কিছু কিছু সময় আসে, যখন শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি সত্য মনে হয়। চারপাশের বিপুল উচ্চারণ, মত, মতাদর্শ, বিভাজন ও ক্লান্তির ভেতর দাঁড়িয়ে তখন মানুষ ফিরে যেতে চায় নিজের অন্তর্গত কক্ষে— যেখানে শিল্প এখনো একটি ব্যক্তিগত ও বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা। এই সংখ্যার লেখাগুলো যেন সেই অভ্যন্তরীণ যাত্রারই বিচিত্র মানচিত্র।
কোথাও একজন শিল্পী আত্মপ্রতিকৃতির ভেতর নিজেকেই হারিয়ে ফেলছেন, কোথাও বিমূর্ততা হয়ে উঠছে আত্মরক্ষার গোপন ভাষা। কোথাও চলচ্চিত্র আমাদের নিয়ে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নতা, নৈরাজ্য ও রাষ্ট্রের ভাঙা করিডোরে; কোথাও নদী কেবল নদী নয়, মানুষের স্মৃতি, দেশভাগ, উচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ শরীর। আলোকচিত্র এখানে শুধু দৃশ্য সংরক্ষণ করে না— মুহূর্তের অন্তর্দৃষ্টি ধরে রাখে। আবার স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ভিড়ের মধ্যেও থেকে যায় মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনচিহ্ন।
এই সংখ্যায় আমরা ফিরে দেখি রঘু রাইয়ের দৃষ্টি, আফজাল এইচ চৌধুরীর নীরব উত্তরাধিকার, ঋত্বিক ঘটকের তীব্র আত্মস্বীকার, কিংবা কিউবার রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের ভাষাকে। অন্যদিকে তৈয়বা বেগম লিপির আলাপচারিতায় শিল্পচর্চা হয়ে ওঠে সমষ্টিগত দায়ের প্রশ্ন। আর এসবের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, ক্ষয়, প্রেম, প্রতিরোধ ও অস্তিত্বের অস্বস্তি।
সম্ভবত শিল্পের সবচেয়ে বড় কাজ উত্তর দেওয়া নয়; বরং মানুষের ভেতরে এমন কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে তোলা, যা দীর্ঘদিন নীরবে থেকে যায়। চিত্রসূত্রের এই সংখ্যার লেখাগুলোও সেই নীরব অনুরণনের ভেতর দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। আলাদা আলাদা উচ্চারণ হয়েও তারা যেন শেষ পর্যন্ত এসে মিশেছে একই অস্থিরতায়— মানুষকে বোঝার অস্থিরতায়, সময়কে ধরে রাখার অস্থিরতায়।
এই দ্রুত বিস্মৃতির সময়ে, আমরা এখনও বিশ্বাস করতে চাই— একটি লেখা, একটি স্থিরচিত্র, একটি দৃশ্য কিংবা একটি অসমাপ্ত বাক্যও মানুষের ভেতরে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে।
আসমা বীথি
সম্পাদক, চিত্রসূত্র
