স্ট্রিট ফটোগ্রাফি

0
1036

স্থির চিত্র বৈচিত্র্যময়। ধরণভেদে স্থির ছবির ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়েছে—ফটো সাংবাদিকতা, ওয়াইল্ড-লাইফ ফটোগ্রাফি, স্পোর্টস ফটোগ্রাফি, ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি; এরকম অনেকগুলো শাখা-প্রশাখার মধ্যে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি একটি শাখা।

‘স্ট্রিট ফটোগ্রাফি’, যাকে বলা যায় ঘরের বাইরের রাস্তার ছবি, যেখানে সাধারণ মানুষ চলাফেরা করে বা অবস্থান করে। তবে, স্ট্রিট ফটোগ্রাফি শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না— পার্ক, স্টেশন, কিংবা, যেখানে মানুষের সমাগম আছে, তেমন স্থানের প্রাত্যহিক জীবনের মুহূর্তকেও স্ট্রিট ফটোগ্রাফি বলা যেতে পারে।

সেন্ট্রাল পার্ক জু, নিউইয়র্ক সিটি — ১৯৬৭, আলোকচিত্রী: গ্যারি উইনোগ্রান্ড

রাজনৈতিক সমাবেশ বা সংঘাতের রাস্তার ছবি হলেও এটা ফটো সাংবাদিকতা। একটা ছবি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি হয়ে ওঠার জন্য কিছু শর্ত কাজ করে। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির নিজস্ব ডিসকোর্স আছে,সংজ্ঞা আছে যা নিজেকে আলাদা করে অন্য সকল ফটোগ্রাফির শাখা থেকে জন্য প্রয়োজন হতে পারে সঠিক চোখ, যা নিত্যকে আলাদা করে অন্য সকল ফটোগ্রাফির শাখা থেকে। ছবি দেখলে আমরা বুঝতে পারি কোনটি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি আর কোনটি নয়।

কোনটি স্ট্রিট ফটো আর কোনটা নয়—এই আলোচনা খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয় আলোকচিত্রের উন্নয়নের জন্য। রাস্তায় একটি পোর্ট্রেট ফটোকে পোর্ট্রেট আলোকচিত্র বলা যেতে পারে, আবার রাস্তার বিভিন্ন উপাদান থাকার কারণে ছবিটিকে স্ট্রিট ফটোগ্রাফিও বলা যেতে পারে।

১৯০০ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরা যখন বাজারে আনে, তখনই স্ট্রিট ফটোগ্রাফির সূচনা হয়। তবে ফ্রেঞ্চ ফটোগ্রাফার হেনরি (অঁরি) কার্তিয়ের ব্রেসোঁর গোছানো-পরিপাটি কম্পোজিশনের মধ্য দিয়ে আধুনিক স্ট্রিট ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু। সেই সময় থেকে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ও রঙিন ছবির দুই ধরনের আর্কাইভ দেখতে পাই আমরা স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ইতিহাসে। তবে অবশ্যই নেগেটিভ যুগের স্ট্রিট ফটোগ্রাফি তার উন্নত কালার ও টোনের কারণে ডিজিটাল সময়ের ছবির চেয়ে এগিয়ে থাকবে।

ফ্রান্স। প্যারিস। গার দ’অস্টারলিৎস রেলস্টেশনের কাছে ক্যে সাঁ-বার্নার। ১৯৩২।

ফটো সাংবাদিকতার একটি ছবি দেখলে যেমন একটা সংবাদের আলাপ পাই, স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ছবি দেখলে আমরা রাস্তায় গল্পের আন্দাজ পাই। এবং আমরা জানি, একটি রাজনৈতিক ছবি সময়ের ব্যবধানে গুরুত্ব কমতে পারে বা বাড়তে পারে; স্ট্রিট ফটোগ্রাফির মোমেন্ট থেকে যায়। রাস্তায় চলাচল ও সাধারণ মানুষের প্রত্যেকদিনের জীবন নিয়ে তাই তার ডিসকোর্স সময়ের সাথে সাথে পালটে যায় না। যেমন ২০১৩-২০১৪ সালে যেভাবে শাহবাগ আন্দোলনের ছবির গুরুত্ব ছিল তা ১০ বছর যেতে না যেতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক নতুন ইনফরমেশন যুক্ত হওয়াতে গুরুত্ব কমেছে বলা যায়, কিন্তু একটা স্ট্রিট ফটোগ্রাফি যেটা ৭০ সালে নেওয়া, ২০২৬ এসেও তার বিষয় ও ডিসকোর্স অপরিবর্তনীয় থাকে। এবং আমরা দেখতে পাই ১৯৭০-এর ছবির যে স্থান, তা আর আগের মতো নেই; স্ট্রিট ফটোগ্রাফি রাস্তায় পরিবর্তনশীল স্মৃতি ধরে রাখে।

একজন স্ট্রিট ফটোগ্রাফার রাস্তাকে পাঠ করে, যা সবসময় একটা নাটকীয় আমেজে থাকে। রাস্তায় মুহূর্ত বিস্ময়করভাবে পরিবর্তনশীল, এবং এই পরিবর্তনশীল মুহূর্তের চিত্র স্থির করে দেয় ফটোগ্রাফার। স্ট্রিট ফটোগ্রাফার একজন ভ্রমণকারী, যিনি ভ্রমণে বের হন, এবং একজন ভালো স্ট্রিট ফটোগ্রাফারের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে না ও ফেরার তাড়াও থাকে না।

অন্যান্য ফটোগ্রাফি শাখার মতো স্ট্রিট ফটোগ্রাফিও রাস্তায় লাইট, ফর্ম, শেইপ, স্পেস এবং ছবির বিষয়বস্তু মিলিয়ে তৈরি হয়। ছবির বিষয় ছবিকে স্বকীয় করে তোলে। স্ট্রিট ইমেজ বিভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে পাঠকের মনে। এবং আমরা জানি একটা ছবিতে যে রসবোধ থাকে সেটাই পরিপূর্ণ করে তোলে ছবিকে। আর এই রসবোধের ব্যাপারে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি খুবই ভিন্ন প্রণোদনা দেয় মনকে। কখনো কোনো ছবি ‘ডার্ক হিউমার’ কোনো ছবি ‘সোশ্যাল কন্ট্রাস্ট’-এ পরিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো ছবি শুধু কম্পোজিশন দিয়ে রহস্য তৈরি করে, যার সমাধান খুঁজতে আমরা বাধ্য হই।

প্রত্যেকটা ফটোগ্রাফি শাখার একটা নিজস্ব ভাষা আছে। স্ট্রিট ফটোগ্রাফিরও একটা ভাষা আছে, যা ইউনিভার্সেল। একটা ছবি কীভাবে কম্পোজ করলে সেই ইউনিভার্সেল ভাষার সঙ্গে মিলতে পারে, তার একটা ভিজ্যুয়াল গাইডলাইন আছে, যা তৈরি হয়েছে ফটোগ্রাফির আর্কাইভ থেকে। বিশেষ করে রাস্তার বিষয় ও রাস্তায় মানুষদের শ্রেণি সবখানেই এক; স্ট্রিট ফটোগ্রাফার ঠিক করে বিষয় ও ফ্রেমকে সে কীভাবে ব্যবহার করবে।

স্ট্রিট ফটোগ্রাফার রাস্তায় মধ্যে যে জড় ও অজড় কাঠামো থাকে, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে। কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তকে থামিয়ে দিয়ে সে একটা ছবি ক্যাপচার করে। এক্ষেত্রে তাকে স্পেসের জ্যামিতি, বিষয়, আলোসহ অনেককিছুর খেয়াল রাখতে হয়।

পৃথিবীর সব ধরনের স্ট্রিট ফটোগ্রাফির একটা ইউনিভার্সেল টোন আছে, তবে ছবি আলাদা হয় তার ভূগোলের কারণে ও মানুষের আচারের ভিন্নতার কারণে। আমেরিকার রবার্ট ফ্রাঙ্কের ছবি আমেরিকার জিওগ্রাফি ও মানুষ নিয়ে; সেই ছবি আমাদের উপমহাদেশের স্ট্রিট ফটোগ্রাফার রঘু রাইয়ের ছবির সঙ্গে একদম মিলবে না। কারণ দুই দেশের ভূগোল ও মানুষ আলাদা। এবং আপনি দেখবেন রঘু রাইয়ের স্ট্রিট ফটোগ্রাফির মধ্যে যে নীরবতা ও আধ্যাত্মিকতা, তা রবার্ট ফ্রাঙ্কের আমেরিকান সিরিজের মধ্যে পাবেন না। সেখানে বরং পাওয়া যাবে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ কিংবা রুক্ষ বাস্তবতা। এই ভিন্নতার ভূগোলে ফটোগ্রাফারকে তার মানসিক কৌশল দিয়ে নির্ণয় করতে হবে তিনি কি ক্যাপচার করবেন, আর কি দেখাবেন তার দর্শককে। গ্রাম থেকে শহর—রূপান্তর হওয়ার যে আখ্যান তার একজন গুরুত্বপূর্ণ দর্শক ও সংরক্ষণকারী স্ট্রিট ফটোগ্রাফার।

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে