বাংলাদেশের কিংবদন্তি চলচ্চিত্রগ্রাহক ও খ্যাতিমান আলোকচিত্রী আফজাল এইচ চৌধুরীর সঙ্গে যে আমার খুব বেশি পরিচয় ছিল তা নয়। তাঁকে একবারই দেখেছিলাম পাঠশালায়। ২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাঠশালা সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির প্রথম কনভোকেশনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় আফজাল চৌধুরী ও পাঠশালার অধ্যক্ষ ড. শহিদুল আলমের হাত থেকে সনদ গ্রহণ করেছিলাম। তখন জানতাম না তিনি এত বড় মাপের সেলুলয়েড শিল্পী! এ দেশে আফজাল চৌধুরীকে নিয়ে কখনো চর্চা হয়নি। তাঁর  সৃজনকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়নি। ফলে অনেকটা অন্তরালেই থেকে যান শক্তিমান এই ক্যামেরাশিল্পী। এ কথা ঠিক যে, তিনি নিজেও ছিলেন এক নিভৃতচারী মানুষ। ২০২১ সালে অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটি দেশ টেলিভিশনের ‘বেলা অবেলা সারাবেলা’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়। সামাজিক দুনিয়ায় সাক্ষাৎকারটি থেকে যাওয়ায় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পান আফজাল চৌধুরী।

আফজাল এইচ চৌধুরী। আলোকচিত্র : কাকলী প্রধান

হাইস্কুলে পড়ার সময় ফটোগ্রাফি শুরু করেন তিনি। পরবর্তী জীবনে জড়ান চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের রায়পুর উপজেলার লক্ষীকলা গ্রামে। তাঁরা চার ভাই তিন বোন। পিতা হাজী আবদুল ওয়াহাব চৌধুরী রংপুরের মহিমাগঞ্জে কাঠের ব্যবসা করতেন। তাঁর যখন এক মাস ২২ দিন বয়স তখন মা আমেনা খাতুন মারা যান। আবদুল ওয়াহাব তাঁর খালাকে বিয়ে করেন। খুব ছোট বয়সে আবদুল ওয়াহাব তাঁকে মহিমাগঞ্জে মামির কাছে পাঠিয়ে দেন। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনি সেখানে পড়াশোনা করেন। এরপর সিরাজগঞ্জের জ্ঞানদায়িনী স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। ১৯৪৭ সালে সিরাজগঞ্জ বিএল হাইস্কুলে থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারাই ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ব্যাচের শিক্ষার্থী। কলকাতায় পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বাবার অনুমতি না পেয়ে ১৯৪৮ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন পত্রিকায় কোডাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখলেন। ছয় টাকা ১২ আনায় বিক্রি হচ্ছে কোডাক বক্স ক্যামেরা; সঙ্গে এক রোল ফিল্ম। বড় ভাই আবুল হোসেন চৌধুরীকে চিঠি লিখলেন টাকা পাঠানোর জন্য। কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় প্রথম ভাই-ভাবিদের ছবি তোলা শুরু করেন। সিরাজগঞ্জে তখন স্টুডিয়ো ছিল। ওখানে গিয়ে শিখলেন ফটোগ্রাফির টুকিটাকি। কিছু বইপত্র সংগ্রহ করলেন। ঢাকা থেকে কিনে আনলেন কেমিক্যাল। বাড়িতে ডার্করুম না থাকায় রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে লালবাতি জ্বালিয়ে ডিসের মধ্যে নেগেটিভ ডেভেলপ করতেন। প্রথমে প্রিন্ট করতে জানতেন না। স্টুডিওতে নেগেটিভ নিয়ে গিয়ে প্রিন্টং করা শিখলেন। তখন কন্ট্রাক্ট প্রিন্টের একটা ফ্রেম পাওয়া যেত। তাতে নেগেটিভ রেখে ১৩ সেকেন্ড আলো ফেলে কন্টাক্ট প্রিন্ট করা যেত। কিন্তু ছবি এনলার্জ করবেন কেমন করে? বাবার কাঠের দোকানে মিস্ত্রিরা কাজ করতো। তাদের সহযোগিতা নিয়ে কাঠ দিয়ে এনলার্জার বানিয়ে তাতে কনডেক্সার আর ক্যামেরার লেন্স লাগালেন। তখন কিন্তু তিনি নবম শ্রেণিতে পড়েন। ছবি তোলাটা তখন তাঁর নেশার মতো হয়ে গেলো। দশম শ্রেণিতে উঠে কোলকাতায় গিয়ে কিনে আনলেন রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা ও ফ্ল্যাশগান। রোলিফ্লেক্স খুবই দামি ক্যামেরা ওই জামানায়। তিনি যে ফটোগ্রাফি করতেন তাতে পরিবার থেকে কোনো রকমের বাধা পাননি। বরং পরিবারের কিংবা আত্মীয়-স্বজনের ছবি তোলার দরকার হলে তাঁর ডাক পড়তো। আফজাল চৌধুরী শখে ছবি তুলতেন। কিন্তু একবার কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই পুরস্কার পেয়ে যান। ওই সময় বোম্বেতে  ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ থেকে একটা ম্যাগাজিন বের হতো ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’ নামে। ওখানে চিলড্রেনস কর্ণার বলে একটা পেজ থাকতো। ভাগনের ছবি তুলে সেটি খামে ভরে পাঠিয়ে দিলেন। কিছুদিন পর খবর পেলেন, ছবিটি পুরস্কার জিতেছে।

২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাঠশালার প্রথম কনভোকেশনে আফজাল এইচ চৌধুরীর হাত থেকে সনদ নিচ্ছেন লেখক

কলেজে পড়ার সময়ে ১৯৪৮ সালে ১৪ আগস্টে রাষ্ট্রীয় একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেন ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত পরিচালক এ জে কারদার সিক্সটিন মিলিমিটার ক্যামেরায় ছবি তুলছেন। কারদারের মুভি ক্যামেরা তাঁকে বেশ আকৃষ্ট করলো। ওই দিনই তিনি মুভি ক্যামেরা শেখার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সময় কয়েক বন্ধু মিলে হিচহাইকিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম তখন আজিমপুরে থাকতেন। আফজাল চৌধুরী তাঁর বাসায় গেলেন। হিচহাইকিংয়ে যাবেন শুনে শামসুদ্দীন আবুল কালাম  তাঁর এইট মিলিমিটার মুভি ক্যামেরাটা আফজাল চৌধুরীর হাতে দিলেন। আফজাল চৌধুরী বললেন, ‘এটা কি আপনি বিক্রি করবেন?’ অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে তিনি বললেন, ‘এটা তুমি নিয়ে যাও। যদি দরকার হয় আমি তোমার কাছ থেকে চেয়ে নেব।’ ওই ক্যামেরা দিয়েই তিনি চা বাগানের উপর সাড়ে তিন মিনিটের একটা ডক্যুমেন্টারি বানান। কিছু দিন পর মাইকেল টডের একটা ইউনিট ঢাকায় আসে। তারা ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেটে যাবে। তখন এফডিসির অপারেটিভ ডিরেক্টর নাজির আহমেদ আফজাল চৌধুরীকে একটা ক্যামেরা ও থারটি ফাইভ মিলিমিটার চারশ ফুটের একটি রোল দিয়ে ওই ইউনিটের সঙ্গে পাঠান। নাজির আহমেদ আফজাল চৌধুরীর ধারণ করা ওই রোলটা মাইকেল টড কোম্পানির কাছে পাঠান। কিছুদিন পরে নাজির আহমেদের কাছে একটা চিঠি আসে। চিঠিতে লেখা, ‘রোলটা প্রসেস করে বিভিন্ন টেলিভিশনে পাঠানো হয়েছিল। সবাই এই কাজের খুব প্রশংসা করেছে।’ এই চিঠি দেখে আফজাল চৌধুরী সিনেমাটোগ্রাফার হওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫১ সালের শেষের দিকে বড় ভাইকে রাজি করিয়ে বোম্বে যান সিনেমাটোগ্রাফি শিখতে। ওখানকার বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক সুধীন মজুমদারের মাল্টি  স্টুডিওতে যোগ দেন। প্রথমে তিনি  স্যুটিং চলাকালীন গ্যালারির উপর থেকে লাইট অফ-অন করতেন। পরে পেলেন ট্রলি ঠেলার কাজ। ওই স্টুডিওতেই তিনি বোম্বের তারকা চিত্রগ্রাহক সহোদর ফলি মিস্ত্রি ও জাল মিস্ত্রির ক্যামেরার কাজ দেখার সুযোগ পান। এতে তাঁর ভাবনার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ওই সময় পূর্ববাংলা থেকে ফজলুল হকের সম্পাদনায় ‘সিনেমা’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সেই পত্রিকায় ‘বোম্বের চিঠি’বলে একটি বিভাগ ছিল। আফজাল চৌধুরী তারকাদের ছবি তুলে ছবির পেছনে বর্ণনা লিখে পাঠাতেন। সেগুলো বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি ফজলুল হকে সঙ্গে ঢাকায় ‘গ্রিন স্টুডিও’ স্থাপন করেছিলেন। বোম্বেতে আরো থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু বাবার চিঠি পেয়ে দেড় বছর পর দেশে ফিরে আসেন। বাড়িতে থাকলেন কিছুদিন। এক বন্ধু তাকে বললেন ইউএসআইএসে [আমেরিকান ইনফরমেশন সার্ভিস] ফটোগ্রাফার নেওয়া হবে। বন্ধু তাঁকে ইউএসআইএসের পরিচালকের কাছে নিয়ে গেলেন। পরিচালক সব শুনে বললেন, ‘আগামিকালই তুমি যোগদান করো।’ ইউএসআইএস থেকে তখন নিয়মিত একটি বুলেটিন বের হতো। এর জন্য তাঁকে নিউজ ফটোগ্রাফি করতে হতো। আর যুক্তরাষ্ট্রে ছবি পাঠাতে হতো। বেশির ভাগ সময় কাজ থাকতো না। তাই একদিন পরিচালককে বললেন, মুভি ক্যামেরা এনে দিতে। কয়েক দিনের মধ্যে জার্মানি থেকে থারটি ফাইভ অ্যারি ক্যামেরা এসে হাজির। যখন যা চাইতেন, সামনে এসে হাজির হতো। তবু এই কাজ করতে ভালো লাগলো না। দেড় বছর পর মনে হলো, এটা তাঁর কাজ না। ১৯৫৭ সালে ইউএসআইএসের চাকরি ছেড়ে করাচিতে গিয়ে ইস্ট্রার্ন ফিল্ম স্টুডিওতে যোগ দেন চিফ অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে।

১৯৬০ সালে তিনি ‘আর ভি গাম হ্যায়’ নামে একটি সাদাকালো সিনেমার চিত্রায়ন করেন। ছবিটা প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পায়। এরপর চলচ্চিত্র পরিচালক ডব্লিউ জেড আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয়। করাচি ও লাহোরে  ডব্লিউ জেড আহমেদের বেশ কয়েকটি ছবিতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। ওখানে রঙীন ফিল্মে কিছু নৃত্য ও গানের চিত্র ধারণ করেন। তখন ইংল্যান্ডে এসব ফিল্ম প্রসেস হতো। ১৯৬১ সালে চিত্রায়ন করেন ‘গুলে বাঁকালি’। এটি তৎকালীন উভয় পাকিস্তানের প্রথম আংশিক রঙীন চলচ্চিত্র। এই ছবি মুক্তি পাওয়ার পর চারদিকে আফজাল চৌধুরীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালে জহির রায়হান ‘কাঁচের দেয়াল’ নামে একটা লো-কি সিনেমা বানাবেন। এক মাসের মধ্যে ছবির কাজ শেষ করতে হবে। দেশে উপযুক্ত চিত্রগ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। ছবির নায়ক খান আতাউর রহমানের মাধ্যমে আফজাল চৌধুরীর খোঁজ পান জহির রায়হান। পিআইয়ের রিটার্ন টিকিট আর একটা চিঠি দিয়ে খান আতাকে তিনি লাহোরে পাঠালেন। চিঠিতে লিখলেন, ‘এক মাসের জন্য ঢাকায় আসো।’ দেশে আসার পর জহির রায়হান তাঁকে সবকিছু খুলে বলেন। ২৯ দিনের মধ্যে ছবির কাজ সমাপ্ত হলো। জহির রায়হান তাঁর কাজে এত মুগ্ধ হলেন যে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললেন, ‘সামনে একটা রঙীন ছবি বানাবো। তুমি আর যেও না।’ দুজনের বোঝাপড়া এত মিলে গেল যে আফজাল চৌধুরীর আর পাকিস্তানে যাওয়া হলো না। জহির রায়হানের পরিচালনায় ১৯৬৪ সালে তিনি করলেন সম্পূর্ণ রঙীন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। এই ছবি সুটিংয়ের আগেই ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে এফডিসিতে কালার প্রসেসিং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করা হয়। এরপর টেলিস্কোপ সিনেমা ‘বাহানা’ করেন ১৯৬৫ সালে। এরপর ১৯৭০ সালে করলেন বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’।

১৯৬৯ সালে জহির রায়হান বললেন, ‘তুমি একটা ছবি প্রযোজনা করো, আমি ডিরেকশন দিবো। ছবির সুটিং হবে লাহোরে।’ দুজনে মিলে ‘জ্বলতে সুরুজ কে নিচে’ নামে একটা ছবি বানান। এটিই প্রথম ট্রিপল রোলের চলচ্চিত্র। এই ছবিতে নায়িকা হিসেবে ববিতার অভিষেক। ‘জ্বলতে সুরুজ কে নিচে’ সিনেমায় অভিনয় করার সময় ফরিদা আক্তার পপির নাম ‘ববিতা’হয়ে যায়। ‘ববিতা’ নামটা রাখেন আফজাল চৌধুরীর স্ত্রী সুরাইয়া আফজাল। সত্তরের শেষের দিকে জহির রায়হান ববিতাকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। এরমধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর শুনতে পান জহির রায়হান নিখোঁজ। এদিকে পাকিস্তানে ছবির কাজ শেষ করতেই তাঁর অনেক সময় লেগে যায়। ১৯৮০ সালে দেশে ফেরেন। পরিচালক মমতাজ আলীর সঙ্গে ঢাকায় বেশ কয়েকটা ছবি করেন। কিছুদিন এফডিসির উপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের সৌজন্যতা না পেয়ে ফিল্ম ছেড়ে দেন। ঢাকায় অন্যান্য পরিচালকের সঙ্গে তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো অনেক দিনের চেনা [১৯৬৪], আপন দুলাল [১৯৬৬], নয়নতারা [১৯৬৭], আয়না ও অবশিষ্ট [১৯৬৭], বাঁশরী [১৯৬৮], মনের মতো বউ [১৯৬৯]। ১৯৭৭ সালে নাজের-উল-ইসলাম পরিচালিত পাকিস্তানের সবচেয়ে ব্যবসাসফল রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘আয়না’ও তাঁরই সেলুলয়েডে আঁকা।

এ জেড কালার ল্যাব

১৯৬২ সালে জহির রায়হানের কাচের দেয়াল চলচ্চিত্রের চিত্রায়ন করতে এসে সুরাইয়া আফজালকে বিয়ে করেন আফজাল চৌধুরী। আগে থেকেই তাঁদের পরিচয় ছিল। ইউএসআইএসে চাকরি করার সময় আফজাল চৌধুরী সুরাইয়াদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। সুরাইয়ার বাবা-মা আফজাল চৌধুরীকে পছন্দ করতেন। পরে দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটা হয়। তাঁদের দুই মেয়ে সীমা আর সাদিয়া। দুই মেয়েই প্রবাসী। ১৯৮৩ সালে ঢাকার লালবাগে তিনি এ জেড নামে একটা কালার ল্যাব খোলেন। পরবর্তী সময়ে ল্যাবটি সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে স্থানান্তর করেন। কিন্তু ল্যাব ব্যবসায় তিনি সফলতা পাননি। এ সময় তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি [বিপিএস] এর বেশ কয়েকটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৮ সালে তাঁকে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মনোনিত করা হয়। ঢাকার বারিধারার ডিপ্লোমেটিক জোনে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন আফজাল চৌধুরী। অবসর জীবনে কম্পিউটারে নিউজ পড়ে, বই পড়ে আর ইংরেজি ছবি দেখে তাঁর সময় কাটতো। দুই মেয়ে আর তিন নাতি-নাতনির সান্নিধ্যে তাঁর ভালো লাগতো। শেষের কয়েক বছর নানা ধরণের শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইউনাইটেড হাসাপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীকে বলে যান তাঁর মরদেহ যেন এফডিসিতে না নেওয়া হয়। ৩১ আগস্ট,২০২৩ দুপুরে অনেকটা নীরব অভিমান নিয়ে চলে গেলেন ৯৩ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। ৩ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ শহরের মালশাপাড়া পৌর কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় তাঁর মৃত্যুতে এদেশের মিডিয়াগুলোও ছিল নীরব।

জীবিতকালেও যে তাঁকে খুব সম্মান দেওয়া হয়েছে এমন নয়। ২০১৬ সালে ১৪তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হীরালাল স্মারক সম্মাননা পদক’ প্রদান করে। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আফজাল চৌধুরী বলেন, বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের কালজয়ী সব চলচ্চিত্রের প্রধান চিত্রগ্রাহক হয়েও জাতীয় চলচ্চিত্র কমিটি থেকে তিনি এখনো কোনো সম্মাননা পাননি। তথ্যমন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান, কোনো গাফেলতির কারণে তাঁকে উপেক্ষা করা হচ্ছে কী না। এ সময় মন্ত্রী লজ্জা পেয়ে জিভে কামড় দিয়ে মাথা নাড়েন। একই বছর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার ব্যাংক  দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’ প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। এ দেশের প্রায় ৭০ ভাগ প্রতিষ্ঠিত চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরীর ছাত্র কিংবা শিষ্য। কিন্তু কি নির্মম বাস্তবতা, এদেশে তাঁর কোনো সমাদর হলো না! আলোকচিত্র আর চলচ্চিত্রের সঙ্গে ছিল যার ৮০ বছরের সখ্য, ক্যামেরার পেছনে থাকা আমাদের ইতিহাসের সেই সাক্ষীও চিরতরে চলে গেলেন।

তথ্যসূত্র 
১. আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে সাক্ষাৎকার: বেলা অবেলা সারাবেলা, দেশ টেলিভিশনে প্রচারিত, ১৪ ডিসেম্বর ২০২১
২. ওমর শাহেদের সঙ্গে আলাপ: জহির আমাকে ছাড়ল না, কালের কণ্ঠের সাপ্তাহিক সাময়িকী কথায় কথায়, ২ মে ২০১৬
৩. বাংলাদেশের রঙীন চলচ্চিত্র: সূচনালগ্নের নেপথ্য কথা, মীর শামছুল আলম বাবুর প্রবন্ধ, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালে প্রকাশিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে