প্রথম পাতা লেখক রুহিনা ফেরদৌস শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির সাথে একান্ত আলাপচারিতা

শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির সাথে একান্ত আলাপচারিতা

0

রুহিনা ফেরদৌস
২০২২ সালের ১৮ জুন থেকে শুরু করে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জার্মানির ক্যাসেল শহরে আনুষ্ঠিত হয় কনটেম্পরারি আর্ট এক্সিবিশন ‘ডকুমেন্টা ফিফটিন’। প্রতি পাঁচ বছরের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত ডকুমেন্টার ১৫তম এ-সংস্করণটি কয়েকটি কারণে বিশেষ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি কারণের একটি, মূল আয়োজনের কিউরেটর ইন্দোনেশিয়ার আর্ট কালেকটিভ ‘রুওয়াংরুপা’। দ্বিতীয়ত ডকুমেন্টা ফিফটিনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট। ২০০২ সালে শুরু হওয়া অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি কথা বলেছেন ডকুমেন্টা ফিফটিন নিয়ে। ড্রয়িং, পেইন্টিং, ইলাস্ট্রেশন, ভিডিও আর্টসহ ক্রস-মিডিয়ার মাধ্যমে তিনি প্রশ্ন করেন নারীবাদ, লিঙ্গ বৈষম্যসহ বিভিন্ন বিষয় ঘিরে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছে ১৮ নভেম্বর ২০২৩ সালে।
চিত্রসূত্র’র পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন— রুহিনা ফেরদৌস

২০২০ সালের মার্চ অথবা এপ্রিলের কথা। জাকার্তাভিত্তিক কন্টেম্পরারি আর্ট কালেক্টিভ ‘রুয়াংরুপার’ কিউরেটর আদে দার্মাওয়ান যোগাযোগ করে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট ও আমাদের কাজ সম্পর্কে জানতে চান। তখন আমরা জিরো-ওয়েস্ট ফুড আর্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এ-কাজের সঙ্গে চাষাবাসের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, ছোট বা বড়ো পরিসরে খাদ্য উৎপাদন বা খাবার বানিয়ে অথবা তৈরি খাবার বিনামূল্যে বিতরণ করার পাশাপাশি ‘নো ওয়েস্ট মেথড’ ফোকাস করে যে-কোনো ধরনের শিল্পকলা সৃষ্টি। বাংলাদেশে তখন কোভিড-১৯ লকডাউন চলছে। সবার মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব। এ-কাজের মাধ্যমে আমরা ওই দূরত্বটাকে ঘুচানোর কথা ভাবছি। আমরা একটা পিডিএফ ফাইলও সবাইকে ইমেইল করি যদি দূর থেকে কেউ আগ্রহী হয়ে এতে অংশগ্রহণ করে। জিরো ওয়েস্ট ফুড আর্টে আমরা কীভাবে অন্য শিল্পীদের সম্পৃক্ত করছি— আদে-কে সেসব বলি।

আমাদের জিরো-ওয়েস্ট ফুড আর্ট নিয়ে চীনের এক পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। আমাদের কাজ সম্পর্কে জেনে আদে ভীষণ আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলো যে, আমরা দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদে কী করবো বলে চিন্তা করছি। এরপর থেকে আদে ও তার দলের সঙ্গে আমাদের একটার পর একটা মিটিং৮৭উই৬৫তে থাকে। ওরা আমাদের আগের কাজগুলো সম্পর্কেও জানতে চায়। আমরাও একে একে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো বলি। প্রায়ই জুম মিটিংয়ে আমাদের আলাপ চলতে থাকে । আমরা দেখি সবসময় নতুন নতুন লোক মিটিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন। আমি ও মাহবুব (শিল্পী মাহবুবুর রহমান) বুঝতে পারছিলাম না যে, কি ঘটছে! এর ছয় থেকে সাত মাস পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে আদে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চায়, আমরা ডকুমেন্টা ফিফটিনে অংশ নিতে আগ্রহী কিনা?

একদম আকাশ থেকে পড়লাম। আমাদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে তখন জানাতে না করা হয়, কারণ ডকুমেন্টা থেকে সাধারণত ওরা অফিশিয়ালি ঘোষণাটা দেয়। আমরা শুধু বলেছিলাম যে, আমাদের ট্রাস্টিদের জানাতে হবে। এরপর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ওরা অফিশিয়ালি সবাইকে জানায়।

হ্যাঁ। সেবার বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন শিল্পী নাঈম মোহাইমেন। তখন দুই জায়গাতে ডকুমেন্টার আয়োজন হয়, একটা কাসেলে অন্যটা গ্রিসে। নাঈমসহ সব শিল্পীদের কাজ দুটো জায়গাতেই ছিল। একটা পার্ট ছিল বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে, এ অংশটির কিউরেটর ছিলেন নাতাশা গিনওয়ালা,ওইখানে আমাদের আবেদিন স্যারের (জয়নুল আবেদিন) দুটো কাজ ছিল। তবে ডকুমেন্টার একটি সংস্করণের সঙ্গে কিন্তু অন্যটির তুলনা করা যায় না। প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন বিষয় থাকে। এবারের ডকুমেন্টা যেমন অনেক বেশি অলাভজনক প্লাটফর্ম/কালেকটিভ নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তটা ডকুমেন্টা নেয় না, আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসেবে আয়োজনের মূল কিউরেটর হিসেবে যারা থাকেন, তারা ঠিক করেন।

ডকুমেন্টা ফিফটিনে বাংলাদেশ থেকে আমাদের প্রজেক্টটি ছিল সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল। শুরুতে কাজ সম্পর্কে ধারণা দিতে আমাদের পাঁচ থেকে ছয়টি প্রজেক্ট সম্পর্কে ওদের বলি। আমাদের মনে হয়েছিল, এগুলোর মধ্যে থেকে হয়তো দুই থেকে তিনটি প্রজেক্ট পছন্দ করতে পারে। কিন্তু ওরা সবগুলো প্রজেক্টেই পছন্দ করে। আমাদের একটি প্রজেক্টের সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক নিয়ে জানতে চাইলে ওদের কাছে আমরা সামগ্রিক আলাপটা তুলে ধরি। কিন্তু সবগুলো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করাটা তো ব্যয়বহুল। এরপর ওরা আমাদের বলে যে, “খরচ নিয়ে চিন্তা করো না, একটি প্রজেক্টও বাদ দেয়া যাবে না। তবে তোমাদের একটু কষ্ট করে কাজগুলো করতে হবে। কেননা আমাদের নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে।”  যদিও ডকুমেন্টা থেকে ওরা ওদের নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে বেশি অর্থ আমাদের জন্য বরাদ্দ করে।

ডকুমেন্টার প্রজেক্ট প্রোপোজালে আমরা আলাপটা শুরু করেছিলাম “খাদ্য ও খাদ্য রাজনীতি” (ফুড অ্যান্ড ফুড পলিটিক্স) নিয়ে। তখন করোনার সময়, লক ডাউন চলছে, আমরা কিছু গবেষণা করারও সুযোগ পাই। বরফ কোম্পানিগুলো কীভাবে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের কর্পোরেট ব্যবসাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে! কীভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে! আমাদের দেশে একটা সময় এগুলো কম ছিল, কিন্তু এখন গ্রামে-গঞ্জেও প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে— এই যে জীবনের পরিবর্তন, এগুলো নিয়েই আমরা ভাবছিলাম।   

প্রান্তিকের প্রাকৃতজনের জার্নিটা শুরু হয় ২০০৯ সালে। আমাদের লক্ষ্য ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর কাছে যাওয়া ও তাদের জীবনযাপনকে বোঝার চেষ্টা করা। ক্রিটিকাল কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, তবে রাজনৈতিকভাবে ওরা অনেকভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত— বিষয়গুলোকে এমন জায়গা থেকে বিশ্লেষণ করা। আমরা মূল জনপদের লোকেরা খুব কম জানি যে আদিবাসীরা কোন পরিস্থিতিতে বসবাস করে। আমরা আমাদের সীমান্ত নিয়ে কথা বলি। বিভক্তি নিয়ে আমাদের অনেক অক্ষেপ বা কষ্ট আছে। আদিবাসী গ্রামগুলোও কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে। যে মেয়েটা বিয়ের পর যখন ইচ্ছা তখন বাবার বাড়িতে আসতে পারতো, সে এখন আর তা পারে না। ওকে অনেক দূর দিয়ে ঘুরে ঘুরে পাসপোর্ট নিয়ে বাবার বাড়িতে যেতে হয়। রাজনৈতিকভাবে ওরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে, আমরা সেগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা যদিও বিষয়গুলোকে খুব বেশি নাড়া দেওয়ার মতো জায়গায় নেই, কিন্তু ওদের কাছে গিয়ে ওদের পাশে থেকে ওদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা তো করতে পারি। তাই মান্দি, ত্রিপুরা, মনিপুরি,হাজং,ওরাং,ম্রো সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আমরা উপকূলীয় এলাকাগুলোতে রাখাইনদের গ্রামগুলিতে যেতে শুরু করি।  

এরমধ্যে মূলত সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে আমরা বিভিন্ন শিল্পীদের একটি দল নিয়ে যাই, যারা যে কোনো চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে যে কোনো জায়গায় থাকতে সক্ষম। কোথাও হয়তো বিদ্যুৎ নেই, কোথাও পানির সরবরাহ। আমরা কখনো মন্দিরে থেকেছি, কোথাও তাঁবু পেতে কিংবা কারো গোডাউন বা কোনো স্কুলঘরেও থাকতে হয়েছে। কাজগুলো ‘প্রডিউজ প্রোডাক্ট বেজ’ না, ‘প্রোসেস বেজ’ ছিল। তাই আমাদের পক্ষ থেকে শিল্পীদের কোনো কিছু বানিয়ে দেখানোর বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়নি। আমরা বরং অভিজ্ঞতা সংগ্রহের দিকে জোর দিয়েছি। যেমন স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে মেশা, ওদের খাবার খাওয়া, জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ এবং ওদের যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা রিচুয়ালগুলো আছে— যেগুলো ক্রমশ সম্প্রদায়ের আকার ছোট হয়ে যাওয়াতে কিংবা অর্থের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে— আমাদের যৎসামান্য অর্থ দিয়ে সেগুলো আবার স্মরণ বা পুনরুদ্ধার করা। এ কাজগুলো আমরা ১৪ বছর (বর্তমানে) ধরে করে আসছি। প্রান্তিকের প্রাকৃতজনের ধারাবাহিকতা হিসেবে ‘ডকুমেন্টা ফিফটিনের জন্য’ পরবর্তীতে “রিভিজিট” নামে একটা প্রজেক্ট করি। যেখানে আমাদের চেষ্টা ছিল বারো বছর পর (২০২১ সালে) ওই জায়গাগুলোতে ফিরে গিয়ে দেখা যে এখন কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে।   

পটুয়াখালির দিকে সুন্দরবনের কাছাকাছি তুফানের চরে গিয়ে দেখলাম আগে যে গাছগুলো ছিল, তা আর নেই। ওপারে বিশাল পাওয়ার প্লান্ট। এ বিষয়গুলোর ভিডিও ধারণের পাশাপাশি সিরিজ অব ফটোগ্রাফি করেছি আমরা। বারো বছর আগে যখন গিয়েছিলাম, তখন এ এলাকাগুলোতে আমাদের শিল্পীরা নানা ধরনের কাজ করেছিলেন। ওই কাজের ছবি এবং প্রতিটি এলাকার মানুষের ছবি বা নানা কর্মকাণ্ডের ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে যাই এবার। যেমন বারো বছর আগে ছোট যে মেয়েটির ছবি তুলেছিলাম, এবার গিয়ে দেখি ওর বিয়ে হয়ে গেছে।

বিরিশিরিতে দূর্গাপুরে যেমন ক্রকারিস তৈরির জন্য সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিগুলো সাদা মাটি তুলে নেয়ার ফলে পাহাড় ধসে পড়ছে। বিপিনগঞ্জ বলে প্রত্যন্ত একটা জায়গা আছে, সেখানে কিছুদিন আগে গিয়ে আমরা দেখেছি, ওই গ্রামের হাজংদের রান্নাতে বাটা মশলার প্রচলন আর নেই, তারা প্যাকেটজাত বিভিন্ন গুড়ো মশলা ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সবার হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। আগে অনেক গ্রামে টয়লেট ছিল না, আমরা বানিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যায় কেউ আর পুকুরে গোসল করে না। এভাবে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। এ প্রজেক্টে আমরা একটা বড় দল মিলে একবছর ধরে প্রায় আটটা সম্প্রদায় আর সাতটা অঞ্চলে ঘুরে বেড়াই। একজন গবেষককে এক বছরের জন্য গ্রান্ট দেওয়া হয়; তার কাজ ছিল র‌্যান্ডমলি কিচেনগুলোতে যাওয়া ও দেখা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলা, তারা কী রান্না করছে সেই রেসিপিগুলোকে নেয়া এবং আগে কী ধরনের রেসিপি ছিল তা সংগ্রহ করা। Mono farming already took place in hilly districts. আমরা আলী কদম বা মধুপুর ফরেস্টে গিয়ে দেখেছি পুরোনো জুম চাষ বন্ধ করে কীভাবে কলা বাগান, আনারস বাগান বা তামাক বাগানগুলো জায়গা করে নিয়েছে।

[ FERA _ REVISIT FILM ]

সাদা মাটির যে পাহাড়টা আমরা দেখে এসেছিলাম, সেখানে মাটি কাটা বন্ধ করতে স্থানীয়দের আন্দোলন সরকার বন্ধ করে দেয়। বারো বছর পর গিয়ে দেখলাম ওই পাহাড়ের চারভাগের তিনভাগ মাটিই কাটা হয়ে গেছে। গর্ত হয়ে আছে। সিলেটের ভোলাগঞ্জে শারপিন টিলায় এবার গিয়ে দেখলাম যে বড় লেক হয়ে গেছে। সরকার যদিও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এরইমধ্যে পাথর উঠানো হয়েছে। একেকটা জায়গার এক এক ধরনের পরিস্থিতি ও সমস্যা। পটুয়াখালির দিকে সুন্দরবনের কাছাকাছি তুফানের চরে গিয়ে দেখলাম আগে যে গাছগুলো ছিল, তা আর নেই। ওপারে বিশাল পাওয়ার প্লান্ট। এ বিষয়গুলোর ভিডিও ধারণের পাশাপাশি সিরিজ অব ফটোগ্রাফি করেছি আমরা। বারো বছর আগে যখন গিয়েছিলাম, তখন এ এলাকাগুলোতে আমাদের শিল্পীরা নানা ধরনের কাজ করেছিলেন। ওই কাজের ছবি এবং প্রতিটি এলাকার মানুষের ছবি বা নানা কর্মকাণ্ডের ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে যাই এবার। যেমন বারো বছর আগে ছোট যে মেয়েটির ছবি তুলেছিলাম, এবার গিয়ে দেখি ওর বিয়ে হয়ে গেছে।

[ FERA _ REVISIT PHOTOGRAPHY ]

আমাদের এই প্রজেক্টের নাম “ফেরা”। ডকুমেন্টা হালেতে একটা রুম আছে যেখানে ওরা ফিল্ম দেখায়। আমরা একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাই, যা সত্যিই ছিল দেখার মতো একটা কাজ। ওই কক্ষে প্রবেশের আগে আমরা আলোকচিত্রের একটা বিভাগ রেখেছিলাম। মূল প্রজেকশনটা অনেক বড় ছিল, ৩৬ ফিট লম্বা ফ্রেমে তিনটি চ্যানেলে দেখানো হয়েছিল। ফিল্ম ও ফটোগ্রাফির এ গোটা প্রজেক্টটাকেই রাখা হয় ফেরার মধ্যে। ২০ মিনিটের আরেকটা ডকুমেন্টরি ফিল্ম ছিল, যা টিভি মনিটরে দেখানো হয়। ওটা ছিল ডকুমেন্টার জন্য আমাদের কাজের নেপথ্যের দৃশ্যধারণ নিয়ে। আর দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপরে মূল যে ডকুমেন্টারিটা আমরা বানাই রিভিজিট নিয়ে, ওটা ছিল ৪০ মিনিটের।

ডকুমেন্টার কাজ প্রদর্শনের স্থায়ী জায়গাগুলোর মধ্যে একটি ডকুমেন্টা হালে। আমাদের জন্য এটি বরাদ্দ দেয়া হয়। জায়গা দেখতে যাওয়ার আগে আমি আর মাহবুব মনে করেছিলাম হয়তো ছোট পরিসরেই কাজগুলো করতে হবে। কিন্তু ২০২১ সালে গিয়ে জায়গা দেখার পর আমাদের রীতিমতো মাথা খারাপ দশা— অনেক বড় জায়গা, অনেক বড় প্রজেক্ট করা যাবে। এ পর্যায়ে আমরা আমাদের পুরানো রিসোর্সগুলোকে কাজে লাগাই। আমাদের গ্রাফিতির চর্চা আছে, তবে ওখানে তা করাটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। কেননা গ্রাফিতি করতে হলে আমাদের শিল্পীদের ওখানে অনেক দিন থাকতে হবে। এ পর্যায়ে গোটা কাজটিকে আমরা দুইভাগে ভাগ করি। একটা অংশ বাংলাদেশে থেকে করা হয়, যা ক্যানভাসে করে ওখানে নিয়ে যাই। আর বাকী অংশটা ওখানে গিয়ে করি। এভাবে কাজটা দ্রুত হয়। ফুড ক্রাইসিস, ফুড অ্যাক্ট, দুর্ভিক্ষ ও দেশ বিভাজন নিয়ে এপার বাংলা-ওপার বাংলার যত সিনেমা আছে একটি রিসার্চ টিম তৈরি করে আমরা তা দেখা শুরু করি। একটা পর্যায়ে এসে দুই বাংলার সাতটির মতো সিনেমা নিয়ে আমরা গ্রাফিতি সাজাই। এখানে চারমাস ধরে কাজটা সাজানোর পর আমরা এগুলো সব ওখানে নিয়ে যাই। সঙ্গে দশজন শিল্পীকেও নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে একজন রিকশা পেইন্টার, দুইজন সিনেমার ব্যানার তৈরির শিল্পী ছিলেন। ডকুমেন্টা হালের মূল দেয়ালজুড়ে আমরা কাজটা করি। ১৪৫X৩০ ফুট মাপের এই গ্রাফিতির নাম দেওয়া হয় “ছায়াছবি।” কালারকিউবস (Kolorcubes) নামে ক্যাসেলে একটা চমৎকার গ্রাফিতি স্টুডিও রয়েছে। ওদের সঙ্গে আমাদের দশজন আর্টিস্ট মিলে একটা পাঁচতলা ভবনের বাইরের পুরো ওয়াল জুড়ে দুই দেশের জনপ্রিয় চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটি গ্রাফিতি করেন। যেমন আমাদের দেশের সঙ্গীত শিল্পী আজম খান কিংবা অভিনেত্রী ববিতা। ওদের দেশেরও জনপ্রিয় কোনো অভিনেতা বা গায়ক। স্টেশনে নেমে ডকুমেন্টার মূল কয়েকটা ভেনুর দিকে সোজা হেঁটে যাওয়ার পথ জুড়ে রাখা গ্রাফিতিটি সবার চোখে পড়বেই।       

[ GRAFFITI _ CITY CENTER ]

[ CHAYACHOBI _ MURAL PROJECT ON BANGLA CINEMA ]

আমরা শিল্পীদের বলেছিলাম খাদ্য রাজনীতি, খাদ্যের বিষক্রিয়া ঘিরে বর্তমান বিশ্বে যা যা ঘটছে (খাদ্য ঘিরে যত নাটক) তার ওপর নিজেদের মতো করে কাজ করতে। শুরুতে কোনো শিল্পীকে আমরা বলিনি যে, কাজগুলো ডকুমেন্টাতে দেখানো হবে। তারপরও কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে কাজ শুরু করেন, কেউ করেন না। অনেকে হয়তো টপিকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারেন নি, আবার অনেকের ভিন্ন স্টাইল থাকে। এভাবে শেষ পর্যন্ত ১১ জন শিল্পী কাজ শুরু করেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে নিজের গল্পটা বলেছেন। তবে সিরামিককে আমরা প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিই, এছাড়া হালকা কাঠামো আর মেটালের কাজ ছিল। এ কাজটিকে আমরা তুলে ধরি টিন দিয়ে ছাওয়া গ্রামের বাজারের আদলে। পাশেই সুপারশপের মতো অন্য একটা কাঠামো তৈরি করা হয়। দুটো অংশকেই স্টোরি টেলিংয়ের মতো করে রাখতে চেয়েছি। বাজারের অংশের বাইরে বাজারের আবহ রেখে ভেতরটা আমরা মিউজিয়ামের মতো করে সাজাই। এ জায়গাটা থেকে বের হয়েই ডকুমেন্টা হালের গেট।  

[ RASAD _ FOOD OBJECTS ]

In the whole world is in seed politics. বীজগুলো সিড পলিটিক্সের মধ্যে ঢুকে গেছে। ফলের বীজ থেকে এখন আর গাছ জন্মে না। নতুন করে বীজ কিনে বুনতে হয়। এখন অর্গানিক বীজ খুঁজে পাওয়াটাও কঠিন। মধুপুরের তিনটি গ্রামে— মান্দি, কোচ ও একটা মুসলিম গ্রামে— আমরা পালান (সবজি বাগান) এবং পাকঘরের বাঁশের কাঠামো আর বাঁশ দিয়ে নানারকমের ডিজাইন বানাই। ডকুমেন্টার জায়গা দেখতে যাওয়ার সময় আমরা বাংলাদেশ থেকে কিছু বীজ নিয়ে যাই— যেমন সীম, করলা, লাউ, মিস্টি কুমড়া, তরমুজ, বাঙ্গি বিভিন্ন রকম শাকসহ হাতের কাছে যা পেয়েছিলাম। আমাদের অনেক সবজি আছে যা ওরা চিনে না। তবে ডকুমেন্টাতে আমাদের করা বাগানে ইউরোপীয় সবজি ও বাংলাদেশী সবজির মিশেল ছিল। আমরা ওদের কিছু বীজও বপন করি। তবে বেশিরভাগই ছিল আমাদের দেশীয় সবজি। জার্মানিতে বেশকিছু অর্গানিক সবজির বাগান আছে। তরুণ ছেলেমেয়েরা এগুলো দেখাশুনা করে। আমরা ওদের কাছে বীজগুলো দিয়ে আসি। ওরা তা বুনে দেয়। তবে সবজি বপনের গোটা কাজটির দায়িত্বেই ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। ওর নাম কার্স্টেন উইনমুথ (Karsten Winnemuth)। ওসহ আরো দুইজন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বৃত্ততে একমাসের রেসিডেন্সিতে আসেন। যা বৃহত্তর ইকো সিস্টেমের সঙ্গে কাজ করার একটি ফলাফল।

[ PALAN _ ORGANIC KITCHEN GARDEN ]

কার্স্টেন অর্গানিক ফুড মুভমেন্টের সঙ্গে জড়িত। ও নিজ হাতে আমাদের বাগানটা সাজায়। আমরা স্রেফ ওর সহযোগী হয়ে কাজ করে যাই। বাগানের শেষ দিকে একটা রান্নাঘর তৈরি করা হয়, নাম দেওয়া হয় “পাকঘর”। বাঁশ দিয়ে তৈরি চমৎকার একটি কাঠামো। ডকুমেন্টা থেকে আমাদের রান্নাঘরের যাবতীয় সেটআপ করে দেয়। আমরা ওখানকার সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেট থেকে সব ধরনের ক্রকারিস কিনে নিই। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণও কেনা হয়। সম্পূর্ণ খরচটা ডকুমেন্টা বহন করে। আর সবজি বাগানের নাম “পালান”।

আমাদের দেশের গ্রামের নারীরা রান্না করতে করতে বা শাক-সবজি কাটতে কাটতে রান্নাঘরের পাশে বীজ ছুড়ে ফেলতেন। ওই ফেলনা বীজ থেকে সবজি বাগান হতো— যা পালান নামে পরিচিত। পালান শেষ হয়েই ছিল আমাদের পাকঘর। ডকুমেন্টা একশ দিনের হয়, তাই আমরা ঠিক করি পাকঘরে একশ দিনে একশ ধরনের রান্না হবে, ১০০টা ন্যাশনালিটির। এরপর অনলাইন, অফলাইনে প্রচারণা চালানো হয়, এখানে অংশগ্রহণ করতে হলে আগে থেকে সাইনআপ করতে হবে। এতে এতোবেশি সংখ্যক লোক সাড়া দেয় যে, পরের দিকে আমরা আর সিডিউল দিতে পারি না। প্রতিদিন কোনো না কোনো দেশের প্রতিনিধি, কোনো একটা দল বা একটা প্ল্যাটফর্ম, এমনকি বিশ্ববিখ্যাত কোনো শেফ অন্য দেশ থেকে এসেও এখানে রান্না করেছেন। 

[ PAKGHOR _ THE SOCIAL KITCHEN ]

আমাদের কাজটা হয় পুরোটার ডকুমেন্টশন করা। পাকঘর আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ছোটবেলায় দেখতাম মফস্বলে বা গ্রামের বাড়িতে কোনো লিভিং রুম কনসেপ্ট ছিল না। পাকঘরের একদিকে হয়তো মা-চাচীরা রান্না করছে, অন্য একটা কর্নারে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছি। পাশের বাড়ি থেকে কেউ বেড়াতে আসছে, এখানে বসেই গল্প করছে। ডকুমেন্টাতে আমরা ঠিক এমন আবহ রাখার চেষ্টা করেছি। কেউ এসে এখানে পারফর্ম করতে চাইলে, আমরা তাকে সুযোগ করে দিয়েছি। ডকুমেন্টার অন্যান্য প্রোগ্রামে যেতে টিকেট লাগলেও পাকঘরসহ আরো কয়েকটা জায়গা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।

তবে এ ধরনের পাকঘরে রান্নার প্রস্তুতি আমরা বাংলাদেশে থেকেই নেওয়া শুরু করেছিলাম। যেমন, শিল্পী ফারেহা জেবা ও শিল্পী সাইদুল হক জুইসের বাসায় রান্নার আয়োজন করা হয়। সাভারে শিল্পানুরাগী আশরাফ কায়সারের বাসায়, আর বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টে শিল্পী তরুণ ঘোষ এবং আর এ কাজল রান্না করেন। সবশেষে আমার আর মাহবুবের স্টুডিও/বাসাতে আমরা বড় করে ‘পাকঘর ঢাকা’ আয়োজন করি, যেখানে শিল্পীরাসহ আরো অনেকেই তাদের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করেন। যা ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্ত কাজের ক্লোজিং ইভেন্ট। আমরা ইকো সিস্টেম আর কমিউনিটিকেন্দ্রিক কাজ করতে চেয়েছি। ডকুমেন্টার সবকিছুতে অনেকের অংশগ্রহণ রাখতে চেয়েছি। আমরা চেয়েছি তালিকাতে সবার নামগুলো রাখার।

প্রতিদিন সকাল ১২টা থেকে শুরু করে বিকাল ৩টায় শেষ করার সময় বাধা ছিল। যদিও সময় ধরে শেষ হতো না, ৫টা/৬টা হয়ে বেজে যেত। কারণ অনেক রকম রান্না থাকতো। যেমন আফ্রিকান বা অ্যারাবিয়ান রান্নাগুলোতে সময় বেশি লাগে। তাছাড়া খাবারটার যেহেতু কোনো মূল্য নির্ধারণ করা ছিল না, আর বৈচিত্র্যও ছিল, তাই অধিকাংশ দিনই অনেক লম্বা লাইন হতো। সবাই আসতো। যতক্ষণ খাবার আছে ততক্ষণ তো কিউ চলতেই থাকতো। আবার দেখা যেতো কোনো টিম হয়তো নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে বেশি পরিমাণে রান্না করছে। সবকিছু শেষে আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজের জন্য একজন বাড়তি লোককেও রাখতে হয়েছিল আমাদের। আমরা বাঁশের একটা ডোনেশন বক্স বানিয়ে নিয়েছিলাম, অনেকে তাতে কন্ট্রিবিউট করতেন। তবে একটা ব্যাপার ছিল, ঝড় বৃষ্টি যাই-ই হোক না কেন, আমরা একশদিন জুড়েই কাজটা করেছি। অস্ট্রিয়া, ইতালি, ফান্স ও জার্মানি থেকে বড় বড় কয়েকটা ইন্সটিটিউশন যোগ দেয় আমাদের সঙ্গে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসে, তারাও রান্না করে। ফুড নিয়ে পারফরমেন্স করে। কেউ হয়তো হাত দেখছে, কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, কেউ মিউজিক করছে— এমন লোকও আসছে। আবার পুরো দস্তুর পারফরমেন্স আর্টিস্টরাও এসেছেন। দেখা গেল, সবাই বসে আছে, হঠাৎ একটা দল এসে পারফরমেন্স শুরু করলো। বিভিন্ন রিসার্চ টিম এসেছে। এইসব কাজের মধ্য দিয়ে একশদিন জুড়ে গোটা আয়োজনটাই ছিল প্রাণবন্ত।

এবার ডকুমেন্টাতে বিভিন্ন দেশের পলিটিকাল এনগেজমেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন দেশের সোস্যাল কনটেক্সে যে বিষয়গুলো ঘটছে, শিল্পীরা তাদের কাজগুলোতে তা নিয়ে অনেক বেশি ফোকাস ছিলেন। কিউরেটরদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, আয়োজনজুড়ে কাজগুলো এমনভাবে রাখা হবে দর্শনার্থীদের যেন মনে হয় তারা পথ চলতে চলতে ঘটনাগুলো দেখতে পারছেন। যেমন কিছু ফিল্ম রাখা হয়েছিল। যেগুলো ছিল ভীষণভাবে রাজনৈতিক।

ডকুমেন্টাতে সবার কাজগুলো ছিল খুব ভিন্ন। আবার লোকেরা এমনও বলছে যে, Where is the art? মানে আর্ট বলতে মানুষ যা বোঝে, তার তুলনায় কাজগুলো অনেক বেশি অ্যাক্টিভিজম, পলিটিকাল স্টেটমেন্ট নির্ভর ছিল। আমি বলবো, ডকুমেন্টা ফিফটিনে প্রচুর কাজ ছিল যা অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত। এবার ডকুমেন্টাতে বিভিন্ন দেশের পলিটিকাল এনগেজমেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন দেশের সোস্যাল কনটেক্সে যে বিষয়গুলো ঘটছে, শিল্পীরা তাদের কাজগুলোতে তা নিয়ে অনেক বেশি ফোকাস ছিলেন। কিউরেটরদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, আয়োজনজুড়ে কাজগুলো এমনভাবে রাখা হবে দর্শনার্থীদের যেন মনে হয় তারা পথ চলতে চলতে ঘটনাগুলো দেখতে পারছেন। যেমন কিছু ফিল্ম রাখা হয়েছিল। যেগুলো ছিল ভীষণভাবে রাজনৈতিক।

তাই আলাদা করে কোনো কাজের কথা বলাটা মুশকিল। কম-বেশি সব কাজই ভালো লেগেছে। আপনি যদি প্রতিটি কাজ বা শিল্পকর্ম বুঝতে পারেন বা তার ভেতরে ঢুকতে পারেন, তাহলে সবগুলো কাজই আপনাকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। মতের পার্থক্য তো থাকতেই পারে। আমার রাজনৈতিক বক্তব্য ভিন্ন হতেই পারে। তবে তা ভিন্ন বিষয়। এখানে সবাই তার ভাবনার জায়গা, বোধ ও উপলব্ধির জায়গা থেকে তার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

ডকুমেন্টা ফিফটিনে আমরা ১৪টি আর্টিস্ট কালেকটিভ অংশ নিয়েছি লুম্বু সদস্য হিসেবে। সব কালেকটিভই কিউরেটরদের সঙ্গে মিলে নিজেদের কাজগুলো সাজিয়েছিল। এবারের থিম ছিল লুম্বু (Lumbung)। ইন্দোনেশিয়ার ভাষাতে এর মানে গোলাঘর বা শস্য রাখার ভান্ডার। আগে গ্রামে যেমন একটা পরিবারে যতটুকু শস্য দরকার, তা রেখে বাকিটুকু গোলাঘরে দিয়ে দেওয়া হতো, ঠিক তেমন। আমাদের বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতাকে সবার মধ্যে ভাগ করে দাও, যার যতটুকু নেওয়ার সে ততটুকু নিবে। এটা যেমন খাদ্য হতে পারে, তেমন সংস্কৃতি কিংবা ধারণা বা অভিজ্ঞতা। সামগ্রিক বিষয়টা ছিল অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। আমাদের ১৪টি লুম্বু সদস্যের দায়িত্ব ছিল অন্য শিল্পী বা প্লাটফর্মগুলোকে খুঁজে নেওয়া বা তাদের সঙ্গে মত বিনিময় করা।

সারা পৃথিবীতেই পলিটিক্যালি  ভিকটিমাইজ বা রাজনৈতিকভাবে আক্রান্ত ও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফুড পলিটিকসের বিষয়টাই যেমন, কেউ এটির বাইরে নয়। আমি আপনি সবাই কিন্তু প্রতিদিন একটা টক্সিকেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বাইরের দেশে হয়তো খাবারগুলোকে পরীক্ষা করে নেয়া হয়, আমার দেশে হয়তো তা করা হয় না। কারণ এটার একটা খরচ আছে। তবে কম-বেশি আমরা সবাই এ রকমের পরিস্থিতিতে বসবাস করছি। এটা কারো জন্যই নতুন কিছু না।

ওরা কিন্তু একবারে ১৪টি সংগঠনকে নির্বাচিত করেনি। বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনের কাজটি করা হয়। যেমন আমাদের যখন অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন আমরাই আবার পরের ধাপের শিল্পী নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ নিই। আর্টিস্টিক টিমটা বিষয়গুলোকে এতোটাই উন্মুক্ত রেখেছিল। ওরা মূলত এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়নি। তাছাড়া আমাদের মতামতও নিয়েছে, জানতে চেয়েছে — এদের আমরা নির্বাচিত করবো কিনা! কারণ মোটামুটি একটা ধাপে নির্বাচনের পর ৭০টি  কালেকটিভের তালিকা করা হয়। এর মধ্যে থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪টি নতুন কালেকটিভকে নেওয়া হয়। কালেকটিভ’স কালেকটিভ; এটাই ইন্টারেস্টিং যে, সংগঠন হিসেবে অংশ নেওয়ার পর আবার আমরাই শিল্পী নির্বাচনের প্রক্রিয়াতে অংশ নিচ্ছি।

আমাদের খুব মিল রয়েছে। সারা পৃথিবীতেই পলিটিক্যালি  ভিকটিমাইজ বা রাজনৈতিকভাবে আক্রান্ত ও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফুড পলিটিকসের বিষয়টাই যেমন, কেউ এটির বাইরে নয়। আমি আপনি সবাই কিন্তু প্রতিদিন একটা টক্সিকেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বাইরের দেশে হয়তো খাবারগুলোকে পরীক্ষা করে নেয়া হয়, আমার দেশে হয়তো তা করা হয় না। কারণ এটার একটা খরচ আছে। তবে কম-বেশি আমরা সবাই এ রকমের পরিস্থিতিতে বসবাস করছি। এটা কারো জন্যই নতুন কিছু না। আমরা অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা তাই পরস্পরের কাজগুলোকে ধারণ করতে পেরেছি। আমরা সবাই হয়তো সবার গল্পগুলো জানতাম না তবে কাজগুলোর মাধ্যমে একজন আরেকজনকে বুঝতে পেরেছি।

দশ বছর আগে আমি রয়েল অন্টারিওতে গিয়েছিলাম। সেবার কোনো কাজ নিয়ে নয়, মিউজিয়াম দেখতে গিয়েছিলাম। এটি খুব বিখ্যাত মিউজিয়াম। আমি অবশ্য নিজেকে কোনো গণ্ডির মধ্যে রাখতে চাইনি, কিন্তু অনেক সময় কিউরেটরদের ওপর এটি নির্ভর করে। ওখানে আমার তিনটি কাজ ওরা দেখাচ্ছে; একটি ভিডিও, বাকি দুইটি অবজেক্ট নির্ভর। জুনে প্রদর্শনীটি শুরু হয়ে আসছে বছরের জানুয়ারিতে শেষ হবে। আমার একটা কাজ ওরা এক্সিবিশন পাবলিসিটির অংশ হিসেবে যেমন ট্রাম বা বাসের গায়ে, বইয়ের প্রচ্ছদ আর পোস্টারের জন্য ব্যবহার করেছে।

থাইল্যান্ড বিয়েনালের জন্য কাজ করছি। শুরু হবে এই ডিসেম্বরে (২০২৩)। এ বছরের জানুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে আমার কাজগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। থাই বিয়েনালের কিউরেটরিয়াল টিমটি কাজগুলো দেখে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সুন্দরম ঠাকুর গ্যালারি থেকে আমার বেশ কয়েকটি কাজ ওরা নিচ্ছে। এছাড়া কোভিডের সময়ে সিল্কের ওপর আমি সুই  সুতা দিয়ে কাজ করতে শুরু করি। এটিকে ওদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে থাই সুতা, সিল্কের ওপর কাজ করছি।  থাইল্যান্ডের অনেক ঐতিহ্য আছে, যা হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগত ওই ফর্মগুলো নিয়ে কাজ করছি থাইল্যান্ডের স্থানীয় বুনন শিল্পীদের সঙ্গে, যারা মূলত জেলের কয়েদি। থাইল্যান্ডের একটি জেলখানায় কাজটি হচ্ছে।  

এছাড়া সেন্ট্রাল মিউজিয়াম নেদারল্যান্ডসে একটা গ্রুপ শো-তে আমার কাজ দেখানো হচ্ছে— যা আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। বৃত্ত এই মুহুর্তে সুইজারল্যান্ডের কুন্সথাউস জুরিখে ‘রশদ’ এর একটা অন্য কম্পোজিশন দেখাচ্ছে। এই প্রদর্শনীতে আমেরিকান পপ শিল্পীদের অনেকগুলো কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রশদের এই এডিশনটা চলে গেছে কুন্সথাউসের স্থায়ী কালেকশনে। প্রদর্শনীটা তিন বছরের জন্য ওপেন থাকবে। ডিসেম্বরে গোয়ার সেরেন্ডিপিটি আর্ট ফেস্টিভ্যালে অংশ নিচ্ছে বৃত্ত। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রশদের আরো একটি কম্পোজিশন যাবে নেদারল্যান্ডসের সেন্ট্রাল মিউজিয়ামে। পালান এবং পাকঘরের নতুন এডিশন হচ্ছে রিয়াদের দিরিয়াহ কনটেম্পরারি আর্ট বিয়েনালে। রশদের অন্য একটি এডিশন যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের হেয়ারউড বিয়েনালে। জুনে লিডসে এটি শুরু হবে।  

শিল্পীরাও যে সংগঠিত হতে পারে, একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারে— এ ধরনের ধারণা থেকে আমরা কাজ শুরু করি। ১৯৯৪ সালে আমরা পাঁচজন বন্ধু মিলে নেপাল, ভুটান, ভারতে ‘ট্রাভেলিং এক্সিবিশন’করি। এরপর আরো কয়েকবার প্রতিবেশী দেশগুলোতে যাই।

অর্জন বলতে আমরা যখন শুরু করি তখন অনেক কিছুই ছিল না, শিল্পীরা এককভাবে চর্চা করতেন। শুরুটা খুব কঠিন ছিল। তবে আমরা সুস্পষ্টভাবেই জানতাম যে কী করতে চাই। যদিও তখন খুব বেশি দিন হয়নি চারুকলা থেকে বের হয়েছি। ইমরান হোসেন পিপলু, কবির আহমেদ, মাসুম তখনও স্টুডেন্ট। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য এবং সালাউদ্দীন খান শ্রাবণ। তবে ততদিনে বাইরের বিশ্বের শিল্পী ও শিল্পচর্চা নিয়ে আমাদের একটা ধারণা হয়ে গেছে; শিল্পীরাও যে সংগঠিত হতে পারে, একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারে— এ ধরনের ধারণা থেকে আমরা কাজ শুরু করি। ১৯৯৪ সালে আমরা পাঁচজন বন্ধু মিলে নেপাল, ভুটান, ভারতে ‘ট্রাভেলিং এক্সিবিশন’করি। এরপর আরো কয়েকবার প্রতিবেশী দেশগুলোতে যাই। মাহবুব ১৯৯৪ সালে জাপান যায় আর ১৯৯৮ তে যুক্তরাজ্যে। এরপর দুজন মিলে ১৯৯৯-২০০০ সালে আমরা যাই আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফিনল্যান্ডে। সেখানে গিয়ে দেখি শিল্পীরাই গ্যালারি তৈরি করছে, তাদের নিজস্ব স্টুডিও বা গ্যালারি আছে, যা কালেকটিভ আর্টিস্টরা চালায়। নেপালে প্রথমবার ১৯৯৪ সালে সিরজনা কনটেম্পরারি আর্ট গ্যালারিতে এক্সিবিশন করতে গিয়েও আমরা চমৎকৃত হই এটা দেখে যে অনেকজন শিল্পী মিলেই এই গ্যালারিটা কালেকটিভলি চালান, যেখানে গ্যালারি ছাড়াও স্টুডিও স্পেস ছিল। এসব দেখা ছিল আমাদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। কেননা আমাদের দেশে তো আমরা শিল্পীরা অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এ বিষয়গুলো আমাদের মধ্যে নতুন কিছু ভাবনা বুনে দেয়। ২০০০ সালে দেশে ফিরে এসে আমরা তাই দলীয়ভাবে নিজেদের একটা স্টুডিও স্পেস নেওয়ার কথা ভাবি। যেখানে নিজেদের কাজের এক্সিবিশনও করা যাবে। কাজটা আমরা খুব অর্গানিক্যালি করতে চেয়েছি। এরমধ্যে ২০০০ সালেই ট্রায়াঙ্গেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে খোঁজ দিল্লির পরিচালক পূজা সুদের মাধ্যমে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ট্রায়াঙ্গেল আর্টস ট্রাস্ট নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আর্ট পৃষ্ঠপোষক রবার্ট লোডার এবং ব্রিটিশ শিল্পী অ্যান্টনি ক্যারো ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। আন্তর্জাতিক এ শিল্প সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের নতুন ধারণা অন্বেষণ করতে এবং অনুশীলনের সীমানা প্রসারিত করতে যূথবদ্ধ করে। বৃত্তের শুরুটা এভাবে। একটা কালেকটিভ আইডিয়া নিয়ে কীভাবে অগ্রসর হতে হয়, কিংবা গোটা কমিউনিটির জন্য কাজ করার ভাবনাটা তখন তো নতুন ছিল। তাই বৃত্তের শুরুটা অনেকেই সহজভাবে নেয়নি। নানারকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা অগ্রসর হয়েছি। তাই অর্জন বলতে, প্রথম কিছু বছর বৃত্ত ভীষণ চাপের মধ্যে দিয়ে গেছে। নেতিবাচক চাপ যেমন ছিল, তবে ইতিবাচক প্রশ্রয়ও ছিল। ২০১১ সালে ৫৪ ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্যাভিলিয়ন করতে পারাটা ছিল বহির্বিশ্বে আমাদের বড় ধরনের অর্জন।

আমরা নিজেরাও খানিকটা ভয়ে ছিলাম যে, আমরা কি সংগঠক হয়ে যাবো! দেখলাম যে, সংগঠক ও শিল্পী দুটোই হওয়া যায় এবং ভালোভাবেই অন্যদের সংযুক্ত করা যায়। আমাদের দেশে তো এককভাবে আমি উঠলাম, বাকীরা পেছনে পড়ে থাকলে থাকবে— এ ধরনের ধারণা। বৃত্ত ঠিক এই জায়গায় কাজ করতে চেয়েছে; এককভাবে উতরে যাওয়া নয়, একগুচ্ছ শিল্পীকে নিয়ে অগ্রসর হওয়া।

এই যেমনটা বললাম— অনেকে বলতো লিপি-মাহবুব ওরা কেন এনজিও করছে। আমাদের পিঠপিছে হয়তো খানিকটা খারাপভাবেই বললো। আজ যারা সম্মিলিত হয়ে কাজ করছে, তখন তারাও কিন্তু বলেছেন। তবে আমরা এগুলো গায়ে মাখিনি। আমরা আমাদের পরিকল্পনা ঘিরে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে ট্রায়াঙ্গেল আমাদের বড় ধরনের মানসিক ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। আমরা নিজেরাও খানিকটা ভয়ে ছিলাম যে, আমরা কি সংগঠক হয়ে যাবো! দেখলাম যে, সংগঠক ও শিল্পী দুটোই হওয়া যায় এবং ভালোভাবেই অন্যদের সংযুক্ত করা যায়। আমাদের দেশে তো এককভাবে আমি উঠলাম, বাকীরা পেছনে পড়ে থাকলে থাকবে— এ ধরনের ধারণা। বৃত্ত ঠিক এই জায়গায় কাজ করতে চেয়েছে; এককভাবে উতরে যাওয়া নয়, একগুচ্ছ শিল্পীকে নিয়ে অগ্রসর হওয়া। সবাইকে নিয়ে অগ্রসর হওয়ার এ প্রচেষ্টায় যদি পাঁচজনও এগিয়ে যায়, এটাও বড় অর্জন। আমার মনে হয় সে জায়গাটা বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে পারছে। বর্তমানে এ ধরনের অনেক উদ্যোগ হচ্ছে। তাই এককভাবে আমাদের দায়িত্বও অনেকটা কমে গেছে। অনেকে হয়তো দ্বিমত করতে পারে। বলতে পারে যে, তোমাদের কারণে এটা ওটা হয়েছে। তোমরা এসব প্রশ্রয় দিয়েছো— যা খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ অধিকাংশ মানুষের যদি ভালো হয় তাহলে আমি বলবো তা গর্বের।

আমরা তো শিল্পী, তাই অনেকের সমর্থন না পেলে অনেক কিছু করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আর ওই সমর্থন জুটানোর কাজটাও কঠিন। এটা একদিনের বিষয় নয়। দিনের পর দিন কাজ করতে হয়। তাই চাইলেই খুব বড় কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে একটা দেশের কমিউনিটিকে যতটুকু সংযুক্ত করা যায়, তরুণদের যতটুকু দিক দেখানো যায়— আমরা এদিকে বরাবর দৃষ্টি দিয়েছি।

ঠিক মূল্যায়ন বলবো না, এটা করার স্পর্ধাও আমার নেই, আর তা করাটাও কঠিন। আমি বলবো কাজ তো হচ্ছে। আবুল খায়ের লিটুর বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের দুর্জয় রহমান একভাবে কাজ করছেন, সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন ও আর্ট সামিটের মাধ্যমে রাজিব সামদানী ও নাদিয়া সামদানী আরেকভাবে কাজ করছেন। বৈশ্বিক আর্ট সিনারিওতে বাংলাদেশের নামটা এখন বারবার আসছে। আমি বলবো এ মুহুর্তে বাংলাদেশ বেশ ভালো জায়গায় অবস্থান করছে। তবে বৃত্ত অনেক ছোট প্ল্যাটফর্ম। আমাদের খানিকটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়। আমরা তো শিল্পী, তাই অনেকের সমর্থন না পেলে অনেক কিছু করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আর ওই সমর্থন জুটানোর কাজটাও কঠিন। এটা একদিনের বিষয় নয়। দিনের পর দিন কাজ করতে হয়। তাই চাইলেই খুব বড় কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে একটা দেশের কমিউনিটিকে যতটুকু সংযুক্ত করা যায়, তরুণদের যতটুকু দিক দেখানো যায়— আমরা এদিকে বরাবর দৃষ্টি দিয়েছি।

আমরা যেমন বিকল্প শিক্ষার কথা ভাবছি। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি পশ্চাদপদ। এ জায়গাটা নিয়ে কাজ করা জরুরি। নতুন দিক দেখানো যে এভাবেও কাজ করা যায় বা ভাবা যায়। এজন্য আমরা আমাদের স্পেসে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাই এবং তাদের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীদের সংযোগ ঘটিয়ে পরস্পরের অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। একে অপরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের মাধ্যমে একধরনের জ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো— এটাই আমরা চেয়েছি। এ জায়গা থেকে আমি বলবো আমরা আমাদের মতো যতটুকু করার করছি। নতুন যে প্লাটফর্মগুলো আসছে তারাও করছে। আমি সামগ্রিক বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। তবে একটা কথা বলবো যে আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত কনটেম্পরারি আর্টের পর্যাপ্ত সংগ্রাহক তৈরি হয়নি। যা কঠিন পরিস্থিতি। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে গ্যালারিগুলো অনেক কষ্ট করে নিজেদের টিকিয়ে রাখছে। ধরা যাক, একটা গ্যালারি কোনো একজন শিল্পীর কাজ নিয়ে প্রদর্শনী করবে, কিন্তু তার তো একটা খরচ আছে। ঠিক কতক্ষণ পর্যন্ত গ্যালারিগুলো নিজেদের পকেটের পয়সা দিয়ে এ কাজগুলো করবে। আমাদের প্রমোটররা যদি সমর্থন না দেয় তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব? হাতেগোনা কিছু তরুণ শিল্পী বের হয়ে আসছেন। কিন্তু এমন অনেক শিল্পীরা রয়েছেন,যারা সত্যিই ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তাদের পথ দেখানোর বা সমর্থন করার কেউ নেই। একজন শিল্পী কী নিজেকে নিজে প্রমোট করবেন না দশজন মিলে তাকে সমর্থন দিবে? আর্ট এবং আর্টিস্ট নিয়ে নানারকমের প্রফেশনাল হোমওয়ার্ক/অ্যাক্টিভিটি আছে সারাবিশ্বে, যার অনেকগুলো শাখাই বাংলাদেশে পুরোপুরি অনুপস্থিত। এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা এবং কাজ করা জরুরি।

 ছবি কৃতজ্ঞতা: বৃত্ত আর্কাইভ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Exit mobile version