শুরু হওয়ার পর প্রায় মিনিট ৪৬ পর পেদ্রোর স্বগতোক্তিটি এরকম: ‘এক সময় আমি ভাবতাম জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিসটি হল মৃত্যু। কিন্তু এখন আমি মনে করি জীবনই সবচাইতে ভয়ঙ্কর।‘
১
সেনিওর আকোস্তা এসে আখক্ষেতের চাষী পেদ্রোকে জানায় এ জমি সে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানিকে বিক্রি করে দিয়েছে। অল্প কিছু পয়সা যা ছিল তা ছেলে ও মেয়েকে দিয়ে বলে তা দিয়ে গ্রামে গিয়ে গান শুনে আসতে, আনন্দ করতে। এদিকে ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে মরে পড়ে থাকে পেদ্রো। পেদ্রো পুড়ে মরে আছে, পেছনে পুড়ছে তার আখের ক্ষেত, দৃশ্যটা কাছ থেকে দূরে চলে যায়… নারীকন্ঠে কেউ উচ্চারণ করে ‘ইয়ো সোই কুবা’ (আমি কুবা)। তারপর প্রশ্ন ছুড়ে: ‘এই রক্ত, এই কান্নার মূল্য কে মেটাবে?’
শুরু হওয়ার পর প্রায় মিনিট ৪৬ পর পেদ্রোর স্বগতোক্তিটি এরকম: ‘এক সময় আমি ভাবতাম জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিসটি হল মৃত্যু। কিন্তু এখন আমি মনে করি জীবনই সবচাইতে ভয়ঙ্কর।‘

২
ছোট ছোট নকশায় বিভক্ত ১৯৬৪ সালের সিনেমা ‘ইয়ো সোই কুবা’-র নির্মাতা রুশ পরিচালক মিখাইল কালাতোজোভ। সাদা-কালোয় ধারণ করা সিনেমাটির কিছু দৃশ্য মনের পর্দায় থেকে যায়। কারিগরি বিচারে একটি অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র এটি। সঙ্গীত ও আবহ নির্মাণ অতুলনীয়। আর বিষয়? বিষয় রাজনীতিক। কুবার রাজনীতি। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের ঠিক আগেকার কুবার রাজনীতিক-আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্রই উঠে এসেছে এই ডকুড্রামায়। এবং অতি অবশ্যই ক্যারিবিয়ো এই দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রতি প্রতিবেশী মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের বিষয়টিই মুখ্য এ-সিনেমায়। রুশ নির্মিত সিনেমাটিকে অনেকে তাই প্রোপাগান্ডা হিসেবে দেখেন। কিন্তু তৎকালীন কুবা তথা লাতিন আমেরিকার বাস্তবতা সেরকমটাই ছিল। গত শতকের তিন-চার থেকে সাতের দশক পর্যন্ত মেহিকো, সেন্ট্রাল আমেরিকা, ক্যারিবিয়ো কয়েকটি দেশসহ দক্ষিণ আমেরিকার বেশির ভাগ দেশজুড়ে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রতিপত্তি বজায় ছিল। ওই সময়কালে দুর্দন্ড প্রতাপে দেশগুলি শাসন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার কতিপয় স্বৈরশাসক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কলকাঠিতে ওই দেশগুলির ভুত-ভবিষ্যৎ ঠিক হত। এরকম স্বৈরশাসকদের তালিকায় একটি অপরিহার্য নাম হল কুবার জেনারেল ফুলগেন্সিও বাতিস্তা।

৩
সিনেমাটির শুরু থেকেই আমরা দেখি মার্কিনি শ্বেতাঙ্গ গ্রিঙ্গোরা কুবার রাজধানী লা আবানা-র নৈশকালীন জীবনে কীভাবে ফূর্তিবাজি করছে। অর্থনৈতিকভাবে সঙ্গীন কুবার গরীবী মেয়েগুলিকে কীভাবে তারা তাদের আনন্দ-ফুর্তির খেলনা হিসেবে ব্যবহার করে তা সাদা-কালো / আধো-আলো স্ক্রিনে সুস্পষ্ট। কুবাকে নিষ্পেষিত করার চিত্রটা প্রতীকীভাবে সিনেমার ছত্রে ছত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে। তার শিকার কখনো বেত্তি, কখনো গ্লোরিয়া, কখনো এনরিকে, কখনো মারিয়ানো। নকশাকারে বেত্তি, পেদ্রো, গ্লোরিয়া, এনরিকে, মারিয়ানোর টুকরো জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে কুবাকাহিনির বয়ান এ সিনেমায়।
সিনেমাটির প্রায় তৃতীয় ভাগে এসে এনরিকেকে আমরা পাই আদর্শবান বিপ্লবী ছাত্র হিসেবে।

ছাত্র বিদ্রোহের দামামা চলে রাস্তায়। একনায়ক জেনারেল ফুলগেন্সিও বাতিস্তার অপশাসনের বিরুদ্ধে ফুসে ওঠে ছাত্রসমাজ। সরকারের লেঠেল বাহিনি গুলি চালায় মিছিলে। এরপরও
বিবা লা লিবের্তাদ, বিবা লা রেবোলুসিয়োন, বিদা ও মুয়ের্তে ইত্যাদি শ্লোগানে ধ্বনিত হয় রাস্তাঘাট। লেনিনের বইকে সঙ্গী করে সকলেই হয়ে ওঠে এক একজন ফিদেল-বিপ্লবী। সিনেমাটির শেষের অংশে আমরা দেখি কুবার ইতিহাসের কিংবদন্তি ফিদেল সহযোদ্ধাদের নিয়ে দখল করে নেয় সিয়েররা মায়েস্ত্রো নামের পার্বত্য এলাকা। এরপর এখান থেকেই তারা বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দেয় দেশজুড়ে। শেষমেষ দুই সন্তানের বাবা কৃষক মারিয়ানোও যোগ দেয় এই সশস্ত্র বিপ্লবে, তার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে, সন্তান ও পরিবারের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যতের কামনায়।








