আমাদের মনে পড়বে, সাজ্জাদের, লাইভ ফ্রম ঢাকার, কথা। রেহানাকে একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে দেখার পর থেকেই সাজ্জাদকে খুঁজব আমরা। একথা যেন জেনেই যে, সাজ্জাদকে পাওয়া যাবে না রেহানা মরিয়ম নুর ছবিতে। লাইভ ফ্রম ঢাকায় সাজ্জাদের বিচ্ছিন্নতাকে চিহ্নিত করা গিয়েছিল রেহানার উপস্থিতি সত্তে¡ও; কিন্তু এখানে, এই ছবি রেহানা মরিয়ম নুরে, রেহানার বিচ্ছিন্নতা দাবি করে তার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা মানসিক এবং শারীরিক। সাজ্জাদের কথা শুনি আমরা, এই ছবিতে, অনেক পরে। রেহানা যখন হাসপাতালে, ট্রমার শিকার হয়ে, তখন তাকে দেখতে আসা আত্মীয়ার মুখে শুনি, রেহানা যে ঘড়িটি পরে আছে সেটি সাজ্জাদের প্রিয় ঘড়ি ছিল। আমরা, মনোযোগী দর্শক, যেন এই যোগসূত্রটির অপেক্ষাতেই রয়েছিলাম; এবং, এখন এই যুক্ততাটি প্রতিষ্ঠিত হলে – লাইভ ফ্রম ঢাকা আর রেহানা মরিয়ম নুরের মধ্যে আমরা এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করি। যে রেহানাকে অনুসরণ করছি অবিরাম তার সম্পর্কে ভীষণ কম জানার অস্বস্তি থেকে উত্তরণের ব্যাপারই যেন এটি। হ্যাঁ, এই রেহানাকে জানি আমরা, তাকে এক ভীষণ ব্যক্তিগত ক্রাইসিস এবং সাজ্জাদের সাথে এক মেলোড্রামাটিক সিচুয়েশনের ভেতর রেখে আমাদের বিদায় নিতে হয়েছিল লাইভ ফ্রম ঢাকা থেকে। এই রেহানা তবে সে-ই! মাঝখানের সময়টা লম্বা এবং মৃত। এই ডেড টাইমের খেলা অবশ্য আবদুল্লাহ সাদের সিনেমার চিত্রনাট্য জুড়েই। অনেক কিছু ঘটে ইমুর স্কুলে, রেহানাদের বাসায়, ডাক্তার আরেফিনের দাম্পত্য জীবনে, এমনকি এই হাসপাতালেও-সেসব দেখি না আমরা; কিন্তু জানি তারা ঘটেছে, ঘটে রেহানার জীবনপ্রবাহকে নানাভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। বলা যাবে তর্কের খাতিরে যে, লাইফ ফ্রম ঢাকার শেষ দৃশ্য থেকে রেহানা মরিয়ম নুরের প্রথম দৃশ্যের মাঝের সময়ে কী ঘটে তা জানি না আমরা; কাজেই তাকে সিনেমাটিক ডেড টাইম বলা যায় কি! এভাবে দেখতে চাই যে, আমরা দর্শক ঘড়ির যোগসূত্রটি প্রতিষ্ঠিত হলে যে স্বস্তি অনুভব করি, রেহানাকে যেন প্লেস করতে পারি আমাদের হিসেবের মধ্যে, সেটাই এই কৌশলকে ডেড টাইমের মর্যাদা দেয়।

কিন্তু দর্শকের স্বস্তির প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। রেহানা বাড়ি ভাড়া পেল কীভাবে? সিঙ্গেল মাদারকে কি আমরা বাড়ি ভাড়া দেই? দেবার আগে অন্তত তার, ওই সিঙ্গেল মাদারের, ইতিহাসের খোঁজ লাগাই না? দুয়েকটা রেফারেন্স বা রেকমেন্ডেশন নিয়ে আসতে বলি না? রেহানা যে এসবের ভেতর দিয়ে গেছে তা নিশ্চিত। হয়তো সাথে থাকা মা-বাবা, ভাই তাকে উৎরে যেতে সাহায্য করেছে এসব সামাজিক পুলিসিং। কিন্তু আমরা, সেই সমাজের উৎপন্নরাই কিন্তু দর্শকের আসনে। আর তাই সিঙ্গেল মাদার রেহানাকে এত কম চিনে এই চিত্রনাট্য নিয়ে অগ্রসর হতে আমাদের অস্বস্তি; হাসপাতালের ক্লস্ট্রোফোবিক ফ্রেমগুলোতে আমরা যে হাঁপিয়ে উঠি; মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করতে থাকি এর বাইরে যাবার-সেটা এমনকি ইমুর আইসক্রিম খাবার জন্যে হলেও তার কারণ হচ্ছে রেহানা এখানে আমাদের ইনসিকিউর করে ফেলে; আমরা বিচ্ছিন্নতাকে উপেক্ষা করলেও সম্ভাব্য নৈরাজ্যের আশংকায় মরিয়া হয়ে থাকি; একটা এস্কেপ রুট চাই-ভীষণভাবে।
এসবের উপরিতলে আছে রেহানার বিচ্ছিন্নতা। হাসপাতালের এই সাদাটে-নীল, আবেগহীন, প্রায় অবাস্তব দৃশ্যময়তা আর শ্যালো ফোকাসের নিয়ম ছাড়া ফ্রেমে রেহানার যাপিত সময় তার বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিকে এই ছবির মূল মোটিফ হিসেবে দেখাতে থাকে।
সাজ্জাদ, লাইভ ফ্রম ঢাকার গল্প রেহানাকে আমাদের পরিচিত মণ্ডলে নিয়ে আসে ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা কেবল রেহানাকে আগে থেকে জানার স্বস্তিটুকু অর্জন করি। সেটাও তখন, যার আগে ঘটে গেছে প্রায় সব ঘটনা, রেহানার বিচ্ছিন্নতা প্রায় সম্পূর্ণ তখন আর এই বিচ্ছিন্নতা রেহানাকে করে তুলেছে এক সোলো অ্যানার্কিস্ট। রেহানা কোনো ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা জানায় নি, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বোধ-বিচারে যে তার আস্থা নেই তা তো দেখি আমরা। অথচ রিলিজিয়াস অর্থডক্সিতে রেহানার এক ধরনের সমর্পণ আছে। সে হিজাব ব্যবহার করে, নিয়মিত নামাজ পড়ে। যে রেহানা টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হতে চেয়েছিল তাকে অন্য রেহানা বলেই মনে হয়। অথবা ধর্মীয় আচার-প্রথা বিষয়ে রেহানার বৃহত্তর বোঝাপড়ার ইঙ্গিতবহ এই পুরনো সময়ের তথ্যটি। এই অর্থডক্সি বনাম প্রতিষ্ঠানের সাথে তার নৈরাজ্যের সংগ্রাম সবসময় এক বিপদজনক সেতু পার হচ্ছে যেন বা। এই পারাপারের যে কৌশলগত নির্মাণ, চিত্রনাট্যের যে ইঞ্জিনিয়ারিং তা-ই হচ্ছে চলচ্চিত্র রেহানা মরিয়ম নুর।

এসবের উপরিতলে আছে রেহানার বিচ্ছিন্নতা। হাসপাতালের এই সাদাটে-নীল, আবেগহীন, প্রায় অবাস্তব দৃশ্যময়তা আর শ্যালো ফোকাসের নিয়ম ছাড়া ফ্রেমে রেহানার যাপিত সময় তার বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিকে এই ছবির মূল মোটিফ হিসেবে দেখাতে থাকে। আর বাইরে চলতে থাকে তুমুল বর্ষা। বৃষ্টির শব্দ আর মেঘের নিনাদ এই হাসপাতালময় রেহানার জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে আরো গাঢ় করে তোলে। আমরা কেমন অনুভব করি যে বাইরে, প্রকৃতিতে চলছে এক দুর্যোগ-হয়তো প্লাবন। বর্ষা এভাবে, এই ছবিতে এক বিরল সংকেতে আবির্ভূত হয়; তার পাঠ নতুন, কিন্তু মানব যে তা দারুণ লাগসই। অন্যদিকে, রেহানার ব্যক্তিত্বটি এমন যে তাকে তার পরিবার, ছাত্র এবং কোলিগদের সাথে এক ধরনের দূরত্বের মধ্যে দেখি আমরা। এই দূরত্ব একজন একা মানুষের সমাজ সম্পর্কে বোঝাপড়ার ভেতর থেকে গড়ে ওঠা একটি প্রবণতা বলেই মনে হয়। একা মানুষ রেহানার প্রোফাইলটি বারবার উন্মোচিত হতে থাকে। রেহানার সব সিদ্ধান্ত তার একার। রেহানা তার উৎকণ্ঠা, অনিশ্চিতবোধ অথবা একাকীত্ব কখনও শেয়ার করে না। রেহানা জীবনের বিষয়ে হয়তো তিক্ত নয়; কিন্তু গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের কাছে তার প্রত্যাশা অত্যন্ত কম। এই চলচ্চিত্রে রেহানা মাত্র একবার হাসপাতালের বা এই মেডিক্যাল কলেজের বাইরে যায়। সেটি ইমুর স্কুলে। সেখানে ঘটনাটি এমন যে ভিন্ন কোনো রেহানাকে নয়, বরং বিচ্ছিন্ন রেহানাকেই আমরা আরো জোরালোভাবে পাই। সুতরাং, রেহানা সমাজের ভিন্নতর বাস্তবতায় কীভাবে রিঅ্যাক্ট করে বা করতে পারে তা আমরা জানতে পারি না। একবার রেহানাকে দেখি হাসপাতালের রেলিং টপকে কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে বাইরের পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করতে। তখনও বাইরে কিন্তু প্রবল বর্ষণ। আরেকবার রেহানা টবে লাগানো একটি গাছের চারাকে রোদ পাবার আশায় কাঁচের দেয়ালের কাছে এনে রাখে। এভাবে জীবনের প্রতি রেহানার সদর্থক প্রকাশগুলোকে হয়তো দেখি আমরা। তারা আসলে রেহানার চরিত্রটিকে মাত্রা দেয়; বিচ্ছিন্নতা রেহানাকে জীবনের প্রতি নেতিবাচক করে তোলে নি-এমন প্রতিপাদ্য বিবেচনায় নিতে পারি আমরা।
এই রেহানাকে নির্মাণ করে যে চলচ্চিত্র-কৌশল সে নিজেই অবশ্য অনেকখানি প্রথাবিরোধী, প্রায় নৈরাজ্যমূলক। তবে তার ঘরানা নতুন নয়, চলচ্চিত্রের এমন আঙ্গিক দেখা গেছে আগে। আমাদের হয়তো মনে পড়বে গত শতকের নব্বই দশকের ডগমা ৯৫ আন্দোলনের কথা। হাতে ধরা ক্যামেরা, প্রায়ই অপ্রচলিত কোণে দৃশ্যায়ন, লম্বা লেন্সে শ্যালো ফোকাসের কাজ, কখনো প্রায় আউট অব ফোকাস বিষয়, নীল বিষাদঘন রঙের মোনোক্রম সব ফ্রেম; টুকরো, টুকরো সংলাপ, যা কখনো মনে হয় ইমপ্রোভাইজড, চিত্রনাট্যের কোনো প্রথাগত অঙ্গভাগ অনুসরণ না করা – এসব মিলে রেহানা মরিয়ম নুরের বেশ ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা।
কিন্তু রেহানার রয়েছে ন্যায়-অন্যায়, ভুল-ঠিক, নৈতিক-অনৈতিক এসব বাইনারিগুলোর বিষয়ে খুবই পরিষ্কার সিদ্ধান্ত। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজের কথা রেহানা ভাবতে পারে না। সেটা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর যৌন হয়রানি বা মেয়ের স্কুল-কর্তৃপক্ষের একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে। দেখা যাচ্ছে যে সমাজ যেভাবে চলে তাতে এসব বিষয়ে নানারকম সমঝোতার প্রয়াস ক্রমাগতই ক্রিয়াশীল থাকে। মিমির পরীক্ষায় নকল করার ব্যাপারটি কলেজ কর্তৃপক্ষ খুব বড় করে দেখতে চান না। অন্যদিকে, অ্যানির সাথে যৌন হয়রানির ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চান প্রিন্সিপাল নিজের স্বার্থের কথা ভেবে। আর রনি চায় স্কুল-কর্তৃপক্ষের অন্যায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে বাড়বাড়ি করে রেহানা যেন ইমুর পারফরম্যান্সটিকে আটকে না দেয়। রেহানা এই প্রতিটি বিষয়ে এক ধরনের নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে। সেই অবস্থানটি এমন যে তা সমাজের সামষ্টিক কল্যাণের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু সেটি অর্জনে ব্যষ্টিক পর্যায়ের যে বিসর্জন বা ক্ষতি তাকে বিবেচনায় নিতে রাজি নয় রেহানা। লক্ষ করা যেতে পারে যে, আমাদের ব্যাখ্যা এ ক্ষেত্রে, একটি সমাজের প্রতিষ্ঠিত চিন্তাকে ধারণ করে প্রকাশিত হচ্ছে, তারা রক্ষণশীল, নানা ধরনের সমঝোতামুখী । অর্থাৎ, আমরা আসলে প্রতিষ্ঠানের কর্ম-পদ্ধতিকে অনুসরণ করছি এবং রেহানাকে আমাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছি এভাবে যে, সে একরোখা, হয়তো স্ট্রং হেডেড। মিমির নকল করার পেছনে আছে পড়াশোনার অত্যধিক চাপ, অভিভাবকের ওপর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে সন্তানকে পড়ানোর ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ। রেহানা এসব বিষয়কে বিবেচনায় না নিয়ে নকল করে ডাক্তার হওয়ার যে ভয়াবহ সামাজিক পরিণাম সে বিষয়টির ওপর জোর দিচ্ছে। যখন বিষয়টি জটিল সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয় হয়ে উঠছে তখন রেহানা আশা করছে যে, মিমির সতীর্থ ছাত্ররা মিমির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। যখন সেটি ঘটছে না, এমনকি অ্যানিও রেহানার বিপক্ষে যাচ্ছে, তখন রেহানা তাকে চড় মেরে বসছে! অ্যানি ডাক্তার আরেফিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে রাজি হচ্ছে না, কারণ এই অভিযোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সমাজ তার দিকেই আঙুল তুলবে। রেহানা তখন নিজেই যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ দায়ের করে। আর ইমুর স্কুল কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রেহানা ইমুর ইচ্ছেকেই গলা টিপে মারে। কারণ ইমুকে যেহেতু রেহানা অ্যাপলোজাইস করতে দেবে না সেহেতু ইমু স্কুলের ফাংশানে পারফরম্যান্স করতে পারে না। শিশু ইমু বিষয়টি বুঝতে পারে না। সে দারুণভাবে হতাশ হয়। রেহানা প্রথমে ইমুকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষে অত্যন্ত কঠোর আচরণ করে। এভাবে রেহানা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বৃহত্তর সত্য বা নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সমাজে অনুমোদিত বা গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি-কাঠামোর বাইরে চলে যায়। বলা যেতে পারে এভাবে রেহানা নিজেকে একজন অ্যানার্কিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করে। প্রতিষ্ঠান যখন অন্যায়ের প্রতিকার করে না, তখন রেহানা প্রতিষ্ঠানে আর আস্থা রাখে না; বরং, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে তার নিজস্ব উপায়ে প্রতিকারের চেষ্টা করে।

এই রেহানাকে নির্মাণ করে যে চলচ্চিত্র-কৌশল সে নিজেই অবশ্য অনেকখানি প্রথাবিরোধী, প্রায় নৈরাজ্যমূলক। তবে তার ঘরানা নতুন নয়, চলচ্চিত্রের এমন আঙ্গিক দেখা গেছে আগে। আমাদের হয়তো মনে পড়বে গত শতকের নব্বই দশকের ডগমা ৯৫ আন্দোলনের কথা। হাতে ধরা ক্যামেরা, প্রায়ই অপ্রচলিত কোণে দৃশ্যায়ন, লম্বা লেন্সে শ্যালো ফোকাসের কাজ, কখনো প্রায় আউট অব ফোকাস বিষয়, নীল বিষাদঘন রঙের মোনোক্রম সব ফ্রেম; টুকরো, টুকরো সংলাপ, যা কখনো মনে হয় ইমপ্রোভাইজড, চিত্রনাট্যের কোনো প্রথাগত অঙ্গভাগ অনুসরণ না করা – এসব মিলে রেহানা মরিয়ম নুরের বেশ ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা। বলা যায়, এই ছবি সিনেমাটিক অ্যাপারাটাসের নিরাকরণের এক সচেতন প্রচেষ্টা। কারিগরি সফিসটিকেশনের অনুপস্থিতি দর্শককে চলচ্চিত্রিক আবিষ্টতা থেকে দূরে রাখে এবং তাকে কাহিনি ও অভিনয়ে মনোযোগী করে। লক্ষ করি যে, এসব প্রথাবিরোধিতার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে নিবিষ্টভাবে এগিয়ে চলে এই ছবি। সমগ্র চিত্রনাট্যের ক্লাইমেক্স নয়; কিন্তু, রেহানার যে প্রথাবিরোধী চরিত্র তার এক ধরনের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটে শেষ দৃশ্যে। আমরা মনে না করে পারি না যে লাইভ ফ্রম ঢাকায় সাজ্জাদের গল্প যখন দারুণভাবে কেন্দ্রাতিগ; তখনও এক চূড়ান্ত নাটকীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ হয় ছবিটি। সেখানেও আমরা অনুভব করি যে, অনির্দিষ্ট এক সমাপ্তির ঝুঁকি নেওয়া হয় নি চিত্রনাট্যে; বরং, একটি হিসেবী অনিশ্চয়তার চমকই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। আর রেহানা মরিয়ম নুরে তো রেহানার বিচ্ছিন্নতা আর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাই মূল প্রতিপাদ্য। তার এক চূড়ান্ত কনসেনট্রেশন ঘটে এই ছবির শেষ দৃশ্যে।
সেই দৃশ্যে শুধু একজন আরেকজনের মুখের কথা কেড়ে নেন নি, একই সাথে দুই জোড়া সংলাপও চালু থেকেছে কখনো। যে ক্যায়োটিক রিয়ালিটির মধ্যে চলে আমাদের বাস্তব জীবনের বাহাস তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে দৃশ্যটি।
এই ছবিতে শব্দের নৈরাজ্য থাকতে পারত পুরো সময় জুড়েই। কিন্তু অসুস্থ রেহানার হাসপাতালে থাকার দৃশ্যটি ছাড়া আর কোথাও এই নৈরাজ্য ব্যবহৃত হয় নি। সেই দৃশ্যে শুধু একজন আরেকজনের মুখের কথা কেড়ে নেন নি, একই সাথে দুই জোড়া সংলাপও চালু থেকেছে কখনো। যে ক্যায়োটিক রিয়ালিটির মধ্যে চলে আমাদের বাস্তব জীবনের বাহাস তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে দৃশ্যটি। কিন্তু এই ঘরানাটি পুরো ছবিতে ব্যবহৃত হয় নি। সব দৃশ্যেই চরিত্ররা সংলাপ বলেন আলাদা আলাদা করে। কেউ কারো মুখের কথা কেড়ে নেন না। কেড়ে নিয়ে অস্পষ্ট, অযৌক্তিক শব্দ উচ্চারণ করেন না। অথচ, বেশির ভাগ দৃশ্যেই এমনভাবে অগ্রসর হয় ন্যারেটিভ এবং চিত্রায়ন যে সংলাপের এই নৈরাজ্য ঘটতেই পারত। বিশেষ করে রেহানার পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রদের শ্লোগানের সময় যে তুমুল হট্টগোল তার ভেতরও সংলাপের কোনো নৈরাজ্য নেই, চরিত্ররা একজনের সংলাপ শেষ হলে সময় নিয়ে সংলাপ বলেছেন। কিন্তু উল্টো দিকে, যা আছে এই ছবিতে তা হলো নীরবতার ঐশ্বর্য চরিত্রদের সংলাপ বলার ফাঁকে, ফাঁকে ছোট, ছোট নীরবতা টেনশন বাড়িয়ে দিয়েছে, আবার কখনো দৃশ্যের গভীরতাকে আত্মস্থ করতে সাহায্য করেছে। ছবির সাথে আমাদের চলমান যুক্ততা সময় পেয়েছে আমাদের দৃশ্য-শব্দের পাঠকে আরো নিবিড় করার। বলা যায় সাইলেন্সই একমাত্র চলচ্চিত্র-কৌশল বা অ্যাপারাটাস যাকে নির্মাতা অনেকখানি স্পেস দিয়েছেন।
কিন্তু তারা কখনো সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে না। এমনকি রেহানা যখন ছাত্রদের দাবির মুখে হাসপাতালে আটকে পড়ে, ইমুকে আনতে স্কুলে যেতে পারে না, তখনও এই সমস্যার সমাধানের চেয়ে রেহানার একাকীত্ব, তার বেদনা আমাদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। আমরা ইমুর স্কুলে পৌঁছুতে চাই ঠিকই, কিন্তু রেহানার নিঃসঙ্গতা, তার রক্তক্ষরণ আমাদের মনোজগতের দখল নিয়ে রাখে।
চিত্রনাট্যে অঙ্কে বিভক্ত নেই ঠিকই, কিন্তু দেখি যে, সে তার চলিষ্ণুতার ভেতর দিয়ে কিছু ছোট, ছোট সিচুয়েশন তৈরি করে এবং তাদের মীমাংসা উপস্থাপিত হয়। এভাবে, ন্যারেটিভ এক ভিন্ন মাত্রার আকর্ষণ তৈরি করে যা ছবির বৃহত্তর যে গন্তব্য- রেহানার বিচ্ছিন্নতার নির্মিতি তার সমান্তরালে চলতে থাকে। আমরা উৎসুক হই এভাবে যে, মিমির নকল করার বিষয়টি কোন দিকে যাবে, অ্যানির যৌন হয়রানির বিষয়টি কীভাবে অগ্রসর হবে, অ্যানি অভিযোগ জানাতে অস্বীকার করলে রেহানা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, রেহানার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রিন্সিপাল কী করবেন, ডাক্তার আরেফিনের স্ত্রী তার স্বামীর দুষ্কর্মের কথা জেনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবে- এসব ঘটনারা ক্রমাগতই দর্শককে ন্যারেটিভের ভেতরে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু তারা কখনো সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে না। এমনকি রেহানা যখন ছাত্রদের দাবির মুখে হাসপাতালে আটকে পড়ে, ইমুকে আনতে স্কুলে যেতে পারে না, তখনও এই সমস্যার সমাধানের চেয়ে রেহানার একাকীত্ব, তার বেদনা আমাদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। আমরা ইমুর স্কুলে পৌঁছুতে চাই ঠিকই, কিন্তু রেহানার নিঃসঙ্গতা, তার রক্তক্ষরণ আমাদের মনোজগতের দখল নিয়ে রাখে।

সিনেমাটিক ডেড টাইমের ব্যবহার প্রসঙ্গে লিখেছি এই রচনার গোড়াতেই। মনে হয়, এই কৌশলের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবহার দেখেছি আমরা রেহানার পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের দৃশ্যে। কী হয় শেষ পর্যন্ত? রেহানা কি সত্যি তার অভিযোগ তুলে নিতে বাধ্য হয়? প্রশ্নটি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৃহত্তর নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার রেহানার যে সংগ্রাম তার একটি প্রধান বিষয় ছিল এই বিষয়টি। ডাক্তার আরেফিন ছাত্রীর সাথে যে অনৈতিক আচরণ করেছিলেন তাকে সেই জন্যে শাস্তি দিতে চেয়েছিল রেহানা। তাকে কি সেই অবস্থান থেকে পিছু হটতে হয়? রেহানাকে খোলা কোলাপসিবল গেটের সামনে দেখে আমাদের তো সেরকমটিই মনে হয়। কারণ তার আগেই আমরা প্রিন্সিপালকে বলতে শুনি যে রেহানা অভিযোগটি তুলে নিলে ছাত্রদের তিনি বুঝিয়ে শান্ত করতে পারবেন। রেহানার নৈতিক অবস্থানের এরকম একটি বিপর্যয়কে কিন্তু চিত্রনাট্যে সেভাবে ট্রিট করা হয় নি। বরং, কিছুটা নির্বিকারভাবেই ন্যারেটিভ এগিয়ে যায়। মনে করবার সুযোগ আছে যে, চলচ্চিত্রের এই দার্শনিক সংকটকে নির্মাতা এড়িয়েই গেছেন!
রেহানা মরিয়ম নুর দেখতে বসে মনে হয়েছে এটি রেহানার জীবন-দর্শন বিষয়ে কোনো বাহাস নয়। কারণ সেরকম ক্ষেত্রে রেহানার অবস্থানের কাউন্টার পয়েন্ট এই চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত হতো। সেটি ঘটে নি। বরং, এটি একরৈখিকভাবে রেহানাকে অনুসরণ করার এক উদ্যোগ।
বরং বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় অসুস্থ রেহানার হাসপাতালের দৃশ্যটি নিয়েই। এই দৃশ্যটি কেন যুক্ত হয়েছে? রেহানাকে দেখতে আসা আত্মীয় পরিবারের স্বামী-স্ত্রী যে তর্কে লিপ্ত হন তা এই ছবিতে কীভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে? তারা পরস্পরকে আলগা লিবেরাল আর আলগা ফেমিনিস্ট বলে আখ্যায়িত করেন। অথবা দৃশ্যের শুরুতে এক আত্মীয়-পরিবারে মাকে ছেলের কিডনি দেওয়া সংক্রান্ত যে গল্প শোনা যায় তা-ই বা কী প্রতিষ্ঠা করে? লক্ষ করি, রেহানা এসব গল্প, তর্কে একবারও যুক্ত হয় না। তাহলে কি ব্যাপারটি এই যে, গড়পরতা শিক্ষিত মানুষ নারী-পুরুষের অধিকার নিয়ে যেসব আলোচনা, বিতর্ক করে তা রেহানাকে স্পর্শ করে না? রেহানার রয়েছে, এসব বিষয়ে একেবারে সম্মুখ যোদ্ধার অভিজ্ঞতা, নিজের জীবন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নির্মিত হওয়া বোধ ও বিশ্বাস যা – এসব মামুলি পাঁচালির তুলনায় অনেক র্যাডিক্যাল, অনেক রক্তাক্ত! এই বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও বলতে হয়, প্রয়োজনের তুলনায় দৃশ্যটি লম্বাই।
রেহানা মরিয়ম নুর দেখতে বসে মনে হয়েছে এটি রেহানার জীবন-দর্শন বিষয়ে কোনো বাহাস নয়। কারণ সেরকম ক্ষেত্রে রেহানার অবস্থানের কাউন্টার পয়েন্ট এই চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত হতো। সেটি ঘটে নি। বরং, এটি একরৈখিকভাবে রেহানাকে অনুসরণ করার এক উদ্যোগ। তার কাজ, উচ্চারণ, অনুচ্চারিত শপথ – এসব আমাদের মধ্যে একপাক্ষিকভাবেই কাজ করতে থাকে। আমরা রেহানাকে পাই একটি দারুণভাবে ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক আবহের মধ্যে। রেহানা সেখানে তার যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে থাকে। আমরা সে যুদ্ধটা দেখি। আবহটা এতই নৈরাশ্যজনক যে, রেহানার সাথে সেখানে কোনো সংলাপের সম্ভাবনা দেখা যায় না। এমনকি রেহানা নিজেও খুব মাত্রায়িত হয়ে ওঠে না। তার রিলিজিয়াস অর্থডক্সি সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল কাজ করে। তা এবং আরো অনেক কিছু অমীমাংসিতই থেকে যায়। এভাবে
রেহানার বিচ্ছিন্নতা এবং একটি মাত্রার অ্যানার্কিস্ট দর্শনকে আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু ওই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশের মতোই রেহানার চরিত্রের এই দুই মাত্রাকে আমরা দেখি এক দম বন্ধ করা চিত্রনাট্যের ভেতর দিয়ে। ফলে বহুমুখী সংলাপ সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই ছবির বিন্যাস একটি ক্রিটিক্যাল ডায়ালগের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। সেদিকে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না।








