ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশান ও অসমতার কথন

0
339

রিপ্রেজেন্টেশানের রাজনীতি শিল্পের সব শাখাতেই আছে, রবীন্দ্রনাথকে যতটা পশ্চিম চেনে নোবেল-এর কল্যাণে, নজরুল, জীবনানন্দকে নয়; সত্যজিৎকে যেমন চেনেন অস্কার এর জন্য, ঋত্বিক ঘটককে কিন্তু তেমন একটা নয়। দেখা যাচ্ছে পুরস্কার বা সম্মাননা শিল্পীর শিল্পকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছে, গেট কিপারদের কাছে গুরুত্ব না পাওয়া শিল্প ও সাহিত্যগুলো বিশ্বব্যাপী প্রবাহিত না হয়ে ধীরে বহে, বলা যায় সাধারণ মানুষ সেই আর্ট সম্বন্ধেই জানে, যেটা তাকে জানানো হয়।।

শাসক শ্রেণি ক্যামেরার ক্ষমতাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল এবং নিয়ন্ত্রণও করেছিল, যার কারণে যখন সোশ্যাল ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি শুরু হয় সেটাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-এর অর্থায়নে।

ফটোগ্রাফির ইতিহাসও এর বাইরে নয়, বরঞ্চ অন্য শিল্পের শাখার চেয়ে ফটোগ্রাফি একটু বেশি রিপ্রেজেন্স-এর রাজনীতি দিয়ে আক্রান্ত হয়েছে, আর্লি ফটোগ্রাফি হিস্ট্রিতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও শোষিত জীবনব্যবস্থার ছবি পাওয়া যায় না অন্তত  বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত, অথচ কোডাক ব্রাউনি ততদিনে বেশ ভালোই প্রচলিত ছিল, ফটোগ্রাফির ‘এজ ইট ইজ কপি’ করার ক্ষমতা তখনও ছিল, কিন্তু স্টিল ফটোগ্রাফি একটু দেরিতে সমাজের দ্বন্দ্বগুলো নিয়ে হাজির হন, এই অবস্থাকে ফটোগ্রাফার-এর শুধু দায় তা আমার কাছে মনে হয় না, শাসক শ্রেণি ক্যামেরার ক্ষমতাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল এবং নিয়ন্ত্রণও করেছিল, যার কারণে যখন সোশ্যাল ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি শুরু হয় সেটাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-এর অর্থায়নে। তার মানে এই নয় আর্লি হিস্ট্রিতে কেউ সামাজিক তীব্র দ্বন্দ্ব-এর ছবি তোলেনি, হয়তো সংরক্ষণ করা যায়নি। কারণ আমরা বর্তমানে ভিভিয়ার মায়ার ( Vivian Maier)  -এর যে-স্ট্রিট ফটোগ্রাফি দেখি, সেগুলো তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয়, তিনি জীবৎকালে নিজেকে ফটোগ্রাফার বলে দাবীই করেননি, হয়তো এমন অনেকে থাকতে পারে।

সে-ক্ষেত্রে আর্লি ফটোগ্রাফি হিস্ট্রিতে দিঅনে আরবুস (Diane Arbus)-এর ছবিতে দেখা যায় বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের ছবি, এবং সমাজের সেই সকল শ্রেণির ছবি যারা অন্য ফটোগ্রাফারদের কাছে ছিল অপ্রয়োজনীয়। ওয়াকার ইভানস্, ডরথি ল্যাঙ (Walker Evans, Dorothea Lange), আরও হয়তো কিছু নাম পাওয়া যেতে পারে যারা সোশ্যাল ডকুমেন্টারি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং প্রজেক্টগুলো ছিলও গেট কিপারদের ফান্ডে। এবং সবাই পশ্চিমা ফটোগ্রাফার, সামাজিক ইস্যু নিয়ে প্রাচ্যের ফটোগ্রাফারদের পাই আরও অনেক পরে। রাজা দীন দয়ালের রাজা মহারাজার গুণকীর্তন টাইপ ফটোগ্রাফি চর্চা ছিল এবং তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, বলা যায় হোয়াইট সুপ্রিমেসির গেট কিপারদের জন্য সেফ অপশন ছিলেন।

ফটোগ্রাফি এজেন্সি ও ক্রেতার যে মার্কেট সেটা এখনও ইউরোপ ও অ্যামেরিকার দখলে, পরিবর্তন যতটুকু হয়েছে লোকাল সবখানেই স্টিল ফটোগ্রাফির একটা মার্কেট তৈরি হয়েছে। কিন্তু মোটা দাগে স্টিল ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ইউরোপ(ব্রিটেন সহ) ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রেস্ট অফ দা ওয়ার্ল্ড  কঞ্জুমার বৈকি অন্য কিছু নয়।

ইউজিন স্মিথ (Eugin Smith)-এর ভিলেজ ডক্টর-এ দেখা যায়, ভালো কম্পোজিশন-এর ছবি, কিন্তু ঘুরেফিরে সেই শিক্ষিত শ্রেণিরই গল্প, চাষাভুষা, শ্রমিক, নির্যাতিত জনগণ, ও উপনিবেশিক আগ্রাসনের ফটোগ্রাফিও খুব একটা নেই। এবং এই যে প্রাচ্য ও পশ্চিমের কথা বলা হচ্ছে ক্ষমতার বলয় বুঝানোর জন্য, উপনিবেশিক শাসন দিয়ে যখন আফ্রিকা ও ভারত উপমহাদেশ চালিত হচ্ছিল তখন নিশ্চয়ই স্টিল ফটোগ্রাফির প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক তারা ছিলেন না, বরঞ্চ ফটোগ্রাফি বিবর্তনে তারা ক্যামেরা ক্রেতা ও ইমেজ কীভাবে ও কোনটা প্রদর্শিত হবে তার  দর্শক। এবং এখনও তাই, ফটোগ্রাফি এজেন্সি ও ক্রেতার যে মার্কেট সেটা এখনও ইউরোপ ও আমেরিকার দখলে, পরিবর্তন যতটুকু হয়েছে লোকাল, সবখানেই স্টিল ফটোগ্রাফির একটা মার্কেট তৈরি হয়েছে। কিন্তু মোটা দাগে স্টিল ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ইউরোপ (ব্রিটেন সহ) ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রেস্ট অফ দা ওয়ার্ল্ড কঞ্জুমার বৈকি অন্যকিছু নয়।

ক্যামেরা বন্দুক-এর মতো ক্ষমতাবান, অতএব বিক্রি করলেই হচ্ছে না, যে ইমেজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি-উপায়ে তৈরি হচ্ছে তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও ক্ষমতাবানদের কাজ, নইলে ফটোগ্রাফি শিল্পের যে-কোনো শাখার চেয়ে বিধ্বংশী অস্ত্র হয়ে তাদের ধ্বংস করতে পারে। ফটোগ্রাফি প্রদর্শনের রাজনীতি তাই সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল ও এখনও আছে।

ইউজিন স্মিথ এর প্রথম ডকুমেন্টারি গল্প কান্ট্রি ডক্টর

আবার স্টিল ফটোগ্রাফি যুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের যে কিছু করার নাই, শুধু দর্শকমাত্র সেই সম্মতি আমাদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়, শেষ একশো বছরের যত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সেইগুলোর নেরেটিভ তৈরিতে ফটোগ্রাফির যারা প্রদর্শনের কাজটা করে তারা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছে তাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ফটোগ্রাফারদের ছবি তুলতে বাধ্য করে সোশ্যাল ইস্যুর বেলায় অন্তত। সেক্ষেত্রে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি অনেক রাজনীতিমুক্ত, ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফাররা যে আর্কাইভ তৈরি করেছেন তা অনেক ভিন্ন মাত্রার। 

ফটোগ্রাফি রি-প্রেজেন্টেশন-এর রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করা হয় প্রদর্শন বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে; কোন ছবি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে, কোন ইস্যুর ছবি প্রদশর্নী হবে এবং কোন কোন ছবি এ্যাওয়ার্ড পাবে ও কোন ধরনের প্রজেক্টে টাকা দেওয়া হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে।

ইউক্রেন নিয়ে যে পরিমাণ ছবি আমরা দেখতে পেলাম, তার কানাকড়ি ছবিও যদি ইয়েমেনের আগ্রাসন নিয়ে থাকতো, তাহলে হয়তো এই যুদ্ধ নিয়ে একটা সমাধানে পৌঁছাতে সাহায্য করতো।

শেষ একশো বছরের ফটোগ্রাফি হিস্ট্রি অনেক কালারফুল, অনেক বিনোদনময় আবার এইসব কিছুর মধ্যেও ক্ষমতাবান যারা প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল, হোয়াইট সুপ্রিমেসির সুবাদে আমরা দেখতে পাই, যারা একসময় উপনিবেশিক শাসন করেছিল তারাই আফ্রিকা ও এশিয়ার ত্রাণকর্তা এমন একটা ধারণা আছে, যেখানে দেখা যায় আফ্রিকার জীর্ণশীর্ণ মানুষ আর তাকে কে সাহায্য করছে তার বিজ্ঞাপনী ছবি, যদিও আমরা জানি এখনও আফ্রিকা কীভাবে ইউরোপ দিয়ে বিভিন্নভাবে শোষিত।

এবং বর্তমান সময়ের ফটো জার্নালিজম প্র্যাকটিস নিয়ে যদি বলি, তাহলে আশ্চর্যজনকভাবে ইয়েমেনের ছবির অভাব, ওখানে কি হচ্ছে তার স্পষ্ট ফটো স্টোরি একদমই যথেষ্ট নয়। ইউক্রেন নিয়ে যে পরিমাণ ছবি আমরা দেখতে পেলাম, তার কানাকড়ি ছবিও যদি ইয়েমেনের আগ্রাসন নিয়ে থাকতো, তাহলে হয়তো এই যুদ্ধ নিয়ে একটা সমাধানে পৌঁছাতে সাহায্য করতো। আবার সাউথ এশিয়ার গুরুত্বের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্ব পায় যেখানে ক্ষমতাধররা একে অন্যকে দোষারোপ করার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়, যার কারণে কি অনেক বেশি রোহিঙ্গা ইস্যুর কাভারেজ?

ভারতের নয়াদিল্লিতে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মৃতদেহ একটি শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে

কিংবা করোনা ভাইরাসের ছবি নিয়ে যদি আলোচনায় আসি তাহলে যখন ইউরোপ ও বাঘা-বাঘা দেশ আক্রান্ত তখন কি ভারতের শ্মশানের ছবিটাই ভাইরাল হবে? পশ্চিম কি তার অসহায়তা দেখাতে চায় না ? আমাদের মনে আছে আফ্রিকার ভাইরাসে আক্রান্ত ছবি আর পশ্চিমের এইবার করোনাতে কাইত হওয়ার ছবি একরকম নয়। বরঞ্চ ঢিলেঢালা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে