রঘু রাই: তাঁর আপন জবানি

0
1020
আলোকচিত্রী ও ফটোসাংবাদিক রঘু রাই সদ্য প্রয়াত হলেন। আলোকচিত্রের জগতে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে থাকবেন মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।  
‘রঘু রাই: তাঁর আপন জবানি’ মূলত সংকলিত রচনা। রাময়া শর্মা সম্পাদিত পকেট আর্ট সিরিজ ’রঘু রাই: ইন হিজ ঔন ওয়ার্ডস', ওয়েবজিন ‘এসকয়ার ইন্ডিয়া’ এবং ন্যাশনাল হেরাল্ড ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া আলাপচারিতা। আলাপচারিতাটি ঠিক প্রশ্ন-উত্তরের আদলে না রেখে টানা গদ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে। বলা ভাল, গদ্যটি রঘু রাইয়ের জীবন, কাজ, করণকৌশল, উপলব্ধি ইত্যাদির সংক্ষিপ্ত বয়ান।

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর বাবা জোর দিয়েছিলেন আমি যেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হই। প্রকৌশল বিষয়টি আমার কাছে ভীষণ নিরস মনে হতো। তারপরও পড়াশোনাটা শেষ করি। বছরখানেক কাজ করার পর আমি চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসি। সেই সময়টা খুব একটা সুখকর ছিল না। আমি বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করি; ভাই ছিলেন সৌখিন আলোকচিত্রী, কিন্তু ভীষণ আগ্রহী। ভাই ও তাঁর বন্ধুরা আলোকচিত্র নিয়ে বেশ ঘোরগ্রস্থ ছিলেন—ক্যামেরা, লেন্স ও ক্যামেরার নানান সরঞ্জাম নিয়েই তাদের সমস্ত আলোচনা। সেখানেই আলোকচিত্রের প্রতি আমার আকর্ষণের সূচনা। অবশ্য শুরু থেকেই আলোকচিত্রী হওয়ার পরিকল্পনা আমার কখনোই ছিল না।


একদিন, আমি ভাইয়ের সঙ্গে তার বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে ভাইকে বললাম, “ক্যামেরাটা দাও, আমি কয়েকটা ছবি তুলতে চাই।”  সেই প্রথম আমার কাঁধে একটি ক্যামেরা ঝুলে পড়ল। ভাই আমাকে ফিল্মভর্তি একটি ক্যামেরা দিয়েছিলেন। তিন দিনের মধ্যেই আমি পুরো ফিল্ম শেষ করে ফেলি। তখন ভালো ছবি না খারাপ ছবি, সেসব নিয়ে আমার কোনো ভাবনা ছিল না। তো, সেই গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে একটা গাধার ছোট্ট বাচ্চা চোখে পড়ল, দেখতে খুবই সুন্দর আর মজার। বাচ্চাটা দৌড়াতে শুরু করলে আমি ওটার পেছনে ধাওয়া করি, একটা সময় বাচ্চাটা ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তখন সেই বাচ্চাটার একটি ছবি তুলি। নেগেটিভগুলো ডেভেলপ করার পর ভাই ওই গাধার বাচ্চার ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টাইমস-এ পাঠিয়ে দেয়। কয়েক সপ্তাহ পর তারা ছবিটি পত্রিকার শেষ পাতায় ছাপায়, অর্ধেক পৃষ্ঠা জুড়ে, আমার নামসহ! সবাই তখন এটিকে বেশ বড় একটা ঘটনা বলে মনে করেছিল, কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয় নি। পরে তো ভাই আমাকে এক্সপোজার, ফোকাস, পার্সপেক্টিভ ইত্যাদির পাঠ দিয়েছিলেন।

 
আমার মনে হয়, সেই ছবিটি সবকিছু মিলিয়ে ভালো হয়ে উঠেছিল কারণ পরিস্থিতি ও মুহূর্তের প্রতি আমার এক স্বতঃস্ফূর্ত অনুভব কাজ করেছিল। যখন আপনি ছবি ও বিন্যাস একসঙ্গে খুঁজতে থাকেন, তখন আপনি আসলে সাধারণ ছবি তোলেন। কিন্তু যখন আপনার অন্তর্দৃষ্টি আপনাকে কোনো মুহূর্ত ধরে রাখতে বলে, তখন সেই জিনিসগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই ছবিগুলোই হয়ে ওঠে অসাধারণ। গঠন ও বিন্যাস আসে দৈনন্দিন জীবনের উপাদানগুলো থেকেই। আপনি যদি বিন্যাসের নিয়মকানুনে আবিষ্ট না হন, তখন আসলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনি নিজেই একটি কাঠামো তৈরি করে ফেলেন। আর তখন আপনার ছবিতে নিজস্ব এক শক্তি ও সতেজতা জন্ম নেয়। তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দিকে আমি রোজ ক্যামেরা হাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম এবং সন্ধ্যায় ফিরে ফিল্ম ডেভেলপ করতাম। ধীরে ধীরে ফটো সাংবাদিকতা পেশার প্রতি মনোযোগ আসতে লাগল। অবশেষে ‘দ্য স্ট্যাটম্যান্ট’ পত্রিকায় কাজ পেয়ে যাই। তারপর টানা দশ বছর আমি ফটো সাংবাদিকতা করেছি। প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শরণার্থীদের নিয়ে তোলা ছবিগুলোর প্রদর্শনী, ঊনিশশ বাহাত্তর সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়। আলোকচিত্রের মহীরুহ হেনরি কর্তিয়ের ব্রেসোঁ সেই প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন, পরবর্তীতে আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠি। প্যারিস থেকে ফিরে এসেই ম্যাগনামের কাছ থেকে একটি চিঠি পাই। সেখানে লেখা ছিল, ম্যাগনামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রেসোঁ আমাকে তাদের দলে যোগদানের জন্য মনোনীত করেছেন। আমি তো তখন আলোকচিত্রের জগতে নবীনতম সদস্য! ওই চিঠি পেয়ে আমি এতটাই ভীত হয়ে পড়েছিলাম যে তখন কোনো উত্তরই দিইনি।

বাহাত্তর সালের সেপ্টেম্বরে আমি ম্যাগনামের সেই চিঠিটি পাই। তখন সেখানে ব্রেসোঁ ছাড়াও ব্রুনো বার্বে, মার্ক রিবোডের মতন কিংবদন্তিরা ছিলেন। আমি তাদের নাম শুনেই ভীত হয়ে পড়েছিলাম। প্রদর্শনীটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা প্রকাশিত হয়েছিল ‘লা মন্দে’, ‘লা ফিগারো’সহ অন্যান্য সংবাদপত্রে। আমার তখন মনে হয়েছিল, এসবই অতিরঞ্জিত কথা। তবু সেই প্রশংসাই আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রমে অনুপ্রাণিত করেছিল। ফটো সাংবাদিকতার চাকরিটা যখন ছাড়ব ছাড়ব করছি, সেই সময় আবার সেই চিঠিটা খুঁজে পাই। তখন গিয়ে আমি ম্যাগনামের তৎকালীন সম্পাদক জিমি ফক্সকে লিখি। তারা জানায়, প্রস্তাবটি এখনও বহাল রয়েছে। সেখান থেকেই ম্যাগনামের সঙ্গে আমার যাত্রার সূচনা।


তরুণ আলোকচিত্রী হিসেবে আমি সবসময় পূর্বতন গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রীদের কাজ দেখতাম, তাদের ছবির অন্তর্নিহিত ভাষা বোঝার চেষ্টা করতাম। ভাবতাম, কীভাবে আমার ছবিও তাদের মতোই গুরুত্ববহ হবে, কীভাবে গভীরতা আনা যায়। কিন্তু আমি আবার অতটা লালায়িতও ছিলাম না। ভারতেই থেকে গিয়েছিলাম, আর এখানেই আমার কাজ শক্তিশালী হতে থাকে, তীব্রতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ভারতের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য ছিল অসীম। প্রাচীন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আধুনিকতা, বিশৃঙ্খলা এবং মনোহর সরলতা একে অপরের সঙ্গে মিশে এক বিস্ময়কর স্তরবিন্যাস তৈরি করেছিল। এখন থেকে একশো বছর পরে কেউ যদি আমার কাজের ভাণ্ডারের দিকে তাকায়, আমি মনে করি তারা তখনকার ভারতের দৃশ্যমান ইতিহাস দেখতে পাবে, আমরা তখন কীভাবে জীবন যাপন করতাম। ভালো সাংবাদিকতা যদি ইতিহাসের প্রথম খসড়া হয়, তবে একটি ভালো ছবি সেই ইতিহাসের প্রথম দৃশ্যমান প্রমাণ। এটাই আমার পেশার প্রকৃত পবিত্রতা।

আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, “মুখতালিফ তরিকোঁ সে জিন্দেগি পে কুরবান” অর্থাৎ নানাভাবে নিজেকে জীবনের কাছে সমর্পণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিষ্ঠা এবং নিরন্তর শিখন ও সৃষ্টির প্রতি বিশ্বাস রাখা। ম্যাগনাম যখন আমাকে সদস্যপদের প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন আমি নিজেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা মহান আলোকচিত্রী বলে ভাবিনি। আজও যখন আমি নিজের ছবিগুলো সম্পাদনা করি, তখন সেগুলোকে কোনও এক নবীনের দৃষ্টিতে দেখি, একজন শিক্ষানবিশের চোখে।

প্রসঙ্গক্রমেই বলি, সঙ্গীত আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পর আমার প্রথম কাজ হলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা। আমার ভেতরে সঙ্গীত এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আমি যখন ছবি তুলি, বিষয় যাই হোক না কেন, সেই সঙ্গীত ছবির মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। দৃশ্যগুলো আমার সামনে যেন একেকটি পরিবেশনার মতো আবির্ভূত হয়। ছোটবেলায় আমি সঙ্গীতশিল্পী হতে চেয়েছিলাম। তাই ফটো সাংবাদিক হওয়ার পর আমি ভারতীয় মহান শিল্পীদের কনসার্টে যেতে শুরু করি। রবি শংকর, বিসমিল্লাহ খাঁ, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া…তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। মঞ্চে পরিবেশনের সময়, অনুশীলনের সময় কিংবা বিশ্রামের মুহূর্তে সেই মহারথীদের ছবি তুলতাম, যেন তাঁদের সঙ্গীতের কিছু অংশ আমার ছবির মধ্যে ধরে রাখতে পারি।


দেখুন, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে যেন দু’জন মানুষ বাস করে। একজন অনুভব করে, আরেকজন চিন্তা করে—যাকে আমরা মস্তিষ্ক বলি। কেউ যখন কোনও কাজ করে তখন তা হৃদয় থেকে উৎসারিত হলে ভাল। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা যেহেতু প্রোগ্রাম করা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছি, তাই সৃষ্টির সময়ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মস্তিষ্ককেই ব্যবহার করি। ফলে সব ছবিই প্রায় একরকম হয়ে ওঠে; সুন্দর, পূর্বানুমেয়, অথচ শিল্পবিরোধী। একটি ছবিকে শিল্প হয়ে উঠতে হলে তার ভেতরে শক্তি, সতেজতা ও আত্মার স্পর্শ থাকতে হয়। তাই আমাদের মস্তিষ্ককে ‘কুরবান’ করতে হবে, আবর্জনা ঝেড়ে ফেলতে হবে এবং অজানার পথে প্রবেশ করতে হবে। পৃথিবীকে দেখতে হবে অন্তর্দৃষ্টির আলোয়।

আমরা যাকে ‘মন’ নামের বিশাল কম্পিউটার বলি, সেখানে যদি নীরবতা না থাকে, তাহলে সেখানে কোনো স্বচ্ছতা প্রবেশ করতে পারে না। আমরা ক্রমাগত আমাদের মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা যখনই কিছু করতে চাই, সে বলে, “এটা ঠিক, ওটা ভুল।” সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো এই মন। এটিকে আপনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। আপনার সামনে থাকা পরিস্থিতিকে সরাসরি উপলব্ধি করতে চাইলে আপনার দৃষ্টিকে হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের চোখ বা দৃষ্টি যদি মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বা মনের কাছে বাঁধা থাকে, তখন আবেগপ্রবণতা ও অতীত-অভ্যাসের প্রভাব সেখানে প্রাধান্য পায়। কিন্তু আপনি যদি বর্তমানে, এই মুহূর্তে, অবস্থান করেন, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক।

আমি একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ। আমি যেমন খ্রিস্টের কাছে সাহায্য চাইতে পারি, তেমনি আল্লাহও আমাকে রক্ষা করবেন—এই অনুভূতি নিয়েই আমি বেঁচে থাকি। কেন জানেন? কারণ আমার ধর্ম হলো আলোকচিত্র। এটি আমার কাছে পবিত্রতম ধার্মিকতার এক সাধনা। এর বাইরে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি যখন নামাজে দাঁড়ান কিংবা মন্দিরে প্রবেশ করেন, তখন চোখ বুজে হৃদয়ের গভীরতা দিয়ে এক মহাশক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। আমিও সেই একই ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে ছবি তুলি, যেন আমার হৃদয় প্রকৃতির দিকে এক ঐশী শক্তি প্রেরণ করে, আর প্রকৃতি তখন আমার জন্য নাচতে শুরু করে।

অনেকেই জানতে চান, নবীন আলোকচিত্রীদের জন্য কোনও পরামর্শ আছে কী-না। আমার মনে হয়, অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জড়ানোটা বাদ দিতে হবে। ভালো ছবি পাওয়ার জন্য লড়াই করা নয় বরং নদীর মতো প্রবাহিত হওয়া, প্রেমময় মানুষের মতো বেঁচে থাকা, এসবের মধ্যে দিয়েই ঐশ্বরিক শক্তি এসে ধরা দেবে। একবার এক মোহনীয় সঙ্গীতসন্ধ্যার পর আমি সরোদ সম্রাট আলী আকবর খাঁ-র কাছে গিয়ে বলেছিলাম, “আপনি আজ অবিশ্বাস্য বাজিয়েছেন।” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি তো বাজাইনি। ঈশ্বর এসেছিলেন, তিনিই বাজিয়েছেন।” ভারতের আরেকজন মহান শিল্পী সৈয়দ হায়দার রাজা বলতেন, “আমি একটি বড় ক্যানভাস নিই, তাতে লাল রং চড়াই, তারপর অপেক্ষা করতে থাকি, কারণ ঈশ্বর এখনও এসে পৌঁছাননি।” এই ‘ঈশ্বর’ তাহলে কী? যা কিছু চেতনার ও জ্ঞানের সীমার বাইরে, যেখানে মহৎ শিল্প ও জাদুময়তার জন্ম হয়, সেই অদৃশ্য শক্তিই ঈশ্বর।

একজন চিত্রশিল্পী তার দৃশ্যপটের সঙ্গে মানিয়ে আকাশকে সবুজ রঙে আঁকতে পারেন। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো রঙ মিশিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু আমরা যখন রঙিন আলোকচিত্র তুলি, তখন কিছুই পরিবর্তন করতে পারি না, চাই সে রঙগুলো মিলুক বা না মিলুক। কেউ প্রশ্ন তোলে না কেন একজন শিল্পী আকাশকে সবুজ এঁকেছেন, কিন্তু আমরা আলোকচিত্রীরা যদি তেমন কিছু করি, তখন আমাদের বিরুদ্ধে বিকৃতির অভিযোগ ওঠে। ফলে একটা ছবিকে সাদা-কালোতে রূপান্তর করে রঙের এই কোলাহলকে দূরে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। তখন সুরগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, তাতে পরিস্থিতি বা মনের অবস্থা যেমনই হোক না কেন। সেজন্য আমার সবসময়ই মনে হয়, কাজের সময় কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে যাওয়া উচিত নয়। আপনি যদি আবেগের রঙে রাঙা হয়ে পড়েন, হোক সে দুঃখ, লজ্জা বা আনন্দ, সেই আবেগ আপনার কাজে প্রতিফলিত হবেই। একজন প্রতিবেদক বা আলোকচিত্রীর কাজ হলো সত্যকে ধারণ করা এবং তা প্রতিফলিত করা। একটি পরিস্থিতিতে যা সত্যিই ঘটছে, তা সে আবেগগত হোক বা রাজনৈতিক, ক্যামেরা সবসময় আপনার পাশে থাকবে, সমর্থন দেবে।

জীবন আমাদের নানান কিছু শেখায়। তবে জীবনে কখনো এমন ধারণা লালন করা ঠিক না, যে, আমি বা আপনি পৃথিবীকে বদলে দিতে পারব। আপনি বা আমি যা করতে পারি, তা হলো হয়তো তাকে সামান্য ঠেলে এগিয়ে দিতে পারি। আমাদের পৃথিবী এমন কোনো ত্রাতার অপেক্ষায় নেই, যে এসে তার প্রাণ সঞ্চার করবে। আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, তার দিকে নজর রাখুন। যুদ্ধ, উন্মাদনা, উগ্রতা থেকে আমরা কী শিখেছি? পৃথিবী ক্রমশ আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে। ট্রাম্পকে দেখুন, পুতিনকে দেখুন। তারা কী কিছু শিখেছে?

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে