ঐতিহাসিক ছবির ভুল উপস্থাপন

0
2
শেখ শওকত কামাল

অতীতের আঁকা অথবা ক্যামেরায় তোলা ছবি সেই কালকে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করে থাকে। পুরাতন ছবির মাঝে যে ঐতিহাসিক বার্তা পাওয়া যায়, তা অনেক ক্ষেত্রে সেই সময় লেখা নথিপত্রের চেয়েও স্পষ্টভাবে ধরা দেয়। এ বিবেচনায় অতীতের ছবিগুলো ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গৃহিত হয়ে আসছে।

শত শত বছর আগের আঁকা অথবা ক্যামেরাবন্দি ছবিগুলোতে অতীতকালের চট্টগ্রামকে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্তমান শিল্পীদের আঁকা কাল্পনিক ছবিও রয়েছে, যা অতীতের বক্তব্যকে ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করে। চট্টগ্রামের ইতিহাস চর্চায় এই ছবিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ছবিগুলোর মাঝে এমন কিছু ছবি দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলো চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এই ছবিগুলো মূলত অন্যস্থানের, যা ভুল করে চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বর্তমান কালের শিল্পীর আঁকা ছবিতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক বিষয়কে ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। এমনই কিছু ছবির বিষয় এই প্রবন্ধটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এই ছবিগুলো কেন চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত নয় বা কেন ছবিতে চট্টগ্রামের ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, এ বিষয়গুলো নিয়ে এই প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ‘কালাদান’ নদীর ঐতিহাসিক ছবিকে ভুলবশত ‘কর্ণফুলি’ নদীর দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন

চিত্র ১ : ১৭০২ খ্রিষ্টাব্দে Peter Schenk-এর বইয়ে প্রকাশিত আরাকানের দৃশ্যপট
নিয়ে ছাপা ছবির রঙিন সংস্করণ। সূত্র : https://www.swaen.com/listing/bandel-de-reede-van-de-vermaerde-koopstadt-arrakan-chittagong/19593

চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে উন্মুক্ত বিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়াতে’ লেখা কিছু প্রবন্ধে এই ছবিতে [চিত্র ১] দৃশ্যমান স্থানটিকে কর্ণফুলি নদীর তীরে সে সময়কার চট্টগ্রাম বন্দরের দৃশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১,২ বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় ছাপানো এক প্রবন্ধে এই ছবিটিকে বাংলায় পর্তুগিজদের রণতরীর দৃশ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। ৩ এই ছবি নিয়ে এ সকল প্রবন্ধে দাবি করা কোনও তথ্যই সঠিক নয়। রঙিন এই ছবিটির মূল সূত্র হলো ১৭০২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত মুদ্রণ শিল্পী Peter Schenk-এর সম্পাদিত বই

Hecatompolis sive Totius Terrarum Oppida Nobiliora Centrum (One Hundred of the Most Notable Towns of the Whole World)৪ [চিত্র ২]।। ছবির ক্যাপশনে ডাচ ভাষায় দুটি বাক্য লেখা রয়েছে। একটি হলো- BANDEL de Reede van de varmaerde koopstadt Arrakan (BANDEL, the rodastead pf the renowned trading city of Arakan) ,  অপরটি BANDEL seu ora maritima Empory Carissimi Arrakan (Bandel or prominent coastal market of Arakan)। এ বিষয়ে এর বাইরে কোনও তথ্য তাঁর বইয়ে পাওয়া যায় না।

চিত্র ২ : ১৭০২ খ্রিষ্টাব্দে চবঃবৎ ঝপযবহশ এর প্রকাশিত ঐবপধঃড়সঢ়ড়ষরং ংরাব ঞড়ঃরঁং ঞবৎৎধৎঁস ঙঢ়ঢ়রফধ ঘড়নরষরড়ৎধ ঈবহঃৎঁস বইয়ে দৃশ্যমান তৎকালীন আরাকানের নৌবন্দরের ছবি।

১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ এর লেখা বই ঙড়ংঃ-ওহফরংপযব াড়ুধমরব (ঊধংঃ ওহফরধ ঠড়ুধমব) এ তৎকালীন আরাকানের একটি  আঁকা ছবি দেখতে পাওয়া যায়, যার সাথে চবঃবৎ ঝপযবহশ এর ছবিতে দৃশ্যমান দৃশ্যপটের সাথে অনেকাংশে মিল রয়েছে [চিত্র ৩]। ৫ ছবির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “উব ইধহফবষ ড়ভ জববফব াড়ড়ৎ ফব ংঃধফঃ অৎৎধশধহ” (ঞযব ইধহফবষ জড়ধফংঃবধফ নবষড়ি ঃযব পরঃু ড়ভ অৎৎধশধহ)। দৃশ্যপটের মিল থাকায় ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ এর বইয়ে ছাপানো ছবিটিকে চবঃবৎ ঝপযবহশ-এর ছবিতে উল্লিখিত দৃশ্যপটের আদি সূত্র হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর বইয়ে তৎকালীন আরাকানের রাজধানী ম্রোহাং/ম্রোক উ এবং সেখানে অবস্থিত ডাচ ফ্যাক্টরি সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা  দিয়েছেন। ডাচ নাগরিক ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ ছিলেন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কর্মরত একজন মেডিকেল সার্জন। চাকুরির সুবাদে তিনি তৎকালীন আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য) অবস্থিত ডাচ ফ্যাক্টরিতে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাস হতে ১৬৬১  খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন। ৬ সে সময় রাখাইন রাজ্যের ‘কালাদান’ নদীটি ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে ‘আরাকান  রিভার’ নামে পরিচিত ছিল। তাঁর লেখা বইয়ের বর্ণনা মতে উপরের ছবিটি তৎকালীন আরাকানের রাজধানী (ম্রোহাং/ম্রোক উ)  শহরের নিকটবর্তী কালাদান নদীর তীরে অবস্থিত বন্দরের দৃশ্য। এই ছবিতে তৎকালীন আরাকানের বিভিন্ন প্রকার নৌযান, বৌদ্ধমন্দির, নদীতে অপেক্ষমাণ ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ ও নদীর তীরবর্তী বাজারের দৃশ্যের উল্লেখ রয়েছে। ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ-এর লেখা বইয়ের তথ্য যাচাই করলে কর্ণফুলি নদীর দৃশ্যের দাবি ভুল প্রমাণিত হয়। প্রাচীন আরাকানের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন রেমন্ডের মতে, এ ছবিতে দৃশ্যমান স্থানটি বঙ্গোপসাগরে বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কালাদান নদীর মোহনা থেকে আনুমানিক ৬০ কিলোমিটার উজানে কালাদান নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।৭

চিত্র ৩ : ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ-এর এশিয়া ভ্রমণ কাহিনির উপর ডাচ ভাষায় লেখা ঙড়ংঃ-ওহফরংপযব াড়ুধমরব বইয়ে ছাপানো তৎকালীন আরাকানের রাজধানী শহরের বাইরে অবস্থিত বন্দরের দৃশ্য।

উপরে উল্লিখিত ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ ও চবঃবৎ ঝপযবহশ উভয়ের বইগুলো সর্বপ্রথম ছাপানো হয়েছিল ডাচ রাজধানী অ্যামস্ট্রাডামে। তৎকালীন চট্টগ্রামকে নিয়ে মুঘল ও আরাকান শাসকদের মাঝে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের দৌরাত্ম্যের কারণে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামে তাদের ফ্যাক্টরি স্থাপন করা থেকে বিরত থেকেছিল।৮ ডাচ সূত্রে সর্বপ্রথম পাওয়া এই ছবিগুলোর মুদ্রণকালে চট্টগ্রামে ডাচ ফ্যাক্টরির অনুপস্থিতি, এই ছবিতে দৃশ্যমান স্থানটি চট্টগ্রামের হওয়ার দাবিকে আরো  জোরালো ভাবে নাকচ করে দেয়।

চট্টগ্রামে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম চিফ  হ্যারি ভ্যারেলস্টের ভুল ছবি

চিত্র ৪ : ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের ডেপুটি লেফটেন্যান্টের পোশাক পরিহিত ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ক্রিকেটার হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্ট। সূত্র : উইকিপিডিয়া। যদিও বাংলাপিডিয়া দাবি করছে, ছবিতে দেখতে পাওয়া ব্যক্তি চট্টগ্রামের প্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিফ, হ্যারি ভ্যারেলস্ট।

