মুক্তকথা

0
410

না, এই লেখা আমার কোনো জীবনী নয়, কিছু ঘটনা বা সময় যা আমাকে নাড়া দিয়ে গেছে সেই সময়টুকুই কেবল ধরার চেষ্টা করছি, ভালো-মন্দ সবই আছে, অনেক চরিত্রর অনেক মুখও আছে।

আর্ট কলেজ ও অ্যাকাডেমি

আমার আর্ট কলেজের দিনগুলো যে মসৃণ ছিল তা বলা উচিত হবে না, আসলে আমার চলার পথটাই তাই, সবসময় চড়াই-উতরাই, যথারীতি ক’দিনের মধ্যেই র‍্যাগিংয়ের খপ্পরে পড়লাম। সব দাদারা একাট্টা, আমাদের রসহীন অত্যাচার করতে ওদের কী আনন্দ আর আমাদের অসহায়তা ওদের প্রতি মুহূর্তে উত্তেজিত করেছে। আমার জেদকে আমি নিজেই ভয় পাই। ঠিক করলাম এটাই হবে আর্ট কলেজের শেষ র‍্যাগিং, এরপর অনেকেই চেষ্টা করেছিল, আমার আর আমার সঙ্গীদের প্রতিরোধে বন্ধ হলো এই প্রথা, তার বদলে এলো রুচিসন্মত গানবাজনা। এভাবেই হবে নতুনদের সঙ্গে পুরনোদের পরিচয়।

সময়টা ছিল এমনিতেই উত্তাল। নকশাল আন্দোলন শুরু হয়েছে। চারিদিকেই চোরাগোপ্তা খুন হয়ে চলেছে, প্রেসিডেন্সির ছেলেমেয়েরা কলেজ স্ট্রিট প্রাঙ্গণকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু দিয়ে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে। চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান, বন্দুকের নলই ক্ষমতার একমাত্র উৎস, চারু মজুমদার যুগ যুগ জিও, অসীম চ্যাটার্জী, কানু সান্যাল জিন্দাবাদ ইত্যাদি। আর আমার পাড়াটা ছিল এই যুদ্ধের আর এক দুর্গ। যেখানে আমিও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছিলাম।

তবে আমার লক্ষ্য থেকে আমি সরিনি। নিজেকে তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঘুরছিল এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার পরিকল্পনা যা ভবিষ্যতে বার বার আমি করেছিলাম।

১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৮ তথ্যকেন্দ্রে গভর্নর মহোদয়

টাটা সেন্টারের উল্টোদিকের ময়দানে শুরু হয়েছে মুক্তমেলা, প্রতি শনিবার করে বিকেলে বসছে সবাই। সেখানে অনেক কবি-শিল্পীরা যাচ্ছেন, বেশ ভিড় হচ্ছে। আমি আমার বন্ধু রতন ব্যানার্জী যে আজীবন সম্পর্ক আমার সঙ্গে বজায় রেখে আসবে, আর বন্ধু শুভাপ্রসন্ন মিলে ঠিক করলাম আমরাও যাবো। মানুষ তো স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলায়, আমরা যদি তৎক্ষণাৎ তার পোর্ট্রেট করে দেই তবে কেমন হয়? সকলেই সহমত হই। শনিবার করে তল্পিতল্পা নিয়ে হাজির হচ্ছি মুক্তমেলায়। মাত্র দু’টাকার বিনিময়ে দশ মিনিটে পোর্ট্রেট করে দিচ্ছি, প্রায় লাইন দিয়ে পোর্ট্রেট আমাদের দিয়ে করাচ্ছে সব লোকজন, এর মধ্যে রঘুনাথ গোস্বামীও একদিন করিয়ে নিলেন নিজের ও ওনার স্ত্রীর পোর্ট্রেট, পাশেই দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কবিতা পড়ছেন তুষার রায় ওর সেই বিখ্যাত ব্যান্ড মাস্টার। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে, মাঝে মাঝে শক্তি চ্যাটার্জী, জ্যোতির্ময় দত্ত, সুনীল গাঙ্গুলী, গৌরকিশোর ঘোষ আসছেন। প্রকাশ কর্মকার তাশা পার্টি নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চড়েও একদিন চলে এলেন ওর ছবি নিয়ে, শুভা তখন ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে পড়ে, দু’জন আলাদা কলেজ হলেও নিয়মিত সাক্ষাৎ আমাদের ছিল, ও আমাদের পাড়ার কাছাকাছি থাকে।

আমাদের রোজগার বেশ ভালই হয়েছিল। আমাদের রং তুলি কাগজ অনেকদিনের জন্য সঞ্চয় হয়ে গেলো। হঠাৎ করেই একদিন দেখলাম কারা যেন বোমা মেরে পালিয়ে গেলো, সেই আতঙ্ক মেলাকে ব্যাহত করলো।

শনিবার করে তল্পিতল্পা নিয়ে হাজির হচ্ছি মুক্তমেলায়। মাত্র দু’টাকার বিনিময়ে দশ মিনিটে পোর্ট্রেট করে দিচ্ছি, প্রায় লাইন দিয়ে পোর্ট্রেট আমাদের দিয়ে করাচ্ছে সব লোকজন, এর মধ্যে রঘুনাথ গোস্বামীও একদিন করিয়ে নিলেন নিজের ও ওনার স্ত্রীর পোর্ট্রেট, পাশেই দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কবিতা পড়ছেন তুষার রায় ওর সেই বিখ্যাত ব্যান্ড মাস্টার

কানাঘুষো শুনতাম চিন্তামনি করের সঙ্গে লেডি রাণু মুখার্জীর একটা দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্ব চলে আসছে, সেকারণে তিনি চাইতেন না তার ছাত্র বা শিক্ষক অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে গিয়ে প্রদর্শনী বা অন্য কোনোভাবে জড়িত থাকুক। এদিকে রথীন মৈত্র ও গোপাল ঘোষ দুজনেই একাডেমির যুগ্ম সচিব, দুজনেই তখন প্রথিতযশা শিল্পী, শুনেছিলাম একদিন গোপাল ঘোষকে তিনি খুবই লাঞ্ছনা করেন, ওনার ব্যক্তিগত আলমারি থেকে অনেক ছবি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভূলুণ্ঠিত করে দিয়েছিলেন! শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। গোপাল বাবুকে দেখতাম এক মনে বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতেন আর প্রকৃতি থেকে রং আবিষ্কার করতেন। তিনি আমাকে জল রং শেখাতেন। রথীন মৈত্র হয়ত কিছুটা ডিপ্লোম্যাসি করে চলতেন, মুখে হাসি থাকতো, আমাকে কিছুটা প্রশ্রয় দিয়েছিলেন আমার নানা কাজে। ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম ও বরেন নিয়োগী দুজনেই আমাদের ক্লাস নিতেন দুজনেই নন্দলালের শিষ্য ছিলেন, ধীরেন বাবু বেটেখাট মানুষ, ছাত্রদের তুমি বলে সম্মোধন করতেন আর মেয়েদের আপনি বলে, কেননা ওনার বোধে মেয়েরা মায়ের জাত। যা হোক ছেলেরা বাপের জাত হলেও নতুন কোনো সম্বোধন আর আশা করতো না। আমার শিক্ষক ভাগ্য খুবই ভালো, যাদের কাছ থেকে অনেক নতুন নতুন রাস্তা আমি খুঁজে পেতাম। সুনীল পাল, সত্যেন ঘোষাল, সুশীল গুপ্ত, হরেন দাস, গনেশ হালুই সহ আরো অনেকেই ছিলেন এই তালিকায়।

একদিন শুনলাম বাম মনোভাবাপন্ন বেশকিছু শিল্পী, তার মধ্যে জোছন ঘোষ দস্তিদারও ছিলেন, একটা মিছিলের ডাক দিয়েছে, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ঘেরাও হবে, রাজ্য স্টেট অ্যাকাডেমি সরকারকে করতে হবে, এই অ্যাকাডেমি কখনোই রাজ্য অ্যাকাডেমি হতে পারে না। আমি রথীন বাবুর কাছ থেকে জানতে চাইলাম, তিনি যা বোঝালেন শুনে খুব রাগ তৈরি হলো এই মিছিলের উপর, আমি রথীন বাবুকে বলেছিলাম লেডি মুখার্জিকে জানিয়ে দেবেন অ্যাকাডেমিকে যারা বারোটা বাজানোর তাল করছে আমরা সেটা হতে দেব না। প্রতিরোধেরও প্রতিরোধ আছে, কথাটা তিনি যথাযথ জায়গায় বললেন। আমরা কয়েকজন অ্যাকাডেমিতে গিয়ে স্কেচ ক্লাবে ভর্তি হলাম, যা কল্পনার বাইরে ছিল এই কলেজের ছাত্রছাত্রীদের। খবরটা চিন্তামনি বাবুর কানেও গেলো। কিন্তু কিছু বুঝতে দিলেন না। আমাকে একদিন লেডি রাণু ওনার অফিস ঘরে ডাকলেন সঙ্গে রথীন বাবুও ছিলেন। ওই পরমা সুন্দরী মহিলা যাকে নিয়ে শংকর চৌরঙ্গি উপন্যাসে চরিত্র করেছেন, যার জন্য ভানুসিংহর পত্রাবলি হলো, যিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। আমাকে ভালো করে দেখে বোঝার চেষ্টা করলেন, তোমাকে তো চিন্তামনি ছাড়বে না। তোমার সাহস আছে, এখানে এসো, যা দরকার লাগবে বলো। রথীনবাবুকে বললেন স্কেচ ক্লাবে ওর থেকে কোনো টাকা যেনো না নেওয়া হয়। আমার অবশ্য টাকা দেবার সামর্থ্যও ছিল না। বুঝলাম এ হলো দুই মহারথীর যুদ্ধ, আমি আমার মতো চলবো। ওই মিছিল বেরিয়েছিল তবে অ্যাকাডেমি না গিয়ে বিধান সভা ভবনে যায়। চিন্তামনিবাবু আমার ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষায় থাকবেন, সে আমি বুঝে গেছি।

অ্যাকাডেমি স্কেচ ক্লাবে তখন অনেক শিল্পীরাই লাইফ ড্রইং করতে আসতেন। আমি এই লাইফ ড্রইঙের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যবহার করতাম। নিউডস মডেল থেকেই একমাত্র লাইফ শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। অ্যাকাডেমির বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজেকে যুক্ত করবো ঠিক করলাম আবার কলেজ থেকেও যতটা সম্ভব শিক্ষা নেবো। অনেক ভালো ভালো শিল্পী-শিক্ষক পেয়েছি যাদের থেকে আমি স্নেহভরা আশীর্বাদ পেয়ে এসেছি, নিজেকে ধন্য মনে করেছি। সৌভাগ্যবান মনে করেছি।

২.
রাতারাতি বদলে গেলো তথ্যকেন্দ্র, গোপাল ঘোষ আধঘণ্টায় বড়ো জলরঙের ছবি করলেন। সময়টা ১৯৬৮, সে-বছর বন্যায় উত্তরবঙ্গ তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ বিপদে দিন কাটাচ্ছে। যার যেমন সামর্থ্য সেই মতো সাহায্য করছে। আমি ছাত্র, তার উপরে নিজেই দারিদ্র্য সীমানার নিচে, আমি আর কী করতে পারি! কিন্তু আমার মন ও ইচ্ছাশক্তি দারিদ্র্য সীমানার উপরে ছিল। প্রতিদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে বৌবাজারের মোড় থেকে ট্রামে উঠে ধর্মতলার মোড়ে যাই, সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে কলেজে যাই। পথে কোনো হকার ছিল না, পরিষ্কার রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধে হতো না। এই রাস্তায় আসতে আসতে রোজই দেখতাম অনেকেই ত্রাণ সংগ্রহ করছেন নানা উপায়ে। আমি কলেজে এসে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করলাম আর্টিস্টদের পক্ষ থেকে একটা প্রদর্শনী করে তার বিক্রি থেকে যে টাকা আসবে সেটাই আমরা রাজ্যপালের তহবিলে জমা দেব। আমরা কারা—আমাদের পরিচয় একটা প্রয়োজন ছিল, নয়তো এগোতেই পারবো না। আমার পাড়ার কেউ কেউ আর কলেজের অনেককে নিয়ে আমি একটা সংগঠন গড়লাম, নাম ঠিক হলো শৃণ্বন্তু, নামটা দিয়েছিলেন আমাদের শিক্ষক সুনীল পাল। আমাদের সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি ও আরও অনেক কলেজের ছেলেমেয়েরা যুক্ত হলো। সভাপতি হলেন ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য। তিনি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন আর লোকশিল্প ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছেন। এহেন সভাপতির সঙ্গে আমার মতো এক অর্বাচীন ছাত্রের নাম যুক্ত হল সম্পাদক হিসেবে। এই সংস্থা শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য কাজ করবে।

২০ ডিসেম্বর, ১৯৬৮, বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণ

আমরা ঠিক করলাম আমাদের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কাজ নিয়ে কলকাতা তথ্য কেন্দ্রে প্রদর্শনী হবে। অ্যাকাডেমিতে প্রদর্শনী হলে কারও ছবি পাব না। আবেদনপত্রও পৌঁছে গেলো তথ্যকেন্দ্রে। তখন দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিম ভট্টাচার্য, আমাদের অনেক ঘুরিয়ে শেষে জানিয়ে দিলেন হল তো দেওয়া যাবে না, আগে থেকেই বুকিং আছে, বিবেকানন্দের উপর প্রদর্শনী হবে। আমি বোঝালাম এই প্রদর্শনী দেশের জন্য এই মুহূর্তে কতটা প্রয়োজনীয়। তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্য ছিলেন পরে জেনেছিলাম। আসলে এনারা বসের আজ্ঞাবহ। আর সুযোগ পেলে আমাদের কীটপতঙ্গ ভাবাটাই দস্তুর। আমি জেদ ধরেই এগোচ্ছি সরাসরি রাজ্যপাল ধর্মভিরাকে আবেদন করলাম উদ্দেশ্য জানিয়ে এবং আমাদের সঙ্গে কারা আছেন। এবং জানালাম আপনি এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করুন সবাই চায়, আপনার সুবিধামতো দিন দেখেই আমরা শুরু করবো। শুনেছিলাম এই বিবেকানন্দের প্রদর্শনীও উদ্বোধন করতে তিনি আসবেন। অচিরেই চিঠির উত্তর এসে গেলো, তিনি ওই একই দিনে ওখানেই প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে রাজি আছেন। রাতারাতি রাইটার্স থেকে চিঠি এলো। তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব শ্রী মাথুর আমাকে দেখা করতে বলেছেন। আমি সকাল-সকাল ওনার বাড়িতে হাজির হলাম, আমাকে ওখানেই যেতে বলা হয়েছে। আমার কাছ থেকে বিস্তারিত জানলেন এবং বোঝাবার চেষ্টা করলেন তথ্য কেন্দ্রে একটাই হল আছে, সেখানে বিবেকানন্দের প্রদর্শনী ঠিক হয়ে আছে, এখন রাজ্যপাল ওখানেই দুটো প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন ঠিক হয়েছে, কী করা যায়! উনি বেশ চিন্তিত হলেন, রাস্তা বেরোলো, ওখানকার বড়ো একটা রিডিং রুমকে খালি করে প্রদর্শনীর জন্য যা যা প্রয়োজনীয় সব করে দেওয়া হবে। তৎক্ষণাৎ প্রীতিম বাবুকে জানিয়ে দিলেন, ডেকোরেটরকেও জানিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে দিতে হবে।

আমার শিক্ষক ভাগ্য খুবই ভালো, যাদের কাছ থেকে অনেক নতুন নতুন রাস্তা আমি খুঁজে পেতাম। সুনীল পাল, সত্যেন ঘোষাল, সুশীল গুপ্ত, হরেন দাস, গনেশ হালুই সহ আরো অনেকেই ছিলেন এই তালিকায়।

আমি বিজয়ের উল্লাসে বেরিয়ে এসে সবাইকে জানিয়ে দিলাম ১২ জানুয়ারিতে আমাদের প্রদর্শনী উদ্বোধন। ছবি জোগাড় করতে সবাই মিলে উঠেপড়ে লাগলাম। সবাইকে বলা হলো ছবির দাম কম রাখতে, পুরো টাকাটাই যাবে রিলিফ ফান্ডে। গোপাল ঘোষ কলেজে বসেই বড়ো একটা জলরঙের ছবি করে দিলেন, সময় নিলেন মাত্র আধঘণ্টা। গণেশ হালুই, রথীন মৈত্র, ইন্দুভূষণ রক্ষিত, সুশীল গুপ্ত, অজিত গুপ্ত সহ অনেকেই ছবি দিলেন। লেডি রাণু মুখার্জিকে আমি ওইদিন আসতে বললাম, তিনি আসবেন কথা দিলেন। প্রীতিমবাবু আমার ধারে কাছে আসেননি, ঘটা করে উদ্বোধন হলো, রাণু মুখার্জি ও ধর্মভিরা একসঙ্গেই ঢুকলেন। রাণু মুখার্জি ঢুকেই আগে আমার ছবি কিনলেন, রাজ্যপাল ধর্মভিরা গোপাল ঘোষের ছবি কিনলেন, এরপর অনেকেই ছবি কিনলেন। আমরা রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে চেক তুলে দিলাম। কলেজে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়েছে, বিশেষ করে চিন্তামনি করের।

আসলে গঠনমূলক কাজ আমি চিরকাল জেদের বসে করতে বাধ্য হতাম কিছু মানুষের বিরোধিতার জন্য। আমার রাস্তাটা যে বেঠিক নয় তারজন্য আমার চেষ্টার অন্ত থাকতো না। যারা অকারণে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমাকে প্রতি মুহূর্তে বাধা দিতে এসেছেন তাদের আমি কখনও না কখনও যোগ্য জবাব দিতে পিছপা হতাম না, হয়তো এর জন্য আমাকে অনেককাল অপেক্ষা করতে হয়েছে।

কেননা তখন শিল্পের পরিবেশটাই কেনো যেনো ঝিমানো, আর্ট কলেজ থেকে পাস করে এতো শিল্পীরা সব কোথায় যায়? মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সমাজে কাউকে তেমন দাগ কাটতে দেখা যাচ্ছে না কেনো? এসব ভাবনা আমাকে সবসময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়।

এই সমস্ত কার্যকলাপে কলেজে ও অ্যাকাডেমিতে বিশেষ করে লেডি মুখার্জির মনে হতে থাকে অসিত সবাইকে নিয়ে কিছু একটা করবে এই ঘোর অন্ধকারে। অন্ধকার কথাটা বললাম কেননা তখন শিল্পের পরিবেশটাই কেনো যেনো ঝিমানো। আর্ট কলেজ থেকে পাস করে এতো শিল্পীরা সব কোথায় যায়? মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সমাজে কাউকে তেমন দাগ কাটতে দেখা যাচ্ছে না কেনো? এসব ভাবনা আমাকে সবসময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। অ্যাকাডেমিতে লোকজনের সমাহার তেমন ছিল না। ক্যাথেড্রাল রোডটায় সন্ধ্যে হলে অন্ধকার নেমে আসতো। রাস্তা তখন দেহপসারিণীদের হাতে চলে যেত, মেয়েরা একা যেতে ভরসা পেতেন না। আমি ও রতন নিয়মিত অ্যাকাডেমিতে যেতাম। ক্রমে ক্রমে আমি ওখানে অনেককেই নিয়ে যাই এবং অ্যাকাডেমি আমার এক বড় ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রমশ…

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে