
একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা। ফিল্ম স্কুল এফটিআইআই থেকে চলচ্চিত্র সম্পাদনার উপর শিক্ষা গ্রহণ করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ক অনেকগুলো প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন এবং বেশকিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি হিসেবেও অংশগ্রহণ করেন।
সৌরভ ষড়ঙ্গীর নির্মিত টুসু কথা, বিলাল, কারবালা মেমোরি’স, ইত্যাদি চলচ্চিত্রগু্লো তাঁকে বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। ‘মধ্যিখানে চর’ তাঁর অন্যতম উল্লেখযাগ্য কাজ।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গঙ্গা নদীর ভাঙ্গন প্রবণ এলাকায় হাজারো গৃহহীন ও দেশহীন মানুষদের নিয়ে কথা বলে এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি। যেভাবে কিশোর রুবেলকে আমরা দেখতে পাই , যে ভারতে স্কুলে পড়তে চায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো তাকে প্রতিদিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের গঙ্গা নদী পার হয়ে চাল পাচার করতে হয়। আবার এই নদীই তার ঘর ভাঙ্গে। রুবেলের সেই নদীরই মাঝখানে জেগে ওঠা ভাঙ্গনের চরে তাঁর বেঁচে থাকার স্বপ্ন-সংগ্রামের গল্পটি অসাধারণ ভঙ্গিমায় বুনেন সৌরভ ষড়ঙ্গী। এই গদ্যটি দুই দেশের মধ্যকার সেই গঙ্গা নদী নিয়ে।
চলচ্চিত্রে দেখা নদী, চর, চরিত্রগুলো আরও বড় কোনো গল্পের/ পরিসরের ইঙ্গিত আর অনুভূতি নিয়ে বিস্তার লাভ করে সৌরভের এই লেখা। একটি চলচ্চিত্র গড়ার পেছনে নেপথ্যের এই স্মৃতিভাষ্য নতুন চলচ্চিত্রকারদের জন্য নিশ্চয় জরুরি।
গঙ্গা-পারের বৃত্তান্ত
আখেরীগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ। ২০০২ সাল, কলকাতা থেকে ভোর ভোর রওনা দিয়ে পৌঁছলাম বেলা এগারোটা নাগাদ। আমি সফরসঙ্গী এক টিভি ইউনিটের সাদা আম্বাসাডরে, নদী পাড়ে সেটাকে রেখে গাড়ির দরজা খুলতেই যে দৃশ্য ধাক্কা দিলো সে এক ভয়ানক।
নদীর জলে সাদা ফেনা ঘূর্ণি দিয়ে ফুঁসে ফুঁসে উঠছে, ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির মতোন। আর নদীর পাড়টা নেমে যাচ্ছে জলের গভীরে, কখনো ঝপাং করে একটা শব্দ, কখনো নিঃশব্দে। চলে যাচ্ছে বাড়িঘর, বাগান, পুরোনো গাছপালা, মসজিদ দোকানপাট, গোরস্তান। বিকেলের মধ্যে একটা জনপদ চোখের সামনে মিলিয়ে গেলো। একটা নতুন শব্দ শুনলাম, ‘বাড়ি টানা’। মানে বাড়ির ইঁট, দরজা জানালা ভেঙে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে রাখা, ভবিষ্যতের জন্যে। আমার সঙ্গী টিভি ইউনিট খুব খুশি, দারুণ ‘স্টোরি’ হবে।
আমি বাড়ি ফিরে সেই রাতে ঘুমোতে পারিনি, হাঁটু অবশ হয়ে এসেছিলো
কিছুদিন বাদেই আবার ফিরে এসেছিলাম, একা। নদী তখন শান্ত, পরিতৃপ্ত অজগর সাপের মতো। ভাঙা পাড়ে কয়েকজন বসে আছে, একজন চিনতে পারলো। বাকিরা কোথায় শুধোলে দেখিয়ে দিলো বাঁধের ওপরে গজিয়ে ওঠা কয়েকটা ঝুপড়ির দিকে, তবে বেশীর ভাগের ঠিকানা হয়েছে বাস রাস্তার দুপাশে। গেলাম, ইটগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে একটু দূরে। কোনাকুনি করে বানানো বাঁশের খাঁচা, তার ওপরে ত্রিপলের ছাউনি। গেলাসে এগিয়ে দেয়া জল, আরেকটু চাইতে লজ্জা পেলো বাড়ির বৌ। খাবার জল আনতে হয় অনেক দূর থেকে, হিসেব করে।
রাজমহল পাহাড়ের পাথুরে বুক থেকে মুক্তি পেয়ে গঙ্গা নদী আমাদের মালদা মুর্শিদাবাদ ধরে বয়ে গেছে মোটামুটি ১৭৪ কিলোমিটার, তারপরে নাম বদলে প্রতিবেশী বাংলাদেশে। আমি কয়েক বছর ধরে এই ১৭৪ কিলোমিটার নদী বরাবর হেঁটেছি, থেকেছি। থেকেছি ওই ছিন্নমূল মানুষ গুলোর সঙ্গে, কখনো কখনো কেউ সঙ্গী হয়েছেন শহর থেকে। কখনো নয়।
নদী এখানে সীমান্ত। দেশ ভাগের সময়ে নদীর মাঝ বরাবর লাইনটা টেনেছিলেন রাডক্লিফ সাহেব। হাতে সময় ছিল কয়েক সপ্তাহ। এখনো কোথাও কোথাও বাড়ির গোয়াল আর রান্নাঘরের মাঝ দিয়ে লাইনটা পাতা আছে, এও দেখেছি। সে যাই হোক, এই লাইনটা নড়াচড়া করতে পারেনা, কিন্তু নদী করে। সেটাই নদীর স্বভাব, বিশেষ করে বাংলার পাললিক ভূমিতে। কলেজে ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়ার সুবাদে কিছু কিছু ব্যাপার জানা ছিল, তবে নদী আমাকে চিনিয়েছেন নদীর মানুষেরা। এখানে নদী চলে সাপের মতো, কখনোই সোজাসুজি নয়, এঁকেবেঁকে। অনেকটা ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। যে অঞ্চল জুড়ে নদীর গতিবিধি, ভাঙাগড়ার খেলা, সেটাই হলো নদীর চারণভূমি (Meander Belt)।
নদীপারের মানুষেরা নদীর এই চলাফেরা বোঝে জন্ম জন্মান্তর ধরে, তাহলে ওরা কি বোঝেনা নদী কোন পারে ভাঙবে আর কোনখানে গড়বে? কেন ওদের ভিটে বাড়ি ছাড়তে হয় বছর বছর?
উত্তরটা পেয়েছিলাম মালদা জেলার পঞ্চানন্দপুরে
একদিন সকালে তরিকুলের বাড়িতে বসে বাজরার শক্ত মোটা রুটি চিবোচ্ছি ব্রেকফাস্ট হিসেবে। ওই রুটি খেলে সারাদিনের মতো আমি নিশ্চিন্ত। তরিকুলের বাবার জমি ছিল অনেকখানি, মানে বিঘের পর বিঘে। ওনাকে আমি দাদাভাই বলি, আর গল্প শুনি হারিয়ে যাওয়া পঞ্চানন্দপুরের। সেই পঞ্চানন্দপুর যেখানে বাইচ খেলা হতো জলে, আর ডাঙায় বর্শা ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা। কখনো জিততো হিন্দু টিম, কখনো মুসলমান। কিন্তু খেলা শেষে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়াটা জমতো সবার বেশি।
দাদাভাইয়ের মনে কোনো ক্ষোভ নেই, নালিশ নেই, আছে একটা শরতের মেঘের মতো হাসি আর বুকছোঁয়া দাড়ি। হঠাৎ আমাদের গল্প থামিয়ে তরিকুল বললো, শেখ মন্তাজ আলী এসেছে আমার সঙ্গে দেখা করতে।
মন্তাজ আলীর বয়েস বোঝা মুশকিল, চোখে ভালো দেখেন না আর সারাদিন ভাঙা নদীর পাড়ে পায়চারি করেন। হাতে একটা লাঠি। থাকেন বাড়ি ঘর খুইয়ে জামাইয়ের বাড়িতে, খিদে পেলে কারোর বাড়িতে গিয়ে বসেন। ছিলেন ঝালাইয়ের মিস্ত্রী, ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরির সময়ে কাজ পেয়েছিলেন মূল স্তম্ভগুলোর লোহার খাঁচা তৈরি করার, আরো অনেকের মতো।
সারা ভারত থেকে মানুষ এসেছিলো ফারাক্কায় বাঁধ বানাতে। বাঁধই হলো স্বাধীন ভারতের নতুন মন্দির। একথা বললেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ভাকরা নাঙাল বাঁধ উদ্বোধন করার সময়ে। সে এক উত্তাল সময়। বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেছে, রাজতন্ত্র বদলে নতুন রাষ্ট্র জন্মাচ্ছে সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ এবং আরো নতুন নতুন মন্ত্রে। তখন বিধান রায়ের আমলে ফারাক্কা ছিল দ্বিধাবিভক্ত বাংলার পশ্চিমে।
এক বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার মন্তাজ আলীকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। কথায় কথায় উনি যেদিন জানলেন মন্তাজের বাড়ি পঞ্চানন্দপুরে, সেদিন একটা পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও বাড়ি বানাতে!
পঞ্চানন্দপুর থেকে ফারাক্কা দেখা যায়না, প্রায় বিশ বাইশ কিলোমিটারের দূরত্ব। মন্তাজ আলী কান করেননি, কিন্তু বাঙালি ওই ইঞ্জিনিয়ার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, এমন কৌণিকভাবে ফারাক্কার গেটগুলো বানানো হচ্ছে, তাতে বাঁধ চালু হলে অবধারিত ভাবে জল গিয়ে একদিন ধাক্কা মারবে পঞ্চানন্দপুরে, আর মন্তাজের বাড়ি তখন থাকবে না। তবে হাতে সময় আছে, মন্তাজ যেন পঞ্চানন্দপুর ছেড়ে অন্য কোথাও বাড়ি বানায়।
না, মন্তাজ আলী ফারাক্কায় বাঁধ বানানোর টাকা কামিয়ে নতুন কোথাও বাড়ি বানাননি, উল্টে মাটির দেয়াল ভেঙে ইঁটের দেয়াল তুলেছিলেন, যাকে বলে পাকা বাড়ি। দিনরাত ঝালাই করতে করতে শুধু চোখটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। হাতে একটু টাকা পেলে নদী-মানুষেরা ব্যাংকে সেটা রাখে না, শেয়ার-বাজারে খাটায় না, বিয়ে-শাদির ব্যাপার না থাকলে সোনাদানাও কেনে না, আরেকটু জমি কিনে ফেলে। যেখানে বন্যার জল সরে গেলে মিহি পলির ওপর একটু বীজ ছড়িয়ে দিলেই রাইয়ের ক্ষেত হেমন্তের মরা আলোয় ঝলমল করে ওঠে। বর্ষায় পাটের চারা লিকলিকে কিশোরী শরীর দোলায়। না লাগে মনসান্তো, না লাগে বায়ের কোম্পানি।
কিন্তু সেই জমিটুকু চলে গেলে কি থাকে? মন্তাজ আলীর চোখের ছানি কাটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমার হাতে আর কিছুই থাকে না, থাকে শুধু একটা ক্যামেরা। ক্যামেরা খানিক দেখে, বেশিটাই পারে না।
নদী বিজ্ঞানী ডঃ কল্যাণ রুদ্র বলছেন আরেকজনের কথা। রবার্ট ওয়াসন, হিসেবে করে উনি বলছেন উত্তর আর মধ্য ভারত থেকে গঙ্গা বয়ে আনে অন্তত ৭৩ কোটি টন পলি, ৪০ কোটি চলে যায় পদ্মার স্রোতে, আর ৭ কোটি ঢোকে আমাদের পশ্চিম বাংলায়। ভাগীরথী আর ফারাক্কার Feeder Canal ধরে। বেশ, তাহলে মোটামুটি ৩০কোটি টন পলি যায় কোথায়? এবং, যদি এটা এক বছরের হিসেব হয়, তাহলে গত ৪৫ বছরে এই পরিমাণটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে; সত্যি বলতে কি, এ নিয়ে আমি কিছু বলতেও চাইনা; যোগ্যতাও নেই!
বরং বলি রেণুর কথা, যে থাকে জিয়াগঞ্জের বাঁধের ওপরে। ওখান থেকে ফারাক্কা দেখা যায়। রেণু বিড়ি বাঁধে আর একই সঙ্গে বাকি সব কিছুই করে, এরকম মাল্টিটাস্কিং নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। দিনে হাজার বিড়ি, যে ভাবেই হোক। কিন্তু বাঁধটা ভেঙে যাচ্ছে, আর ওর ঘরটা বাঁধের পেছনে। ফলে, ঘরে সারাক্ষণ হাঁটু জল। রেণু ভেবেছিলো আমি ভোট চাইতে এসেছি, এসে দাঁড়ালো একটা হাঁসুয়া নিয়ে!
রেণুর পেছনে আরো অনেকে, হাতে লাঠিসোটা সেটা বোঝাই যায়। সিদ্ধান্ত হলো আমাকে জলে ফেলে দেয়ার, যাতে কিনা আমি ওদের বাস্তবটা বুঝতে পারি। সাঁতার জানিনা এবং আরো বড়ো ব্যাপার ক্যামেরা জলে পড়লে সে দায়িত্ব কে নেবে? আমার স্থাবর অস্থাবর দিয়েও তো হয় না! ক্রমশ ভিড় জমলো, সেই রাতে আমি ছিলাম রেণুদের সঙ্গে। বাঁধ নতুন করে বানাতে হবে, এবং ওদের নদী থেকে দূরে সরে যেতে হবে, এই হলো আসল ব্যাপার।
নদীর ভাঙ্গনে জমি গেলে তার কোনো আইনী দাবি করা যায় না, কিন্তু ভাঙ্গনের আগে, উদ্বাস্তু করার আগে, সেটা করা যায়। নতুন করে বাঁধ বানানোর সরকারি অনুমতি এসে গেছে। রেণুর বাড়ি ভেঙে নতুন বাঁধ উঠবে, নতুন বাড়ি হবে ওদের। বস্তা বস্তা সিমেন্ট বালি রাখা আছে একটু দূরেই। ভারী বর্ষা নামবে একটু পরেই। রেণু চেষ্টা করছে যদি রাত্তিরে আমার একটা শোয়ার ব্যবস্থা করা যায়। তক্তাপোশটাকে বালির বস্তা টেনে এনে খানিক উঁচু করে, জলের ওপরে! ওরা শোবে বাঁধের ওপর। একরাতের ব্যাপার, রাত কাটলে আমি চলে যাবো, ওরা থাকবে কোথায়?
জানি না কিভাবে একটা খিল দেয়া দরজায় ঢোকার পর মা কালীর ছবি দেখলাম, পাশেই লক্ষ্মী, এবং কাবা, নজরুল ইসলাম। একরাতে আমার সীমান্ত পেরিয়ে আসার গল্প শোনা হয়ে গিয়েছিলো। নদী কোনো ধর্ম মানে না, কে কোন জাত সেসব জানে না, নদী শুধু খায়, মানুষ খায় রে বাবু, আর এইখানে মানুষ খায় মানুষকে।
উল্টো দিকে রাজশাহী। খালি চোখে দেখা মুশকিল, কিন্তু যায়, দেখা যায়। “ঐনে বাপো মায়ের দ্যাশ আমার, ঐনে আমার বাই থাকে, ঐনে অহনো উড়াল দেয় রে বাবু পুষ্যা কবুতর আমার !”
জবাব দিলো রেণুর মেয়ে। রেন্ডিপাড়ায়
রেন্ডিপাড়ায় ঢুকলাম মাহেন্দ্রক্ষণে, আকাশ থেকে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে মেঘের শুঁড় ধরে। একটু দূর থেকেও নদীর শরীরের গন্ধ পাচ্ছি। ভদ্র-মানুষেরা আর ঢুকলেন না। কয়েকটা ইঁট পেতে ঢোকার রাস্তা। ততক্ষণে খবর হয়ে গেছে, রেন্ডিপাড়ায় কোলকাতার বাবু ঢুকেছে। হাত ধরে টানাটানি, পা পিছলে পড়া, খিল খিল হাসি। জানি না কিভাবে একটা খিল দেয়া দরজায় ঢোকার পর মা কালীর ছবি দেখলাম, পাশেই লক্ষ্মী, এবং কাবা, নজরুল ইসলাম। একরাতে আমার সীমান্ত পেরিয়ে আসার গল্প শোনা হয়ে গিয়েছিলো। নদী কোনো ধর্ম মানে না, কে কোন জাত সেসব জানে না, নদী শুধু খায়, মানুষ খায় রে বাবু, আর এইখানে মানুষ খায় মানুষকে।
উল্টো দিকে রাজশাহী। খালি চোখে দেখা মুশকিল, কিন্তু যায়, দেখা যায়। “ঐনে বাপো মায়ের দ্যাশ আমার, ঐনে আমার বাই থাকে, ঐনে অহনো উড়াল দেয় রে বাবু পুষ্যা কবুতর আমার !”
আমি শুধু ভেসে যাচ্ছিলাম নদীর মাঝ বরাবর ধরে, যেখানে কাঁটাতার পাতা নেই কিন্তু একটা অদৃশ্য সীমান্ত ভেসে থাকে, নদীর মেদুর কোলে মেঘেদের ছায়া ভাসে আর ওরা উড়ে যায় একদেশ থেকে আরেক দেশে। ছায়াগুলো রোজ কিন্তু নিয়ম করে খান খান হয়ে ভেঙে যায় নজরদারি দুরন্ত স্পিডবোটের পরাক্রমে, আর দুপাড়ে চলে অনবরত পায়দল টহল। শক্তিশালী দূরবীন দৃষ্টি, এপার দেখে ওপার আর ওপারের শ্যেন দৃষ্টি এপারে। সামরিক উর্দির কাছে খবর পৌঁছোয় সাদাকাপড়ের হাত ধরে। খবরের সংকেত আর ফিসফিস হাওয়া ওড়ে নদী ঘিরে, ঘনায় অবিশ্বাস, বাড়ে সন্দেহ। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে পরিবার। এ এক পরাবাস্তব জগৎ, যা জানে শুধু সীমান্তবাসী মন, যে অতীত হারায়, যার বর্তমান বদলায় প্রতিদিন আর ভবিষ্যৎ হাতছানি দেয় প্রতিমুহূর্তে। রাডক্লিফ সাহেবের টানা লাইনটা লম্বায় বাড়ে না, সেটা ক্রমশ চওড়া হয়, ২০০ মিটার অব্দি ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’, ২ কিলোমিটার অব্দি সীমান্তরক্ষীদের নজরদারি ও আইনি কর্তৃত্বে, এখন সেটা হতে চলেছে ৫০ কিলোমিটার। সীমান্ত এভাবে ঢুকে পড়ে বাড়ির অন্দরমহলে আর মনের অন্দরে।
যেখানে সীমান্ত পুলিশ কেন, সাধারণ পুলিশেরও ঢোকার সাহস হয় না কোনোদিন। যেখানে ফেরারি আসামিরা নিরাপদে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। সরকারি ভাবে ভূতনির চর হলো পয়োস্তি জমি, যেখানে নুরুলের মতো একজন ভুলে যেতে পারে সে কটা মানুষ মেরেছে আর সরকার ভুলে যেতে পারে তার মাথার দাম।
ব্যাপারটা বদলে যায় যখন নদী ভাঙে
তখন নদীর মানুষের ঘর হারানো তো তারিয়ে খাবার মতো খবর। আসল খবর তখন ‘ওয়াকি-টকিতে’। সরে আসে সাময়িক সামরিক টহলদারি ব্যবস্থা। টনক নড়ে ওপরমহলে, শুরু হয় নদীকে বাগে আনার পরিকল্পনা, কেতাবি ভাষায় ‘River Management’। মন্ত্রীদের আনাগোনা বাড়ে, বাড়ে আমলাদের তৎপরতা, কাজে নেমে পড়েন ইঞ্জিনিয়াররা, ফিতে হাতে সার্ভেয়ররা। রেণু, মিনারুলরা দূর থেকে দ্যাখে, চেষ্টা করে দূর গ্রহ থেকে নেমে আসা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একবার কথা বলে দেখার। হাজার হলেও ওদের আঙুলের ছাপেই গদিয়ান ওনারা, এমনকি বাড়িতেও এসেছেন নির্বাচনের আগে।
কিন্তু ফল হয় না। ঠিকানা না থাকলে ভোটার কার্ড বাতিল হয়ে যায়, একটা মানুষ না-মানুষ হয়ে যেতে ওটাই যথেষ্ট। ভেঙে যাওয়া জমির রেকর্ড তো আছে, খাজনাও দেওয়া হয় নিয়ম করে! কিন্তু সবই তো ‘সিকস্তি’ জমি, তার কোনো দাম নেই, “পয়োস্তি হলে দেখা করবি”। আমার শব্দ ভাণ্ডারে আরো দুটো নতুন শব্দ যোগ হয়। তখনো NRC, CAA শব্দগুলো চালু হয়নি, ভোটার কার্ড না থাকলে বা বাতিল হয়ে গেলে আত্মহত্যার কথাও শুনিনি, এখন শুনছি।
১৯২২-২৩ সাল অব্দি গঙ্গা বয়ে যেতো তৎকালীন বিহারের রাজমহল থেকে বাংলার ফারাক্কা অব্দি মোটামুটি একটা সরল রেখায়। এখন যে মানচিত্র উপগ্রহ থেকে পাওয়া যায় তা অনেকটাই আলাদা। নদী সরে গেছে ক্রমশ উত্তরে। গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে, মানিকচক শঙ্করটোলা ঘাট পেরিয়ে সে যেন কথা বলতে চেয়েছে বোন কালিন্দ্র্রীর সঙ্গে, মূল ধারা মিলতে চেয়েছে শাখা নদীর সঙ্গে। মুর্শিদাবাদের উত্তরে মালদা, এই পথে ছিল অজস্র জনপদ, আমের বাগান, ধান আর পাটক্ষেত, অনেক পায়ে চলা রাস্তা, মন্দির মসজিদ, এমনকি প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়… কিন্তু হাত বদল হতে হতে রাজধানী এখন বন্দরনগরী কলকাতায়। নদী ইচ্ছেমতো এভাবে গতিপথ বদলাবে আর আমরা কি তাই মেনে নেবো? আমাদের হাতে প্রযুক্তি আছে , আছে বিজ্ঞান। কলকাতা বন্দর বাঁচাতে আর কি চাই!
নুরুল আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিল, বিজ্ঞান শব্দটার মানে কি। বিজ্ঞান হলো জ্ঞানের আগে একটা বিশেষণ, ‘বি’। ‘বি’ মানে বিশেষ। নুরুল পকেট থেকে দুটো পিস্তল টেবিলে রেখে একটু হেসেছিলো, ঝোলা থেকে বাকি জিনিস পত্তরও নামিয়ে রেখে স্পেশাল চা অর্ডার করে আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। যখন বিশেষণ বিচ্ছিন্ন হয় মূল শব্দ থেকে তখন এই ‘বি’ হয়ে ওঠে বিষ।
নুরুলের লেখাপড়া ক্লাস আট অব্দি। আমরা কথা বলছিলাম ভূতনির দিয়াড়ায়, যেখানে রাতের রোশনাই দিনের আলো ছাড়িয়ে যায়। যেখানে সীমান্ত পুলিশ কেন, সাধারণ পুলিশেরও ঢোকার সাহস হয় না কোনোদিন। যেখানে ফেরারি আসামিরা নিরাপদে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। সরকারি ভাবে ভূতনির চর হলো পয়োস্তি জমি, যেখানে নুরুলের মতো একজন ভুলে যেতে পারে সে কটা মানুষ মেরেছে আর সরকার ভুলে যেতে পারে তার মাথার দাম। ওই টাকাটা ও দিয়ে দিতে পারে সামনে রাখা অস্ত্রগুলোর একটা শব্দ তৈরি করে। নদীর পাড়ে এসব শব্দ একটু দূর থেকে শোনা যায়।
তখন নদী নির্বিকার ভাবে কাটতে থাকে তলায়, যেখানে বালি আর সময় ছাড়া কিছু থাকে না।
নদী পারের মানুষেরা বুঝতে পারে, একটা অদৃশ্য ঘূর্ণি ঘুণপোকার মতো তলায় তলায় পাক খায়। সাদা ফেনা ভেসে ওঠে, ওপরের পলি-স্তর হয়ে যায় ভঙ্গুর, ভারসাম্য হারিয়ে সে অপেক্ষা করে জলে মিশে যাওয়ার। ওপর মহল থেকে অর্ডার আসে, এক্ষুনি চাই ‘অ্যাকশন’, এতো মানুষের জীবন মরণ। ভাঙন রোখার জন্যে ওপরে পাথর চাপাও, কিন্তু আসবে কোথা থেকে এতো পাথর।
ফাটাও পাহাড়, রাজমহলে কি অভাব পাথরের? গুম গুম শব্দে আগ্নেয়শিলা চুরমার, পাথর তখন সোনার চেয়েও দামি।
কিন্তু নদীর মাঝখানটা তো আন্তর্জাতিক সীমান্ত-অঞ্চল, এই চরের ওপর দিয়েই তো রাডক্লিফ-লাইন চলে গেছে। এখানে মনুষ্য বসতি নিষিদ্ধ। প্রশাসনের মাথায় হাত, দু দেশেই। কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা যায় চরের অন্যদিকে ওদেশি ভিটেহারা মানুষেরা একই কান্ড ঘটিয়েছে। দফায় দফায় আলোচনা, লাঠি হাতে পুলিশ, রাইফেল হাতে সীমান্তরক্ষী কোনোকিছুতেই ওদের আন্তর্জাতিক আইনকানুন বোঝানো যায় না। ওদের কথা… নদী সরেছে, জমি নয়। ফলে খাজনা দেয়া জমির হক ওদের। এসব কুটকচালি চলার ফাঁকে অনুর্বর বালিতে বোনা গমের চারা বেড়ে ওঠে, রাইয়ের বোঁটা থেকে শিশির ঝরে পড়ে, পাটের খেত হাওয়ায় দোলে, ভোরে আজানের শব্দ ওপারের সঙ্গে মিলে যায়।
কথাটা বাড়িয়ে বলছি না, এটা তরিকুলের কথা। তরিকুল সোনার ব্যবসায়ী, সোনার দাম ও জানে নিক্তিতে ভরিতে। ভঙ্গুর নদীর পাড়ে পাথর চাপালে সেটা সবসুদ্ধু ভেঙে পড়তে সময় লাগে না। আর পাথরের হিসেবে কারচুপিও ধরা পড়ে না, পাথর তখন সোনা হয়ে যায়। তার ভাগ বাঁটোয়ারা ঠিকাদার ঠিক করে দেয়, নদীপাড়ের ইজারা তখন ওদের হাতে, প্রতিবাদ করলে নুরুল আছে।
প্রযুক্তি থেকে যুক্তি আর বিজ্ঞান থেকে জ্ঞান এভাবে খসে পড়ে লক্ষ-কোটি টাকার বিনিময়ে। গঙ্গা তখন দ্রৌপদী, তার ওপরে বাজি রেখে চলে প্রাচীন দ্যূতক্রীড়ার পুনরাভিনয়। সাক্ষী থাকে সবাই, নিঃশব্দে। জলে মিলিয়ে যাওয়ার আগে খাদানের ডিনামাইটের শব্দের প্রতিধ্বনি তোলে অজস্র বোল্ডার।
বাসরাস্তার ধারে প্রতি বর্ষায় লম্বা হয় ছাউনির সারি। বন্যা ভূমিকম্প আগুন জলোচ্ছাসে সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়, ভাঙ্গনে যাওয়া জমির জন্যে যায় না, কারণ আইনে নেই।
নদীর বুকে ডিঙিনৌকো বেয়ে ভূতেধরার মতো কিছু ভিটেহারা মানুষ বাঁশের লগি খোঁচাতে থাকে অনেক দিন ধরে। দিন কেটে মাস, মাস কেটে বছর, বছরের পর বছর। কি খোঁজে ওরা?
নদী যা নেয় তা আবার ফিরিয়ে দেয়, হারান মণ্ডল আর নজরুল শেখের ভিটের মাটি নদী আস্তে আস্তে করে নিজের বুকে জড়ো করে, চর জাগে। জ্যোৎস্নায় সাদা হাড়ের মতো হিম, দিনের আলোয় বালি চিক চিক করে। রুপোর হার যেন কেউ ফেলে রেখে গেছে জলের ওপর। সেই আলো ঝলসে ওঠে চোখে চোখে, পুরোনো চাদর শাড়িতে পুঁটুলি বাঁধা হয়। মাথায় সেসব চাপিয়ে পিঁপড়ের সারির মতো মানুষ চলে নদী পেরিয়ে। পিছু নেয় চতুষ্পদেরাও।
নতুন জেগে ওঠা চরে কি থাকে? বেঁচে থাকার মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই না। সময় লাগে নতুন বাড়ি বানাতে। বালিতে গর্ত করে খাবার জল তুলতে। হারিয়ে যাওয়া গ্রামের নকশা মাটিতে পেতে জমি ভাগ করতে। বিস্মৃত পরাশপুর গ্রাম এইভাবে চর-পরাশপুর হয়ে মানুষের কলকাকলিতে জেগে ওঠে।
কিন্তু নদীর মাঝখানটা তো আন্তর্জাতিক সীমান্ত-অঞ্চল, এই চরের ওপর দিয়েই তো রাডক্লিফ-লাইন চলে গেছে। এখানে মনুষ্য বসতি নিষিদ্ধ। প্রশাসনের মাথায় হাত, দু দেশেই। কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা যায় চরের অন্যদিকে ওদেশি ভিটেহারা মানুষেরা একই কান্ড ঘটিয়েছে। দফায় দফায় আলোচনা, লাঠি হাতে পুলিশ, রাইফেল হাতে সীমান্তরক্ষী কোনোকিছুতেই ওদের আন্তর্জাতিক আইনকানুন বোঝানো যায় না। ওদের কথা… নদী সরেছে, জমি নয়। ফলে খাজনা দেয়া জমির হক ওদের। এসব কুটকচালি চলার ফাঁকে অনুর্বর বালিতে বোনা গমের চারা বেড়ে ওঠে, রাইয়ের বোঁটা থেকে শিশির ঝরে পড়ে, পাটের খেত হাওয়ায় দোলে, ভোরে আজানের শব্দ ওপারের সঙ্গে মিলে যায়।
একসময়ে ওদের তো ছিল সবই। কিন্তু বিজলি, পাকা রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল ছাড়া এখন ওরা ফেরে সভ্যতার প্রাক-ইতিহাসে। চারদিকে জল, ওপরে খোলা আকাশ আর বেঁচে থাকার আশ্চর্য আনন্দ নিয়ে। তারার আলোয় পথ দেখা যায়, শেয়ালেরা সমস্বরে সময় জানায়। টিম টিম করে দুএকটা আলো জ্বলে। রোদে তেতে ওঠা নরম বালির ওপর দিয়ে হাঁটার কায়দা না জানলে এখানে যাতায়াত করা মুশকিল। মোষের গাড়ির চাকাও ঢুকে যায় সেই বালির বুকে। ঘাস নেই, জল নেই, লাল চোখে ফোঁসফোঁস করে প্রাণীগুলো, চাবুকের পর চাবুক; চোখের তারা উল্টে যায়, আর মাথার ওপর সূর্য তখন গনগনে একটা আগুনের গোলা।
এইরকম ভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমার আলাপ রুবেলের সঙ্গে। ভারী মিষ্টি দেখতে, বয়েস বারো কি তেরো। একটা স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে পরিষ্কার পোশাক পরে রোজ ও নদী পেরিয়ে চর থেকে আসে ভারতের মূল ভূখণ্ডে । সেখানেই ওর স্কুল। পুরোটা করতে পারে না, কারণ ওকে ফিরতে হবে নদী আর বালির প্রান্তর পেরিয়ে, পাঠকাঠির দেয়ালঘেরা একটা বাড়িতে। ফেরার সময় পোশাকটা পাল্টে নেয়, মাথায় থাকে একটা ২৫ -৩০ কিলো চালের বস্তা। সঙ্গে থাকে প্রাণের বন্ধু তহিজুল। পুরো রাস্তাজুড়ে অনেক গল্প। তবে তহিজুলের স্কুলটুলের বালাই নেই। এইবয়েসেই বিড়ির খুব নেশা। ওর মাথাতেও চালের বস্তা।
এভাবেই সময় আর সভ্যতা এগিয়েছে, বেড়েছে সম্পর্ক, সংস্কৃতির দেয়া নেয়া। দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশ, জলের ইন্দ্রজালে নদী সাগর পেরিয়ে এভাবেই মানুষ জড়িয়ে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু আজ সেই সনাতন ব্যবসার নতুন নাম ‘স্মাগলিং’। রুবেল আজ সীমান্ত অপরাধী। অজান্তেই, বা কিছুটা জেনেই জড়িয়ে গেছে একটা মাফিয়া চক্রের সঙ্গে, যেখানে তহিজুল জানে কোন ‘স্যারের’ কোন বন্ধ শুধু নয়, আরো বেশি বিপদ ঘটতে পারে। সীমান্তের সব ঘটনাই খবর হয়ে ওঠে না, বা উত্তীর্ণ হয়না খবর হয়ে ওঠার জন্যে। এসব রুবেল তহিজুলের পথচলতি গল্প হিসেবেই থেকে যায়, কোনো ‘রেকর্ড’ থাকে না।
প্রতিদিন এতো চাল লাগে কেন ওদের?
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার আগে, ভোরের আলো তখনো ফোটে না, রুবেল বেরোয় সেই বস্তা ঘাড়ে। মোবাইল ফোনে মিসড কল আসে তহিজুলের, ওরা ‘মিট’ করে ‘পয়েন্টে’। তখন কথাবার্তা ফিসফাস করে। পয়েন্ট পেরোতে হয় এজেন্টকে কমিশন অ্যাডভান্স দিয়ে। চেনা মুখ, অসুবিধে হয় না, শুধু অচেনা মুখ দেখলে এজেন্ট গামছায় মুখ বেঁধে নেয়। পয়েন্টের পরে পিলার, জমিতে বসে একটু অপেক্ষা, বাংলাদেশী সিম থেকে আরেকটা মিসড কল, ওরা ঢোকে ভিনদেশে। আরো বেশ খানিকটা রাস্তা, তখন হালকা আলো ফুটে গেছে। ওরা শুধু নয়, এবার চোখে পড়ে প্রায় সারা পরাশপুর, কিশোর, জোয়ান, মদ্দ। কেউ প্রায় বাদ নেই। বিরাট চালের বাজার বসেছে। দাম নিয়ে দরাদরি, বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো পাল্লায় বাটখারা চাপানো। হাতে আসে বাংলাদেশী টাকা, সেটা ইন্ডিয়াতে হাতে পেলে যেতে হবে হাজতে। তাই আবার এজেন্ট। তার এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে টাকা আর রুপির তোড়া। ডলারের দাম প্রতি মুহূর্তে বদলায়, মোবাইলে সেটা দেখা যায়। চালের দামের ওঠাপড়া তো আছেই, তার ওপর ডলারের ওঠাপড়া। ফলে জটিলতা বাড়ে, কিন্তু বিশ্বাসের দাম এতটাই যে ভুল বোঝাবুঝি মিটতে বেশি সময় লাগে না।
ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরির পর, এদেশে ইলিশ আগের মতন ওঠে না। ওদেশে পদ্মায় এখনো ওঠে। দামটাও অনেক কম। টাকা ভাঙ্গানোর আগে রুবেল আমার জন্যে একজোড়া ইলিশ কিনেই ফেলে। কেউ কিনছে শাড়ি, কেউ আবার বস্তাভর্তি রসুন। ওদেশে এগুলো সস্তা। এদেশে এনে বেচতে পারলে লাভ হয় একটু। চালের বস্তা নিয়ে যাওয়া আর রসুনের বস্তা মাথায় নিয়ে দেশে ফেরা, হাতে ঝোলে একজোড়া টাটকা ইলিশ।
নদী অনেক যুগ ধরে এটাই ওদের শিখিয়েছে, এসো হে, পারাপার করো আমার বুকে, আমি তোমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবো। এপারে পণ্য কিনে ওপারে বেচো, যাকে বলে ব্যবসা করা। মদের ব্র্যান্ড পছন্দ, সন্ধের আগে যেটা পৌঁছে না দিলে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে পারাপার করা এভাবেই সময় আর সভ্যতা এগিয়েছে, বেড়েছে সম্পর্ক, সংস্কৃতির দেয়া নেয়া। দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশ, জলের ইন্দ্রজালে নদী সাগর পেরিয়ে এভাবেই মানুষ জড়িয়ে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু আজ সেই সনাতন ব্যবসার নতুন নাম ‘স্মাগলিং’। রুবেল আজ সীমান্ত অপরাধী। অজান্তেই, বা কিছুটা জেনেই জড়িয়ে গেছে একটা মাফিয়া চক্রের সঙ্গে, যেখানে তহিজুল জানে কোন ‘স্যারের’ কোন বন্ধ শুধু নয়, আরো বেশি বিপদ ঘটতে পারে। সীমান্তের সব ঘটনাই খবর হয়ে ওঠে না, বা উত্তীর্ণ হয়না খবর হয়ে ওঠার জন্যে। এসব রুবেল তহিজুলের পথচলতি গল্প হিসেবেই থেকে যায়, কোনো ‘রেকর্ড’ থাকে না।
রুবেল একটু রোগাসোগা, কিন্তু স্কুলের নাটকে অভিনয় করতে পারে চমৎকার। তার ওপর ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল, অন্য দিকে বসে থাকা মেয়েরা চোখ টিপতো! রুবেল এখন টেনেটুনে পাস করে, ওর বইখাতাই নেই! চাল টানা রুবেল!
তহিজুলের চেহারা তাকিয়ে দেখার মতো, মাঠে ওকে ডিঙিয়ে… এমনকি সুনীল ছেত্রীকেও একটু ভাবতে হবে। গোল পোস্টে যাবি তো তার আগে আমাকে ডিঙা রে পাগলা!
এখন ওদের গোলপোস্ট বদলে গেছে, নাটকের মঞ্চটাও! সূর্য ঢলে পড়ার আগে ওদের শৈশব চলে আসে ঘাড়ের ওপর। বেআইনি চালের বস্তা বইতে হয় রাডক্লিফ লাইন পেরিয়ে, ওদের বয়ঃসন্ধির আলোআঁধারি চুরি হয়ে গেছে। ওরা জেনে গেছে প্রাপ্তবয়স্কের জগৎ, যেখানে একটা গোল করতে গেলে আগে একটা ‘মাল’ লাগে। আর সিগারেটে সেই আসল নেশা হয় না, নেশার জন্যে অন্য কিছু লাগে। যেখানে কলেজপাস বাবা নিজের ছেলেকে বলে, ‘লিখাপড়ার কুনো দাম নেই, স্কুলে যাবি বলবি তো হাড় ভেঙে দিবো। যা, গিয়ে চাল বহআ, নাইতো ঘরে ঢুকবি না’।
চাল ছাড়াও যায় গরু, মাংসের জন্যে। রাতের অন্ধকারে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার থেকে আসা মাংসল গরু নদী পেরিয়ে কাঁটাতার টপকে পার করে দিলে অনেক টাকা। ওপার থেকেও আসে মাংস, কিশোরী, কুমারীরা পাচার হয়, সেখানেও টাকা। আসে সোনা, আগ্নেয়াস্ত্র। আন্তর্জাতিক ভাবে সংগঠিত চক্র কাজ করে ভেতরে ওপরে।
গোমাংস ভারতের অনেক রাজ্যে নিষিদ্ধ, কিন্তু ঐসব রাজ্য ভারতকে গোমাংস রপ্তানির সেরা রাষ্ট্র হিসেবে গর্বিত করে ফেলে। আর সীমান্তে গরু পাচার করতে গিয়ে সফির বাবা বাড়ি ফেরে না, বুলেটে এফোঁড় ওফোঁড় লাশটা সকালে ছাড়িয়ে আনতে হয় পুলিশের হাত থেকে। জীবনবীমার টাকা পাওয়া যায় না, কারণ এ কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, যদিও ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কোনো কারণ লেখা থাকে না। স্কুল ছেড়ে আট বছরের সফির মাথায় ওঠে চালের বস্তা।
এভাবে চালু থাকে চরের জীবনচক্র
আরেকটা চাকা ঘুরতে থাকে সর্দি কাশির সিরাপ ‘ফেনসিডিল’ কে ঘিরে। ফেনসিডিল, সংক্ষেপে ‘ডিল’, সামান্য alcohol আছে, ট্যাবলেটের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ঝিমুনি আসে, মানে নেশা। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে মদ কেনাবেচা নিষিদ্ধ। নেশা করার জন্যে তাই সীমান্ত পেরিয়ে আসা ‘ডিল’। সায়া শাড়ির তলায় রবার ব্যান্ড দিয়ে ওষুধের দোকানের পেছনে গিয়ে শরীরে বেঁধে নেয়া, তারপর খেয়াঘাটে এজেন্টকে কমিশন। কমিশন ঠিকঠাক না দিলে হাজত এবং ‘পেনাল্টি’, ধরা পড়ার জন্যে। বালি পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটারের হাঁটা, শব্দ না করে। পেশিতে যতই রক্ত চাপ চাপ হয়ে জমে যাকনা কেন, নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছতে হবে চোরা আড়তে। নদী অবশ্য মেয়েদের পেরোতে হয় না, তার জন্যে জোয়ান পুরুষের দরকার। কলার ভেলায় ডিল সাজিয়ে ডুব সাঁতার দিয়ে দিয়ে নদী পেরোতে হয়, দূর থেকে দেখে মনে হবে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে। পারে থাকে সকেট বোমা হাতে আরেক দল, গল্প করে নিজেদের মধ্যে, হাসি ঠাট্টাও। দরকার পড়লে সীমান্তরক্ষীদের চমকাতে হয় মাঝে মাঝে, কামান দিয়েও গোলা ছুঁড়তে হয়, এসব ওদের কাছে ডালভাত। বোমা বাঁধতে গিয়ে দুয়েকজনের হাতপা যে যায় না তা নয়, তখন তাদের বৃত্তি বদলে যায়। ওরা তখন চরের চর, ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে, চেনা যায় না!
আসল বৃত্তি ছিল চাষবাস, নৌকো বাওয়া, জাল দিয়ে মাছ ধরা, ইলিশ হলে তো কথাই নেই। ছিল আমের বাগান, গোয়ালে গরু, ধানের মরাই, ভোরের আজান, সন্ধে বেলায় হরিসংকীর্তন। বাঁশিতে বাজতো পল্লীগীতির চেনা সুর। এখন আছে কান চেরা মিলিটারি বাঁশির হুঁশিয়ারি… যখন-তখন এপার থেকে ওপারে ছুরির ফলার মতো ছুটে যাওয়া, বুলেটের আওয়াজ ছোটে আরো দ্রুত; স্পিডবোটের আওয়াজের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি।
রাডক্লিফ লাইন ধরে শৈশব ভেসে যায়, পাশেই ভাসে ভাঙা বাড়ির চাল। যৌবন বিক্রি হয় অকাতরে আকছার, ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো নিরাপত্তা ভেসে যায় বার্ধ্যক্যের, প্রেম ভাসে দেয়ানেয়ার বিকিকিনিতে, তারুণ্য ভাসে বারুদের উত্তেজনায়, ভাসতে থাকা মেঘের ছায়া আটকে যায় ফারাক্কার ইস্পাতবন্ধনীতে, একটুকরো আশার কুহকে ফুটন্ত ভাতের গন্ধ বাষ্প হয়ে ভেসে যায় আকাশে অন্ধকারে। বৃক্ষহীন চরের প্রান্তরে পাখিরা বাসা বাঁধে বালি খুঁড়ে ছোট ছোট গর্ত বানিয়ে, শেয়ালেরা দূরে বসে সব দেখে। তবুও পালক গজালেই ডানা মেলে উড়ে যেতে পারে কয়েকটা ছানা। জীবনের ইন্দ্রজাল শুধু পাক খায় জল ঘিরে, জলের গভীরে।
জল জানে এই চর ক্ষণস্থায়ী, নদী জানে। এই চর ভেঙে সে বানাবে আরেকটা চর। তারপর আরেকটা। শুধু জানি না আমরা। নতুন কি বানাবো, নতুন কোন প্রযুক্তি হাতে আসবে। অঙ্গার-অবরোধী নতুন কি শক্তি আমরা হাতে পাবো যা দিয়ে বদলে দিতে পারবো হিমবাহের গলে নেমে আসা। যখন দুয়ারে ঢোকে অনিবার্য, তখন সে কিছুই মানে না। মানে না ধর্ম, মানে না জাতপাত, জলের উচ্ছ্বাসে নোয়ার নৌকো গিয়ে ঠেকে আরারাত পাহাড়ে, মৎস্য-অবতার আর মনুর কৃপায় আমরা বেঁচে থাকি যুগান্ত পেরিয়ে, যখন ভগীরথ শঙ্খনিনাদে মৃতভস্ম জাগিয়ে তুলে সেই চর প্রতিষ্ঠা করেন আর্য্য উপনিবেশ থেকে অনার্য্য ব্রাত্য ভূমিতে। যেখানে ঢোকে অচেনা নবীন ইউরোপ, পুরা থেকে অধুনা কালে। আর নতুন করে লেখা হয় এক উপমহাদেশের ইতিহাস। অনেক সহস্রাব্দ পেরিয়ে এসে আমরা ভুলে যাই অতীত।
ভুলতে আমাদের সময় লাগে না। নদী জানে, সভ্যতা আর উন্নয়নের চাপে আমরা ক্রমশ হয়ে পড়েছি প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন এক প্রজাতি! রুবেল জানে, সফি জানে, জানে বিলু, যার কথা আমি বললামই না!
‘ভাঙ্গন’ আর ‘মধ্যিখানে চর’ এই দুটো তথ্যচিত্র বানানোর জন্যে মালদা মুর্শিদাবাদে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, এই লেখা তারই স্মৃতিভাষ্য। কিছু নাম বদলে দিলাম, কারণ বুঝতেই পারেন। তথ্যে কিছু ভুল থাকলে সে দোষ পুরোটাই আমার। নদী-বিজ্ঞানী ড: কল্যাণ রুদ্র, নদীপ্রেমিকা এবং লেখিকা জয়া মিত্র আমাকে ঋদ্ধ করেছেন বারেবারে, জ্ঞানে, স্নেহ ও প্রশ্রয়ে। বই অনেক পড়েছি, তালিকা দিলাম না, তবে একটা বইয়ের নাম না বললেই নয়। ‘বাংলাদেশের নদনদী ও পরিকল্পনা’, শ্রী কপিল ভট্টাচার্য। তবে আমার পাঠাগার খুলে দিয়েছিলেন গঙ্গা-পারের মানুষ, অনেকেই নিরক্ষর। শুধু একজনের নাম বলি, কেদার-দা। পুরো নাম কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, উনিও বলেন নি। সবার নাম বলতে গেলে তালিকা দীর্ঘতর হবে বইয়ের তালিকার চেয়ে।