অনলাইন বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়াতে উপরের ছবিতে [চিত্র ৪] দেখতে পাওয়া ব্যক্তিকে চট্টগ্রামের প্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিফ হ্যারি ভ্যারেলস্টের পোর্ট্রেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।৯ অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ বিষয়টি সঠিক নয়। এ ছবির মূল সূত্র হলো ইংল্যান্ডের সাউথ ইয়র্কশায়ারে অবস্থিত ‘এস্টোন হল’ হোটেলের ব্যবসায়িক ওয়েবসাইট।১০ ছবিটি হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্টের, যিনি  ছিলেন ১৯ শতাব্দীর একজন সৌখিন প্রথম শ্রেণির ব্রিটিশ ক্রিকেটার। এছাড়াও তিনি ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ারের ‘জাস্টিস অব পিস’ এবং পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের ডেপুটি লেফটেন্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন  করেছিলেন।১১ তবে চট্টগ্রামের প্রথম  ইংরেজ চিফ (১৭৬০-১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) ও পরবর্তীতে বাংলার দ্বিতীয় গভর্নর (১৭৬৭-১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দ) হ্যারি ভ্যারেলস্টের সাথে হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্টের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে হ্যারি ভ্যারেলস্ট বাংলার গভর্নর থেকে ইস্তফা দিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যাবার পর সেখানকার সাউথ ইয়র্কশায়ারে অবস্থিত এস্টোন এস্টেট কিনে নেন, যেখানে ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বর্তমান ‘এস্টোন হল হোটেল’ অবস্থিত।১২, ১৩ হ্যারি ভ্যারেলস্টের পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকার সূত্রে এস্টোন এস্টেট ও সেখানে অবস্থিত এস্টোন হলের মালিকানা পেয়েছিলেন। হ্যারি ভ্যারেলস্টের তৃতীয় ছেলের নাম ছিল আর্থার চার্লস ভ্যারেলস্ট। সেই আর্থার চার্লস ভ্যারেলস্ট প্রথম নাতি হলেন হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্ট।১৪ এ হিসেবে হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্ট ছিলেন হ্যারি ভ্যারেলস্টের চতুর্থ প্রজন্মের পুরুষ।

এই ছবিটি চট্টগ্রামের প্রথম চিফ হ্যারি ভ্যারেলস্টের না হওয়ার পেছনে সুস্পষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। ছবিটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি একটি ফটোগ্রাফিক ছবি। চট্টগ্রামের প্রথম চিফ হ্যারি ভ্যারেলস্ট ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম ফটোগ্রাফির প্রচলন হয় ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে।১৫, ১৬ এ হিসেবে হ্যারি ভ্যারেলস্টের ফটোগ্রাফিক ছবি থাকা সম্ভব নয়। ছবিতে দৃশ্যমান ব্যক্তির পোশাক ১৯ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে পুরুষদের ব্যবহৃত পোশাকের সাথে মিল রয়েছে। চট্টগ্রামের প্রথম চিফ ও বাংলার দ্বিতীয় গভর্নর হ্যারি ভ্যারেলস্ট ছিলেন ১৮ শতাব্দীর ব্যক্তি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৮ ও ১৯ শতাব্দীর মাঝে ইংল্যান্ডে পুরুষদের বেশভূষায় পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। চট্টগ্রামে হ্যারি ভ্যারেলস্টের ইংরেজ সহকর্মী ছিলেন থমাস রামবোল্ড। ১৮ শতাব্দীতে চিত্রশিল্পী থমাস গেইনস বারাফের আঁকা ছবিতে দৃশ্যমান থমাস রামবোল্ডের সাথে উপরের ছবির ব্যক্তির বেশভূষার তুলনা করলে শতাব্দীর ব্যবধানে ইংল্যান্ডের পুরুষদের পোশাক ও ফ্যাশনের যে আমূল পরিবর্তন হয়েছিল, তা সহজেই  বোঝা যায় [চিত্র ৫]।

চিত্র ৫ : ১৮ ও ১৯ শতাব্দীর মাঝে ইংল্যান্ডে পুরুষদের বেশভূষায় দৃশ্যমান পার্থক্য।

বামে : ১৮ শতাব্দীর পোশাক পরিহিত থমাস রামবোল্ড ও তাঁর ছেলে

ডানে : ১৯ শতাব্দীর পোশাক পরিচিত হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্ট

১৮ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের পুরুষরা ব্রিসেজ নামের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা এক প্রকার প্যান্ট ব্যবহার করতেন এবং প্রায় সকল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ফ্যাশন হিসেবে মাথায় পরচুলা ব্যবহার করতেন। ১৯ শতাব্দীর শুরুতে পুরুষদের মাথায় পরচুলা ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্রিসেজের পরিবর্তে লম্বা ট্রাউজার/প্যান্ট ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।১৭, ১৮ এ সকল কারণে ফটোগ্রাফিক চিত্রে দৃশ্যমান ব্যক্তিটি চট্টগ্রামের প্রথম চিফ ও বাংলার দ্বিতীয় গভর্নর হ্যারি ভ্যারেলস্ট নয়, বরং তাঁর উত্তরাধিকারী ও পরবর্তী প্রজন্মের পুরুষ, ১৯ শতাব্দীর ক্রিকেটার হ্যারি উইলিয়াম ভ্যারেলস্ট।

চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী যুব বিদ্রোহের ভুল ছবি

চিত্র ৬ : বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামে সংঘটিত ব্রিটিশবিরোধী যুব বিদ্রোহের সাথে জড়িত যুবকদের গ্রেপ্তারের দৃশ্য হিসেবে ব্যবহৃত ছবি।

কিছু ভারতীয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যেমন সববাংলায়, স্টারস আনফোল্ডেড (ঝঃধৎংটহভড়ষফবফ), ইনুথ (ওহঁঃয), নিউজ ক্লিক (ঘবংি ঈষরপশ), জিকে টুডে (একঞড়ফধু), টাইমস নাও (ঞরসবং ঘড়)ি; এ সকল ডিজিটাল সংবাদ মিডিয়াতে ‘ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামে সংঘটিত যুব বিদ্রোহ’ সম্বন্ধে লেখা প্রবন্ধে উপরের ছবিটি [চিত্র ৬] ব্যবহার করা হয়েছে।১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪ ছবিটি ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা  যায়, এটি একটি নকল ছবি, যা দুটো ছবির উপকরণ জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যে দুটো মৌলিক ছবি জোড়া দিয়ে এই ছবিটি তৈরি করা হয়েছে তা চিত্র ৭ ও ৮-এ দেখানো হয়েছে, যেগুলো ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে সিঙ্গাপুরে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহের সাথে সম্পর্কিত।২৫, ২৬

চিত্র ৭ ও ৮ : উপরের ছবিতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বিদ্রোহী সিপাহীদের সাধারণ পোশাকে তৎকালীন সিঙ্গাপুর জেলখানার দেয়ালের সামনে চার ফুট অন্তর খুঁটিতে বেঁধে দাঁড় করানোর দৃশ্য। নিচের ছবিটি ফায়ারিং স্কোয়াডে ফায়ার শুরু করার ঠিক পরবর্তী দৃশ্য। সূত্র : ওসঢ়বৎরধষ ধিৎ সঁংবঁস ড়ভ টক এবং ঘধঃরড়হধষ খরনৎধৎু ড়ভ ঝরহমধঢ়ড়ৎব.

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন  ব্রিটিশ  নিয়ন্ত্রিত সিঙ্গাপুরে ভারতীয় পঞ্চম লাইট ইনফেন্ট্রির সিপাহিদের একাংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যাদের বেশির ভাগ ছিলেন মুসলিম। সপ্তাহখানেক স্থায়ী এই বিদ্রোহ চলাকালীন বিদ্রোহী সিপাহীদের হাতে আনুমানিক ৪৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক ব্রিটিশ ব্যক্তিবর্গ এবং বেসামরিক  ইউরোপীয়,  চাইনিজ ও মালে ব্যক্তিবর্গ।২৭ অবশেষে তৎকালীন ব্রিটিশ মিত্র ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানের নৌসেনাদের সহায়তায় বিদ্রোহ দমন করা হয়।২৮ বিদ্রোহীদের কোর্ট মার্শাল হয়েছিল এবং ৪৭ জনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। মৃ্ত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এই বিদ্রোহীদের ২২ জনের একটি দলকে ২৫ মার্চ ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে সিঙ্গাপুরের আউটরাম রোডে অবস্থিত জেলখানার দেয়ালের সামনে দাঁড় করে ফায়ারিং স্কোয়াডে জনসমক্ষে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।২৯ উপরের ছবি দুটোতে (চিত্র ৭ ও ৮) সেই ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের দৃশ্য ধারাবাহিকভাবে ধারণ করা হয়েছে।

মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের বিভ্রান্তকর কাল্পনিক ছবি

চিত্র ৯ : বর্তমান আমলে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী আলপ্তগীন তুষারের আঁকা ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রাক্কালে মুঘল সেনাদের তৎকালীন চট্টগ্রামে অবস্থিত আরাকানি দুর্গ আক্রমণের কাল্পনিক দৃশ্য।

প্রয়াত ড. সামসুল হোসেন সম্পাদিত ‘ঊঃবৎহধষ ঈযরঃঃধমড়হম’ (চিরায়ত চট্টগ্রাম) বইয়ের সূত্র হতে জানা যায়, উপরের ছবিটি [চিত্র ৯] এঁকেছেন দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী আলপ্তগীন তুষার।৩০ এটি চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কল্পনা করে বর্তমান আমলে আঁকা ছবি। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রাক্কালে, মুঘল সেনাদের তৎকালীন চট্টগ্রামে অবস্থিত আরাকানি দুর্গ আক্রমণের দৃশ্য এই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আরাকানি দুর্গ হিসেবে আঁকা যে স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে, সেই স্থাপনাটি দেখতে তৎকালীন আরাকানের স্থাপনার মতো নয়। বিশেষত, আরাকানি দুর্গের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার অথবা ব্রুজ দেখতে মোটেও এ রকম ছিল না। সে সময়কার ইউরোপীয় শিল্পীদের আঁকা আরাকানের দুর্গের যে ছবি [চিত্র ১০] দেখতে পাওয়া যায়, তার সাথে এর কোনো মিল নেই। বরং এই ছবিতে দৃশ্যমান স্থাপনাটির সাথে মুঘল স্থাপত্যের যথেষ্ট মিল রয়েছে। যার ফলে, মুঘল স্থাপনা সম্বন্ধে ধারণা রাখেন এমন দর্শকের কাছে এই ছবি বহিঃশত্রু কর্তৃক মুঘল দুর্গ আক্রান্তের দৃশ্য বলে মনে হবে। অন্যদিকে যারা মুঘল স্থাপনা সম্বন্ধে ধারণা রাখেন না, সেই সকল দর্শকের মনে আরাকানি দুর্গ সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা জন্ম দেবে। এছাড়া চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত প্রাকৃতিক দুর্গের মাঝে চট্টগ্রামের সেই আরাকানি দুর্গটি অবস্থান করায় এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আন্দরকিল্লা’। ছবিতে এই বিষয়টিও ফুটে উঠতে দেখা যায় না। যদি তৎকালীন মুঘল দরবারে মুন্সি হিসেবে কর্মরত ইবনে মোহাম্মদ ওয়ালীর (যিনি শাহাবুদ্দিন তালিশ নামে সুপরিচিত ছিলেন) লেখায় পাওয়া চট্টগ্রামের সেই ‘আরাকানি আন্দরকিল্লার’ বর্ণনার সাথে৩১ ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ-এর বইয়ে দৃশ্যমান সেই সময়কার আরাকানি দুর্গের স্থাপত্যের সাথে মিল রেখে উপরের ছবিটি তৈরি করা হতো, তাহলে একটি ইতিহাস সমৃদ্ধ ছবি পাওয়া যেত। ঐতিহাসিক বিষয়ের কাল্পনিক ছবি আঁকার ক্ষেত্রে ছবির উপকরণগুলো অবশ্যই ইতিহাসের সাথে মিল রেখে আঁকা প্রয়োজন। অন্যথা সেই ছবি দর্শকের মনে ভুল বার্তা দেবে।

চিত্র ১০ : ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ডড়ঁঃবৎ ঝপযড়ঁঃবহ লেখা ঙড়ংঃ-ওহফরংপযব াড়ুধমরব বইয়ে ছাপানো তৎকালীন আরাকানের রাজধানী (ম্রোহাং/ম্রোক উ) শহরকে ঘিরে চারপাশে নির্মিত আরাকানি দুর্গের দৃশ্য।

শেষ কথা

আলোচ্য ছবিগুলো চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে কেন সম্পৃক্ত নয় বা চট্টগ্রামের ইতিহাসকে সঠিকভাবে কেন উপস্থাপন করে না, এই বিষয়ে উপরে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এ আলোচনায় বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে ও বিশ্বকোষে এই ছবিগুলোর ভুল উপস্থাপন উঠে এসেছে। এই ডিজিটাল যুগে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বকোষ সঠিক তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাঠক অনলাইন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হাজারো গুজবের মাঝে সঠিক তথ্য পেতে এসব নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। আশঙ্কার বিষয় হলো, এই অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ও বিশ্বকোষে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ছাড়া ছবি ব্যবহার করা হলে তা পাঠককে সঠিক তথ্য পাওয়া থেকে বিরত রাখবে। ভুল ছবি উপস্থাপনে প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃতি হয়। শুদ্ধ ইতিহাস চর্চায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র : যঃঃঢ়ং://ফড়র.ড়ৎম/১০.১৩১৪০/জএ.২.২.১৫৮৪১.২৬৭২০

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে