সম্পাদকীয়

0
149

তিন বছর ধরে লেখকদের লেখা আটক থাকা গর্হিত অপরাধ। এই দায় নিয়ে চিত্রসূত্ররচতুর্থ বর্ষে নতুন-পুরাতন-পূর্ব ধারাবাহিক কিছু লেখা সহ দ্বিতীয়বারের মতো হাজির হলো। বলা চলে নতুন যাত্রা। নতুন এ-কারণে এবার থেকে উন্মুক্ত ‘চিত্রসূত্র’। এতদিন পর্যন্ত শুধু আমন্ত্রিত লেখকরাই এখানে লিখেছেন। এখন থেকে আমাদের বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলা ভাষাভাষী যে কেউ লিখতে পারেন।লেখকদের জন্য ‘নিয়মাবলী ও যোগাযোগ’ বিভাগে এ-বিষয়ে বিস্তারিত  রইল।

এবারে বিভিন্ন বিভাগে আমাদের লেখা যাচ্ছে মোট চৌদ্দটি। এর মধ্যে দুটো সাক্ষাৎকার রয়েছে। শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিল দু’হাজার তেইশ সালের নভেম্বর মাসে। তখন সদ্যই অনুষ্ঠিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কনটেম্পরারি আর্ট এক্সিবিশন ‘ডকুমেন্টা ১৫’।  জার্মানির ক্যাসেল শহরে প্রতি পাঁচ বছর ব্যবধানে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কালেক্টিভ এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করেছে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট। বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি  বলেছেন ডকুমেন্টায় তাদের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা, বৃত্ত গড়ে ওঠার নেপথ্য ভাবনা, গ্যালারি, আর্ট ফাউন্ডেশন, শিল্পীদের সংকট এমন বিবিধ বিষয় নিয়ে।

চিত্রকলা বিভাগের তিনটি মৌলিক গদ্য ভিন্নতর স্বাদ যোগাবে এবং শিল্পী অসিত পালের জীবনব্যাপী বিস্তৃত অভিজ্ঞতা বরাবরের মতো তরুণ শিল্পীদের শ্রম-নিষ্ঠা-মেধা চর্চায় আগ্রহী করে তুলবে। শিল্পী অসিত পাল গত শতকের সত্তর দশকের শিল্প আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সময় এবং কাজের ধরণ পালটে গেলেও শিল্পীর ‘প্যাশন’ বোধ করি সর্বকালে একইরকম রয়ে যায়।

সদ্য প্রয়াত বিশ্বের উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক একটি রচনা যাচ্ছে। যেটি রাময়া শর্মা সম্পাদিত পকেট আর্ট সিরিজ ‘রঘু রাই: ইন হিজ  ঔন’ ওয়ার্ডস, ওয়েবজিন ‘এসককয়ার ইন্ডিয়া’ এবং ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নেয়া হয়েছে। গদ্যে রূপান্তর ও ভাষান্তর করেছেন মাহমুদ আলম সৈকত।  রঘু রাইয়ের বিস্তৃত উপলব্ধিজাত জীবন, কাজ, করণকৌশল ইত্যাদি বিষয় আকৃষ্ট করবে পাঠককে আশা করা যায়।

একজন ভাল স্ট্রিট ফটোগ্রাফারের কোনো গন্তব্য থাকে না, থাকে না ফেরার তাড়াও; এমনতর ভাবনা থেকেই হয়তো এক দশকের অধিককাল ধরে সাইদ সুমন ঢাকার উদ্যানে, হাতিরঝিলে নিয়মিত ছবি তুলে যাচ্ছেন। তারই বয়ানে থাকছে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি নিয়ে একটি ছোট গদ্য।

সয় কুবা (আই অ্যাম কিউবা), মিখাইল কালাতোজভর ছবিটি মূলত বিখ্যাত এর গল্পের জন্য নয়, বরং এর চলচ্চিত্রভাষার জন্য। চিত্রগ্রাহক সের্গেই উরুসেভস্কির সাথে মিলে কালাতোজভ ক্যামেরাকে এমন গতিশীল, দীর্ঘ এবং ভাসমান শটে ব্যবহার করেন, যা চলচ্চিত্র ইতিহাসে আজও বিস্ময় জাগায়। কিউবার বিপ্লবকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখালেও, ছবিটি পরে বিশেষভাবে পরিচিত হয় তার দৃশ্যনির্মাণের সাহস, ক্যামেরার চরম গতিশীলতা এবং সিনেমাকে প্রায় বিশুদ্ধ দৃশ্য-অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার কারণে। একসময় প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেলেও পরবর্তীতে পুনরাবিষ্কৃত হয়ে এটি চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর লেখায় সয় কুবাকে এক ঝলক ফিরে দেখা।

‘…মধ্যিখানে চর’ একটি আলোচিত ও প্রশংসিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গঙ্গা নদীর ভাঙ্গন প্রবণ এলাকায় হাজারো গৃহহীন ও দেশহীন মানুষদের নিয়ে কথা বলে এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি। যেভাবে কিশোর রুবেলকে আমরা দেখতে পাই, যে ভারতে স্কুলে পড়তে চায়; কিন্তু বাস্তবতা হলো তাকে প্রতিদিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের গঙ্গা নদী পার হয়ে চাল পাচার করতে হয়। আবার এই নদীই তার ঘর ভাঙ্গে। রুবেলের সেই নদীরই মাঝখানে জেগে ওঠা ভাঙ্গনের চরে তাঁর বেঁচে থাকার স্বপ্ন-সংগ্রামের গল্পটি অসাধারণ ভঙ্গিমায় বোনেন নির্মাতা সৌরভ ষড়ঙ্গী। দুই দেশের মধ্যকার সেই গঙ্গা নদী নিয়ে লিখেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে দেখা নদী, চর, চরিত্রগুলো আরো বড় কোনো গল্পের/পরিসরের ইঙ্গিত আর অনুভূতি নিয়ে বিস্তার লাভ করে সৌরভের এই লেখা। একটি চলচ্চিত্র গড়ার পেছনে নেপথ্যের এই স্মৃতিভাষ্য নতুন চলচ্চিত্রকারদের জন্য নিশ্চয়ই জরুরি।

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের ১৬ তম আন্তর্জাতিক ও চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করেছেন রেদোয়ান হোসাইন রিয়াদ।

আমাদের মুক্তচিন্তা বিভাগটি শিল্পের যে কোনো শাখা নিয়ে চিন্তাশীল, দার্শনিক ভাবনা প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত। এ-দফায়ও লিখেছেন কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য। মানুষের মৌলবাদী প্রবণতার উত্থানকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্ব, প্রকৃতিকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন মার্কস-লেনিন-জীবনানন্দ-টি এস ইলিয়ট-আতোয়া আর্ত-আইনস্টাইন-রামকৃষ্ণ দেব-গৌতম বুদ্ধ-রজার পেনরোজের মতো কীর্তিমানদের ভাবাঙ্ক অনুসরণ করে। আমাদের জানাশোনার বাইরে মহাজগত ও মহাপ্রকৃতির আরো কোনো এক অসামান্য জগতের অনুসন্ধানই এই লেখা।

এ-অঞ্চলের সংগীতকে উপজীব্য করে খন্দকার নাছির আহাম্মদের একগুচ্ছ আধ্যাত্মিক চিত্রকর্ম এবং মিশ্র মাধ্যমে রিফাত বিন নুরুলের ভিন্ন স্বাদের আলোকচিত্র রইল চিত্রশালা বিভাগে।

সবাইকে পাঠের আমন্ত্রণ।

চিত্রসূত্রের সাইটটি সাবস্ক্রাইব করে ও গঠনমূলক মতামত দিয়ে পাশে থাকার অনুরোধ রইল। সম্পাদনায়, পরামর্শে, কারিগরি সহায়তায় সর্বোপরি যে-কোনোভাবে উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন সবসময়; এমন সবাইকে শুভেচ্ছা, ভালোবাসা, সালাম।

মে, ২০২৬

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে