(ঋত্বিক ঘটকের দুটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কল্পনা বিশ্বাস, সত্তরের দশকে। ঊনিশশো চল্লিশের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ওপর একটা বড় প্রকল্প নিয়ে তখন কাজ করছিলেন তিনি। এ বাবদে সমস্ত সাক্ষাৎকারই তিনি নিয়েছিলেন ইংরেজিতে। ইংরেজিতেই ১৯৭৬ সালে ‘লেখা’ নামে একটি পত্রিকার পর-পর দুটি সংখ্যায় এ দুটি ছাপা হয়, পরে গ্রন্থিত হয় ‘সাক্ষাৎ ঋত্বিক’-এ (দীপায়ন, ২০০০)। যে-কোন কারণেই হোক এর কোন বাংলা অনুবাদ হয়নি, বা আমাদের তা চোখে পড়েনি।
কল্পনা একজন ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার, মূলত ডকুমেন্টারি ছবি নিয়ে কাজ করেন। সে-সময়ে একই বিষয়ে আরও অনেকের সঙ্গে তিনি কথা বলেছিলেন, তার কিছু-কিছু ছাপা হয়েছে, বাদবাকি সমস্ত নথিপত্রই তিনি দিয়ে যান কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা আজও প্রকাশের মুখ দেখেনি।)
প্রশ্ন: ঘটকবাবু, ছবি তৈরির দিকে আসতে আপনাকে কী-কী বিষয় প্রেরণা যোগাল?
ঋত্বিক ঘটক: বলতে পারো, আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমি চলচ্চিত্রে এসেছি। বাবার ইচ্ছেয় চললে আমার ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হওয়ার কথা। সে-চাকরিও আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য সেটা ছাড়লাম। ওতেই লেগে থাকলে এত দিনে দিব্যি কমিশনার কিংবা অ্যাকাউনট্যান্ট জেনারেল তো হতামই। কিন্তু এখন, আমি এখন রাস্তার কুকুর!
চাকরিটা ছাড়ার পর কিছুদিন কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু দেখলাম ও আমার কম্ম নয়। তারপর কিছুদিন গল্প লিখলাম, তাতে কিছু নামধাম হল। প্রায় শতখানেক গল্প আমার ‘দেশ’, ‘পরিচয়’, ‘শনিবারের চিঠি’র মতো প্রথম সারির পত্রিকায় বেরিয়েছিল। সেই সময় আমি বুঝি যে সাহিত্য মানুষের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে, কিন্তু তা কাজ করে বড্ড ধীরে। ভেতরে শিকড় ছড়াতে তার দীর্ঘ সময় লাগে। কৈশোরে অত ধৈর্য কই, আমি তো চাই তক্ষুনি একটা ছাপ ফেলতে, কারণ আমার তখন মনে হচ্ছে যে জনতাকে এখুনি জাগানো দরকার।
তারপর একটা মিরাকল ঘটল— বলছি আইপিটিএ-র কথা। প্রথমে এল ‘জবানবন্দী’, তারপর বিজন ভট্টাচার্যের বোমা : ‘নবান্ন’। তখন আমি দেখলাম তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগের কথা ভাবলে সাহিত্যের চেয়ে থিয়েটার অনেক বেশি কার্যকর। ফলে আমি গল্প লেখা ছেড়ে দিয়ে নাটক লেখা শুরু করলাম এবং থিয়েটার দল তৈরির নেশায় মেতে উঠলাম।
তারপর আরও একবার আত্মানুসন্ধানের প্রয়োজন হল। সেটা হল মঞ্চে আমার বিরাট সাফল্যের পর। ১৯৫০ সালে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে সমাবর্তনের উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণন, অভিনয়টা ছিল সেই উপলক্ষে। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ করেছিলাম, আর তার প্রধান চরিত্রে ছিলাম আমি। প্রায় আট হাজার লোক দেখেছিল। সে একটা সাংঘাতিক ব্যাপার!
কিন্তু তার থেকে আমি বুঝলাম যে এভাবে আমি বড়জোর দশ হাজার লোকের কাছে পৌঁছতে পারি। এতখানি যৌথ শ্রম খরচ হবে শুধু এইটুকুর জন্য! তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, না, আমি ছবি করব।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আপনার এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে?
ঋত্বিক ঘটক: ফিরে তাকালে মনে হয় না যে চলচ্চিত্রের প্রতি আমার বিশেষ কোন প্রেম আছে। আমার চারপাশের বাস্তবতা নিয়ে আমার যা-কিছু মনে হয় আমি চেয়েছি তা তুলে ধরতে, চেয়েছি চিৎকার করে তা বলতে। এদিক থেকে সিনেমা মনে হয় এখনও আদর্শ মাধ্যম, কারণ একবার ছবির কাজ শেষ হলে তা অসংখ্য লোকের কাছে পৌঁছতে পারে। সে-জন্যই আমি ছবি করি— শুধু ছবির জন্য নয়, বরং মানুষের জন্য। শোনা যাচ্ছে টেলিভিশন দ্রুত এর জায়গা দখল করে নেবে। আরও বেশি লোকের কাছে তা পৌঁছবে। তাই যদি হয় তো আমি ফিল্মকে লাথি মেরে টিভিতে চলে যাব।
প্রশ্ন: এমন কোন বিশেষ প্রভাবের কথা মনে করতে পারেন যা আপনাকে চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠার প্রেরণা যুগিয়েছে?
ঋত্বিক ঘটক: আইজেনস্টাইন-এর ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’, পুদভকিন-এর ‘মাদার’, চেকোস্লোভাকিয়ার ‘ক্রাকাতিত’, অস্কার ভাভরা-র ‘নেমা বারিকাদা’র মতো সব ছবি; আর আইজেনস্টাইনের ‘ফিল্ম ফর্ম’ ও ‘ফিল্ম সেন্স’, পুদভকিনের ‘ফিল্ম টেকনিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাক্টিং’-এর মতো সব বইপত্র। পেঙ্গুইন সিরিজে ইভর মন্তাগুর ফিল্ম নিয়ে লেখাপত্রের সংকলন আর বেলা বালাজ-এর ‘থিওরি অফ দ্য ফিল্ম’— এ সবই আমার চোখের সামনে সম্পূর্ণ এক নতুন জগৎ খুলে দিল। যে-সমস্ত ছবির নাম বললাম, অধিকাংশই তখন এদেশে নিষিদ্ধ ছিল। লুকিয়ে-চুরিয়ে এসব আমরা দেখতাম। ফলে গোটা অভিজ্ঞতাটায় এক ধরনের রোম্যান্টিক দ্যুতির সঞ্চার হয়েছিল। তারপর ভারতে প্রথম ফিল্ম ফেস্টিভালে ইতালীয় নিও-রিয়ালিস্টদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হল। সে আবার এক সম্পূর্ণ নতুন ও চমকপ্রদ জগৎ।
এই সমস্ত ছবি আর বই আমার রুচি তৈরি করেছে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষভাবে আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। কোন স্কুল বা ঘরানাতেই আমি নাম লেখাইনি।
প্রশ্ন: যাঁদের কথা আপনি বললেন, চলচ্চিত্রে উৎসাহীদের মধ্যে আপনার মতে কি তাঁরাই সেরা?
ঋত্বিক ঘটক: এঁরা নিছক উৎসাহী বা অনুরাগী ছিলেন না, উত্তেজক এই নতুন মাধ্যমটার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে দেখায় কমবেশি তাঁরাই পথিকৃৎ। আইজেনস্টাইন, পুদভকিন এবং দভশেঙ্কো চলচ্চিত্রের এক নতুন শৈল্পিক ভাষা আবিষ্কার করেছিলেন। প্রথম দু-জন শুধু চলচ্চিত্রকার ছিলেনই না, ছিলেন দুনিয়ার প্রথম ফিল্ম-তাত্ত্বিকদের অন্যতম। দুনিয়ার যে-কোন ছবি-করিয়ে, বিশেষ করে আইজেনস্টাইনের কাছে ঋণী। তিনি অভিব্যক্তি বা ভাবপ্রকাশের সম্পূর্ণ নতুন এক মাধ্যম আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
প্রশ্ন: চলচ্চিত্র বোধ হয় এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তেজক গণ-মাধ্যম। কিন্তু অল্প কিছু পরিচালকই এর বিপুল সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। কোন্ চিত্র-পরিচালক বা ঘরানা, আপনার মতে, এর মধ্যে রীতিমতো সফল?
ঋত্বিক ঘটক: আমার মতে, সেরগেই য়ুকতেভিচ আর লুইস বুনুয়েল-ই এঁদের মধ্যে মহত্তম। কিন্তু য়ুকতেভিচ সম্প্রতি মারা গেছেন, আর বুনুয়েল এই মহত্তম মাধ্যম নিয়ে চূড়ান্ত বাণিজ্য হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, বিরক্তিতে ছবি করাই ছেড়ে দিয়েছেন। জঁ-লুক গোদার বলেছেন, বুর্জোয়া দুনিয়ায় ফিল্ম করাটা যত দিন না কাগজ-কলমের মতো শস্তা হবে, তত দিন ভালো ছবি তৈরি করা যাবে না। এক ফরাসি সাংবাদিকের কাছে তাঁর কথা শেষ শুনেছি। তিনি ছবি করা ছেড়ে দিয়েছেন, এখন প্যারিসের বুলেভারে ঘুরে বেড়ান আর পার্টির কাজ করেন।
তারপর আছে জাপানি স্কুল। আমি নিশ্চয়ই আকিরা কুরোশাওয়া-র মতো এক্সপোর্ট কোয়ালিটি ছবি-করিয়েদের কথা বলছি না, বলছি মিজোগুচি, ওজু এবং তানাকা-র মতো পরিচালকদের কথা। এখন কয়েকজন প্রতিশ্রুতিবান তরুণকেও দেখা যাচ্ছে, যেমন নাগিশা ওসিমা।
দক্ষিণ আমেরিকায় পাচ্ছি লিওপোল্ড টরে নিলসন-কে, গ্রিসে আছেন মিখায়েল কাকোয়ানিস, এবং অবশ্যই সুইডেনে আছেন ইঙ্গমার বের্গমান। আমেরিকার তথাকথিত আন্ডারগ্রাউন্ড সিনেমা নিয়ে, বা ব্রিটিশ স্কুল, বা সত্যজিৎ রায়ের মতো দারিদ্র্যের বাস্তবতা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ করে দেওয়া পরিচালকদের নিয়ে আমার কোন উৎসাহ নেই। আর আছে পর্নোগ্রাফিক ছবির ঢেউ, এদের কথা ভাবলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়।
হয়তো আরও অনেক উল্লেখযোগ্য পরিচালক আছেন, কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশে বাইরের পরিচালকদের সাম্প্রতিক ছবি দেখার কোন সুযোগ নেই, ফলে আমি হয়তো দুর্দান্ত কিছু শিল্পকর্ম এখনও দেখতেই পাইনি।

প্রশ্ন: দেখলাম আপনি ইতালীয় স্কুল বা বিতর্কিত ‘ন্যুভেল ভাগ’ বা নবতরঙ্গ আন্দোলনকে বাদ রাখলেন।
ঋত্বিক ঘটক: ইতালীয়রা এখন ফুরিয়ে গেছে। ইতালীয় নিও-রিয়ালিজমের স্ফুলিঙ্গ এখন ফেদেরিকো ফেলিনি, আন্তনিওনি, লুচিনো ভিসকন্তি-র মতো মহান আচার্য ও অন্যান্যদের হাতে ফ্যান্টাস্টিক রিয়ালিজমে পরিণত হয়েছে। এর আর কিছু দেওয়ার নেই। একই অবস্থা আন্দ্রে ওয়াইদা-র নেতৃত্বে পোলিশ স্কুলের। রোমান পোলানস্কি-র মতো লোকেদের হাতে পড়ে এক ধরনের নব্য অস্তিত্ববাদের দিকে চলেছে। পোলানস্কি ঠিকই তাঁর স্বর্গ খুঁজে পেয়েছে হলিউডে।
আর ন্যুভেল ভাগ, ফরাসিদের সবকিছুর গায়ে একটা নাম লটকে দেওয়ার অদ্ভত অভ্যেস আছে। ত্রুফো-র ‘কাত্র স্যাঁ ক্যু’ এবং রেনে-রব গ্রি-র ‘লা’নে দেরনিয়ের আ মারিয়েনবাদ’-এর মতো ছবিতে এক নিঃশ্বাসে ‘ন্যুভেল ভাগ’ লেবেল সাঁটিয়ে দেওয়ার পক্ষে কথাটা খুবই ঝাপসা আর অস্পষ্ট। ছবি দুটো একেবারেই আলাদা গোত্রের। ফলে ঘরানা হিসেবে একে আমি স্বীকার করতে প্রস্তুত নই। কিন্তু এর মধ্যে কয়েকজন পরিচালক মারাত্মক শক্তিশালী, সে-ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। পূর্ব ইয়োরোপের দেশগুলো কী করছে আমি জানি না।
প্রশ্ন: আচ্ছা। কিন্তু ভারতীয় ফিল্মমেকাররা কী করছে সে তো আপনি জানেন। সৃষ্টিশীল কাজ হিসেবে কোথায় তাদের স্থান?
ঋত্বিক ঘটক: ছবি আমি দেখি না। কালেভদ্রে দেখি, তবু যা দেখেছি তাতে বলতে পারি যে বাংলা ছবি থেমে গেছে। আমাদের নতুন পরিচালকরা নাকি কান্না আর ছেঁদো গপ্পের ফেরে আটকে গেছে।
তবে ভারতের অন্য জায়গায়, বম্বে সহ, নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা প্রতিশ্রুতি দেখাচ্ছেন। যেমন আমি বম্বে থেকে শ্যাম বেনেগাল, কুমার সাহনি এবং মণি কাউলের কথা বলতে পারি; বলতে পারি পুনে থেকে সত্যদেব দুবে, কর্ণাটক থেকে সথ্যু এবং কেরালার জন আব্রাহামের কথা। বাংলাতেও একটা আন্দোলন চলছে, তবে বাণিজ্য তার গলা চেপে ধরেছে।
প্রথমত, ছবিতে অভিনয় পরিচালক ও অভিনেতার মধ্যে এক গভীর সম্পর্কের বিষয়, দুঃখের ব্যাপার হল এদেশে যার অস্তিত্ব নেই। দ্বিতীয়ত, ছবিতে অভিনয় পুরোপুরি ক্যামেরার অবস্থান, আলো এবং সর্বোপরি সম্পাদনার ওপর নির্ভর করে। আমাদের কোন অভিনেতা অভিনেত্রী এর একটাও কখনও বোঝার চেষ্টা করেননি, তাঁদের কোন ইচ্ছেই নেই। অথচ এগুলো সম্পর্কে না জানলে সত্যিকার অর্থে ছবিতে অভিনয় করা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: অভিনয় নিয়ে কে বলবেন? ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কি কখনও আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা অভিনেত্রী তৈরি করতে পারবে না?
ঋত্বিক ঘটক: এক কথায় বলা যায় যে কিছু ম্যাটিনি আইডল আর তাৎক্ষণিক চমক তৈরি করা কিছু নাম ছাড়া অভিনয়ের ক্ষেত্রে ভারতীয় সিনেমায় কিছু হয়নি। একজন বন্দারচুক, বা তোশিরো মিফুনে বা গিয়ুলিয়েত্তা মাসিনা-র মতো অভিনেতা এদেশে আমরা ভাবতেই পারি না।
প্রথমত, ছবিতে অভিনয় পরিচালক ও অভিনেতার মধ্যে এক গভীর সম্পর্কের বিষয়, দুঃখের ব্যাপার হল এদেশে যার অস্তিত্ব নেই। দ্বিতীয়ত, ছবিতে অভিনয় পুরোপুরি ক্যামেরার অবস্থান, আলো এবং সর্বোপরি সম্পাদনার ওপর নির্ভর করে। আমাদের কোন অভিনেতা অভিনেত্রী এর একটাও কখনও বোঝার চেষ্টা করেননি, তাঁদের কোন ইচ্ছেই নেই। অথচ এগুলো সম্পর্কে না জানলে সত্যিকার অর্থে ছবিতে অভিনয় করা সম্ভব নয়।
আমাদের মহান সব অভিনেতাদের যখন মাইলের পর মাইল সেলুলয়েড জুড়ে থপথপ করতে দেখলে তুষারের মধ্যে হাতির
নাচ দেখছি বলে মনে হয়। ওরা এখানে টাকা কামাতে এসেছে, আর দ্যাখো, ওরা তা কামাচ্ছে! ওখানেই সব জিনিশটার শেষ। এটা অভিনয় নয়!
প্রশ্ন: অভিনয় ছাড়াও, যাকে আপনি পুরোপুরি বাতিল করলেন, এখনকার অধিকাংশ ছবির কাহিনি মোটা দাগের আর একেবারেই অগভীর, সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির আর-একটা জিনিশও ভীষণভাবে সমালোচিত হয়, সেটা হল এসব ছবির নায়ক-নায়িকারা সামান্যতম সুযোগ পেলেই নাচগান শুরু করে দেয়!
ঋত্বিক ঘটক: ঠিকই তো।
ফলে আমার গানের প্রতি কোন বিশেষ অনুরাগ নেই। আমার প্রথম যে-ছবিটা রিলিজ করে, ‘অযান্ত্রিক’, তাতে কোন গান নেই। ও-ছবিতে তার কোন প্রয়োজন আমি বোধ করিনি। কিন্তু প্রয়োজন যদি বোধ করি তো গান ব্যবহার করতে আমি মোটেই দ্বিধা করব না।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনার অশিক্ষার প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা সত্ত্বেও আপনি নিজে কীভাবে আপনার প্রায় সমস্ত ছবিতে ঐ একই টেকনিক ব্যবহার করলেন?
ঋত্বিক ঘটক: দেখুন, আমি জাঁ-লুক গোদার-এর এই কথার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত যে শিল্পী তাঁর বক্তব্যপ্রকাশের জন্য যা-কিছুই ব্যবহার করুক না কেন, তা বৈধ— সেটা গান হোক, নাচ হোক, সংবাদপত্রের হেডলাইন বা ধারাবিবরণী হোক, বা আর কিছু। শৈল্পিক ন্যায্যতাই একমাত্র মানদণ্ড।
তাছাড়া, আমাদের দেশে গান চিরকাল যে-কোন সৃষ্টির কাজেই গুরুতর ভূমিকা পালন করেছে। খোয়াব-বেচা পরিচালকরা যদি তার অপব্যবহার করে তো তার মানে এই নয় যে আমি তা ব্যবহার করব না। প্রকৃতপক্ষে আমার কাছে বাংলা লোককথা নিয়ে এমন একটা স্ক্রিপট মজুত আছে যাতে আমি কোন সংলাপই রাখিনি, বেশ কিছু কবিতা সমেত আমি সেখানে ২৫টা গান ব্যবহার করেছি শুধু। আর-একটা স্ক্রিপটে আমি একেবারে বিপরীত দিকে গেছি, সেটা আমার ইচ্ছে বম্বেতে করার। সেখানে গান তো নেই-ই, কোন সংলাপও নেই—আছে কিছু বিকৃত কোলাহল আর আবহসঙ্গীত। মহারাষ্ট্রের এক বোবা-কালা মেয়ের গল্প সেটা।
ফলে আমার গানের প্রতি কোন বিশেষ অনুরাগ নেই। আমার প্রথম যে-ছবিটা রিলিজ করে, ‘অযান্ত্রিক’, তাতে কোন গান নেই। ও-ছবিতে তার কোন প্রয়োজন আমি বোধ করিনি। কিন্তু প্রয়োজন যদি বোধ করি তো গান ব্যবহার করতে আমি মোটেই দ্বিধা করব না।

প্রশ্ন: আপনি আটটা কাহিনিচিত্র আর দশটা ছোট ছবি বানিয়েছেন। এর মধ্যে কোন্টা আপনার কাছে খুব সন্তোষজনক, এবং কেন?
ঋত্বিক ঘটক: এর উত্তর দেওয়া কঠিন, তবে আজ পর্যন্ত চারটে ছবি আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে : ‘অযান্ত্রিক’, অভিব্যক্তির ক্ষণিকতার জন্য, আর কিছু প্রায়োগিক সাফল্যের জন্য; ‘সুবর্ণরেখা’, যেটা মনে হয় আমার সবচেয়ে দার্শনিক ছবি; ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, বাংলার দেশগাঁয়ের গীতিময়তার ওপর একটা প্রবন্ধ, বিশেষত বর্ষাকালে। তা ছাড়া ওতে প্রবলভাবে বাঙালি, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এক শ্রমজীবনকে আমি দেখাতে পেরেছি। আর ‘কোমল গান্ধার’, কারণ সেখানে আমি সাধারণ গল্পের ধারা ভেঙে একই সঙ্গে চারটে স্তরে আমার বক্তব্য প্রকাশ করেছি।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি এখন আবার থিয়েটারে ফিরেছেন। চলচ্চিত্র মাধ্যমে এত তৃপ্তিদায়ক সব অভিজ্ঞতা ছাড়াও আপনার আশ্চর্য সব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে, তা ছাড়া শুরুর দিকে আপনি আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছনোর জন্য থিয়েটার থেকে সিনেমায় চলে এসেছিলেন, এরপরেও এই যে আবার থিয়েটারে ফিরে এলেন, এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আপনি?
ঋত্বিক ঘটক: এ হল বুড়ো বয়সে এক ধরনের বৌদ্ধিক অনুশীলন। এটা আমাকে এক ধরনের মানবিক আনন্দ আর উষ্ণতা দিচ্ছে। থিয়েটারে দর্শক ও লেখকের মধ্যে পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার একটা সুযোগ ঘটে, যেটা আবার অন্য কোন মাধ্যমে মেলে না। এটাই হল আমার অনুপ্রেরণার গোপন কথা। তা ছাড়া আমি জনগণকে বাজিয়ে দেখতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে সিনেমায় আমার অবদানকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারি।
এই অর্থে, ফিল্ম ডিরেক্টর একজন ডিক্টেটর। কিন্তু থিয়েটারে তা নয়। সেখানে একজন মঞ্চ-পরিচালক শিল্পীদের একটা গাইডলাইন দিতে পারে মাত্র। পর্দা একবার উঠে গেলে তার আর কিছু করার নেই। তখন শিল্পীরাই নাটক সৃষ্টি করে, আর মঞ্চ-পরিচালক মঞ্চের বাইরে বসে থাকে।
প্রশ্ন: আপনি সিনেমা এবং থিয়েটার, উভয় মাধ্যমেই কাজ করেছেন। এই দুই মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে বড় তফাতটা কোথায়?
ঋত্বিক ঘটক: এ দুটো একেবারে আলাদা মাধ্যম, এ দুয়ের ভাষা মিলবে না, যদিও কখনও-কখনও মনে হয় যেন মিলে যাচ্ছে।
ভালো ছবি তৈরির রহস্য রয়েছে সম্পাদনায়। এর জন্য একটা অদ্ভুত সময়ের বোধ দরকার হয়। ভারতে একমাত্র সত্যজিৎ রায়ের সেটা আছে।
ছবি তৈরি করাটা একটা ভীষণই যান্ত্রিক ব্যাপার, যেখানে কল্পনা বা প্রেরণার হঠাৎ বিস্ফোরণের কোন জায়গা নেই। এ হল প্রশান্তির মধ্যে সংকলিত আবেগের ব্যাপার, অর্থাৎ এর সব কিছুই ছবি তৈরি শুরু করার অনেক আগেই ভেবে রাখা হয়।
এই অর্থে, ফিল্ম ডিরেক্টর একজন ডিক্টেটর। কিন্তু থিয়েটারে তা নয়। সেখানে একজন মঞ্চ-পরিচালক শিল্পীদের একটা গাইডলাইন দিতে পারে মাত্র। পর্দা একবার উঠে গেলে তার আর কিছু করার নেই। তখন শিল্পীরাই নাটক সৃষ্টি করে, আর মঞ্চ-পরিচালক মঞ্চের বাইরে বসে থাকে।
প্রশ্ন: শিল্পীদের অভিনয় নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় যে-বিপুল সম্ভাবনা আছে, যেটা ধরুন গ্রোতওস্কি আর তাঁর অনুগামীরা করছেন দারুণ সাফল্যের সঙ্গে, আপনি তা নিয়ে কখনও ভাবেননি?
ঋত্বিক ঘটক: কয়েকটা বেতার-নাটক প্রযোজনা ছাড়া বিগত ঊনিশ বছর নাটকের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। সত্যি কথা বলতে কী, এর মধ্যে এ নিয়ে ভাবিও নি।
এখন যখন থিয়েটারে ফেরার কথা ভেবেছি, আমার মনে হয় আমি বড্ড ব্রেখট-প্রভাবিত। তাঁর কিছু-কিছু নাটক আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি। বের্লিনার এনসেম্বলে-র প্রযোজনায় ব্রেখটের ‘মাদার কারেজ’টা শুধু একটা পুরো দৈর্ঘ্যের ডকুমেন্টারিতে দেখেছি আর তাঁর কিছু লেখা পড়েছি, তার মধ্যে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক রচনা ‘অর্গানন’ও আছে।
যেহেতু আমি কখনও দেশের বাইরে যাইনি, ফলে আমার পুরোটাই পরোক্ষ জ্ঞান, কিন্তু তার মধ্যেই যেটুকু শিখেছি তা আমার চিন্তাকে গড়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে এটাও যোগ করা দরকার যে আমি যখন নাটক প্রযোজনা করব তখন স্বাভাবিকভাবেই আমি কোন বিশেষ তত্ত্বে আটকে থাকব না। সুযোগ পেলেই আমি নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করব আর নিজের একটা ফর্ম তৈরি করব।
শুধু বাংলায় এ ধরণের একটা পরিষ্কার আন্দোলন হচ্ছে। সমাজ-সচেতন তরুণ ছেলেমেয়ের দল, আর তথাকথিত অ্যাবসার্ড নাটকের প্রবক্তারা ব্যাপক পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। বাঙালিরা খুব আত্মসচেতন, আর এই আন্দোলনে সবচেয়ে আশার জায়গা এইটা যে এ আর কলকাতার চৌহদ্দিতে আটকে নেই। ছড়িয়ে গেছে জেলায়, শিল্প-শহরে, এবং এমনকী গ্রামে। পেশাদার মঞ্চকে তা নাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার মতে বর্তমান ভারতে সবচেয়ে ফলদায়ী নাট্য আন্দোলন কোন্গুলো?
ঋত্বিক ঘটক: জাতীয় স্তরে এদেশে কোন নাট্য আন্দোলন নেই। আছে কিছু বিক্ষিপ্ত চেষ্টা, যেমন মারাঠি থিয়েটারে তণ্ডুলকারের মতো লোক করছে, ওদিকে কর্ণাটক, পটনা ও দিল্লিতে তুমুল আন্দোলন তৈরি হচ্ছে। হিন্দি লেখক শিল্পীদের এক নতুন প্রজন্ম প্রচুর উপন্যাস আর উত্তেজক সব আইডিয়া নিয়ে উঠে আসছে। শুধু বাংলায় এ ধরণের একটা পরিষ্কার আন্দোলন হচ্ছে। সমাজ-সচেতন তরুণ ছেলেমেয়ের দল, আর তথাকথিত অ্যাবসার্ড নাটকের প্রবক্তারা ব্যাপক পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। বাঙালিরা খুব আত্মসচেতন, আর এই আন্দোলনে সবচেয়ে আশার জায়গা এইটা যে এ আর কলকাতার চৌহদ্দিতে আটকে নেই। ছড়িয়ে গেছে জেলায়, শিল্প-শহরে, এবং এমনকী গ্রামে। পেশাদার মঞ্চকে তা নাড়িয়ে দিয়েছে। গতানুগতিক দু-রকম প্রতিক্রিয়া তার। এক তো যৌনতা আর শস্তা আমোদ। আদ্ধেক নাটকেই এখন একটা ক্যাবারে নাচের দৃশ্য থাকে, আর নগ্নতার ঠিক আগে গিয়ে তা থামে। বাকি অর্ধেকে নতুন নাট্য ভাবনা থাকে। বাণিজ্যিক থিয়েটারের বাইরেই উত্তেজক ঘটনাগুলো ঘটছে।
আমার কাছে, তার যা-ই দোষ থাকুক না কেন, আজ পর্যন্ত উৎপলই বাংলার শ্রেষ্ঠ মঞ্চ-প্রযোজক। সে বেশ ভালো স্যাটায়ারিস্ট, তার নাটক ভালো চলে, এবং নিজে সে ভালো অভিনেতা। এরা সবাই আমারই প্রজন্মের। এখনকার প্রজন্মের ছেলেপিলেদের সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না, তবে তাদের কিছু-কিছু নাটক ও প্রযোজনা বেশ ভালো।
প্রশ্ন: এর মধ্যে কোন প্রচেষ্টা কি বিশেষভাবে সফল হয়েছে?
ঋত্বিক ঘটক: একদিক থেকে শম্ভু মিত্র কিছুটা সফল হয়েছে। বিজন ভট্টাচার্য উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেছে, কিন্তু তার দরকার ভালো প্রযোজক। তারপর অবশ্য উৎপল দত্ত আছে। আমার কাছে, তার যা-ই দোষ থাকুক না কেন, আজ পর্যন্ত উৎপলই বাংলার শ্রেষ্ঠ মঞ্চ-প্রযোজক। সে বেশ ভালো স্যাটায়ারিস্ট, তার নাটক ভালো চলে, এবং নিজে সে ভালো অভিনেতা। এরা সবাই আমারই প্রজন্মের। এখনকার প্রজন্মের ছেলেপিলেদের সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না, তবে তাদের কিছু-কিছু নাটক ও প্রযোজনা বেশ ভালো।
আসল কথা হল, এই মুনাফাখোর জগতে পক্ষে-বিপক্ষে সবাই নিজের-নিজের ধান্ধায় আছে। এর মধ্যে কোন বেটাই নিরপেক্ষ সমালোচক বা শিল্পের সত্যিকার প্রেমিক নয়। ফলে আমি এই ইঁদুর-দৌড়ে নেই।
প্রশ্ন: পেশাদার থিয়েটার কীভাবে যৌনতাকে ব্যাবহার করছে এ নিয়ে আপনি বেশ অবজ্ঞার সঙ্গে কিছু কথা বললেন। এর থেকে নাটকে ও সিনেমায় যৌনতা, নগ্নতা আর চুম্বনের কোন যৌক্তিকতা আছে কি না, এ নিয়ে বিতর্কের কথা মনে পড়ছে। একজন লেখক, অভিনেতা এবং পরিচালক হিসেবে এ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
ঋত্বিক ঘটক: আমি এটাকে সমর্থনও করব না, বাতিলও করব না। এ একেবারে বালখিল্য প্রশ্ন। এ নিয়ে লোকের এত ভাবনা কেন আমি তো তা-ই বুঝি না।
শিল্পে সব কিছু বৈধ। প্রশ্নটা হল যে-সমস্ত লোক নগ্নতা ও চুম্বনকে প্রবলভাবে সমর্থন করছে তারা কি শিল্পের কথা ভেবে করছে? নাকি, তারা দ্রুত কিছু পয়সা কামিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে? একই সঙ্গে আমি ভারতীয় সংস্কৃতির ভয়ানক সংরক্ষকদের বলব আমাদের প্রাচীন গুহা আর মন্দিরগুলো ঘুরে আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে বিষয়টাকে দেখেছিল সরেজমিনে তা বিচার করে দেখতে।
আসল কথা হল, এই মুনাফাখোর জগতে পক্ষে-বিপক্ষে সবাই নিজের-নিজের ধান্ধায় আছে। এর মধ্যে কোন বেটাই নিরপেক্ষ সমালোচক বা শিল্পের সত্যিকার প্রেমিক নয়। ফলে আমি এই ইঁদুর-দৌড়ে নেই।
এখন, সত্য কী? চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই। প্রত্যেকটা শিল্পীকে যন্ত্রণাময় এক ব্যক্তিগত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তার ব্যক্তিগত সত্যে পৌঁছতে হয়। এ কথাটাই তিনি বলতে চেয়েছেন।
এ দুনিয়ায় এখনও শ্রেণিহীন শিল্প বলে কিছু নেই। কারণ শ্রেণিহীন সমাজ নেই। সমস্ত শিল্পই আপেক্ষিক, এবং এই আপেক্ষিকতা জনগণ সাপেক্ষে। শিল্প পদবাচ্য যে-কোন কিছুকেই কাজ করতে হবে মানুষের সপক্ষে।
প্রশ্ন: টাকা কামানোর জন্য বা দর্শকের মন যোগানোর জন্য ছবি করা খুবই ক্ষতিকর বলে আপনি মনে করেন। তার বদলে আপনি কি মনে করেন এই শক্তিশালী মাধ্যমটিকে সংস্কারবাদী প্রচারে এবং সক্রিয় ধর্মান্তরণের কাজে ব্যবহার করা উচিত, যা বিখ্যাত কয়েকজন পরিচালক করেছেন, এবং করেছেন প্রায়ই শিল্পকে জলাঞ্জলি দিয়ে?
ঋত্বিক ঘটক: এ ব্যাপারে আমি প্রাচীনপন্থী। রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, শিল্পকে সুন্দর হতে হবে, কিন্তু তার আগে তাকে সত্যনিষ্ঠ হতে হবে।
এখন, সত্য কী? চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই। প্রত্যেকটা শিল্পীকে যন্ত্রণাময় এক ব্যক্তিগত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তার ব্যক্তিগত সত্যে পৌঁছতে হয়। এ কথাটাই তিনি বলতে চেয়েছেন।
এ দুনিয়ায় এখনও শ্রেণিহীন শিল্প বলে কিছু নেই। কারণ শ্রেণিহীন সমাজ নেই। সমস্ত শিল্পই আপেক্ষিক, এবং এই আপেক্ষিকতা জনগণ সাপেক্ষে। শিল্প পদবাচ্য যে-কোন কিছুকেই কাজ করতে হবে মানুষের সপক্ষে।
আমি কোন অনমনীয় তত্ত্বে বিশ্বাস করি না, কিন্তু একই সঙ্গে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই এই সমস্ত মহান চলচ্চিত্রকারদের দেখে, মানবিক সম্পর্কের শিল্প যারা এত চিৎকার করে তারা আসলে ফালতু লোক। নিজের সামাজিক দায়িত্বকে অস্বীকার করার এ এক চতুর উপায়। তারা যা করছে তা শুধু প্রতিষ্ঠানকেই সাহায্য করবে। তারাও পার্টিবাজ, কিন্তু ভাব করে যেন তা নয়। আমি এ ধরণের শ্লোগানকে ঘৃণা করি।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত কী সেই সত্য যা আপনার গল্প, ছবি ও নাটককে অনুপ্রাণিত করেছে?
ঋত্বিক ঘটক: পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি হিসেবে, স্বাধীনতার নামে আমার জনগণের ওপর কী সাংঘাতিক দুর্দশা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তা আমি দেখেছি। যে-স্বাধীনতা সম্পূর্ণ মিথ্যে আর জাল। আমার শেষ ছবিতেও আমি এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছি, যা এখনও রিলিজ হয়নি (‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’), সেখানে আমি এর বিভিন্ন দিক দেখিয়েছি। আমার চারপাশে সম্পূর্ণ নৈতিক অধঃপতনের ব্যাপারেও আমি সচেতন, বিশেষত তরুণতর প্রজন্মের মধ্যে। আমার পরের ছবি, যার নাম ‘সে বিষ্ণুপ্রিয়া’, তার বিষয়ও এ-ই। আমার সাম্প্রতিক নাটকের বিষয়ও একই।










