেই পুরোনো লোহার টর্চটাই লাগবে। আমার প্রোডাকশন টিম বলত, এটা তো দেখা যাবে না। আমার কথা হলো দেখা যাক বা না যাক, ওই টর্চটাই  লাগবে। এই প্রস্তুতিটা আমি অনেক আগে থেকে শুরু করি। হাওয়া-তেও করেছি, রইদ-এও করেছি।  আমরা একটা বড় প্রেজেন্টেশন বানিয়েছিলাম। আর্ট টিম, কস্টিউম টিম—সবাইকে বলেছি, পেছনে যে মানুষটাকে সবচেয়ে কম দেখা যাবে, তারও একটা ছবি আমাকে দেখাতে হবে। কেউ যদি বলে, ও তো শ্যালোতে থাকবে, দেখা যাবে না—আমি সেটা মানি না। হাঁড়ি-পাতিল, গ্লাস, ট্রাঙ্ক—সবকিছুর জন্য আমরা আলাদা করে রেফারেন্স দেখেছি। হয়তো ট্রাঙ্কটা ছবিতে এক সেকেন্ডের জন্য দেখা গেছে, কিন্তু সেই ট্রাঙ্ক বেছে নিতে আমাদের মাসখানেক সময় লেগেছে।

 এইযে ডিটেলের কথা বলছেন, এটা আসলে ছয় মাস থেকে এক বছরের প্রি-প্রোডাকশনের ফল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তো আছেই। অনেক কিছু চাইলেই পাওয়া যায় না। তাই আমি সময় নিই। আমার টিমকে বলি, খোঁজ চলতে থাকুক। যতদিন লাগে, লাগুক। কারণ আমি যে পৃথিবীটা নির্মাণ করতে চাই, সেটা বিশ্বাসযোগ্য হওয়া আমার কাছে খুব জরুরি।

আসমা বীথি: ফিকশনে যে গ্ল্যামারের ধারণা, সেই ধারণার সঙ্গে আপনার ধারণার একটা পার্থক্য আছে। ফিকশন বলতে তো আসলে এক ধরনের গ্ল্যামার, বিউটি বা চাকচিক্যপূর্ণভাবে দেখানোর একটা মানসিকতা প্রচলিত। সেই জায়গা থেকে আপনার কাছে রূপের ধারণাটা কী? আরো স্পষ্ট করে বললে, এখানে কোনো দ্বৈত সত্তা কাজ করে কি না…
মেজবাউর রহমান সুমন: আমি তো বিজ্ঞাপনও বানাই। ধরেন, একটা সাবান, শ্যাম্পু বা তেলের বিজ্ঞাপন বানাব, তখন বিউটিটা আসলে আমার কাছে ওই প্রোডাক্টের বিউটি। ওগুলো আমার জীবন ধারণের জন্য বানাতে হয়। কিন্তু যখন আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করি, তখন ওই ভিজুয়ালে বিশ্বাসী না। আমার আশপাশের সবাই জানে, আমি বিউটি প্রোডাক্ট খুব কম করেছি। ইনফ্যাক্ট, দুই-একটা ছাড়া প্রায় করিইনি। নাহলে এই পনেরো বছরে আমার তো অসংখ্য গ্ল্যামারাস বিউটি প্রোডাক্ট করার কথা ছিল। আমার টিভিসি বা অন্য কাজ দেখলেও দেখবেন, গ্ল্যামারনির্ভর প্রোডাকশন খুবই কম। পাঁচ শতাংশও না, মনে হয়। কারণ আমি শুরু থেকেই বিজ্ঞাপনের কাজ বেছে নিয়েছি। আমি যে ধরনের কাজ পছন্দ করি, সেই ধরনের কাজ বিজ্ঞাপনের ভেতরেও করা যায় কি না, সেটাই আমার চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যথায় আমি ওটার সঙ্গে নিজেকে মিলাতে পারতাম না। কারণ আমি বিউটিকে ওইভাবে দেখি না। আমার কাছে বিউটি সবসময় চরিত্র। চরিত্রের জন্য যে বিউটিটা প্রয়োজন, ওটাই আমার কাছে বিউটি।

আর সবকিছুরই একটা প্র্যাকটিস আছে। আপনি তো বলছিলেন, আমি প্রভাবিত কি না। হ্যাঁ, মানুষ বিভিন্ন সময়ে প্রভাবিত হয়। আমি যদি সারাক্ষণ চকচকে প্রোডাক্ট নিয়েই কাজ করি, তাহলে সেই চকচকে লাইটিং, সেই ক্রিসপি ইমেজ আমার মধ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু রইদ দেখবেন অনেক গ্রেইনি। ইচ্ছা করেই অনেক গ্রেইনি ফুটেজ ব্যবহার করেছি। লক্ষ্য করেছেন কি না জানি না। চকচকে যুগে আমি কেন গ্রেইন যোগ করলাম? বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি ক্যামেরা ব্যবহার করেছি। বিদেশ থেকে লেন্স এনেছি। আমার সিনেমা বানানোর টাকারই সংকট, তারপরও এই দুই জায়গায় বড় অঙ্কের টাকা খরচ করেছি। এত কিছু করার পরও কেন ফুটেজটা একটু গ্রেইনি রাখলাম? আমাকে একজন পরিচালক জিজ্ঞেসও করেছিলেন, ‘আপনি কি ইচ্ছা করেই গ্রেইন চেয়েছিলেন?’ আমি বলেছি, হ্যাঁ, চেয়েছি। না চাইলে সেটা আসবে কেন? সফট্ ফোকাসও ইচ্ছাকৃত। আসলে আমি যে ইমেজটা ধরতে চাই, সেটা তো ফিলোসফিক্যাল। বিষয়টা একটু গভীর থেকে ভাবার। এই সময়ে এসে ইমেজ সুন্দর করা সবচেয়ে সহজ কাজ। চকচকে ইমেজ বানানো খুব সহজ। বরং কঠিন হচ্ছে সাদু আর পাগলিকে ধরতে  পারা। আমি যে জনপদের গল্প বলি, সেই জনপদের জীবনকে ভিজুয়ালি অনুবাদ করা। যদি ওই বাড়িটা, ওই পরিবেশটাকে খুব চকচকে করে দেখাতে চাইতাম, সেটা আমার জন্য খুব সহজ ছিল। দুপুরবেলায় শ্যুট করিনি। প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টা শ্যুটিং বন্ধ থাকত শুধু আলোর জন্য। কারণ অতিরিক্ত চকচকে ইমেজ চাইনি। গ্লুমি ওয়েদারের জন্য ওয়েট করেছি।

অনেকে প্রশ্ন করেছেন, পাগলি কিংবা সাদুকে আমি একটু বেশি রুক্ষ করে ফেলেছি কি না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, বিহাইন্ড দ্য সিন যখন আমরা প্রকাশ করেছি, তখন তো ওই অঞ্চলের মানুষদের সবাই দেখেছেন। সেখানে নারীরা তুষির সঙ্গে যেভাবে মিশেছে, পুরুষরা যেভাবে ইমরানের সঙ্গে মিশেছে—তাদেরই তো একজন সাদু, তাদেরই তো একজন পাগলি। আমার সবসময় উদ্দেশ্য থাকে, যে-মানুষের গল্প বলছি, সেই মানুষের কাছাকাছি যাওয়া। পুরোপুরি তো সম্ভব হয় না, কিন্তু কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। আর আমি যে বিষয়টা ধরতে চাই, সেটা আর্টের জায়গা থেকে হোক, কস্টিউমের জায়গা থেকে হোক—আমার টিমকেও সবসময় বলি, তোমরা ওই জীবনটা দেখো।  

আমার কস্টিউম ডিজাইনার আদিবাসী সম্প্রদায়ের একজন মেয়ে। তার জন্য বাঙালির এই জীবনযাপন ধরাটা সহজ না—এটা আমি জানি। কিন্তু ও দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করছে। তাই আমি ওকে বলেছি, তুমি গ্রামে যাও, মানুষের সঙ্গে থাকো, গল্প করো, ছবি তোলো। একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকো, তাদের সঙ্গে বসো। তারপর ফিরে এসে ওই অভিজ্ঞতা থেকে কাজ করো। আর্ট ডিরেকশনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।

হাওয়া-তেও কস্টিউম করেছিল আনিকা। প্রথমে সে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করত, পরে কস্টিউমে আসে। এখন সে খুবই পরিচিত। আর রইদ-এ মিমিহ্লা কাজ করেছে। সে এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিল। শুধু কস্টিউম না, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গেছে। আমি ওকে শুরুতেই কিছু রং বাদ দিতে বলেছিলাম। যেমন, লাল রং আমরা দেখাচ্ছি শুধু যখন সাদুর বউ বিয়ে হয়ে আসে। তারপর আর লাল নেই। হলুদও নেই। কারণ আমি ছবির জন্য একটা নির্দিষ্ট কালার চার্ট তৈরি করেছিলাম। একটা মনোক্রোম্যাটিক আবহ চেয়েছিলাম। অনেক রং এলে আমি যেভাবে ছবিটাকে কল্পনা করছিলাম, সেটা সম্ভব হতো না। একটু মলিনতা চেয়েছিলাম। সেই মলিনতার মধ্য দিয়েই রূপ খুঁজেছি। আমার কাছে রূপ মানে নিখুঁত বা চকচকে হওয়া না; বরং চরিত্র, সময়, পরিবেশ আর জীবনের সত্যের ভেতর যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, সেটাই।

আসমা বীথি:  তাহলে রূপের জায়গাটা আসলে আমরা এরকম ধরতে পারি যে, আপনার জায়গা থেকে যে-যেমন দেখতে, তাকে সেই রূপেই, সেই বাস্তবের যতটা কাছাকাছি রাখা যায়…
মেজবাউর রহমান সুমন: অবশ্যই, অবশ্যই। সেটাই তো। আমার চরিত্র তো আমার চরিত্রই। আমি যে জনপদের কথা বলছি, তারাই তো আমার ছবির রূপ। আমি তাদের ওইভাবেই দেখতে পছন্দ করি।

আসমা বীথি:  আরো প্রায় পনেরো বছর আগে টেলিভিশনের জন্য নির্মিত তারপরও আঙ্গুরলতা নন্দকে ভালোবাসে, তারপর পারুলের দিন—সেখানেও আমরা ঘোড়া, পরী, মিথের ব্যবহার দেখি। আঙ্গুরলতা তো পতিতাপল্লীর কঠিন, নিষ্ঠুর পরিবেশে এক অর্থে দয়ালু, সুন্দর একটা পরীই ছিল…
মেজবাউর রহমান সুমন: কালিও ছিল। যখন সে তার হাজবেন্ডের ওপর খড়গটা বসিয়ে দেয়, তখন সে কালি হয়ে ওঠে।


আসমা বীথি:  হ্যাঁ, নন্দ মারা যাওয়ার একটু আগে… তারপর পারুলের দিন-এও আমরা দেখি, পারুলের প্রতারক প্রেমিককে সে ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেখে। তার মানে প্রতীক ও মিথের এই ব্যবহারগুলো আপনি অনেক আগে থেকেই করে আসছেন। সরাসরি গল্প না বলে মেটাফরের আশ্রয় নিতে ভালোবাসেন। এটা কি আপনার গল্প বলার টেকনিক, নাকি অন্যকিছু? নিজের ভেতর এই যাত্রার অস্তিত্ব আপনি প্রথম কীভাবে অনুভব করলেন? রইদ-এর গন্ধম ফল পর্যন্ত এই যাত্রাটা আসলে কেমন?
মেজবাউর রহমান সুমন:  প্রথমত বলি, এটা সচেতন না। নিজেকে আবিষ্কার করেছি। আমি ছোটবেলা থেকেই গল্প শুনতে পছন্দ করতাম। বাঙালি সমাজে এটা খুবই প্রচলিত—দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা খালাদের কাছে গল্প শোনা। তো আমাদের এখানে, ওই যে নারীর মনে একটা স্বপ্ন থাকে— পারুলের দিন-এ যেমন আছে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে রাজকুমার ঘোড়ায় চড়ে আসবে, তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে—এই গল্পটা মনে হয় প্রত্যেকটা নারী কোনো না কোনো সময়ে ছোটবেলায় শুনে বড় হয়। পারুলের দিন-এ ওই স্বপ্নটাকেই পারুলের ভিজ্যুয়ালের ভেতর দিয়ে তুলে   ধরতে চেয়েছি। আমার কাছে মনে হয়, মিথের একটা জায়গা হচ্ছে আমার আশপাশের গল্প। আমি সেই গল্পই বলতে পছন্দ করি, যেটা আমার দেখা, শোনা, বোঝার ভেতরে আছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, মিথ পড়তেও আমার খুব ভালো লাগত। তবে সেটা অনেক পরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেহেতু চারুকলায় পড়েছি, বিভিন্নভাবে এই বিষয়গুলো পড়তে হয়েছে। আর এগুলো আমার আগ্রহের জায়গাও ছিল। যখন আমি গল্প লিখতে শুরু করলাম, কিংবা ভিজ্যুয়ালি কাজ করা শুরু করলাম, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই এগুলো আমার কাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এটা অন্য কোনো পরিকল্পনা থেকে আসেনি, বা আমি আগে থেকে ঠিক করিনি যে মিথ ব্যবহার করব। বরং আমার মনে হয়, আমার ভেতরের গল্প বলার প্রক্রিয়ার সঙ্গেই এগুলো জড়িয়ে আছে।    

আসমা বীথি: নাটকের সাথে সিনেমাটিক ভাষার মৌলিক পার্থক্য কী বলে মনে হয়?  
মেজবাউর রহমান সুমন : না, আমি নাটক বানাইনি। আমি ওই নাটকে বিশ্বাসী না। টেলিভিশনে যে নাটকটা হয়, ওটা করতে পারিনি বলেই বোধহয় ছেড়ে দিয়েছি। টেলিভিশনের জন্য যে ফিকশনগুলো করেছিলাম, সেগুলো আমার নিজের মতো করে, আমি যে সিনেমাটিক ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষাতেই করার চেষ্টা করেছিলাম। পরে মনে হয়েছে, এই কাঠামোর মধ্যে সেটা করা খুব কঠিন। এটা ইন্ডাস্ট্রির দোষ বলছি না, কিন্তু আমার জন্য কঠিন ছিল। একসময় খুবই আপসেট হয়ে টেলিভিশন থেকে বের হয়ে গেছি। সত্যিকার অর্থেই আপসেট। কারণ মনে হয়েছে, এই অল্প সময়ে, এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করা আমার জন্য সম্ভব না। টেলিভিশনের একটা নির্দিষ্ট অভিনয়-প্যাটার্ন তৈরি হয়েছে। যেমন একসময় বাংলা সিনেমায় যাত্রাপালার একটা ঢং ছিল, টেলিভিশনেও একটা অভিনয়ের ঢং তৈরি হয়েছে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা—কিন্তু চরিত্রের ভেতরের শারীরিকতা নেই, আচরণ নেই, জীবন নেই। চরিত্রটাকে ধরা যায় না। চরিত্রটা শুধু অভিনয় করে। আমার কাছে এটা সুখকর লাগে না। বরং এটা সিনেমার জন্য ক্ষতিকর। আমাদের বাংলা সিনেমাতেও ওই টেলিভিশন অভিনয়ের প্রভাব থেকে যাচ্ছে। অবশ্য এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মত।

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে