১৯৮৬ সালের ২৪ আগস্ট বাংলাদেশে একটি চলচ্চিত্র সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম।’ ‘মুক্ত চলচ্চিত্র, মুক্ত প্রকাশ’— হলো যার স্লোগান। আজকের দিনের আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারাই এ-সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তখনকার দিনে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এক একজন চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী ও তরুণ নির্মাতা।
সংগঠনটির সাথে জড়িত থাকা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, এনায়েত করিম বাবুল, তারেক শাহরিয়ার, শামীম আক্তার, মানজারে হাসিন মুরাদ, ইয়াসমিন কবির, নূরুল আলম আতিক, জাহিদুর রহিম অঞ্জন, রাশেদ চৌধুরী প্রমুখ। তাঁদেরকে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পেছনে সাহস-উদ্দীপনা যুগিয়েছেন সবার অগ্রজ ও অনেকের শিক্ষাগুরু চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবির।
নির্মাতাদের নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা ছিল সংগঠনটি তৈরির উদ্দেশ্য। আবার সৎ-সুস্থ ও প্রগতিশীল চলচ্চিত্রধারাকে সমুন্নত রেখে কুরুচিপূর্ণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করাও এর আরেক উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনে নিবিড়ভাবে কাজ করছে সংগঠনটি।
২০১৬ সালে সংগঠনটি ৩০ বছরে পদার্পণ করে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুইদিন ব্যাপী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রথম দিন (২৬ আগস্ট) জাতীয় চিত্রশালায় দুপুরে ছিল স্মৃতিচারণ পর্ব। এ সময় চলচ্চিত্র নিয়ে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সংগ্রাম, সাফল্য ও লড়াইয়ের গল্প বলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা নির্মাতারা।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তানভীর মোকাম্মেল সেদিন বলেন, আশির দশকের প্রথম দিকে শুরু হয় বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র তৈরির আন্দোলন। শুরুর দিকে অনেক কিছুই গ্রহণযোগ্যতা পেতো না। এফডিসিতে এই দৈর্ঘ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুমতি ছিলো না। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আর্থিক অবস্থাও তেমন ভালো ছিলো না। অনেক সময় সন্দেহ হতো সংগঠনটি টিকে থাকবে কি-না। এতো কিছুর মধ্যেও তিন দশকে এসেছি, এটা আমাদের কাছে এক ধরনের প্রাপ্তি। তিনি আরও বলেন, এখনও অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেকে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে। তবে অধিকাংশই ফোরামে যুক্ত হয়নি। আমার মতে, শর্টফিল্ম ফোরাম হলো একটি চেতনার নাম।
অনুষ্ঠানে মানজারে হাসিন মুরাদ বলেন, আমি আর মোরশেদ একটি অফিস থেকে দিনের শুরুতে ক্যামেরা চুরি করে কাজ করে আবার দিয়ে আসতাম। এভাবে আমরা শর্টফিল্ম তৈরি করার চেষ্টা করেছি। সে সময় শর্টফিল্ম তৈরির যোদ্ধারা মিলে মিছিল করে স্লোগান দিয়ে সেই কাজগুলো করার অনুমতি আদায় করি। তরুণ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা কোনো না কোনোভাবে আমাদের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে চায় না।
তারপর বক্তব্য রাখেন মোরশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে চলচ্চিত্র আন্দোলন হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। শুরুতে আমরা আশ্রয় নিলাম আলমগীর কবির ভাইয়ের কাছে। তিনি আমাদেরকে অনেক সাহস যোগাতেন। আমি তৈরি করি ‘আগামী’। প্রথমে পাবলিক লাইব্রেরিতে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী করি। এরপর সেই ছবিটি যায় দিল্লির একটি চলচ্চিত্র উৎসবে। সাবটাইটেল ছিলো না বলে দেখানো সম্ভব হলো না। সে সময় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সাবটাইটেল রাখতে হলে বিশ হাজার টাকা লাগতো। খুব কষ্ট করে আজকের জায়গাটা প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা।
বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের সর্বদা একটা প্রতিবাদী অবস্থান ছিল এবং তারা সেই প্রতিবাদী অবস্থানটুকু সুপ্রচেষ্টার মাধ্যমে সবসময় ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এছাড়া তাদের অবস্থান সবসময় মৌলবাদবিরোধী। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
প্রতিটা স্বাধীন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাকেই নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে প্রতিনিয়ত হাঁটতে হয়। কখনো চিত্রনাট্য ও কলাকুশলী তৈরি থাকে। কিন্তু টাকার অভাবে আর শ্যুটিং শুরু করা যায় না। কখনো বা শ্যুটিং শুরু হলেও তা মাঝপথে আটকে থাকে। শ্যুটিং শেষ তো আর্থিক কারণে পোস্টের কাজ আটকে গেল। নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় প্রদর্শন নিয়ে। বেশ কয়েকজন তরুণ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতার ‘শর্টফিল্ম’ এবং ‘ডকুমেন্টরি’ দেশ-বিদেশের বহু চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়, এখানকার কয়জন দর্শককে সেগুলো দেখানো গেল?
প্রতিষ্ঠানটির নির্মাতাদের হাত ধরে এ পর্যন্ত বহু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর সবগুলো চলচ্চিত্রই যে সফল, এমনটাও দাবি করা সমীচীন হবে না হয়ত। তবে চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণে নির্মাতাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল বাঙালি জাতিসত্তাকে প্রাধান্য রাখার। মাটি ও মানুষের ছন্দ আর তাদের যাপিত জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার। মানুষও এসব চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছে এবং সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এসব চলচ্চিত্র অর্জন করেছে অনেক মানসম্পন্ন পুরস্কার। এতে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন। সংগঠনটির দাবির মুখে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ‘ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ গঠন করে দেন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান চালু করার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে তিনি তা বাস্তবায়নও করেছেন।
প্রতিটা স্বাধীন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাকেই নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে প্রতিনিয়ত হাঁটতে হয়। কখনো চিত্রনাট্য ও কলাকুশলী তৈরি থাকে। কিন্তু টাকার অভাবে আর শ্যুটিং শুরু করা যায় না। কখনো বা শ্যুটিং শুরু হলেও তা মাঝপথে আটকে থাকে। শ্যুটিং শেষ তো আর্থিক কারণে পোস্টের কাজ আটকে গেল। নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় প্রদর্শন নিয়ে। বেশ কয়েকজন তরুণ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতার ‘শর্টফিল্ম’ এবং ‘ডকুমেন্টরি’ দেশ-বিদেশের বহু চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়, এখানকার কয়জন দর্শককে সেগুলো দেখানো গেল? এটা ভেবেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্যোক্তা হয় বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। ১৯৮৮ সাল থেকে তারা সেই চলচ্চিত্র উৎসব করে আসছে। দুই বছর অন্তর অন্তর আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবটি হয়। এটি শুধু বাংলাদেশেই না, উপমহাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব।
উৎসবটিতে ৩ হাজার ৮৬২টি চলচ্চিত্র জমা পড়েছে। বাছাই কমিটি বাংলাদেশসহ ১৩০টি দেশের ৪১৪টি চলচ্চিত্র নির্বাচিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বুসান, কান, বার্লিন, অস্কার, সানড্যান্স, লোকোর্নো-এর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ৬০টিরও বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
এরই ধারাবাহিকতায় ‘১৬তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব-২০২২’ উদযাপিত হয়। ২০২২ এর ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত আয়োজিত হয় উৎসবটি।

উৎসবটিতে ৩ হাজার ৮৬২টি চলচ্চিত্র জমা পড়েছে। বাছাই কমিটি বাংলাদেশসহ ১৩০টি দেশের ৪১৪টি চলচ্চিত্র নির্বাচিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বুসান, কান, বার্লিন, অস্কার, সানড্যান্স, লোকোর্নো-এর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ৬০টিরও বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

মূল ভেন্যু শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তন ও চিত্রশালা মিলনায়তন। প্রতিদিন বেলা ১১টা, ৩টা, বিকাল ৫টা ও সন্ধ্যা ৭টায় মোট ৪টি প্রদর্শনী চলে এ ভেন্যুতে। এছাড়াও জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১ ও ২ মার্চ বিকাল ৪টা ও ৬টায় দুটি করে প্রদর্শনী হয়। বিশেষ এই প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ প্যানোরমা’ শিরোনামে আয়োজিত হয়। এখানে বাংলাদেশের বাছাই করা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশ প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদের সহযোগিতায় এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। একই ভেন্যুতে ২ মার্চ (বুধবার) ভারতের চিত্রগ্রাহক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা আর.ভি. রামানির রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শিত হয়।
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ের তরুণ বিকল্পধারার নির্মাতারাও কম নয় কোনো অংশে। পৃথিবীব্যাপী অনেক নামীদামি চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁদের ছবি বিজয়ী হয়েছে। সেইসব ছবিগুলো ‘১৬ তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’য়েও প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে। অনেকগুলো পুরস্কারও পেয়েছে। বন্ধু-বান্ধব, দলবল, পরিবার নিয়ে অনেকেই এসেছেন এইসব চলচ্চিত্রগুলো একবারের জন্য প্রদর্শনীতে দেখতে। এই উৎসবের বাংলাদেশের কয়েকটি চলচ্চিত্র সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হলো:

আইনের দরজায় (Before the law)
ফ্রান্ৎস কাফকা’র উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’ এর একটি প্যারাবোল ‘বিফোর দ্য ল্য’ অবলম্বনে নির্মিত হয় ‘আইনের দরোজায়’ নামক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি। দূরগ্রাম থেকে বেশ কিছু যৌক্তিক দাবি নিয়ে আসা একজন ব্যক্তি আইনের দরজা দিয়ে প্রবেশের অপেক্ষায় প্রহর গোনেন। কৃষকদের ন্যায্য পাওনার কথা, তার মনের হাহাকারের কথা কিংবা সমাজের বুদ্ধিজীবীদের প্রহসনের কথা সবই তিনি প্রকাশ করতে চান। চান এর সুষ্ঠু সমাধানও। কাঠামোর ফেরে পরে নিজের সব দিয়ে তিনি কাঠামোর ভিতকেই শক্ত করে যান। কিন্তু সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার পরও তাঁর বক্তব্য কাঠামোর কানে পৌঁছায় না। ‘আইন’ এখানে সামগ্রিক ব্যবস্থার বা কাঠামোর একটি রূপক। যেখানে চলচ্চিত্রে দেখানো হয় রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আদর্শিক সম্মতি তৈরি করতে থাকে, যা অন্যদিকে কর্তৃত্বের ভিতকে শক্তিশালী করে। নির্মাতা সাইয়্যিদ শাহজাদা আল কারীম বলেন, যেকোনো আর্টফর্মেই বিশেষ করে সিনেমার কথা যদি বলি ফিল্মমেকারদের একটা দায়িত্ব থাকে যে তিনি যেই সময়টাতে বিলং করেন, চলচ্চিত্রে সেই সময়ের একটা প্রভাব বা উপস্থাপন থাকা। সচেতন নির্মাতা হলে কিছুতেই তার সময়কে উপেক্ষা করে কাজ করার সুযোগ নেই। আমিও তাই করেছি। যদিও আমার সিনেমা কাফকার আগের একটা চিন্তা থেকে, প্যারাবল থেকে নির্মাণ করা। তবুও সূক্ষ্মভাবে তাকালে তিনি যে কথাগুলো বহুবছর আগে বলে গেছেন, তা এখনো আমাদের রাষ্ট্রের সাথে বা সমাজ কাঠামোর সাথে একদমই মিলে যায়। তিনি তাঁর চিন্তাটা গল্পের ভিত্তিতে বা ন্যারেটিভের ভিত্তিতে বলে গেছেন। আর আমি তাঁর চিন্তাটাকে আমার সমাজের social context বা political context এর ভিওিতে পুনঃনির্মাণের চেষ্টা করেছি।

গিত্তাল মি আচ্ছিয়া (AS THE GRAIN RISES)
মান্দি বা গারো সম্প্রদায়ের আদি ধর্মের নাম ‘সাংসারেক’। সাংসারেক অনুসারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি জনিক নকরেক। বলা চলে তিনি সাংসারেক ধর্মের শেষ পুরোহিত। যৌবনে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে মধুপুর শালবনের প্রাচীন গ্রাম চুনিয়ায়। চুনিয়াই ছিল তাঁর পৃথিবী। তাঁর পৃথিবী তাঁর মতো করে বিস্তৃত করে গেছেন গ্রামবাসী থেকে শুরু করে দেশে ও দেশের বাইরের অগণিত শ্রেণি- পেশা-ধর্ম-বর্ণ-জাতির মানুষের মধ্যে। উন্মুক্ত সংহতির এই জ্ঞানবলয়ে জনিক নকরেক পেয়েছেন দার্শনিকের মর্যাদা। জনিক নকরেকের এই দার্শনিক জায়গাটা এবং লুপ্তপ্রায় সাংসারেক ধর্মের সাথে প্রকৃতি ও একটি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতির একাকার হয়ে যাওয়াটাকে ধরতে চেয়েছেন প্রামাণ্যচিত্রকার আসমা বীথি।
পরিচালনা ছাড়াও তিনি প্রামাণ্যচিত্রটির অন্যতম চিত্রগ্রাহক ও গবেষক। মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে সিনেমাটোগ্রাফিতে। জনিক নকরেকের ঝরাপাতা মাড়িয়ে শালবন ধরে হাঁটার দৃশ্যটা চোখে আটকে থাকার মতো। সংগীতে মান্দি জনগোষ্ঠীর গান, নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ও সুরের সঙ্গে বনের বাতাস, পাতার মর্মর শব্দ ব্যবহার অনবদ্য। নির্মাতা বলেন, ‘গিত্তাল মি আচ্ছিয়া’ এই শিরোনাম মান্দি ভাষায় নামকরণ করা হয়েছে। এর ইংরেজি করা হয়েছে ‘AS THE GRAIN RISES’. চলচ্চিত্রটিতে আমরা দুটি ভাষা ব্যবহার করেছি। কারণ এঁরা মান্দি ভাষাভাষীর হলেও বাংলা তাঁদের চর্চার অংশ। এছাড়া ইংরেজি সাবটাইটেল তো আছেই। আরো বলেন, সাংসারেক ধর্ম এখন বিলুপ্তপ্রায়। এখানে আসলে ধর্ম মূল বিষয় নয়। সাংসারেক ধর্মকে কেন্দ্র করে গারো সম্প্রদায়ের যে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি— এগুলোকে সম্পর্কিত করতে চেয়েছি। কেন্দ্রীয় চরিত্র জনিক নকরেক এখন আর বেঁচে নেই। ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে আমাদের সেই ইচ্ছেই ছিল ইতিহাস ধরে রাখা, সংরক্ষণ করা।

মাটিশ্বর (the spirit of clay)
মাটি হলো পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম নিদর্শন। আর প্রথম বিজ্ঞান হলো সে মাটি দিয়ে কাজ। আর সেটা যখন শিল্পের পর্যায়ে পড়ে, তখন তা মৃৎশিল্প। আবহমান বাংলায় এই মৃৎশিল্পের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে কুমার বা কুম্ভকার। প্রাচীনকাল থেকেই এই শিল্পের সাথে জড়িত হিন্দু সম্প্রদায়ের পাল বর্ণের লোকেরা। পালরা মাটি দিয়ে কঠোর পরিশ্রমে সুনিপুণ হাতে তৈজসপত্র তৈরির মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এদের জীবনকাহিনী নিয়েই নির্মিত এ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি। ‘মাটিশ্বর’ নির্মাণের পেছনের গল্প জানিয়ে নির্মাতা চৈতন্য রাজবংশী বলেন, তথ্যচিত্রটি নির্মাণের সময় চিত্র ধারণ করার জন্য ক্যামেরা ছিল না। ব্যবস্থা করার মতো কোন উপায়ও ছিল না। কিন্তু এইসব মানুষের জীবনপ্রবাহ এবং তাদের সংগ্রামের কথাগুলো ফ্রেমে বন্দি করার জন্য প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠে। তাই হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়েই শুরু করতে হয় চিত্রধারণের কাজ। ছোটবেলা থেকেই কুমারদের আমি দেখে আসছি। মাটির সাথে তাদের অস্তিত্বের জীবনচিত্র। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় তাদের। এভাবেই রচিত হয় তাদের জীবনপ্রবাহ। মাটিই যেন হয়ে উঠে তাদের ঈশ্বর। এই মাটির স্বরূপসন্ধান করতেই আমার এই কাজ।
নির্মাতা নেহেরু রঞ্জন সরকার বলেন, ক্যামেরা ছিলো আমার এই সিনেমার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আমি সিনেমায় কোনো ক্যামেরাই ব্যবহার করিনি। আমাকে এই সিনেমাটা প্রায় ছয় মাস ধরে শ্যুট করতে হয়েছে। যার পুরোটাই আমি মোবাইল দিয়ে শ্যুট করেছি। ক্যামেরাকে প্রতিবন্ধকতা বলার কারণ হলো আমি যদি ক্যামেরা নিয়ে এই সিনেমাটি শ্যুটিং করতে যেতাম তাহলে আমি সিনেমাটি শেষ করতে পারতাম না। ক্যামেরার সামনে আমার সিনেমার চরিত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে তাদের কাজ করতে পারতো না।

ওয়ার্ক (ইয়ার টু ইয়ার)
হাওরের একটি ছোট্ট পরিবারকে কেন্দ্র করে এই সিনেমা এগিয়ে যায়। হাওর অঞ্চল বছরের অর্ধেক সময়ই পানিতে নিমজ্জিত থাকে। যখন পানি থাকে তখন হাওরের গ্রামগুলো হয়ে যায় একেকটা ছোট্ট দ্বীপের মতো। হাওরের কৃষি নির্ভর পরিবারের মানুষদের থাকে না কোনো কর্মব্যস্ততা। সবাই এক প্রকার অলসজীবন পার করে। একসময় হাওরের পানি শুকিয়ে যায়। আর তখনই হাওর হয়ে ওঠে কর্মচঞ্চল। হাওরের প্রধান ফসল ধান। হাওর থেকে পানি চলে যাওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় এই ধান উৎপাদন প্রক্রিয়া। হাওরের কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর মধ্যে তখন দেখা যায় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। হাওরের শুকনো মৌসুমের কাজগুলো নিয়েই এই সিনেমা ওয়ার্ক (ইয়ার টু ইয়ার)। নির্মাতা নেহেরু রঞ্জন সরকার বলেন, ক্যামেরা ছিলো আমার এই সিনেমার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আমি সিনেমায় কোনো ক্যামেরাই ব্যবহার করিনি। আমাকে এই সিনেমাটা প্রায় ছয় মাস ধরে শ্যুট করতে হয়েছে। যার পুরোটাই আমি মোবাইল দিয়ে শ্যুট করেছি। ক্যামেরাকে প্রতিবন্ধকতা বলার কারণ হলো আমি যদি ক্যামেরা নিয়ে এই সিনেমাটি শ্যুটিং করতে যেতাম তাহলে আমি সিনেমাটি শেষ করতে পারতাম না। ক্যামেরার সামনে আমার সিনেমার চরিত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে তাদের কাজ করতে পারতো না। আশেপাশে থেকে লোকজন জড়ো হয়ে আমার সিনেমার পারিপার্শ্বিক সাউন্ডের অবস্থা খারাপ করে দিতো। মোবাইল দিয়ে শ্যুট করার কারণে কেউ বুঝতেই পারেনি যে আমি কোনো সিনেমার শ্যুটিং করছি।

ফ্লাইং চাইল্ড (flying child)
বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশুরা চরম দারিদ্র্য, অপুষ্টি, রোগ, নিরক্ষরতা ও সহিংসতাসহ নানা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এ শিশুদের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন (৩০ শতাংশের বেশি) জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন ঘুমানোর জন্য বিছানা এবং নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় এমন একটি ঘর থেকেও বঞ্চিত। তারা পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরো বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে। প্রায় ৭ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ একা ঘুমায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু কয়েকজন একসঙ্গে মিলে ঘুমানোর মাধ্যমে সুরক্ষা ও স্বস্তি খোঁজে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার প্রতি তিনটি ঘটনার একটি (৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) রাতে তাদের ঘুমের সময় ঘটে থাকে। এতটুকু মানবেতর জীবন হলেও তারা বাঁচতে চায়। তাদের জীবন পরিবর্তন হবে এমন অনেক শিশুই স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নগুলো, আকাঙ্ক্ষাগুলো, আক্ষেপগুলোকে নির্মাতা অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির মাধ্যমে তথ্যচিত্রটিতে বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে ফ্লাইং চাইল্ডের পরিচালক ফজলে রাব্বী জানান, আমি একটা সময় ডেইলি লাইফ ফটোগ্রাফি করার জন্য স্টেশনে যেতাম। ওখান থেকেই এই ছবির কনসেপ্টটা জেনারেটেড হয়। একটা বাচ্চা একটা স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যাচ্ছে without any reason পাখির মত করে যেন এক ডাল থেকে অন্য ডালে। এজন্যেই পথশিশু ও বাচ্চাগুলোকে আমি ‘ফ্লাইং চাইল্ড’ বলেছি। ওর জীবন, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, না-পাওয়া ওসবের কথা বলেছি।
এখানে কাজ করতে গিয়ে এই জনগোষ্ঠীকে খুব কাছ থেকে দেখছি। আমাদের সমাজ ওদের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। আগে সমাজের এই অজ্ঞতাটাকে দূর করতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি ওদের যারা extreme violence এর শিকার তাদের আর্তিটাকে তুলে ধরতে
অদম্য (Stalwart)
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিমুহূর্তেই বৈষম্যের শিকার হয়। এমনকি পরিবারের কাছেও ওদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে যায়। শিক্ষার সুযোগ কারো ঘটলেও কিশোর বয়সেই তা থেমে যায়। সহপাঠী আর শিক্ষকদের অসহযোগিতা বা কখনো নির্যাতনের কারণে। তবুও সব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা দমে যায় না। তাদের রোজকার যুদ্ধটা চালিয়ে যায় নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। মনের ভেতর চুরমার করা হাজারটা হাহাকার নিয়েও তারা বাঁচার সংগ্রামটা করে। এই ডকুমেন্টারিতে এমন কজন অদম্য হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার, ট্রান্সম্যান, ট্রান্সউইম্যানদের জীবন সংগ্রামটাই তুলে ধরা হয়েছে। নির্মাতা রুহুল রবিন খান বলেন, আমি একটা অর্গানাইজেশনের সঙ্গে কাজ করি। সেখানে বাংলাদেশের তৃতীয় জনগোষ্ঠীর হিউম্যান রাইটস, সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। এখানে কাজ করতে গিয়ে এই জনগোষ্ঠীকে খুব কাছ থেকে দেখছি। আমাদের সমাজ ওদের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। আগে সমাজের এই অজ্ঞতাটাকে দূর করতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি ওদের যারা extreme violence এর শিকার তাদের আর্তিটাকে তুলে ধরতে আর চেয়েছি সারা বাংলাদেশ থেকেই যেন ওদের জনগোষ্ঠীর represent থাকে আমার কাছে। তাই আমি খুলনা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ আরো বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শ্যুট করেছি।
সেটে আমরা সব used materials ব্যবহার করেছি। এর কোনোটাই direct props নয়। আমরা চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের কালচার, হেরিটেজকে স্টপমোশন অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখাতে। স্টপমোশন অ্যানিমেশন নির্মাণে নির্মাতার আলাদা একটা স্ট্রাগল আছে। নির্মাতাকে scene by scene বা shot by shot ছবি তুলতে হয় এতে। আমাদের প্রায় ৫৫০০-৬০০০ ছবি তুলতে হয়েছিল। পুঁথি গানের মাধ্যমে story telling টাও একটু টাফ ছিল। audience খুব ভালো রিয়েকশন দিচ্ছে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বায়োস্কোপ (Bioscope)
‘বায়োস্কোপ’ একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য স্টপমোশন অ্যানিমেশন ফিল্ম। বর্তমানে বৃক্ষনিধনের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবন শহরকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হচ্ছে যা এই চলচ্চিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে। মূলত এখানে বাঙালি গ্রামীণ জীবনের সংষ্কৃতি ও ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পুরাতন পুঁথি পাঠের মাধ্যমে। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় সবকিছুই হারিয়ে গেছে। একসময় একটি বটবৃক্ষকে ঘিরেই মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প গাঁথা ছিল। সময়ের পালাবদলে তা হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সেই বটবৃক্ষও। সবকিছু হারিয়ে গেলেও আমাদের ঐতিহ্যের সেই ভীত রয়ে গেছে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে। সুরে সুরেই রপ্ত হয়েছে সূতোয় গাঁথা বাঙালির সেই ঐতিহ্য। নির্মাতা ওয়াহিদ রাজ বলেন, এটা আসলে একটা set based স্টপমোশন অ্যানিমেশন ফিল্ম। আমরা ৩ বন্ধু মিলে বানিয়েছি। সেট নির্মাণেই আমাদের প্রায় ৩-৪ মাস সময় লেগেছিল। এর আগেও ২-৩ মাস আমরা লাইব্রে্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে রিসোর্স কালেক্ট করি। সেটে আমরা সব used materials ব্যবহার করেছি। এর কোনোটাই direct props নয়। আমরা চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের কালচার, হেরিটেজকে স্টপমোশন অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখাতে। স্টপমোশন অ্যানিমেশন নির্মাণে নির্মাতার আলাদা একটা স্ট্রাগল আছে। নির্মাতাকে scene by scene বা shot by shot ছবি তুলতে হয় এতে। আমাদের প্রায় ৫৫০০-৬০০০ ছবি তুলতে হয়েছিল। পুঁথি গানের মাধ্যমে story telling টাও একটু টাফ ছিল। audience খুব ভালো রিয়েকশন দিচ্ছে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
Prologue (প্রোলগ)
গল্পের মূল ভাবটি ফ্রানস কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ গল্প থেকে অনুপ্রাণিত৷ মেটামরফোসিস গল্পে গ্রেগর সামসার চরিত্রটি করোনার গৃহবন্দী জীবনে কীভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে তাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে এই চলচ্চিত্র জুড়ে। গল্পের শুরুতেই দেখা যায় করোনার বন্দীদশায় প্রচন্ড হতাশাগ্রস্ত জীবনের ঘুম ভাঙে মৃত্যুর মিছিলের ঘোষণা ও তার বাবার নিরাশার আস্ফালন এর দুঃস্বপ্নে। ঘুম থেকে জেগে ওঠা মাত্রই জীবন দেখে কোন এক আশ্চর্য কারণে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটছে তার আশেপাশে যা ক্রমশ তাকে বন্দি করে ফেলছে তার নিজেরই ভেতর। আর এই ঘটনাচক্রেই মেটামরফোসিসের সাক্ষী হয় জীবন। নির্মাতা বিবেক অনুপ নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, কোভিড থাকায় শ্যুটিং সমস্যা হচ্ছিল। আমার বাড়ির উপরের তলায় একটি ফ্ল্যাট খালি ছিল। সেটাকে আমি সেট হিসেবে তৈরি করে আমার টিমকে জানাই। আমরা ভোর ৬ টা থেকে পরেরদিন ভোর ৪ টা পর্যন্ত শ্যুট করি। একটানা প্রায় ২২ ঘন্টা শ্যুট। এটা একটা স্ট্রাগল। কারণ এছাড়া কিছু করার নেই। কোভিডে রাস্তায় যানবাহন ছিল না। একসাথে হওয়াটাই কঠিন। এটা এক কঠিন বাস্তবতা। কাজ তো আরো অনেক পরের ব্যাপার ছিল। কিন্তু এর ভেতরেও আমাদের একাগ্রতা ছিল বলেই কাজটা করতে পেরেছি।

Circle of circles (সার্কেল অব সার্কেলস)
এটা একটা ফিকশনাল স্টোরি। এই চলচ্চিত্রে দুইটি ক্যারেক্টার ব্যবহার করা হয়েছে। একজন ডাক্তার স্বপ্নীল। অন্যজন অলীক। অলীক একজন স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং একা ঘরের বাসিন্দা। গল্পের শুরুতে দেখা যায় অলীক রাতের বেলা স্ক্রিপ্ট লেখে ঘুমিয়ে গেছে। পরদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখে টেবিলে স্ক্রিপ্টে যা লিখেছিল কিছুই নেই, সব ভ্যানিশ হয়ে গেছে। এর কারণ জানতে অলীক ডাক্তার স্বপ্নীলের কাছে যায়। ডাক্তার স্বপ্নীল জানায় এর কারণ একটা হতে পারে–অলীকের ঘুমের ভেতরে এটা হয়েছে। এভাবেই গল্প এগিয়ে যায়। পরিশেষে যা দেখা যায় তা হচ্ছে, একটা dream within a dream মাল্টিপল পারসনের মধ্যে হতে পারে। বাস্তবে তা হয়ত অসম্ভব। তবে সম্ভাব্যতার সম্ভাবনা নিয়ে ফিকশনটা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে নির্মাতা সোহেল শাহরিয়ার বলেন, ‘circle of circles’ এর যে story line টা এখানে বলা আছে, এটা পুরোপুরি কাল্পনিক গল্প। কিন্তু এর মধ্যে ইনসোমনিয়া নিয়ে একটা ছোট্ট মেসেজ আছে। আমরা দেখাতে চেয়েছি ইনসোমনিয়ায় সিরিয়াস আক্রান্ত হলে কী হতে পারে। যদিও কোনো severe problem এখানে দেখানো হয়নি। তবুও ইনসোমনিয়া নিয়ে আমাদের প্রজন্ম যেন সজাগ হয়, সচেতন থাকে, সেটা নিয়ে একটু ভাববার আছে ব্যাপারটাই আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি।

চক্রব্যূহ (The Endless Circle)
সেই পৌরাণিক সময় থেকে শুরু করে আধুনিক সময়েও ধর্ষণ ঘটনা বর্তমান এবং চলছে। গৌতম মুনির বেশ ধরে অহল্যার সাথে দেবরাজ ইন্দ্রের গুপ্ত যৌনলালসা পূরণ কিংবা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ সময়ের পরিক্রমায় রূপ বদলালেও ধর্ষক মানসিকতার পুরুষদের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সেটাকে পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যেতে পারে ধর্ষক পাপাত্মা বারবার খোলস বদলে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে, আসবে। সভ্যতার উন্নতির সাথে মানুষের বহুমুখী পরিবর্তন হলেও ধর্ষণ ঘটনা হাজার হাজার বছর ধরে একইভাবে মানব সমাজে ঘটে যাচ্ছে। যে বৃত্ত ভেঙ্গে আমরা এখনও বের হতে পারিনি আর কবে পারবো সেটা কি আমরা জানি?
এই উৎসব থেকে এইটুকু স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে বিকল্প ধারার ছবি নির্মাণের আগ্রহ ও তৎপরতা বেড়েছে। তারা তাদের ভাষা ও ভঙ্গি দিয়ে বদলে দিতে চাইছে সিনেমার পরিচিত চেহারা। ফিকশন, নন-ফিকশন এখানে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা করছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দিকে তাকালেও দেখা যায়, বিশ্বের স্বনামখ্যাত উৎসবগুলোতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতাদের সিনেমা।
২০২০ সালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে, ‘চক্রব্যূহ’ একটি বিগত ও অনাগত সময়ের আখ্যান। পরিচালক অরুনাভ বিলে জানান, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জন্ম নিয়ে নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। নারীরা তাদের আইডেন্টিটি এবং পোশাকের কারণে ঘরে, চলার পথে এবং কর্মক্ষেত্রে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে যৌন শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! এটা একটা পুরুষতান্ত্রিক দুষ্টচক্র, আর এই যে প্রতিনিয়ত চক্রের ভেতর আবদ্ধ হয়ে বাঁচা, নিগ্রহের শিকার হওয়া এবং বিচারহীনতার অঘটনগুলো প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে ‘চক্রব্যুহ’ তার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। আমাদের সবার মিলে একটি সুশৃঙ্খল এবং সুস্থ মানসিকতার সমঅধিকারের সমাজ গঠনে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে সচেতন হয়ে কাজ করতে হবে।
এই উৎসব থেকে এইটুকু স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে বিকল্প ধারার ছবি নির্মাণের আগ্রহ ও তৎপরতা বেড়েছে। তারা তাদের ভাষা ও ভঙ্গি দিয়ে বদলে দিতে চাইছে সিনেমার পরিচিত চেহারা। ফিকশন, নন-ফিকশন এখানে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা করছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দিকে তাকালেও দেখা যায়, বিশ্বের স্বনামখ্যাত উৎসবগুলোতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতাদের সিনেমা। বিশ্বের নানা দেশের সিনেমার সঙ্গে লড়ে নানান মাত্রার সম্মান কুড়াচ্ছে সেসব ছবি। বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের এতদিনের লড়াই-সংগ্রাম তাই বলা চলে বৃথা যায়নি। বাংলাদেশ আগামীতে আরো বেশি করে এই সংগ্রামের ফল ভোগ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
লেখক: কো-অর্ডিনেটর, প্রেস এন্ড মিডিয়া সেকশন, আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব-২০২২








