বেগম সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম

0
487

সকাল দশটা । শরৎ গুপ্ত রোড। এগারটায় আসার কথা। স্বভাববশত আমি দশটায় এসে উপস্থিত। উৎকণ্ঠা আর আগ্রহ বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। গল্পে শোনা নূরজাহান বেগমকে কাছ থেকে দেখব, গল্প শুনব আর ছবি তুলব। তিনি অসুস্থ তবুও সময় দিয়েছেন । 

বহু পুরনো বাড়িটি অদ্ভুতভাবে টানছে। দরজা যিনি খুলে দিলেন তিনিও যেন অতি প্রাচীন, বয়স আশির কাছাকাছি।

নূরজাহান বেগম

‘আপনারতো এগারটায়…’ কথা শেষ হবার আগেই তীব্র চিৎকারে আমার ত্রিভুবন কেঁপে উঠলো। বাঘ না কুকুর তা বোঝার আগে ক্যামেরার ব্যাগটা  সামলাতে সামলাতে কোনোমতে বৃদ্ধের হাত জাপটে ধরলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে হাত ছাড়াবার চেষ্টা করলেন কিন্তু কোনো কাজ হলো না। মিনিট পাঁচেক পর টমি থামলেও আমার আতঙ্ক থামেনি। এমনিতেই প্রচন্ড কুকুরভীতি তার মাঝে টমি আমাকে যথেষ্ট শাসিয়েছে।  খানিক পর  টমিকে (নূরজাহান বেগমের প্রিয় কুকুর) আটকে রাখা হলো।

প্রিয় টমিকে আদর করছেন

টমিভীতি ফিকে হতেই বিস্ময়ের ঘোর শুরু হলো। সামনে সীমাহীন বিস্ময় নিয়ে আর কেউ নন, স্বয়ং নূরজাহান বেগম! বহু পড়ার, শোনার, কিন্তু অদেখার হিরন্ময় মানুষ! ঘরের অল্প আলোর বাল্বটাকে তুচ্ছ করে জ্বলজ্বল করছেন। ফুল তোলা চাদরের তক্তপোশের উপর বসা। পেছনে গুরুসম বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ছবি। সামনের ছোট্ট টেবিলটি বিছানা লাগোয়া। তার উপর ছড়িয়ে রাখা কাগজের স্তুপ, কলম, ডায়েরি, কালো রঙের টেলিফোন, দূরের কাউকে ডাকার বেল, একখানা আতশ কাচ। পরিমিত ব্যক্তিত্বের ভ্রুজোড়া কুঁচকানো। কাছের-দূরের সহযোগী কাঁচের ভেতরের চোখজোড়া এত প্রখর আর দ্যুতিময়! 

শরত দাস গুপ্ত লেইনের বাড়ির নীচতলা, সওগাত সম্পাদক সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এবং নূরজাহান বেগম দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।

গল্প আর টুকটাক ছবি তোলা।  চা-পর্ব শেষ হলো। কিন্তু ভাবনার সাথে পাল্লা দিয়ে কথা এগুচ্ছে কম।  মাঝে মাঝেই টেলিফোন তুলে নিচ্ছেন আপা। ছবি তোলার সময়ে যে-সব দক্ষতা সাধারণত কাজ করে তার কোনোটাই ব্যবহার করছি না। মগজে ইতিহাসের হাজার হাজার শব্দের ঝড় নিয়ে শান্ত হয়ে শুট করছি । ওই ব্যক্তিত্বের সামনে শাটারের শব্দ নিজ কানেই বাজছে। তাঁর শরীরটা ভাল নেই। কালো-লাল রঙের  লাঠিটি ভর করে দাঁড়ান। আপাকে তাঁর কাজে রেখে অনুমতি নিয়ে বাড়িটা ঘুরে দেখছি। বাড়িটি যেন আপার ভ্রু-জোড়ার মতো ক্লান্ত। তলছাদে একটা কিশোর বিড়াল তখনও আগুন পোহাচ্ছে। অল্প আগে পাশে কেউ বসে আগুন পোহাচ্ছিল তার ছাপ তখনও স্পষ্ট। 

বারান্দা

এখানে ওখানে হাহাকার করা শূন্য চেয়ারগুলোতে আলো-ছায়া দুলছে। পাশে গাঁদা ফুলের টবটা  ঠিকঠাক করা হলো। নূরজাহান বেগমের ছবি তোলা হবে। পুরো বাড়িটাই যেন একটা  সাদা-কালো ছবি। তার মাঝে একমাত্র রঙিন নিমগাছটা সবুজ হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে।  

ওপারে পার্কস্ট্রিট এর প্রেসটা এখন কোন আদলে আছে? আর ওই বাড়িটা? ১১ নং ওয়েলেসলি স্ট্রিট যেখানে বেগম রোকেয়া ফোন করে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে বলেছিলেন আপনার কন্যা নূরজাহানকে আমি চাইছি। আপনার মেয়েকে আমার স্কুলে পড়তে দিন আমি তার পড়াশুনার বিশেষ যত্ন নেব। ছোট্টনূরী ছাত্রী হয়ে গেলো রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে।

হাঁটছি চাঁদের রেলিঙের  পুরানো পাড় ধরে।  দেশভাগের সময় ঢাকার ‘বিজয়া’ প্রেসের মালিক বিজয় চন্দ্র বসুর কাছ থেকে এই বাড়িটা বিনিময় করে নেন সওগাত সম্পাদক সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।  ওপারে পার্কস্ট্রিট এর প্রেসটা এখন কোন আদলে আছে? আর ওই বাড়িটা? ১১ নং ওয়েলেসলি স্ট্রিট যেখানে বেগম রোকেয়া ফোন করে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে বলেছিলেন আপনার কন্যা নূরজাহানকে আমি চাইছি। আপনার মেয়েকে আমার স্কুলে পড়তে দিন আমি তার পড়াশুনার বিশেষ যত্ন নেব। ছোট্ট নূরী ছাত্রী হয়ে গেলো রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে। মাত্র কিছুদিন আগে চাঁদপুরে  নূরীর নানার বাড়ি থেকে স্ত্রী ও চার  বছরের মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন  মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। মেয়েলি করে বড় করতে চাননি নূরীকে।  নাকফুল খুলে, ছোট চুল করে দিয়েছিলেন সুবিধার জন্য।  ছোট্ট নূরী মাঝে মাঝেই পান সাজাতেন কবি নজরুল ইসলামের জন্য। কবি যে বাড়ির নিচ তলায় থাকতেন! না বাজি-কে (বেগম রোকেয়াকে স্কুলের সবাই ‘বাজি ’ বলে ডাকতো ) তেমন মনে নেই , আবছা অবয়ব আর গল্পের মিথ ছাড়া। কিন্তু বাজি সারাক্ষণ থাকতেন স্কুলের সব কর্মে, মর্মে। তারপর বাকিটা পথ  বেগম রোকেয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে নিজেকে দিয়ে চলেছেন। সওগাত পত্রিকায় নারীদের জন্য মাঝে মাঝে পাতা বেরতো। সুফিয়া কামালও যুক্ত ছিলেন সওগাতে। একদিন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বেগম সুফিয়া কামালকে ডেকে বললেন, অনিয়মিত মেয়েদের সংখ্যা বা পাতায় ফলপ্রসূ কিছু হবে না। মেয়েরা সংস্কৃতি অঙ্গনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না যদি না তাদের  নিজস্ব একটা পত্রিকা থাকে। যেখানে মেয়েরা নিজেদের মতামত এবং লেখার চর্চা করতে পারবে।  তিনি নারীদের জন্য নিয়মিত সাপ্তাহিকী বের করার পরামর্শ দেন। সুফিয়া কামাল ভীষণ উৎসাহিত হন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সুফিয়া কামালকে সম্পাদক এবং নূরজাহান বেগমকে ভারপ্রাপ্ত  সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। ২০ জুলাই ১৯৪৭, কলকাতা। নারীদের প্রথম সচিত্র সাপ্তাহিক ‘বেগম’ আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে ছাপা হয় বেগম রোকেয়ার ছবি। 

অপরাহ্নে

বাড়ির রান্নাঘর নিচতলায়। খাটোমতো মধ্যবয়সী এক নারী মাছ কুটছেন। তাকে ঘিরে ছয়টি বিড়াল বসে আছে। নিচ তলায় অনেক ক’টা  ঘরের প্রায় সবক’টাই ফাঁকা। কলকাতায় দুস্থ নারী ও এতিমদের নিয়ে অরফ্যানেজ হোম চালাতেন আপারা। দেশ ভাগের সময়  নিজেরাই শুধু আসেননি। হোমের দুস্থ পরিবারগুলোকেও নিয়ে এসেছিলেন। তারা এই ঘরগুলোতে থাকতেন। এখন ঘরগুলো ফাঁকা। এই বাড়িতেই বাস ছিল সাংবাদিক, সংগঠক, ছড়াকার রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের। নূরজাহান আপার জীবনসঙ্গী। তাঁদের দুই মেয়েও বেড়ে উঠেছেন এখানেই। তিন প্রজন্মের সরবতার স্মৃতি নিয়ে নূরজাহান বেগম এই বাড়িটির মতোই নির্জন আজ । 

একসময়ের বনেদি ওয়ারির চেহারা ভেঙে গড়ে উঠেছে উঁচু সব দালান। খানিক দূরে পাটুয়াটুলির বিখ্যাত সওগাত প্রেস। সওগাত ও বেগমের ছাপাখানা। ঢাকা-কলকাতার কবি সাহিত্যিকদের বৈঠকখানা বললেও কম বলা হবে। ওখানে নারীদের ‘বেগম ক্লাব’ও গড়ে উঠেছিল। এক সময়ের জমজমাট প্রেসটির চত্বরে এখন ঘাস। চারপাশের আওয়াজে মেশিনের শব্দ আলাদা করে শোনা যায় না। 

একসময়ের বনেদি ওয়ারির চেহারা ভেঙে গড়ে উঠেছে উঁচু সব দালান। খানিক দূরে পাটুয়াটুলির বিখ্যাত সওগাত প্রেস। সওগাত ও বেগমের ছাপাখানা। ঢাকা-কলকাতার কবি সাহিত্যিকদের বৈঠকখানা বললেও কম বলা হবে। ওখানে নারীদের ‘বেগম ক্লাব’ও গড়ে উঠেছিল। এক সময়ের জমজমাট প্রেসটির চত্বরে এখন ঘাস। চারপাশের আওয়াজে মেশিনের শব্দ আলাদা করে শোনা যায় না। 

শরত দাশ গুপ্ত লেইন, বর্তমানে নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন

আপা নামাজ পড়ছেন। শব্দ না করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পাশের রুমটায় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বসতেন। খুব ইচ্ছে হলো রুমটা দেখি। অনেকদিন পরিচ্ছন্ন করা হয়নি বলে আপা বলেছেন পরে একসময় দেখাবেন। ইশ, যদি ‘সওগাত’ বা পুরানো ‘বেগম’ পাওয়া যেত! হোক তা ধুলোমাখা। ‘বেগম; পত্রিকার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় শহরে-গ্রামে মেয়েদের কাছে পৃথিবীর খবরাখবর পৌঁছে যেত। ষাট ও সত্তরের দশকে বেগম পত্রিকার হাত ধরে এদেশে নারী লেখকদের বড় একটা অংশ বেরিয়েছে। সেই ‘বেগম’ এর জৌলুশ আজ নিভু নিভু …তবুও যে-কোনো সময় নিভে যাওয়া সোলতেটিকে দু’হাতের মুঠো ধরে বাঁচিয়ে রাখছেন তিনি। দরজা দিয়ে ঢুকার আগে জানালার গরাদ দিয়ে আপাকে দেখলাম। শ্বেতশুভ্র চুলে নিমগ্ন আপা। বিপরীত দরজায় অপরাহ্নের আলো। অলক্ষে চেষ্টা করেও ওই সময়টা তোলা গেল না। 

দরজা দিয়ে ঢুকার আগে জানালার গরাদ দিয়ে আপাকে দেখলাম। শ্বেতশুভ্র চুলে নিমগ্ন আপা। বিপরীত দরজায় অপরাহ্নের আলো। অলক্ষে চেষ্টা করেও ওই সময়টা তোলা গেল না। 

আপা খাবারের টেবিলে এগিয়ে গেলেন খবরের কাগজ সঙ্গে। এই বয়সেও সময়কে নিজের মতো ব্যবহার  করছেন। টেবিল সাজানোর ফাঁকে আতশ কাঁচে খবর পড়ছেন। নিজে তেমন কিছু খেলেন না, যত্ন করে আমাকে খাওয়াচ্ছেন। সত্তুর দশকের টেলিভিশনের উপরের ফ্রেম থেকে আপার  দুই মেয়ে তাকিয়ে আছেন । উনাদের অনপুস্থিতে আপার এই আপ্যায়নে সংকোচ লাগছে।  

শোবার ঘর

একসময় আপাকে হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে এলাম। তিনি সযত্নে আঁচল তুলে দিলেন মাথায়। নিজ থেকেই স্নিগ্ধ চোখে তাকালেন ক্যামেরার চোখে। একদম ‘বেগম’ সম্পাদিকা। ছবি তোলা যখন প্রায় শেষের দিকে তখন মজার এক ঘটনা ঘটলো। 

আপাকে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিতে বলে আমি অপেক্ষা করছি নরম আলোর। একসময় আপাকে হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে এলাম। তিনি সযত্নে আঁচল তুলে দিলেন মাথায়। নিজ থেকেই স্নিগ্ধ চোখে তাকালেন ক্যামেরার চোখে। একদম ‘বেগম’ সম্পাদিকা। ছবি তোলা যখন প্রায় শেষের দিকে তখন মজার এক ঘটনা ঘটলো।  নূরজাহান আপা আমাকে বিস্মিত করে টমির সাথে ছবি তোলার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ভয়ে-আতঙ্কে আমি যোজন দূরে একটা চেয়ারের আড়ালে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নিলাম। ছবি নয়, আপা নয়, আত্মরক্ষার তাগিদে সত্তর-দুইশো তাক করে আছি টমির দিকেই। টমিকে আনা হলো কিন্তু দরজা থেকে টমিকে কিছুতেই বারান্দায় আনা যাচ্ছে না। হুঙ্কার দূরে থাক আতঙ্ক নিয়ে টমি আমাকেই দেখছে! টমির পছন্দের বিস্কুটেও তাকে সহজ করা যাচ্ছে না। অনবরত শাটার পড়ছে ক্লিক ক্লিক …অদ্ভুত এক সুখে শব্দ করে হেসে উঠলাম, যখন বুঝলাম টমির আতঙ্কের বিষয় আমি।

নিজ বাস ভবনের বারান্দায়

অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং আবারও আসার আকুতি জানিয়ে নিচে এলাম। নূরজাহান আপা  দোতলার বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। নিম পাতার ফাঁক গলে স্বর্ণাভাগুলো ঝিরিঝিরি হয়ে দুলছিলো আপার অবয়বে, বদনে। আমি ভিউ ফাইন্ডার থেকে চোখ সরিয়ে খালি চোখে দুই স্বর্ণাভার সংযোগ দেখছিলাম। 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে