
বাংলাদেশের সমকালীন চলচ্চিত্রে মেজবাউর রহমান সুমন এমন একজন নির্মাতা, যিনি একইসঙ্গে দর্শকপ্রিয়তা এবং শিল্পভাষা—এই দুই ক্ষেত্রেই একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে লোকজ মিথ, প্রতীক, মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতি ও বাস্তবতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ মিলেমিশে নির্মাণ করে এক স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা প্রায়ই গল্পের সীমা অতিক্রম করে পৌঁছে যায় নির্মাণদর্শন, নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পচিন্তার প্রশ্নে।
এই দীর্ঘ আলাপটি মূলত তাঁর সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র রইদকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে তাঁর সমগ্র সৃজনপ্রক্রিয়া জুড়ে। গল্প নির্বাচন, চিত্রনাট্য, সংলাপ, অভিনয় পরিচালনা, মিজঁ-সান, ক্যামেরা, শব্দ, সংগীত, লোকঐতিহ্য, বাস্তবতার নির্মাণ, শিল্পীসত্তা, বাজার, দর্শক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের নৈতিকতা—বিভিন্ন প্রসঙ্গে তিনি বিস্তারিতভাবে নিজের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি উঠে এসেছে হাওয়া নির্মাণের অভিজ্ঞতা, টেলিভিশন ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রি-প্রোডাকশন, লোকেশন নির্মাণ, শিল্প নির্দেশনা এবং চলচ্চিত্রের প্রচারণা নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
কথোপকথনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে কিছু সংযোগ-প্রশ্নও ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছে, যাতে আলাপের ধারাবাহিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা অক্ষুণ্ণ থাকে। পাঠের সুবিধার্থে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দুই পর্বে প্রকাশ করা হচ্ছে। আশা করি, এই আলাপ নির্মাতার চলচ্চিত্রগুলো দেখার পাশাপাশি তাঁর নির্মাণপ্রক্রিয়া ও শিল্পভাবনা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্যও সমানভাবে উপভোগ্য হবে।

নির্মাণ প্রক্রিয়া: ফ্রেম, ব্লকিং ও শব্দ
আসমা বীথি: ফ্রেমিংয়ের ক্ষেত্রে আগে থেকেই কঠোরভাবে স্টোরিবোর্ড মেনে চলেন, নাকি লোকেশনে গিয়ে ব্লকিং দেখে অর্গানিক্যালি সেট ডিজাইন করেন?
মেজবাউর রহমান সুমন: হাওয়া এবং রইদ—দুটোর ক্ষেত্রেই বিষয়টা আলাদা ছিল। হাওয়ায় আমরা জানতাম যে ওই বোটের বাইরে যাব না। সেখানে উপরে অসীম আকাশ, চারদিকে শুধু জলরাশি, আর মাঝখানে একটা নৌকা। তাই লোকেশন দেখে রাখার তেমন প্রয়োজন ছিল না। হাওয়ার সময় আমরা একটা মিনিয়েচার বোট বানিয়েছিলাম। পরে এ হাওয়া গানটার শ্যুটিংয়ে যে মিনিয়েচার বোট দেখা যায়, সেটাই আসলে। শ্যুটিংয়ের আগেই আমরা এটা বানিয়েছিলাম শর্ট ডিভিশন করার জন্য—কীভাবে শটগুলো সাজাবো, তার একটা গ্রাফ তৈরি করার জন্য। প্রায় পাঁচ-ছয় ফুটের একটা বোট ছিল সেটা, অফিসে রাখা থাকত।

হাওয়ার জন্য আমার মোটা দুইটা বই ছিল। ইচ্ছে ছিল পরে প্রকাশ করব, আর হয়ে ওঠেনি। সেখানে আটশোরও বেশি ড্রয়িং করেছিলাম, হয়তো আরও বেশি। অনেক মাস ধরে প্রতিদিন আমরা তিন-চারজন বসতাম—আমার সিনেমাটোগ্রাফার খসরু ভাই, এডিটর সজল, কখনো কস্টিউম ডিজাইনার, কখনো আর্ট ডিরেক্টর। আমি আঁকতাম, সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ছবি তুলে রাখা হতো।
আমি যেহেতু ছবি আঁকি, তাই স্টোরিবোর্ড সবসময় নিজেই করি। সিনেমার ক্ষেত্রে অন্তত। বিজ্ঞাপনে অবশ্য সবসময় না। হাওয়ার জন্য আমার মোটা দুইটা বই ছিল। ইচ্ছে ছিল পরে প্রকাশ করব, আর হয়ে ওঠেনি। সেখানে আটশোরও বেশি ড্রয়িং করেছিলাম, হয়তো আরও বেশি। অনেক মাস ধরে প্রতিদিন আমরা তিন-চারজন বসতাম—আমার সিনেমাটোগ্রাফার খসরু ভাই, এডিটর সজল, কখনো কস্টিউম ডিজাইনার, কখনো আর্ট ডিরেক্টর। আমি আঁকতাম, সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ছবি তুলে রাখা হতো। পরে সেগুলো বই আকারেও সাজানো হয়েছিল। কিন্তু বিষয় হচ্ছে, স্টোরিবোর্ড করলেও শ্যুটিংয়ে গিয়ে অনেক কিছু বদলে যায়। কারণ স্পেস তাৎক্ষণিকভাবে অনেক পরিবর্তন ঘটায়। আমি শ্যুটিংয়ের সময় এই তাৎক্ষণিক অনুভূতিকে অনেক গুরুত্ব দিই। একটা ভাষাগত জায়গা থেকে, শটের জায়গা থেকে আমি একটা নকশা করে যাই, কিন্তু সেটার মধ্যে পরিবর্তনের জায়গাও রাখি।
রইদর ক্ষেত্রে বিষয়টা আবার ভিন্ন। পুরো ছবির একটা পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু হাওয়ার মতো বিস্তারিত স্টোরিবোর্ড করিনি। কারণ আমরা জানতাম, পুরো ছবিটাই ব্লকিং-নির্ভর হবে। কিছু ড্রয়িং অবশ্য করেছি, কিন্তু রইদএ আমরা বরং কিছুটা অর্গানিক থাকতে চেয়েছি। এর কারণও আছে। হাওয়ার মতো এখানে আমি একটা সীমাবদ্ধ স্পেসে ছিলাম না। রইদর সেই বাড়িটাতে আমি প্রায় আট মাস থেকেছি। বাড়িটা তৈরি হচ্ছে, চারপাশে গাছপালা বড় হচ্ছে—এই পুরো সময়টায় আমি, আমার সিনেমাটোগ্রাফার জোয়াহের, সজল, তুষি, রিয়াদ, নূর —আমরা প্রায়ই সেখানে থাকতাম। অনেক সময় পারফর্মারদের নিয়ে দৃশ্যের ব্লকিংও করতাম। যেমন তুষির সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের দৃশ্যটা। আমরা ওই দৃশ্য বহুবার মোবাইলে শ্যুট করে দেখেছি। কারণ গ্রামের যেসব নারী পরে ওই দৃশ্যে ছিলেন, তারা তো আসলে শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তারা বাড়ি লেপেছেন, গাছ লাগিয়েছেন, কাজ করেছেন।

আসলে রইদর অনেক পারফর্মারই বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যারা এই বাড়িটা বানিয়েছেন, গাছ লাগিয়েছেন, তারা সবাই ওই গ্রামের মানুষ। আমরা প্রায় বিশ-পঁচিশজনকে নিয়মিত কাজের জন্য নিয়েছিলাম। তারা প্রতিদিন সকালে এসে গাছে পানি দিতেন, সার দিতেন, বাড়ি আর উঠান লেপতেন। কারণ ওটা মেঘালয়ের কাছাকাছি অঞ্চল, প্রচুর বৃষ্টি হয়। একবার বৃষ্টি হলেই উঠান নষ্ট হয়ে যেত, আবার লেপতে হতো। এটা রীতিমতো আরেকটা কর্মযজ্ঞ ছিল। কারণ আমাদের তো কন্টিনিউটি ধরে রাখতে হবে। একটা দৃশ্যে উঠান পরিপাটি, আর পরের দৃশ্যে সেটা অন্যরকম—এটা তো হতে পারে না। তাই সবসময় জায়গাটা একইরকম রাখার চেষ্টা করতে হয়েছে। শুরুর দিকে অবশ্য একটা সমস্যাও হয়েছিল। গ্রামের কিছু মানুষ, বিশেষ করে ধর্মীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন, চাইছিলেন না যে গ্রামের নারীরা শ্যুটিং-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত হোক। প্রথমে কয়েকজন নারী এসে কথা বলে গেলেন, কিন্তু পরের দিন আর এলেন না। পরে আমরা জানতে পারলাম, তাদের ওপর চাপ ছিল। কিন্তু কয়েকদিন পর তারাই আবার এসে বললেন, তারা কাজ করবেন। তারা নিজেরাই গ্রামের অন্যদের বুঝিয়েছেন যে এখানে খারাপ কিছু হচ্ছে না। বরং সবাই একসঙ্গে একটা কাজ করছে। আমাদের টিমটাও খুব ইয়াং ছিল—অনেকের বয়স একুশ, তেইশ, চব্বিশ। গ্রামের নারীরা তাদের নিজেদের ছেলেমেয়ের মতোই দেখতেন। ফলে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপর তারা শুধু কাজই করেননি, অভিনয়ও করেছেন। কারণ এর মধ্যেই তারা আনন্দ পেতে শুরু করেছিলেন। আমরা ওই মানুষদের নিয়েই ব্লকিং করেছি। কোনো দৃশ্যে তিনি অভিনয় করবেন না, তবুও তাকে দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা দাঁড়ানোর ব্লকিং করিয়েছি। কখনো কাউকে একটা চরিত্র ধরে নিয়ে মহড়া করেছি, যদিও সেই চরিত্রটা হয়তো অন্য একজন অভিনয় করেছেন। এইভাবে করতে করতেই রইদর ব্লকিং তৈরি হয়েছে। এটা খুব কঠোর স্টোরিবোর্ডের মাধ্যমে নয়; জায়গাটা, মানুষগুলো আর তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বসবাসের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।
আসমা বীথি: আপনার চলচ্চিত্রে সাউন্ড একটা আলাদা মেটাফর হিসেবে কাজ করে। হাওয়ায় সমুদ্রের গর্জন, ট্রলারে কাঠের কড়কড় শব্দ বা বাতাসের শব্দ সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলেছে। রইদ-এর সাউন্ডস্কেপ তৈরিতে আপনি শব্দকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন?
মেজবাউর রহমান সুমন: আমি কখনো একবারে সবটা চিন্তা করি না। রাইটিংয়ের ক্ষেত্রেও আমি বারবার লিখতে থাকি। শ্যুটিং শেষ হওয়ার পরও আমার রাইটিং চলতে থাকে। মানে শ্যুটিং শেষ হয়ে এডিটিং টেবিলে এসে ছবিটা যেন আরেকবার লেখা হয়। লেখা বলতে আরেকবার ভাবা হয়। কারণ অনেক সিন আছে, আমি ইচ্ছে করেই পুরোটা দেখাইনি। অর্ধেকটা দেখিয়েছি, তারপর কেটে অন্য সিনে চলে গেছি। আরেকটু স্পেসিফিক করে বলি—বাড়ি যে পুড়ল, সেখানে একটা সিন ছিল। আমি যদি সেটা দেখাতাম, তাহলে দর্শক বুঝে ফেলত কারা বাড়িটা পুড়িয়েছে। আমি সেই সিনের অল্প একটু অংশ দেখিয়ে শেষ করে দিয়েছি। ওই যে প্রশ্নটা তৈরি করা, সেটাও এক ধরনের রি-রাইট। আমি সবসময় এই জিনিসটা চেষ্টা করি। সাউন্ডের ক্ষেত্রেও একইরকম। রইদ-এর পুরো সাউন্ড কিন্তু অন লোকেশন রেকর্ড করা। এখানে যে বাতাসের শব্দ শুনেছেন, সেই বাতাস হয়তো ওই নির্দিষ্ট সিনের সময় হয়নি, কিন্তু অন্য কোনো সময় প্রচণ্ড ঝড় হয়েছে, আমাদের সাউন্ড টিম সেটা ধারণ করে রেখেছে। রইদ-এর ডায়লগও ডাবিং করা না। এটা সিঙ্ক সাউন্ড। পারফর্মাররা শ্যুটিংয়ের সময় যেভাবে অভিনয় করেছে, সেটাই রাখা হয়েছে। খুব অল্প কিছু জায়গায় এডিআর করতে হয়েছে, যেখানে শব্দ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে পুরো কোনো সিন ডাবিং করা হয়নি। বলা যায়, ছবির ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই অনশ্যুট সিঙ্ক সাউন্ড। আর রইদ-এর সাউন্ড ডিজাইন, ওই যে ঘাস নড়ার শব্দ, সেটাও ওই বাড়িরই শব্দ। হয়তো সেই নির্দিষ্ট সিনের সময় রেকর্ড করা হয়নি, অন্য কোনো সময়ে সজীব ভাই সেটা ধারণ করেছেন। সজীব ভাই সাউন্ডের ব্যাপারে ভয়ঙ্কর প্যাশনেট। শোয়েব আর রাজেশ সাউন্ড ডিজাইন করেছে। শোয়েব পুরো মিউজিক করেছে। এটার মধ্যে যত ধরনের শব্দ শুনবেন, যেমন তাল পড়ার শব্দ, সেটা চাইলে আমরা স্টুডিওতে ফোলি করে তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু আমরা তালগাছে লোক উঠিয়ে, সেখান থেকে নিচে মাইক্রোফোন ধরে সেই শব্দ রেকর্ড করেছি, এসব স্টুডিওতে বসেও করা যেত। কিন্তু অথেন্টিসিটিগুলো রাখতে চেয়েছি, কিন্তু আমি জানি না অন্য ছবিতে কী করব, এই ছবিতে অর্গানিকভাবেই করতে চেয়েছি। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরটাও আউটডোরে করতে চেয়েছিলাম। আপনারা যে মিউজিক শুনছেন, সেটা আমি চেয়েছিলাম ওই সাদুর বাড়িতে বসেই করতে, খোলা জায়গায়। সেখানে বাজানো হবে, সেখানেই রেকর্ড করা হবে, যেন পরিবেশের অনুভূতিটাও তার মধ্যে থাকে। বাংলাদেশে এধরনের আয়োজন করা একটু কঠিন। খোলা, ওয়াইড একটা জায়গায় মিউজিক বাজছে, আর সেই পরিবেশের ভেতরেই সেটাকে রেকর্ড করা হচ্ছে, কিন্তু সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে কোনো ছবিতে হয়তো করতে চাইব।
আসমা বীথি: রেকর্ডেড গানগুলো তো প্রমোশনাল কাজে ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু ফিল্মের গানগুলো আমরা আলাদাভাবে শুনতে পেয়েছি বলে মনে হলো। তাই কি?
মেজবাউর রহমান সুমন: ফিল্মে যত লালনের গান শুনছেন, ওগুলো অরিজিনাল টেক, মানে শ্যুটিংয়ের সময়ের ধারণ করা। শুধু ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’ গানটি স্টুডিওতে ধারণ করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রে সংগীত: লোকঐতিহ্য, শিল্পী ও স্বত্ব
আসমা বীথি: সংগীতের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তখন জানতে চাই—আপনি বাংলা লোকসংগীতের দুই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী কানাই দাস এবং বাসুদেব বাউলকে ছবিতে যুক্ত করেছেন। ওনাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল? বিশেষ করে এখন তো আমরা দেখি লোকগানের নানা ফিউশন হয়, যেখানে অনেক সময় মূল গানের স্বরূপই বদলে যায়। কিন্তু আপনার ছবিতে গানগুলোকে খুব স্বাভাবিক ও অরিজিন্যাল রূপে পাওয়া গেছে। এবিষয়ে আপনার ভাবনাটা কী? আর ওনাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের জায়গাটাও জানতে চাই।
মেজবাউর রহমান সুমন: কোনো বাউলের কণ্ঠে যখন গান শুনি, তখন আমি আমার ছোটবেলার গান শোনার জায়গা থেকে শুনি। আমি দেখতাম, একজন বাউল দোতারা বাজিয়ে গান গাইছেন, সঙ্গে বড়জোর একটা বায়া। পরবর্তীতে দেখলাম বাউল গানের সঙ্গে নানা ধরনের যন্ত্র যুক্ত হচ্ছে—ভায়োলিন, হারমোনিয়াম, আরও অনেক কিছু। তখন আমার কাছে সেগুলো খুব একটা ভালো লাগত না। মনে হতো, গানের যে সরলতা, যেটা আমাকে আনন্দ দেয়, অতিরিক্ত যন্ত্রসংগীত অনেক সময় সেটা আড়াল করে ফেলে। আমি সবসময় নিজের শোনাটাকে প্রাধান্য দিই, নিজের দেখাটাকে প্রাধান্য দিই। আমার তো স্যাম মিলস খুব পছন্দের। উনি যখন পবন দাস বাউল-এর আসল চিনি অ্যালবামটি নতুনভাবে উপস্থাপন করলেন, সেটা আমরা সবাই শুনেছি। স্যাম যেটা করেছিলেন, পরে অনেকে সেই ঢং অনুসরণ করে ফিউশন করেছেন। কিন্তু আপনি দেখবেন, তিনি খুব সফলভাবে ফিউশন করলেও গানের মূল সুরভি বা সংগীতের ভেতরের ঢং-টা নষ্ট করেননি।
কিন্তু নিরীক্ষা করতে গেলে সংগীত নিয়ে গভীর জানাশোনা থাকতে হয়। আমাদের এখানে অনেক সময় কী হয়—একটা বাউল গান নেওয়া হলো, তারপর তার সঙ্গে ড্রামস, গিটার বা অন্য যন্ত্র যোগ করে নতুনভাবে কম্পোজ করে ফেলা হলো। কিন্তু সেখানে ভাবনাটা থাকে না। অনেক সময় সেটাকে শুধু বিক্রির উপযোগী করার চেষ্টা থাকে।
আসমা বীথি: নিরীক্ষাটা সফল ছিল…
মেজবাউর রহমান সুমন : হ্যাঁ। স্যাম মিলসের ওই নিরীক্ষাটা সফল ছিল বলেই পরবর্তীতে আমরা তার প্রভাব দেখতে পাই। এখন নিতিন সাহনির কথা বলতে পারি, কিংবা বাংলাদেশের আনুশেহ আনাদিল বা অর্ণব যখন বাংলা ব্যান্ড নতুন উপস্থাপনা নিয়ে এসেছেন, তখনও কোথাও না কোথাও সেই নিরীক্ষার ধারাবাহিকতা দেখতে পাই। কিন্তু নিরীক্ষা করতে গেলে সংগীত নিয়ে গভীর জানাশোনা থাকতে হয়। আমাদের এখানে অনেক সময় কী হয়—একটা বাউল গান নেওয়া হলো, তারপর তার সঙ্গে ড্রামস, গিটার বা অন্য যন্ত্র যোগ করে নতুনভাবে কম্পোজ করে ফেলা হলো। কিন্তু সেখানে ভাবনাটা থাকে না। অনেক সময় সেটাকে শুধু বিক্রির উপযোগী করার চেষ্টা থাকে। এখন যেমন একটু বিকল্প ধারার ছবি জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেক প্রযোজক বা পরিচালক মনে করেন, একটু ভিন্ন ধরনের ছবি বানালে মধ্যবিত্ত দর্শক সেটা গ্রহণ করবে। কিন্তু শুধু গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কিছু করলেই তো হয় না। আসল ব্যাপার হচ্ছে নিরীক্ষা। সেই নিরীক্ষাটা যদি না থাকে, তাহলে বিষয়টা কেবল নেওয়ার গল্প হয়, সৃষ্টির গল্প হয় না।
আসলে আমি সবসময় একটা বিষয় বিশ্বাস করি—গান শুধু কণ্ঠের বিষয় নয়, এটা প্রাণের বিষয়। কানাই দাস বাউলের কণ্ঠে গান শুনে আমার মনে হয়েছিল, এই গান তিনি যেভাবে গাইতে পারেন; অন্য কেউ সেভাবে গাইতে পারবে না। তাই শুরু থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল, যেভাবেই হোক এই গান তাঁর কণ্ঠেই রাখতে হবে।
আসমা বীথি: আমরা সচরাচর দেখি অরিজিন্যাল গান যখন ব্যবহার করা হয়, তখন অনেক সময় অনুমোদন নেয়া হয় না। কপিরাইট ইস্যু নিয়ে সবাই সতর্ক না। আপনার ছবিতে কানাই দাস বাউল ও বাসুদেব বাউলের গান ব্যবহার করার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?
মেজবাউর রহমান সুমন: কানাই দাস বাউলের যে গানটি আমি ব্যবহার করেছি, সেটি মূলত মাতম চাঁদ গোঁসাইয়ের রচনা। তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। তাই তাঁর পালিত পুত্র ও পরিবারের কাছ থেকে আমরা প্রায় দেড় বছর আগে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়েছিলাম। কানাই দাস বাউলের গান আমি অনেক বছর ধরেই শুনি। ইউটিউবে তাঁর গান পাওয়া যায়, যদিও রেকর্ডিংয়ের মান খুব ভালো নয়। তবু ওই গানগুলোই আমাকে আকর্ষণ করেছে। একইভাবে বাসুদেব বাউলের গানও আমি বহুদিন ধরে শুনে আসছি। গানটির কথা ও সুর মনিরুদ্দিন আহমেদ। হাওয়ার অনেক আগে একবার কলকাতায় গিয়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে বাসুদেব বাউলের ফোন নম্বর পাই। তাঁকে ফোন করলে তিনি আমাকে শান্তিনিকেতনের বাড়িতে যেতে বলেন। আমি সেখানে গিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলাম, তাঁর গান শুনেছি। তখনই তাঁকে বলেছিলাম, আমি একটি চলচ্চিত্র বানাব, সেখানে তাঁকে দিয়ে গান গাওয়াতে চাই। তিনি সম্মতিও দিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে আমরা চলচ্চিত্রের শ্যুটিং শেষ করলাম, কিন্তু কোভিড শুরু হয়ে গেল। ফলে তাঁকে ঢাকায় এনে রেকর্ড করা সম্ভব হলো না। তখন কলকাতায় একটি স্টুডিও ভাড়া করা হয়। আমরা এখান থেকে একটি মিউজিক ট্র্যাক তৈরি করে পাঠাই। তিনি কয়েকদিন অনুশীলন করে স্টুডিওতে যান, আর আমরা অনলাইনে পুরো রেকর্ডিং সম্পন্ন করি। বাসুদেব বাউলের ক্ষেত্রে এভাবেই কাজ হয়েছিল।
কানাই দাস বাউলের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটে। অনেকদিন ধরেই তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। পরিকল্পনা ছিল তাঁকে ঢাকায় এনে রেকর্ড করা হবে। তিনি ভিসার কথাও বলেছিলেন। আবার বলেছিলেন, প্রয়োজনে তোমরা কলকাতায় এসো। কিন্তু শ্যুটিং শেষ হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের কলকাতায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। তখন বাধ্য হয়ে দূর থেকেই রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। অর্থাৎ, হাওয়া ও রইদ—দুই ছবিতেই প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি; একবার কোভিড, আরেকবার রাজনৈতিক অস্থিরতা।
আসলে আমি সবসময় একটা বিষয় বিশ্বাস করি—গান শুধু কণ্ঠের বিষয় নয়, এটা প্রাণের বিষয়। কানাই দাস বাউলের কণ্ঠে গান শুনে আমার মনে হয়েছিল, এই গান তিনি যেভাবে গাইতে পারেন; অন্য কেউ সেভাবে গাইতে পারবে না। তাই শুরু থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল, যেভাবেই হোক এই গান তাঁর কণ্ঠেই রাখতে হবে। ঢাকায় এনে না পারলে কলকাতায় গিয়ে—কিন্তু গানটি তাঁর কণ্ঠেই রেকর্ড করতে হবে। এ ব্যাপারে আমি শুরু থেকেই অটল ছিলাম। আর আপনি যে প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছিলেন, কেন এভাবেই রেকর্ড করার চিন্তাভাবনা আমার মধ্যে ঢুকেছে…এটা আসলে ওই অথেন্টিসিটির জায়গা থেকেই। শুধু কণ্ঠ দিয়ে যারা গান করে সেটা একটা ক্রাফটিং মনে হয়। কেউ অনেক সুন্দর গাইছে, শুনে তার গান ভালো নাও লাগতে পারে, বরং একটু বেসুরো যে গাইছে, কিন্ত তার মধ্যে মায়া আছে; ওটা আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। কারও কাছে এটা পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু এটাই আমার অনুভূতি।
শিল্পের অবস্থান: দর্শক, বাজার ও স্বাধীনতা

আসমা বীথি: কোনো একটা ইন্টারভিউতে বলেছেন, আপনি হয়তো তিনটা ছবি, বা আরেকটা ছবি বানাতে চান, তারপর আর না-ও বানাতে পারেন। এ-বিষয়ে কিছু বলুন।
মেজবাউর রহমান সুমন: না, না-ও বানাতে পারি—এভাবে বলিনি। আমি সিনেমা বানাতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার বলার ইচ্ছা থাকে। যখন মনে হবে যে এটা একটা রিপিটেশনের গল্প হয়ে উঠছে, আমারও ভালো লাগছে না, তখন শুধু শুধু আমি বানাতে চাই না। তিনটা নিশ্চয়ই না, আমি আরও কিছু ছবি বানাতে চাই। আমার আরও কিছু গল্প বলার ইচ্ছা আছে। তিনটার কথা বলেছি যে উদ্দেশ্যে, তিনটার পরে দর্শক আবার আমাকে বয়কট করে দেয় কি না! এটা মজা করে বলেছিলাম। দর্শক যদি মনে করে, না, উনার ছবি দেখব না, উনি একই ধরনের ছবি বানাচ্ছেন—ওইটা হলে তখন একটু ডিফিকাল্ট। কারণ দর্শকের তো ছবি দেখতে হয়ই। দিনশেষে একটা শিল্পের শেষ পরিণতি দর্শক। সেটা আমি গান করি, কবিতা লিখি বা ছবি বানাই—যাই করি না কেন, সেটা তো দর্শককে দেখতে হয়। আমার মূল উদ্দেশ্য দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আমি কিছু আইডিয়া বলতে চাই, যেটা আমি বিশ্বাস করি। দর্শক আমার সিনেমার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে সেটা দেখতে পাবে। হাওয়া দেখেছে, রইদ দেখেছে, সামনে আরেকটা হবে। আমি একটু একটু করে দর্শককে আমার গল্পটা কিংবা আমার আইডিয়াটা বলতে চাই। আর আমি দর্শকের মগজের ভেতরে কিছু প্রশ্ন তৈরি করে দিতে চাই। দর্শক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে থাকবে। এইটুকুই আমার চাহিদা। এটার জন্য আমাকে একটা-দুইটা ছবি কিংবা অনেকগুলো ছবির ভেতর দিয়ে বলতে হবে। ওটাই আমার উদ্দেশ্য।
আমি যখন কোনো টেলকো ব্র্যান্ডের জন্য টিভিসি বানিয়েছি কিংবা কোন থিমেটিক কাজ করছি, তখন ক্লায়েন্ট বা এজেন্সির চাওয়া ছিল—‘সুমন ভাই, আপনি যেভাবে কাজ করেন, আমরা সেটাই চাই’। কিন্তু তবুও সেটা নিজের কাজ হয়ে উঠে না। সিনেমায় আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন।
আসমা বীথি: নির্মাতা হিসেবে একজন শিল্পীর অবস্থান আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো প্রচুর অর্থ লগ্নি হচ্ছে, বিশাল বিনিয়োগ। সেই জায়গা থেকে উঠে আসতে হলেও তো চাপটা নিতে হয়। তো শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো নীতি বা সূক্ষ্ম কৌশল কি মেইনটেইন করতে হয়? হতে পারে গ্ল্যামার নেই, কিন্তু সেই গ্ল্যামারহীনতার মধ্যেও এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করার ভাবনা?
মেজবাউর রহমান সুমন : আমার ক্ষেত্রে তো আমি এটা করি না। আমি যখন বিজ্ঞাপন বানাই, তখন পুরোপুরি সেখানেই মনোনিবেশ করি। কারণ আমি জানি, ওটা আমার কাজ না; কাজটা আমাকে দেওয়া হয়। আমার বিজ্ঞাপন আর আমার সিনেমা পাশাপাশি রাখলে দুইটা দুইরকম ঘটনা ঘটবে। কারণ ওটা একটা করপোরেট কাজ। কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে যেটা ভাবি, সেটাই করতে চাই। জানি এটা খুবই রিস্কি। রইদ যদি কেউ পছন্দ না করে, তাহলে আমার তৃতীয় ছবিটা বানানোই মুশকিল হয়ে যাবে। বিজ্ঞাপন তো আমার সত্তা না। বিজ্ঞাপন হচ্ছে আমার ক্রাফটের জায়গা। আরেকটা হচ্ছে আমার আইডিয়া। আমি একটা বিষয়কে যেভাবে দেখতে চাই, সেটা আমার সিনেমার জায়গা। দুইটা কিন্তু ভিন্ন জিনিস। সিনেমাতেও ক্রাফট লাগে। কিন্তু বিজ্ঞাপনে মূলত ক্রাফটটাই লাগে। বিজ্ঞাপনে কখনো গ্ল্যামার লাগে, কখনো পোয়েট্রি লাগে, কখনো অ্যাকশন, কখনো রোমান্স। সবই এলিমেন্ট হিসেবে আসে। আমি যখন কোনো টেলকো ব্র্যান্ডের জন্য টিভিসি বানিয়েছি কিংবা কোন থিমেটিক কাজ করছি, তখন ক্লায়েন্ট বা এজেন্সির চাওয়া ছিল—‘সুমন ভাই, আপনি যেভাবে কাজ করেন, আমরা সেটাই চাই’। কিন্তু তবুও সেটা নিজের কাজ হয়ে উঠে না। সিনেমায় আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। ওখানে আমার আইডিয়া, আমার চিন্তা। কেউ এসে বলতে পারে না যে, ‘এখানে এই অভিনয়টা চাই না’ বা ‘ওটা বদলে দিন।’ ফলে ওখানে আমি আমারটাই করতে পারি, বিজ্ঞাপনে যেটা সম্ভব হয় না। ঝুঁকি আছে। মানুষ ছবিটা নাও দেখতে পারে। কিন্তু সামহাউ আমি একটু লাকিও। রইদ নিয়ে বাংলাদেশের অনেক মানুষ কথা বলছে। আমার প্রযোজকই বলেছেন, একটা সিনেমা নিয়ে এত লেখালেখি হতে পারে—এটা তিনি ভাবেননি। আর লেখালেখি মানে শুধু ভালো বা খারাপ বলার জায়গা না। রইদ নিয়ে মানুষ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে। কেউ আব্রাহামিক ধর্ম নিয়ে পড়েছে, কেউ মিথ নিয়ে পড়েছে, কেউ আগে যেগুলো পড়েনি, সেগুলোও খুঁজে দেখেছে। একজন নির্মাতা হিসেবে এটা আমার কাছে আনন্দের। কারণ আমি তো চেয়েছিলাম সিনেমা দেখে মানুষ ভাবুক।
আসমা বীথি: অর্থনৈতিক দিকটা কীভাবে হ্যান্ডেল করেন? সর্বোচ্চ মিনিমাল বাজেটের কাজ করলেও একটা ইনভেস্টমেন্ট তো হয়। সেই চ্যালেঞ্জগুলো আপনি কীভাবে ম্যানেজ করেন?
মেজবাউর রহমান সুমন: অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তো হয়ই। ব্যক্তিগত জায়গা থেকে হয়েছে, সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে হয়েছে, টেলিভিশনে কাজ করতে গিয়েও হয়েছে, হাওয়া বানানোর সময়ও হয়েছে। কিন্তু ঠিক আছে, আমার কাছে ওটা বড় চ্যালেঞ্জ লাগে না। আমার মনে হয়, এটা নিয়ে বাড়তি কথা বলারও কিছু নেই। ফিল্মমেকিংয়ে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। আপনি পাহাড়ে উঠতে যাবেন, আপনার পায়ে শক্তি থাকা লাগবে না? সঙ্গে একটা লাঠি নিতে হবে না ওঠার জন্য? না হলে তো উঠতে পারবেন না। তো স্ট্রাগলের কথা বললে, বাংলাদেশের মতো একটা দেশে সিনেমা বানানোই একটা চ্যালেঞ্জ। আর যদি আপনি স্রোতের বিপরীতে সিনেমা বানাতে চান, যেখানে এই ধরনের ছবি বানানোকে উৎসাহ দেওয়া হয় না, বরং উল্টো এটাকে ট্যাগ দেওয়া হয়, নেগেটিভভাবে প্রচারও করা হয়
আমি দেখেছি, একটা বাণিজ্যিক ধাঁচের ছবিকে তারা প্রোমোট করবে, অথচ ভিন্ন চিন্তার কিছু হলেই তারা নীরব। কেন? কারণ মিডিওকারকে প্রশংসা করা সহজ। ওটা করলে তাদের সুবিধা হয়। তারা ওই জিনিসগুলোই প্রডিউস করতে চায়। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় তাদের সমস্যা। শুধু পত্রিকা না—টেলিভিশন, মিডিয়া, নানা জায়গাতেই এটা আছে।
আসমা বীথি: আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তো শৈল্পিক কাজকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে চায় না। এই প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে, এই যে টিকে থাকার ব্যাপার—শিল্পীরা আসলে কীভাবে টিকে থাকবে বলে মনে হয়?
মেজবাউর রহমান সুমন : হ্যাঁ, এটা একটা ফাইট। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুধু যে ইন্ডাস্ট্রির মেইনস্ট্রিম লোকজন আপনার বিপক্ষে যায় তা না; যারা আর্ট-কালচার করে, তারাও অনেক সময় এটার জন্য নেগেটিভ। এত পচা ছবি হচ্ছে, বাজে ছবি হচ্ছে—সেটা নিয়ে তারা কিছু বলবে না। কিন্তু আপনি একটা ভালো কাজ করেছেন, যেটা নিয়ে সবাই কথা বলছে; সেখানে ধরেন কোনো একটা মেইনস্ট্রিম পত্রিকা চুপ থাকবে। আপনাকে এমনভাবে ডিল করবে যেন কিছুই হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। এটা বোকামি। আমি আমার জন্য বলছি না। আমাকে নিয়ে না লিখলে আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু আমি দেখেছি, একটা বাণিজ্যিক ধাঁচের ছবিকে তারা প্রোমোট করবে, অথচ ভিন্ন চিন্তার কিছু হলেই তারা নীরব। কেন? কারণ মিডিওকারকে প্রশংসা করা সহজ। ওটা করলে তাদের সুবিধা হয়। তারা ওই জিনিসগুলোই প্রডিউস করতে চায়। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় তাদের সমস্যা। শুধু পত্রিকা না—টেলিভিশন, মিডিয়া, নানা জায়গাতেই এটা আছে। আর এদের অনেককেই আমরা প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ হিসেবে জানি। কিন্তু বাস্তবে তারা অনেক সময় এই কাজটা করে না। যারা ডিফারেন্ট কাজ করতে গেছে, তাদেরও একই ক্ষোভ থাকবে বলে আমি নিশ্চিত। তবে আমার মনে হয়, এগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে না। ভালো কাজ মানুষের মনে থেকে যায়। মানুষ সেটা নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। আমি বিশ্বাস করি, সময় শেষ পর্যন্ত সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত করবে। যদি কাজটা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, সময় সেটাকে টিকিয়ে রাখবেই।
যারা ভিন্ন ধরনের কাজ করতে চায়, তারা সবসময় শক্তিশালী। যারা স্রোতের বিপরীতে হাঁটে, তারা দুর্বল না। বরং শক্তিশালী বলেই স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে পারে। দুর্বল মানুষ স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে পারে না বলেই স্রোতের অনুকূলে যায়।

আসমা বীথি: এই টিকে থাকার লড়াইটা যারা করছেন, স্রোতের বিপরীতে হাঁটছেন তাদের জন্য কোনো পরামর্শ?
মেজবাউর রহমান সুমন : যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য আমার কোনো পরামর্শ নেই। আমি নিজেই পরামর্শ নেওয়ার মানুষ। আমি মনে করি, যারা ভিন্ন ধরনের কাজ করতে চায়, তারা সবসময় শক্তিশালী। যারা স্রোতের বিপরীতে হাঁটে, তারা দুর্বল না। বরং শক্তিশালী বলেই স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে পারে। দুর্বল মানুষ স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে পারে না বলেই স্রোতের অনুকূলে যায়। এটুকু মনে রাখলেই হবে। কাজের ক্ষেত্রে আমি কোনো কিছুর ধার ধারি না। আমি মনে করি না যে আমার ছবি সফল হতেই হবে। আমি চাইলে এখন এমন ছবি বানাতে পারতাম, যেটা অর্থনৈতিকভাবে খুব সফল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু ওইরকম সফল আমি হতে চাই না। ওই ধরনের সাফল্যের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই।
একটা ছবি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেককিছু করতে হয়। যেহেতু আমার টাকা নেই, তাই আমাকে অন্যভাবে ভাবতে হয়। বিহাইন্ড দ্য সিন, গান, আর্কাইভ—এসব শুরু থেকেই পরিকল্পনায় ছিল। আমার আর্ট টিম, পুরো টিম মিলে এগুলো তৈরি করেছে। এগুলো করতে খুব বেশি টাকা লাগে না, কিন্তু সময় লাগে। আর আমি সময়কে ব্যবহার করার চেষ্টা করি।
আসমা বীথি: আপনাদের মার্কেটিং পলিসি নিয়ে বিশেষ ভাবনা থাকে মনে হয়। আপনারা যেভাবে ফুটেজগুলো সংরক্ষণ করেছেন, প্রমোশোনাল ছাড়ছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করেছেন—সুপরিকল্পনা মনে হয়। কতদিনের পরিকল্পনা থাকে?
মেজবাউর রহমান সুমন: এই যে আপনি বললেন স্রোতের বিপরীতে হাঁটার কথা—স্রোতের বিপরীতে হাঁটা খুব কঠিন। সেজন্য আমাকে অনেক সৈন্য-সামন্ত তৈরি করতে হয়। প্রথমত, আমার টাকা নেই। দ্বিতীয়ত, আমার পর্যাপ্ত লোকজন নেই। আমাকে কেউ বা ইন্ডাস্ট্রি সাপোর্ট দেবে না। আমার আশপাশের মানুষজন আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার মিউজিশিয়ান, আমার সিনেমাটোগ্রাফার, আমার চারপাশে যারা আছে—আমি এই ব্যাপারে খুবই ব্লেসড। আমি সবসময় বলি, আমি অনেক লাকি। তারা আমাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে। আমি তাদের ঠিকমতো পারিশ্রমিক দিতে পারি না। কিন্তু তাতে যেন কিছুই আসে-যায় না। হাওয়া-র ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে, রইদ-এর সময়ও হয়েছে, আমার সারা জীবনের কাজেই এটা দেখেছি। কী কারণে হয় জানি না, কিন্তু আমার আশপাশের মানুষজন অনেক সময় বিনা কারণে আমাকে সাহায্য করতে চায়। একটা ছবি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেককিছু করতে হয়। যেহেতু আমার টাকা নেই, তাই আমাকে অন্যভাবে ভাবতে হয়। বিহাইন্ড দ্য সিন, গান, আর্কাইভ—এসব শুরু থেকেই পরিকল্পনায় ছিল। আমার আর্ট টিম, পুরো টিম মিলে এগুলো তৈরি করেছে। এগুলো করতে খুব বেশি টাকা লাগে না, কিন্তু সময় লাগে। আর আমি সময়কে ব্যবহার করার চেষ্টা করি। ধরেন, রইদ-এর প্রচারণার জন্য একটা গান দরকার। সেটার জন্য দেড়-দুই বছর আগে থেকেই সহজিয়ার রাজু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, আইডিয়া শেয়ার করেছি। মেঘদলের গান, ইমনের সঙ্গে কাজ—এই ছোট ছোট জিনিসগুলো আসলে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক বা শিল্প-প্রতিষ্ঠানের বড় কোনো সাপোর্ট না থাকলেও, আমরা পরিশ্রম দিয়ে জায়গাটা পূরণ করার চেষ্টা করি। দুটো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই একই ব্যাপার ঘটেছে।আমরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছি। কতটুকু পেরেছি জানি না, কিন্তু চেষ্টা করেছি। আর একটা ব্যাপার, আমরা কখনোই বলি না যে, সবাই হলে আসুন। আমরা দর্শককে জোর করি না। আমরা শুধু বলি—যদি এই ছবির ভেতরে এমন কিছু থাকে, যা আপনাকে আকর্ষণ করে, তাহলে নিজ দায়িত্বে এসে ছবিটা দেখুন। আমাদের কাজ শুধু বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া। রইদ-এর জন্যও একটা মার্কেটিং প্ল্যান ছিল। কিন্তু সেখানে আমরা কখনো দর্শককে সরাসরি হলে আসার আহ্বান জানাইনি। অন্যরা বলতে পারে, আমাদের আশপাশের মানুষ বলতে পারে, কিন্তু আমরা টিম থেকে সেটা বলিনি।
শেষের আলাপ
আমার কিন্তু ভিডিও ইন্টারভিউ পছন্দ না। অনস্ক্রিনে কথা বলা আমার ভালো লাগে না। টেক্সটই আমার কাছে ভালো লাগে। আমি সারাজীবন টেক্সট ইন্টারভিউই পড়ে এসেছি। আমার কাছে টেক্সট সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
আসমা বীথি: রইদ কেন্দ্র করে আপনার একরকম ব্যস্ততা যাচ্ছে জানি। তার ভিতরেও সময় দিলেন এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
মেজবাউর রহমান সুমন : আমিও অনেক কথা বললাম। সত্যিকার অর্থে রইদ-এর পর আমি অনেকগুলো ইন্টারভিউ দিয়েছি। কিন্তু এটা আমার জন্য খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল। একটানা দুই দিন ধরে কথা বলা—এবং দুই দিন ধরে কথা বলার কারণেও ভালো লেগেছে। কারণ অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা গেল। আপনার প্রশ্নগুলো আমাকে অনেক রকমভাবে বলতে সাহায্য করেছে। আর জানি না, কী কী উল্টাপাল্টা বলেছি হয়তো। আমার কিন্তু ভিডিও ইন্টারভিউ পছন্দ না। অনস্ক্রিনে কথা বলা আমার ভালো লাগে না। টেক্সটই আমার কাছে ভালো লাগে। আমি সারাজীবন টেক্সট ইন্টারভিউই পড়ে এসেছি। আমার কাছে টেক্সট সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

আসমা বীথি: এমন নয় যে হাওয়া বা রইদ-এর পর আপনার সঙ্গে আলাপের আগ্রহ জন্মেছে। আমি আপনাকে জানি তারও অনেক আগে থেকে। দখিনের জানালা খোলা, আলো আসে আলো যায় (২০০৬), নুসরাত, সঙ্গে একটি গল্প (২০০৭), তারপর পারুলের দিন (২০০৮), তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে (২০০৯), ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনকালে (২০১০)—এসব দেখার মধ্য দিয়েই আগ্রহটা জন্মেছে। প্রায় সবগুলো কাজেরই প্রধান চরিত্র কিন্তু নারী…
মেজবাউর রহমান সুমন: হ্যাঁ। ওই সময় আমি নিজেকে আবিষ্কার করছিলাম। আমি ঠিক জানতামও না যে কী করতে চাই। অনেকে আমাকে এটা প্রশ্ন করেন। ২০১০ সালে যখন আমি টিভি নাটক ছেড়ে আসি, তখনও অনেকেই বলতেন—আপনার সব নাটকের প্রধান চরিত্রই তো নারী। তখন আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ, তাই তো! হাওয়া-তেও খেয়াল করবেন, আটজন পুরুষ চরিত্র থাকলেও প্রধান চরিত্র কিন্তু নারী। ওই নারীকে কেন্দ্র করেই গল্পটা দাঁড়িয়ে আছে। ওই নারী চরিত্রটা না থাকলে এই গল্পই হতো না। রইদ-এ এসেও একই ব্যাপার। পাগলীর মনস্তত্ত্বের ভেতর দিয়েই রইদকে দেখা যায়। এটা কেন হয়, আমি ঠিক জানি না। এটাও পরিকল্পিত না। নারীকে প্রধান চরিত্র করে গল্প করব—এমন কোনো সচেতন ভাবনা কখনো ছিল না। আমার জীবনের অনেক কিছুর মতো এটাও ঘটে গেছে। অনেকের মনে হয় আমি খুব পরিকল্পনা করে মিথ ব্যবহার করি, প্রতীক ব্যবহার করি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বিষয়টা এরকম না। আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। আমার কাছে অনেক কিছুই হঠাৎ আসে। আমি একে অনেকটা কবিতার মতো দেখি। কবিতা লেখার জন্য আমি কখনো বসে থাকিনি। কবিতা যখন এসেছে, তখন লিখেছি। আমার কাছে মনে হয়, নারী চরিত্রও সেভাবেই আমার গল্পে এসেছে। কেন এসেছে, কীভাবে এসেছে—এর পুরো ব্যাখ্যা আমার নিজের কাছেও নেই।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ১৫ ও ১৬ জুন, ২০২৬







