কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন বোধহয় রবীন্দ্রনাথ। বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পরে এসে নিজেকে একজন চিত্রশিল্পীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যান্য চিত্রকর্মের পাশাপাশি তাঁর সেল্ফ পোর্ট্রেটের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যার বেশির ভাগ পরাবাস্তব। রঙের দিক থেকে কালোকে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, এর পেছনেও কি তবে কোনো গূঢ় মাহাত্ম্য রয়েছে বর্ণান্ধ রবীন্দ্রনাথের! “আমার ছবি রেখার ছবি, রঙের ছবি, ভাবের ছবি নয়”— নিজের ছবি সম্পর্কে এমনটাই বলেছেন তিনি।
১৯৩০ সালে প্যারিসে একজন কবির আঁকা ছবি নিয়ে একক চিত্রপ্রদর্শনীর ছবিগুলো দর্শনার্থীদের বেশ ভালো লাগলেও চিত্রসমালোচকদের মনে খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি। ইউরোপে ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম কোনো কবির এমন ছবির প্রদর্শনীতে বেশ কিছু আত্মপ্রতিকৃতি থাকলেও সেসব দেখে আয়োজকদের একজন কঁতেস দ্য নোয়াই কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, বিরক্ত, “একজন সন্তের আঁকা এ কেমন হিংস্র ছবি!” কবির আত্মপ্রতিকৃতিগুলোতে অন্য এক রবীন্দ্রনাথের দেখা পাই আমরা। ভিন্ন চেহারা, আলাদা অবয়ব চোখে পড়ে আমাদের। সত্যি বলতে, যা এর আগে কেউ দেখেনি। ভেতরের ঐ অব্যক্ত দিক কবি বুঝি ইচ্ছেকৃতভাবে ছবিতে প্রকাশ করেছেন। বেশির ভাগ ছবিতে এক ধরনের আড়াল, আবছায়া। এ-যেন ছবি নয় কবিতার কোনো চিত্রকল্প, গীতিকবিতার কোনো লাইন। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো এখানেও তাঁর কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রঙ ও ছায়ার খেলা, কাটাকাটি, লম্বা জ্যামিতিক ঢঙ, রঙের বিচিত্র ব্যবহার— বিশেষ করে কালো রঙ । কালো দিয়ে কবি কি তাঁর জীবনের এমন কোনো অন্ধকার দিক উন্মোচিত করতে চেয়েছেন যা জাগতিক সীমাহীন সফলতার ভিড়ে নিজের কাছেও অপাঙ্ক্তেয় হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
ছবিগুলোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, নিজের নাক ও কান আঁকতে কবিকে যেন বহু কসরত, কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আর প্রায় সবগুলো ছবির মূল আকর্ষণ ছিল চোখ। চোখকে বাদ দিলে ছবিগুলো কল্পনাই করা যায় না। যদিও সেই চোখে নেই সেই কোমলতা। এক ধরনের তীব্র, তীক্ষ্ণ, সুক্ষ্ম হিংস্রতা লক্ষ করা যায় চোখগুলোতে।
আত্মপ্রতিকৃতির কথা বললে, কবি সাহিত্যকদের মধ্যে গুন্টার গ্রাসও নিঃসন্দেহে এই তালিকায় আসতে পারেন। জাদুবাস্তবতার রূপকার এই লেখক তাঁর লেখায় যেমন বারবার ইঁদুর, বিড়াল, পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর গল্প বলেছেন, ছবিগুলোতেও প্রায় একই রকম বার্তা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সে কারণে গুন্টার গ্রাসের আত্মপ্রতিকৃতির আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, “তাঁর কবিতা পড়ি। এখানে-ওখানে আঁকা তাঁর স্কেচও দেখি। বেশিরভাগই আত্মপ্রতিকৃতি। অদ্ভুৎ, ভয়াবহ ও বীভৎস সব ছবি।”
গ্রাস তাঁর ছবির পেছনে কাঁটাগাছ সেঁটে দিয়েছেন, নিজের মুখমণ্ডলের সাথে মিল রেখে বারবার এঁকেছেন ইঁদুর ও বিড়াল। এ কি তবে তাঁর কথাসাহিত্যের কথাগুলোর চিত্রায়িত রূপ! লেখার মতো তাঁর ছবিতেও এ-সবের প্রতি প্রেম চোখে পড়ে। নাকি সমাজের প্রতি তিরস্কার বা ব্যঙ্গ করতে গিয়ে এমন চিত্রকলা! কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি ইঁদুর তাঁর গালে চুমো খাচ্ছে, মুখমণ্ডলের পাশে টেবিলে একদল মরা মাছি, এক চোখে লেগে আছে শামুক, গালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে সাপ বা মাছের পেটে আটকে আছে তাঁর মুখ।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় আমরা মানবজাতি সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলি। পৃথিবীতে কি শুধু মানুষ আছে, আর কিছু নেই? পশু, পাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ সব আছে। তারা আমাদের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীতে ছিল এবং এমন একদিন আসবে যখন আমরা থাকব না অথচ আমরা বাদে পুরো প্রাণিজগৎই টিকে যাবে।”
এমন আত্মপ্রতিকৃতিগুলো সত্যিকার অর্থে তাঁর লেখার বক্তব্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “প্রায়ই আমি লেখালেখির ভেতর ফিরে আসার জন্য ড্রয়িং করে থাকি” তথাপি আমরা দেখতে পাই তাঁর “ ‘Show Your Tongue’ কবিতা, গদ্য, ড্রয়িংয়ের এক মিশেল যা পাঠককে নতুন এক জায়গায় নিয়ে যায়। ছবিগুলোর আরেকটি বিশেষ দিক, সবগুলো স্কেচ পেন্সিল বা কলম দিয়ে আঁকা।
তবে ফ্রিদা কাহালোর বিষয়টা সম্পূর্ণ অন্যরকম। শৈশবের পোলিয়ো ও গাড়ি দুর্ঘটনায় জীবনটা একেবারে বদলে যাওয়ার পর তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিগুলো যেন যাপিত জীবনের গল্প হয়ে এসেছে। ছবির ভেতর দিয়ে বিশেষ করে আত্মপ্রতিকৃতির মধ্যে নিজেকে, কষ্টময় জীবনকে এভাবে তুলে আনতে ভ্যানগঘের মতো অল্প কেউই পেরেছেন!
“আমি স্বপ্ন আঁকি না, আমি আমার নিজের বাস্তবতাকে আঁকি”, ফ্রিদার এই কথাটা বলে দেয়
তাঁর ছবিগুলো কতটা জীবনঘনিষ্ঠ। এই ‘আহত হরিণী’র ছবির দিকে তাকালেই বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফ্রিদার ছবি মানেই তো সেল্ফ্ পোর্ট্রেট। কারণ তিনি বলেছেন, “I paint self-portraits because I am so often alone, because I am the person I know best.”
‘দ্যা লিটল ডিয়ার’ ছবিতে শিল্পীকে দেখা যায় একটি হরিণীর চেহারায়, নয়টি তীরে বিদ্ধ, রক্তাক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জোড়া ভ্রু নিয়ে।
‘দ্যা ব্রোকেন কলাম’ ছবিতে আবার শিল্পীর ভাঙাচোরা শরীরটা ব্যান্ডেজের মতো পোশাক ও লোহার কলাম দিয়ে আটকানো। প্রতিকৃতিটি মনে করিয়ে দেয় মাত্র আঠারো বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ফ্রিদার কথা। মেরুদণ্ডে তিন তিনটা ভাঙনসহ, গাড়ির রডে ক্ষতবিক্ষত হয় তলপেট, জরায়ু। সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন চিরতরে। অথচ ত্রিশবার অস্ত্রোপচার, তিনবার গর্ভপাতও তাঁকে সেই অর্থে হারাতে পারেনি। শিল্পীসত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মমুখরতা ও প্রাণচাঞ্চল্যে উপেক্ষা করেছেন শারীরিক এতো সীমাবদ্ধতা। হুইলচেয়ারে বসে মিছিলে নেমেছেন, হাসপাতালের বেডে শুয়ে এঁকেছেন কালজয়ী চিত্রকর্ম। বলা যায় আত্মপ্রতিকৃতিতেই লিপিবদ্ধ হয়েছে তাঁর আত্মজীবনী।
কোনো পোর্ট্রেটে দেখা যায় তাঁর গলায় কাঁটার নেকলেস, যেখানে আটকে আছে হামিংবার্ড নাকি নিজেরই প্রাণপাখি। অন্যটিতে দেখা যায় তাঁর সঙ্গে চারটি বানর, দুটি ফ্রিদাকে জড়িয়ে ধরেছে, পেছনে আরও দুটি। ‘দ্যা টু ফ্রিদা’স’-এ দেখা যায় একই রকম দুজন ফ্রিদাকে, একজন থেকে অন্যজনের হৃৎপিণ্ডে রক্ত আদান-প্রদান হচ্ছে কিন্তু কাচি দিয়ে পাইপ কাটা, জামায় রক্তের দাগ। বলা হয় স্বামী দিয়েগো রিভেরার সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি ছবিটা এঁকেছিলেন। অন্যদিকে নিজের গর্ভপাতের অসহ্য যন্ত্রণাদগ্ধ অভিজ্ঞতাকে শিল্পকর্মে রূপ দিয়েছেন,’হেনরি ফোর্ড হসপিটাল’ ছবিতে।
এতো কষ্ট ও যন্ত্রণার ভেতরও তাঁর সবকটা প্রতিকৃতির লক্ষণীয় ব্যাপার, শিল্পীর পরিপাটি চেহারা। সব জায়গায় নিজেকে খুব সুন্দর করে সাজানো, চুলগুলো নিজস্ব স্টাইলে বাধা। এমনিতেই ফ্রিদার কাজে মেক্সিকোর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে এমনকি তাঁর পোশাকেও। ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধে একজন শিল্পী তথা নারীর সকল প্রতিবন্ধকতার পরও প্রতিকৃতিগুলোতে আলাদা নজরে আসবে পোশাক ও সাজ। শত সীমাবদ্ধতা, নিয়তির কাছে বারবার পরাজিত হয়েও মাথা না নামিয়ে সংশপ্তক বেঁচে থাকার এক অনুপ্রেরণা হতে পারে বিষয়টা।
প্রসঙ্গত ফ্রিদা-গবেষক হেনেসত্রোসা বলেন, “ফ্রিদা তেহুয়ানা নামে এক বিশেষ ধরণের পোশাক পরতেন, মেক্সিকোর একটি মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী গোষ্ঠীর নারীরা এরকম পোশাক পরতেন।
এর মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং নারীর নিজস্ব শক্তির একটি প্রতীক ফুটিয়ে তুলতেন।”
তাঁর ছবিগুলোকে শিল্প সমালোচকেরা পরাবাস্তব, যাদুবাস্তব নানা আখ্যা দিলেও তিনি একে বাস্তব বলেছেন, কারণ ছবিগুলো তাঁর জীবন থেকে পাওয়া।
ভ্যান গঘ ৩৭ বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনে আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন ৪৭টি। ক’দিন আগেও তাঁর একটি আত্মপ্রতিকৃতি আবিষ্কৃত হয়। স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল গ্যালারি বিশেষজ্ঞদল প্রদর্শনীর আগে শিল্পীর আঁকা একটি ক্যানভাসের এক্স-রে করতেই সামনে উঠে আসে ঘটনাটা। ‘হেড অব এ পেজেন্ট ওম্যান’ নামক এই ছবির এক্স-রে করতেই তার ভেতরে দেখা মেলে ভ্যান গঘের আঁকা একটি আত্মপ্রতিকৃতি। ছবির পিছনে পিচবোর্ডের ভিতর আঠা দিয়ে আত্মপ্রতিকৃতিটি লুকানো ছিল। গবেষকেরা এর পেছনের কারণ হিশেবে ডাচ এ-শিল্পীর অর্থকষ্টকে দায়ী করেছেন।
বারবার ক্যানভাস কেনার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না, তাই শিল্পী একই ক্যানভাস ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করতেন। হয়তো এই ছবিটির ক্ষেত্রেও একইরকম কিছু ঘটেছিল।
ভিনসেন্টের আত্মপ্রতিকৃতিগুলোকে দেখা যেতে পারে আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব রূপে। যেন ছবির ভেতর দিয়ে লিখে রাখছেন নিজের জীবনের কথা, দিনপঞ্জি। প্রতিকৃতিগুলো প্রায় একই রকম- সেই লাল চুল, সবুজ চোখ, কিছুটা বিরক্তি নিয়ে একটু কৌণিক মুখ, কখনো আবার মাথায় হলুদ খড়ের টুপি। তবুও প্রতিটি ছবি আলাদা। নিজেও বলেছেন, “আমি এটা বিশ্বাস করি যে নিজেকে চেনা কঠিন, তবে নিজেকে আঁকাও সহজ নয়।” অনেকের মতে, তিনি আসলে নিজের ছবি আঁকতে চাননি, কিন্ত মডেল খুঁজে না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে নিজেকে আঁকতে হয়েছে। শৈশব থেকেই অতিরিক্ত আবেগ ও অস্থিরতার কারণে কোনো কাজেই ঠিক স্থায়ী হতে পারেন নি। কিন্তু আঁকাআঁকির ব্যাপারে ছিলেন চিরকালই সিরিয়াস। তাঁর লেখা চিঠিপত্র বিশেষ করে ভাই থিওকে লেখা চিঠি দেখলেও জীবন নিয়ে তাঁর উন্নাসিকতা, ব্যর্থতার গ্লানি, উপেক্ষার কষ্ট, প্রকৃতিপ্রেম বা শিল্পচিন্তা চোখে পড়ে। মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটলে, বাম কানের একটি অংশ কেটে র্যাচেল নামের এক পতিতাকে তা উপহার দিয়ে আসেন। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে নিজের ব্যান্ডেজ করা কানসহ আঁকেন কানে ব্যান্ডেজওয়ালা আত্মপ্রতিকৃতি।
পাবলো পিকাসোর পোর্ট্রেটে এক ধরনের বিবর্তন লক্ষ করা যায় যা অন্য কোনো শিল্পীর আঁকায় নেই। একানব্বই বছর বাঁচা শিল্পীর বিভিন্ন বয়েসে আঁকা ছবিগুলো দেখলে একবারও মনে হয় না সেগুলো একজনের! এমন বিচিত্র আত্মপ্রতিকৃতি বোধহয় আর কোনো শিল্পী আঁকেন নি।
“আমি একটা বিষয়কে যেভাবে দেখি সেভাবে আঁকি না, যেভাবে ভাবি, সেভাবেই আঁকি।” বয়েসের সাথে সাথে তাঁর চেহারা নয় চিন্তা বা বিশ্বাসেরও যে পরিবর্তন ঘটে তা সময়ের ধারাবাহিকতায় ছবির তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে সহজে প্রকাশ পাবে। পনেরো, আঠারো, বিশ বা চব্বিশ বছরের প্রতিকৃতির সাথে কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না পঁচিশ, পঁয়ত্রিশ বা ছাপ্পান্ন বছর বয়েসে আঁকা ছবিগুলোতে। আবার তিরাশি থেকে নব্বইয়ে আঁকা কাজগুলোকে যেন অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন, যেগুলোর সাথে আগের প্রতিকৃতির কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তরুণ বা কম বয়সের ছবিতে যেখানে তারুণ্যদীপ্ত অবয়বের প্রকাশ পাওয়া যায় সেখানে আশি থেকে নব্বই বছরের ছবিগুলো অনেক বেশি প্রতীকী ও নিরীক্ষাধর্মী, বিশেষ করে তার সেই বিখ্যাত কিউবিজমের সাথে নিজস্ব ধরন বা রীতির প্রকাশও পাওয়া যায়।
১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল ভোর তিনটা পর্যন্ত ছবি আঁকেন একানব্বই বছর বয়সী পিকাসো, তারপর শেষবারের মতো ঘুমাতে যান। সবশেষ সেল্ফ্ পোর্ট্রেট শেষ করেন ১৯৭২সালে, যার শিরোনাম ‘সেল্ফ্ পোর্ট্রেট ফেইসিং ড্যাথ’।
আত্মপ্রতিকৃতির মধ্য দিয়ে আত্মজীবনীর মতো পরিপূর্ণরূপে শিল্পীকে বা সমগ্র শিল্পী সত্তাকে বিচার করা কঠিন। সেখানে সবসময় ধরা দেয় না শিল্পীর প্রকৃত জীবন। তবে শিল্পী যখন নিজেকে শিল্পের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়ে তুলি হাতে নেন আত্মদর্শন ও চিন্তাই যেন সেখানে প্রগাঢ়ভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে।
তবে আত্মপ্রতিকৃতির সব ধারণাকে পাল্টে দিয়েছেন সালভাদর দালি। ১৯২৯ সালে আঁকা দালির “দ্য গ্রেট মাস্টারবেটর” বাকি সব প্রতিকৃতিকে ছাপিয়ে গেছে। এখানে তিনি স্বাভাবিক কোনো অবয়ব আঁকতে চাননি। চেহারা বাদ দিয়ে ভেতরের মানুষটাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন এই শিল্পী। ভেতরের যত ভয়, বিতৃষ্ণা, কামুকতা ছাড়াও নানা অবজেক্টের মধ্য দিয়ে আলাদা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এই পরাবাস্তববাদী শিল্পী। তাঁর অন্যান্য পোর্ট্রেটেও দেখা মিলবে ব্যতিক্রমী চিন্তা ও বিচিত্র প্রকাশভঙ্গির। কোথাও চোখ,নাক,ঠোঁট এমনকি তাঁর সেই বিখ্যাত গোঁফও আটকানো অবস্থায় দেখা যাবে। আবার কোনোটাতে দীর্ঘ চুল, মেয়েদের পোশাক ও ভঙ্গি, কিউবিজমে আঁকা কোনো ছবি, অন্য কোনোটাতে প্যাঁচানো দীর্ঘ গোঁফ, একচোখ বন্ধ, এমনকি মোনালিসার ছবির মতো করে আত্মপ্রতিকৃতির দেখা মিলবে।
লাল খড়িতে আঁকা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির দরবেশ মার্কা, মাতিসের যিশুর মতো নিষ্পাপ, সেজানের টেকো মাথার প্রতিকৃতির ভিড়ে মকবুল ফিদা হোসেনের একটা সেল্ফ্ পোর্ট্রেট আলাদা আলোচনার দাবি রাখে। তাতে দেখা যাচ্ছে এমএফ হোসেনের দাড়িগুলো যেন ছবির ফ্রেমের বাইরে দেয়া। মনে হচ্ছে গলা কাটা শিল্পীর মাথাটা আলগা করে ফ্রেমে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। ‘সরস্বতী’ বা ‘ভারতমাতা’ ছবি আঁকার পর তাঁকে নিয়ে ধর্মান্ধরা হুলিয়া জারি করেছিল, তাঁর মাথার দাম ধরা হয়েছিল আট কোটি টাকা। শিল্পী কি ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন কাটা মাথার মতো ছবি এঁকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, নাকি অন্য কোনো বার্তা দিতে চেয়েছেন!
আত্মপ্রতিকৃতির মধ্য দিয়ে আত্মজীবনীর মতো পরিপূর্ণরূপে শিল্পীকে বা সমগ্র শিল্পী সত্তাকে বিচার করা কঠিন। সেখানে সবসময় ধরা দেয় না শিল্পীর প্রকৃত জীবন। তবে শিল্পী যখন নিজেকে শিল্পের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়ে তুলি হাতে নেন আত্মদর্শন ও চিন্তাই যেন সেখানে প্রগাঢ়ভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে।
